জাতীয় শোক দিবস : শ্রদ্ধাবনত দেশ-জাতি

uttaranউত্তরণ প্রতিবেদন: ৪৩ বছর হয়ে গেল। মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এতটুকু ভোলেনি কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি। তার প্রয়াণ দিবসে গত ১৫ আগস্ট যেন শোকস্তব্ধ ছিল দেশের সব প্রান্তর। শোকাচ্ছন্ন নীরবতায় থমকে গিয়েছিল গোটা দেশ। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর নশ্বর শরীর কেড়ে নিলেও তার অবিনশ্বর চেতনা ও আদর্শ যে মৃত্যুঞ্জয়ী, ঘাতকের সাধ্য ছিল না ইতিহাসের সেই মহানায়কের অস্তিত্বকে বিনাশ করেÑ কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতি সর্বজনীন শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে প্রতিবছর তারই জানান দেয়। শেখ মুজিব বাড়ন্ত বটবৃক্ষের মতো ধাপে ধাপে বাঙালির সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। মৃত্যুর চার দশক পরও সমানভাবেই রয়েছেন সমুজ্জ্বল।
শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন শপথে বলীয়ান বাঙালি জাতি ৪৩ বছর আগের ভয়াল এক রাতের শোকাবহ স্মৃতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। এবার শ্রদ্ধা জানাতে আসা শোকার্ত মানুষের স্রোত থেকে প্রধান ৩টি দাবি উচ্চারিত হয়েছে সর্বত্র। তা হলো জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করতে জাতীয় কমিশন গঠন এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা। গোটা জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণের পাশাপাশি তার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ও ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় শপথও নিয়েছে।
এই দৃঢ় প্রত্যয় আর অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে পুরো জাতি ১৫ আগস্ট স্মৃতিভারাতুর হয়ে এবং বিনম্র চিত্তে শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে স্বাধীনতার মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় যথাযোগ্য মর্যাদায় ও নানা আনুষ্ঠানিকতায় দেশব্যাপী পালিত হয় জাতির পিতার ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। প্রাণের অর্ঘ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক একাত্তরের পরাজিত শক্তির দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও নির্মূল করে আরও উন্নত দেশ গড়ার শপথও নিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ। ইতিহাসের স্রষ্টা। তার আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। তাই ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তার আদর্শকে যে হত্যা করা সম্ভব হয় না তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে পঁচাত্তরের ঘাতক ও নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের জানিয়ে দিল জাতি। আদর্শিক বঙ্গবন্ধু যে চিরঞ্জীব তা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, দেশের পথে-প্রান্তরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা শোকার্ত মানুষের অস্বাভাবিক ঢল আবারও তা প্রমাণ করেছে। বাঙালি জাতি এতটুকু ভোলেন নি বজ্রকণ্ঠের এই মহামানবকে। যিনি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, লাখো শহীদের রক্তস্নাত লাল-সবুজের পতাকা। শুনিয়েছিলেন সেই অমর বাণীÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ছিল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশাসহ সর্বস্তরের শোকার্ত মানুষের ঢল। শহরজুড়ে দেয়ালে দেয়ালে শোকের পোস্টার। সর্বত্র শোকের তোরণ, কালো পতাকা, বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সেই ৭ মার্চের ভাষণ ও স্মৃতি জাগানিয়া গানে রাজধানীসহ পুরো দেশের পরিবেশটাই পাল্টে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের শহিদদের স্মরণের পাশাপাশি দেশের সর্বত্র শোকার্ত মানুষের কণ্ঠে ছিল অভিন্ন সেøাগানÑ ‘কে বলেছে মুজিব নাই, মুজিব আছে সারা বাংলায়’, ‘মুজিবের বাংলায় জামায়াত-শিবির-জঙ্গিদের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি।
জাতির পিতার শাহাদাতবার্ষিকী জাতীয় শোক দিবস পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়েছে। সকালে দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শোকের কর্মসূচি সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। পরে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

Category:

Leave a Reply