জাটকা সংরক্ষণ : নতুন সম্ভাবনা

Posted on by 0 comment

29রাজিয়া সুলতানা: অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশের নাম জাটকা। পরিযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী ইলিশ পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বড় বড় নদীর উজানে গিয়ে ¯্রােতপ্রবাহে ডিম ছাড়ে। ভাসমান ডিম থেকে রেণু বেরিয়ে এসব এলাকায় কিছুদিন থাকে এবং এখানেই খায় ও বড় হয়। ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে ওই ইলিশ পোনার দৈর্ঘ্যে ১২-২০ সেমি লম্বা হয়, তখন এদের জাটকা বলে। এই জাটকাগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। পরিণত ইলিশ হওয়ার জন্য জাটকাগুলো ফের সমুদ্রের দিকে পাড়ি জমায়। ওই সময়ে জেলেরা কোমর বেঁধে নেমে পড়ে জাটকা নিধনে। কিন্তু সরকার বর্তমান জাটকা সংরক্ষণ আইন করে তা প্রতিহত করেছে। কারণ ইলিশ উৎপাদন নিশ্চিত করতে জাটকা সংরক্ষণের বিকল্প নেই। সরকার ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করে আইন করেছে।
অর্থনৈতিকভাবে ইলিশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাছ। সুস্বাদু ইলিশের সুনাম বিশ্বব্যাপী। পদ্মার ইলিশের নাম শুনলে অনেকের জিহ্বায় পানি এসে পড়ে। পাশাপাশি ইলিশ উচ্চ উৎপাদনশীল একটি প্রজাতি। বড় আকারের একটি ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে। ইলিশ সারাবছর ডিম পাড়লেও সবচেয়ে কম পাড়ে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। আর সবচেয়ে বেশি ডিম দেয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। ইলিশের জীবনচক্র সমুদ্র ও নদীতেই বিদ্যমান। অপ্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ সমুদ্রে পৌঁছে বড় হয়। প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজননক্ষম ইলিশ জীবনচক্র পূর্ণ করার জন্য আবার নদীতে ফিরে আসে। বংশবিস্তারের জন্য একটি মা ইলিশ প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরিয়ে নদীতে পাড়ি জমায়।
নিজেদের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে মাছ ধরা অন্যায় নয়, তবে মা ইলিশ ও জাটকা ধরা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কারণ ইলিশ প্রথমত আমাদের জিআই পণ্য, দ্বিতীয়ত বিদেশে রপ্তানির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশই আসে শুধু ঝকঝকে রূপালি ইলিশ থেকে এবং জিডিপিতে এর অবদান ১ শতাংশ। যদি মা ইলিশ আর জাটকা সংরক্ষণ না করা যায়; তা হলে ধীরে ধীরে ইলিশ ফুরিয়ে যাবে। বর্তমান সরকার মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে এগিয়ে এসে যুগান্তকারী সাফল্য রেখেছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় কম-বেশি প্রায় সারাবছরই জাটকা পাওয়া যায়। তবে নদীর অববাহিকায় জানুয়ারি-এপ্রিলে বিপুল পরিমাণ জাটকা পাওয়া যায়। যদি জাটকা ধরা বন্ধ রাখা যায় তা হলে ইলিশের সর্বাধিক উৎপাদন হবে। তাই সরকার সাধারণভাবে নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি যেহেতু সারাবছরই জাটকা পাওয়া যায়; তাই সরকার বিধিবদ্ধভাবে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জাটকা ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জাটকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করতে সরকার ১১ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০১৭ পালন করেছেন। ‘জাটকা ইলিশ ধরবো না, দেশের ক্ষতি করবো না’ এই স্লোগানকে সামনে রেখেই পালিত হয়েছে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ। ইলিশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশ রক্ষায় কারেন্ট জালসহ অন্যান্য উপকরণ নির্মূলে ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে সারাদেশে এসব জাল পুড়িয়ে ফেলা হবে। এতে ইলিশ উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য আসবে। মৎস্য পরিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৯৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যমান আইন সংশোধন করে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধের পাশাপাশি মা ইলিশ সুরক্ষা আইনটি সঠিকভাবে সংশোধন করা হয়েছে। ফলে ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারছে। ক্রমেই বাড়ছে ইলিশ উৎপাদন। দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশই আসে ইলিশ থেকে আর জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় ৫ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, রপ্তানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। সরকার জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের দুর্দিনের কথা ভেবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল দিচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৬ জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি হারে ৩৭ হাজার ৭৮৮ টন ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে। পাশাপাশি তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৬১৫টি জেলে পরিবারকে তাদের চাহিদানুযায়ী নানা উপকরণ প্রদান করেছে। জাটকা রক্ষা করতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীতে আইন রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তায় সম্মিলিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ অভিযানে ৫ জেলায় মোট ২৬৫টি মোবাইল কোর্ট ও ৪৮৯টি অভিযান পরিচালনা করে ৮৩৩টি বেহুন্দি জাল, ৩০.৬৯ লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও ৬৮৮টি অন্য জাল জব্দ করা হয়েছে। সেই সাথে ৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করে ৪৪ জনকে জেল দেওয়া হয়েছে।
সরকারের কার্যক্রম উদ্যোগ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পরই ইলিশ উৎপাদনে রয়েছে যথাক্রমেÑ মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। এর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া বাকি ১০টি দেশেই ইলিশ উৎপাদন কমেছে। শুধু বাংলাদেশেই ইলিশ উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সূত্রমতে, ১৯৮৬-৮৭ সালে দেশে ইলিশ উৎপাদন হতো ১ লাখ ৯৫ হাজার টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টন। আগামী অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্যমতে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও গত বছর ইলিশ পাওয়া গেছে।
ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ভারতে ২০ শতাংশ, মিয়ানমারে ১৫ শতাংশ, আরব সাগর তীরবর্তী দেশগুলো এবং প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতে বাকি ৫ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছেন স্বাধীন স্বার্বভৌম সবুজ বাংলা। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চিত করেছেন অধিকারের নীল বাংলা। তার সুযোগ্য নেতৃত্বেই বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের অধিকারে এসেছে। আর এই নীল জলরাশি বাংলাদেশের সুবিশাল মৎস্য ভা-ার হিসেবে পরিগণিত। যেখানে রয়েছে ইলিশের অবাধ বিচরণ। জাটকা আরোহন বন্ধ করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায়ই গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। সরকারের উদ্যোগের সাথে সাধারণ মানুষও সচেতন হয়েছেন ইলিশ রক্ষায়। বাজারে গিয়ে জাটকা চোখে পড়লেই নানা প্রশ্ন করেছেন জেলেদের। কেউ কেউ ভয়ও দেখিয়েছেন। কেউবা জাটকা কেনা থেকে বিরত থেকেছেন। এক কথায় সম্মিলিত প্রয়াসেই জাটকা নিধন এই পর্যায়ে এসেছে, যা বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদনে নতুন দিগন্তের সূচনা করছে।

লেখক : কৃষিবিদ, গবেষক এবং সমাজকর্মী

Category:

Leave a Reply