‘জনবান্ধব উন্নয়নমুখী ও সুষম বাজেট’

Posted on by 0 comment

PMউত্তরণ প্রতিবেদন:  প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এই বাজেটে দেশের প্রতিটি মানুষ উপকৃত হবে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। উন্নয়নের গতিধারা ও দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। ইনশাল্লাহ আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবই।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ২৯ জুন বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা এবং ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করে বলেন, অতীতের সকল সরকারের আমলের বাজেট ছিল বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর। উন্নয়ন বাজেটও ছিল বিদেশনির্ভর। কিন্তু আমরা দক্ষতার সঙ্গে প্রতিবার বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছি বলেই এবারের বাজেটে বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। আর উন্নয়ন বাজেটও আমরা নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এর মাধ্যমে আমাদের আত্মনির্ভরশীলতা এবং আত্মমর্যাদাশীলতা প্রমাণ করেছে। প্রতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও আমাদের অন্যতম সাফল্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমৃদ্ধির আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশেরÑ শিরোনামে এবার ৫ লাখ ২৩ লাখ ১৯০ কোটি টাকার সর্ববৃহৎ বাজেট দেয়া হয়েছে। গত ১০ বছরে সারাদেশেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রবৃদ্ধি অর্জনে যে ২০টি দেশ অবদান রাখছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম।
টানা দুই মেয়াদে দেশের উন্নয়ন-সাফল্যের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মানুষের গড় আয়ু ৬৫ থেকে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, মানুষের মাথাপিছু আয় ৫৪৩ থেকে ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অতি দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১১ ভাগে নামিয়ে এনেছি, ৪৫ ভাগ দারিদ্র্যকে ২১ ভাগের নিচে নামিয়ে আনতে পেরেছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, দারিদ্র্যের হার আগামীতে ১৬-১৭ ভাগে নামিয়ে আনব।
শেখ হাসিনা বলেন, অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণেই দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। মূল্যস্ফীতি আমরা ৫ দশমিক ৪ ভাগে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। যখন একটি দেশের প্রবৃদ্ধি উচ্চহারে বৃদ্ধি পায়, মূল্যস্ফীতি নিচে থাকেÑ সেই অর্থনীতির সুফল দেশের সাধারণ মানুষ ভোগ করে থাকে। এ-কারণে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। আর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন সমৃদ্ধ, বাজেটের জিডিপির ৫ ভাগ ঘাটতিও সহনীয়।
আগামী ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংসদ নেতা বলেন, ওই সময়ের মধ্যে মাথা পিছু আয় ২ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলারে উন্নীত এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের প্রতিটি মানুষ উপকৃত হবে। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ অব্যাহত রাখা হবে। কওমি মাদ্রাসাকে মূল শিক্ষার ধারায় ফিরে এনেছি। এরাও শিক্ষা শেষে দেশে-বিদেশে চাকরির পাবে। কারণ এরাও এদেশেরই সন্তান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারুণ্যের শক্তিকে সবচেয়ে প্রাধান্য দিচ্ছি। কারণ তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। বাজেটে কর্মসংস্থান বাড়াতে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। যুব সমাজের উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বাজেটে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব অত্যন্ত যুগোপযোগী। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠাতে শতকরা ২ ভাগ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, এতে প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হবে। তিনি বলেন, দেশের মোট শ্রম শক্তির বড় অংশই কৃষি খাতে নিয়োজিত। এক দশকে কৃষি খাতের উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছি এবং এ খাতে ব্যাপক সাফল্যে এসেছে। ২ কোটি ৮ লাখ কৃষক কৃষিকার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণের ভর্তুকি পাচ্ছে। ব্যাপক গবেষণার কারণেই দেশের কৃষি খাতে ফসলের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে।
প্রতি গ্রামে শহরের আধুনিক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার বর্তমান সরকারের গৃহীত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেয়াই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। দেশের সকল জনগণকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন দেশের ৯৩ ভাগ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।
দেশের রেল যোগাযোগের উন্নয়নে ৩০ বছরের মহাপরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছি, মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে দ্রুত রেল, নৌসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রামে দ্রুতগামীর ট্রেন চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছি।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে তার সরকারের সফলতার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে আমরা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিয়েছি। এখন ফোর-জি চলছে, ফাইভ-জি আনার পরিকল্পনা চলছে। আর দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনা খাত তৈরি পোশাক খাতে ১ ভাগ প্রণোদনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ওই শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা (সামরিক স্বৈরশাসক) ক্ষমতায় থেকে শুধু নিজেরা দুর্নীতি করেনি, দুর্নীতিকে সমাজে ব্যাধির মতো ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান বা নীতি হচ্ছে জিরো টলারেন্স। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের প্রচেষ্টা ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা যুগোপযোগী। আর ব্যাংকের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে হবে। কারণ ব্যাংকে উচ্চহারে সুদ থাকলে শিল্প খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিকশিত হয় না। আর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য অনেক প্রণোদনা রয়েছে, যা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। টানা তৃতীয় মেয়াদে বর্তমান সরকারের আমলে প্রস্তাবিত এই প্রথম বাজেট অত্যন্ত জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম বাজেট। এই বাজেট দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবে, উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন চায়। দেশের মানুষের কল্যাণ ও দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবই ইনশাল্লাহ।
কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় মানুষের অপ্রত্যাশিত কিছু অর্থ আসে। কিন্তু এই অপ্রত্যাশিত অর্থটা কোনো কাজে লাগানো যায় না। তাদের যদি একটা সুযোগ দেয়া হয়, যেন এই টাকাটা মূল ধারায় চলে আসে এবং সেটা জনগণের কাজে দেবে। কোথায় গুঁজে রাখবে বা বিদেশে পাচার করছে সেটাও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। সেজন্য সুযোগটা দেয়া হচ্ছে। তবে যদি দেখি সেখানে দুর্নীতি বাড়ছে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব এবং সেটার সুযোগ আছে। দুর্নীতিটা কখনও প্রশ্রয় দেব না। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জিরো টলারেন্স অব্যাহত থাকবে।

Category:

Leave a Reply