গ্রহাণু পৃথিবীর জন্য আতঙ্ক!

Posted on by 0 comment

 

46অনিরুদ্ধ ব্রতচারি: ১৯৯৭ এক্সএফ ১১ নামের গ্রহাণুটি প্রবল বেগে এগিয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে। ২০২৮ সালে পৃথিবীর কোনো শহর ধ্বংস হয়ে যেতে পারেÑ ঠিক এমন ভাবনায় আতঙ্কিত বিজ্ঞানীরা। বড় বিপদ দেখছেন পৃথিবীর। খুঁজছেন নিস্তারের পথ। হোক আজ, না হয় কাল। অবশ্য অন্যদল পরীক্ষা নিরীক্ষা গবেষণার পর নির্ভয় জানিয়েছেন। তারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির স্কেল মেপে প্রবলভাবে বলার চেষ্টা করছেন পৃথিবীর ক্ষতি করার মতো বিপুল সম্ভাবনা নেই এই গ্রহাণুর।
মহাবিশ্বে এখন গ্রহাণুর সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। এগুলো সারাক্ষণই পৃথিবীর আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। বিজ্ঞানের কঠিন হিসাব-নিকাশের যুগেও কোনো কোনো বিজ্ঞানীর দাবি, পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন করে তুলতে পারে ওই আছড়ে পড়া গ্রহাণুগুলো। এর বৈশ্বিক শক্তি বিশ্বের বৃহত্তম শহরগুলোকেও তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কারণ পৃথিবীর বুকে গ্রহাণুর আছড়ে পড়া কোনো কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের গল্প নয়। যে 47কোনোদিন তা বাস্তবে ঘটতেই পারে। এমনটাই আশঙ্কা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
একদল বিজ্ঞানী মনে করছেন, আজকের দিনে একটি সংঘর্ষই ছোট শহরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। ফলে আপাতত পৃথিবীর কাছে থাকা গ্রহাণুগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। মহাকাশে এমন ১ হাজার ৫০০-এরও বেশি গ্রহাণুর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা পৃথিবীর খুব কাছে রয়েছে। তবে এদের মধ্যে অধিকাংশই বিপজ্জনক নয়। পৃথিবীর দিকে এদের ধেয়ে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
নাসার দাবি এমন অনেক অচিহ্নিত গ্রহাণু রয়েছে, যা যে কোনোদিন ধেয়ে আসতে পারে পৃথিবীর দিকে। উল্লেখ্য, ১০৯ বছর আগে যে গ্রহাণুটি পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল, তা কিন্তু কোনো আগাম আভাস দিয়ে আসেনি। তাই এ বিষয়ে যে সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে, তা বলাই বাহুল্য।
৩০ জুন ছিল বিশ্ব ধূমকেতু দিবস। এ বিষয়টি নিয়েই ওইদিন  লুক্সেমবার্গে একটি সরল উপস্থাপনা দিয়েছেন ফিটজসিমোনস। এ দিনটি কেন ধূমকেতু দিবস তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান ফিটজসিমোনস উপস্থাপনায় ১৯০৮ সালের পুরনো ঘটনা তুলে ধরেছেন। ওইদিন সাইবেরিয়ার টুংস্কাতে একটি গ্রহাণু এসে আছড়ে পড়েছিল। অবিশ্বাস্য ওই ঘটনায় টুংস্কার প্রায় ২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি নতুন গ্রহাণুর অপঘাতের বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন। সচিত্র উপস্থাপনায় তিনি আরও জানিয়েছেন, নতুন নতুন গ্রহাণু পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়তেও পারে; নাও পারে। কারণ মহাকাশচারীরা জানিয়েছেন, মহাকাশ থেকে প্রায়ই দেখা যায় পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেক ধূমকেতু। কিন্তু এসব ধূমকেতুর বিচ্যুতির ফলে পৃথিবীতে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তবে টুংস্কার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না সেই বিষয় নিয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেন নি এই বিজ্ঞানী।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে পৃথিবীর সাথে প্রায়ই ধাক্কা লাগে মহাকাশে থাকা বিভিন্ন ধূমকেতু-গ্রহাণুর। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর ধরেই চলছে এমন সব ঘটনা। গবেষকরা জানিয়েছেন, বেশির ভাগ গ্রহাণুর আয়তন প্রায় ১ কিলোমিটার। বারবার ধাক্কা-ঘর্ষণের ফলে বর্তমানে এই গ্রহাণুগুলোর আয়তন ১৪০ মিটারে কমে এসেছে। তারপরও এগুলোর বিচ্যুতির ফলে পৃথিবীর জন্য বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তবে ১০০ মিলিয়ন বছরে এ ঘটনাটি একবার হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে এ ঘটনাটি ঘটলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতা।
১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বরের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পেসওয়াচ প্রোগ্রামে জিম স্কট জানিয়েছিলেন, ঘটনা সময়সাপেক্ষ হলেও গ্রহাণু এক্সএফ ১১ ক্রমেই পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে। আর তাতে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রহাণু ১৯৯৭ এক্সএফ ১১-এর আকার সম্পর্কে বলা হয়েছিল এটি বড় ব্যাসের এক মাইল লম্বা। ওই সময় আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ্যা কেন্দ্রের মাইনর প্লেট সেন্টারকে সতর্ক করা হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে গবেষণা করার পরে হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ব্রায়ান মার্সডেন ওই গ্রহাণুর কথা জানিয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, এই গ্রহাণুটির সাথে ২০২৮ সালের ২৪ অক্টোবর পৃথিবীর সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে একদল বিজ্ঞানী হাতে-কলমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন এই ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষাণিকটা ভুল রয়েছে। ব্রায়ান মার্সডেন জানিয়েছেন, কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ প্রকৃত দূরত্বে কিছু ভুল রয়েছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি যে এক্সএফ ১১ গ্রহাণুটি চাঁদের কাছাকাছি আসতে চলেছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর দূরত্বে আসার সম্ভাবনা কম।
গ্রহাণু এক্সএফ ১১ নিয়ে রয়েছে বিজ্ঞানীদের বিপরীতমুখী অবস্থানও। জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির এলিয়ানর হেলিন এবং কেনেথ লরেন্স বলেছেন, আগে যে ছবি পাওয়া গিয়েছিল তা দুর্ঘটনাবশত মিলেছিল। সংঘর্ষের সম্ভাবনা নেই। মার্সডেন এবং তার দল স্বীকার করেছেন যে তাদের দূরত্ব বিবেচনায় ভুল ছিল। হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ড্যান ড্যান ডব্লিউই বলেছিলেন, কোনো বিতর্ক ছিল না। আমরা কখনোই অসম্মতি দেখিনি। আমরা নিজেদের পরীক্ষায় দেখেছিলাম যে গ্রহাণুটি ৬০ হাজার মাইল দূরে চলে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সম্মিলিতভাবে বিশেষ পন্থা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা থেকে নিজের রক্ষা করা কঠিন। স্বাভাবিকভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নেই পৃথিবীতে। যার ফলে এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আর এ ঘটনার জেরে বেড়ে চলেছে পৃথিবীর তাপমাত্রাও। ১০০ মিলিয়ন বছরে এ ঘটনাটি একবার হয়। এ বিষয়টিকে রোধ করতে গেলে রাজনীতিবিদ এবং স্পেস এজেন্সির সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ এতে প্রয়োজন পড়বে বিপুল অর্থের।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা বলছে, গ্রহাণুগুলোর অবাধ বিচরণ ৯ থেকে ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। ফলে সব গ্রহাণুই পৃথিবীর জন্য হুমকি নয়।
লেখক : বিজ্ঞানবিষয়ক প্রাবন্ধিক এবং সমাজকর্মী

Category:

Leave a Reply