চলচ্চিত্রের উদ্ভব ও বিকাশ

Posted on by 0 comment

7নূহ-উল-আলম লেনিন:  বিশ্ব ইতিহাসে চলচ্চিত্র ১২১ বছর অতিক্রম করেছে। চলচ্ছবি (Motion Picture) ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। মানুষ ও প্রকৃতির বা যে কোনো অবজেক্টের স্থিরচিত্র ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছিল আরও আগে। কিন্তু স্থিরচিত্র দিয়ে আমাদের চোখের সামনে চলমান জীবন বা কোনো বস্তুর গতিময় অস্তিত্বকে জীবন্ত তুলে ধরা সম্ভব ছিল না। গতিময় বা চলিষ্ণু দৃশ্যাবলীকে ধারণ করার জন্য Motion Picture আবিষ্কার পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
‘চলচ্ছবি’-র ক্যামেরা আবিষ্কার হলেও তার সময়সীমা ছিল মাত্র এক মিনিট। ছবিটিতে মানুষ প্রকৃতি বা বস্তুর নড়াচড়া ও কর্মকা- ধারণ করা গেলেও সেগুলো ছিল নিঃশব্দ। পরবর্তীতে রিল আকারে প্রতি মিনিটকে পরস্পর সংযুক্ত করে ছবির দৈর্ঘ্য ইচ্ছেমতো প্রলম্বিত হয়। রিল সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত এক মিনিটের এই শব্দবিহীন বা নির্বাক চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা ছিল ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। উন্নত প্রযুক্তি এবং যন্ত্র-কৌশল আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সবাক চলচ্চিত্র বা সিনেমার অগ্রযাত্রা শুরু হয় তখনই।
চলচ্চিত্রকে বিনোদনের মাধ্যম এবং শিল্প (Industry) হয়ে উঠতেও অনেকগুলো পর্যায় পার হতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্মিত হয় ১৮৯৭ সালে। প্রথম স্থায়ী সিনেমা হল চালু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ১৯০৫ সালে। সেখানে প্রদর্শিত সিনেমাটির নাম ‘The Nickelodeon’। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ১৯১৪ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। সিনেমা ক্রমশ একটি লাভজনক শিল্পে রূপান্তরিত হয়।
সূচনায় সিনেমার জগৎ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অচিরেই ঔপনিবেশিক ভারতেও সিনেমা প্রদর্শন এবং চিত্র নির্মাণ শুরু হয়।
সেই উনিশ শতকের শেষ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৯৭-৯৮) ভারতের কলকাতা ও বোম্বে শহরে চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং ক্যামেরার কাজ শুরু হয়। কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়, সমগ্র আফ্রো-এশীয় অঞ্চলেই আমাদের মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন ছিলেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রকার। তিনি ছিলেন একাধারে প্রথম মোশন পিকচার ক্যামেরাম্যান, চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, প্রদর্শক, আমদানিকারক, চলচ্চিত্র সংগঠক এবং শিক্ষক। ১৮৯৮ সালেই তার নির্মিত এবং আমদানিকৃত ছায়াছবি কলকাতায় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়। তিনিই প্রথম উপমহাদেশে বিজ্ঞাপনচিত্র, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, তথ্যচিত্র এবং সংবাদচিত্রের জনক। বাংলা চলচ্চিত্রের এবং উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি চির-স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দেশভাগের আগে থেকেই বিভিন্ন হলে সিনেমা প্রদর্শন চলছিল। পর্যলোচনা করলে এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুর পর্বটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্বে, ১৯২৭ সালে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে। জগন্নাথ কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্তকে দেওয়া হয় ছবি নির্মাণের দায়িত্ব। ছবিটির নাম সুকুমারী। ১৯২৮ সালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। অম্বুজ কুমার গুপ্তের নির্মিত দ্বিতীয় ছবি ‘দ্য লাস্ট কিস’ বা ‘শেষ চুম্বন’। প্রদর্শিত হয় ১৯৩১ সালে ‘মুকুল সিনেমা হলে’। তারপর দীর্ঘ বিরতি। বাণিজ্যিক বা অন্যভাবে ঢাকায় আর ছবি নির্মাণ হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকা সফরে এলে তার সফরের ওপর একটি তথ্যচিত্র ‘ইন আওয়ার অব মিডস্ট’ তৈরি করেন নাজির আহমেদ। ১৯৫৪ সালে তিনি আরেকটি প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’ তৈরি করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয় কাহিনিচিত্র নির্মাণ। এটি ছিল ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের দ্বিতীয় পর্ব, যা আজও অব্যাহত আছে। আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। ছবিটি ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায়। তবে এই চলচ্চিত্রটির এডিটিং ও অন্যান্য স্টুডিও সুযোগ-সুবিধার জন্য নির্ভর করতে হয় লাহোরের ওপর। আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ মুজিবের উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে ঢাকায় প্রথম ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি)’ নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ফিল্ম স্টুডিও স্থাপিত হয়। এর ফলে ষাটের দশকজুড়ে ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ দ্রুত বিকশিত হয়।
ষাটের দশক উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যেতে পারে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত, ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবি এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হতো। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে যেমন, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানেও উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-অপর্ণা, বিশ্বজিৎ-সাবিত্রী (অন্য কেউও হতে পারে) জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশেও শুরুটা আশাপ্রদ ছিল। এখানে সপরিবারে দেখার মতো বাণিজ্যিক কাহিনিচিত্র তৈরি হতে থাকে। তখনকার বাস্তবতায় এখানেও শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠে। শিল্পমানের দিক থেকেও বাংলাদেশের ছবি ফেলনা ছিল না। প্রতিভাবান সব চলচ্চিত্র নির্মাতার আবির্ভাব হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত রুচি এবং বৈদগ্ধ্যের অধিকারী বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মাতাÑ আব্দুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, সালাহউদ্দিন, এহতেশাম, জহির রায়হান, কলিম শরাফী, সুভাষ দত্ত, বেবী ইসলাম, মহীউদ্দিন, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, খান আতাউর রহমান প্রমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের একটা চমৎকার ঐতিহ্য গড়ে তোলেন।

Category:

Leave a Reply