জানা-অজানা আতঙ্কের নাম : ডেঙ্গু

PM2রাজিয়া সুলতানা: চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছেÑ ডেঙ্গু থেকে বেশির ভাগ লোকই কোনো স্থায়ী সমস্যা ছাড়াই আরোগ্য লাভ করে। মৃত্যুহার চিকিৎসা ছাড়া ১-৫ শতাংশ এবং চিকিৎসা হলে তা ১ শতাংশেরও কম; তবে রোগের চরম পর্যায়ে মৃত্যুহার প্রায় ২৬ শতাংশ। অথচ সাধারণ মানুষের ধারণা ডেঙ্গু হলেও নিস্তার নেই। ডেঙ্গু এখন জনমানুষের কাছে এক মহাআতঙ্কের নাম। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজন সময়োপযোগী ব্যবস্থাপত্র।
আসলে ডেঙ্গু কী? ডেঙ্গুর সঙ্গে এডিস মশা এবং জ্বর শব্দটির নিবিড় সম্পর্ক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রোগীর গায়ে জ্বর আসবে। সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মম-লীয় রোগ। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের ৩-১৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, বমি, পেশি ও গাঁটে ব্যথা এবং চামড়ায় ফুসকুড়ি ওঠা। ঠিকঠাক ব্যবস্থাপত্র নিলে দু-সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গু থেকে আরোগ্য লাভ করা যাবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে। যাকে ডেঙ্গু রক্তক্ষরী জ্বর (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার) বলে। ফলে রক্তপাত হয়, রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় এবং রক্ত হতে প্লাজমার নিঃসরণ ঘটে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমও দেখা দেয়। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া। এক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু আশঙ্কাও থাকে। মূলত বর্ষার আগেই এপ্রিলে ডেঙ্গুর আবির্ভাব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোগটি মহামারীর দ্বারপ্রান্তে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন, মারা গেছে ৪১ জন। তবে বেসরকারি তথ্যমতে ১৮৫ জন।
আগস্ট মাসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা-এর মতে ঢাকা মহানগরীর ৪১টি হাসপাতালে ৩ হাজার ৩৩২ জন ও ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৮১৫ জন ডেঙ্গু রোগী নানা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়কালে ঢাকায় নতুন ভর্তির সংখ্যা ৭৬১ জন, হাসপাতাল ছেড়েছেন ৭৮৯ জন। ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি ৮৩৬ জন, ছাড়প্রাপ্ত রোগী ৯৩৯ জন। এ বছর ২৪ ঘণ্টায় সংক্রামিত হয়েছেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭১২ জন রোগী; যা একদিনে আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যার দিক থেকে নতুন রেকর্ড। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ধারণা করছে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হতেই ডেঙ্গু আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। বর্তমানে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য মহাদেশের ১১০টির অধিক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে বছরে ৫০-১০০ মিলিয়ন লোকের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রামিত হয়, যার মধ্যে ৫ লাখকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়; তাদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার জনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
চীনা মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়ায় (বিশ্বকোষ) বলছেÑ ডেঙ্গু ভাইসের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় জিন বংশের ২৬৫-৪২০ খ্রিষ্টাব্দে। যেখানে উড়ন্ত পতঙ্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত জলীয় বিষ উল্লেখ আছে। আর ১৭৭৯ সালে ডেঙ্গুর প্রথম প্রামাণিক উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন রাশ তার একটি রিপোর্টেÑ ব্রেক বোন ফিভার শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেন, যা ছিল ১৭৮০ সালের ফিলাডেলফিয়ার মহামারীর ওপর ১৭৮৯ সালে লিখিত। তিনি বিলিয়াস রেমিটিং ফিভার শব্দটিও ব্যবহার করেন। কালপ্রবাহে যা ডেঙ্গু হিসেবে ১৮২৮ সালে ব্যবহার শুরু হয়। ব্রেকহার্ট ফিভার এবং লা ডেঙ্গু একই ভাইরাসের ভিন্ন দুটি নাম। ডেঙ্গু শব্দের উৎপত্তি স্প্যানিস সোয়াহিলিÑ যার অর্থ ‘ডিঙ্গা’ হতে এসেছে। ডিঙ্গা অর্থ খুঁতখুঁতে বা সাবধানী, যা ডেঙ্গু জ্বরের হাড়ের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তির চলনকে বর্ণনা করে। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রীতদাসদের মধ্যে যাদের ডেঙ্গু হতো। ডেঙ্গুর ফলে তাদের ভঙ্গিমা ও চলন ডান্ডি (নৌকা)-র মতো হয়ে যেত। এই অঞ্চলে এ রোগটি ডান্ডি জ্বর নামেও পরিচিত।
প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু জ্বর রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমনÑ ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এটি বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এডিসবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এদেশের চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রোগের চিকিৎসা দিতে সেবার হিমশিম অবস্থা হয়েছিল। সে-বছর মৃতের সংখ্যাও প্রায় শত ছুঁয়েছিল। পরের বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সংখ্যা অনেক কমে আসে। ২০১৫ সালের পর ডেঙ্গু আবার বাড়তে থাকে। সে-বছর আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৭৭ জন। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বাড়ে। ইতিহাসে ডেঙ্গু মহামারীর প্রথম তথ্য জানা যায় চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৫-৪২০ অব্দে জিন সাম্রাজ্যের সময় এ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়।
বিংশ শতকের প্রথমভাগে ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস ও সংক্রমণ সম্পর্কে বিশদভাবে জানা যায়। এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও গবেষণায় উঠে এসেছে। মশক নিধনই বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রতিরোধের প্রধান উপায়। সরাসরি ডেঙ্গু ভাইরাসকে লক্ষ্য করে ওষুধ উদ্ভাবন হয়নি। এ নিয়ে এখনও বিস্তর গবেষণা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০টি অবহেলিত গ্রীষ্মম-লীয় রোগের অন্যতম একটি হিসেবে ডেঙ্গুকে চিহ্নিত করেছে।
সাধারণভাবে এই জ্বর উপসর্গবিহীন ৮০ শতাংশ, সাধারণ জ্বরের মতো সামান্য উপসর্গ ৫ শতাংশ। তবে জটিল এবং স্বল্প অনুপাতে এটি প্রাণঘাতীও বটে। রোগটিতে ইনকিউবিশন পিরিয়ড (উপসর্গসমূহের সূত্রপাত থেকে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময়) স্থায়ী হয় ৩-১৪ দিন; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা হয় ৪-৭ দিন। ডেঙ্গু আক্রান্ত বাচ্চাদের সাধারণ সর্দি এবং গ্যাস্ট্রো এন্টারাটাইটিস (বমি ও ডায়রিয়া) দেখা দেয়। বড়দের চেয়ে ছোটদের উপসর্গের তীব্রতা কম হলেও জটিলতার শিকার বেশি হয়। পাশাপাশি মেরুদ- ও কোমরে ব্যথা হওয়া এ রোগের বিশেষ লক্ষণ। সংক্রমণের কোর্সকে ৩টি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যেমনÑ প্রাথমিক, প্রবল এবং আরোগ্য।
প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অত্যধিক জ্বর, প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি। সঙ্গে থাকে বিরতিহীন মাথাব্যথা। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০-৮০ শতাংশ উপসর্গে রোগীর শরীরে র‌্যাশ দেখা যায়। যা দু-তিন দিনের মাথায় লাল ফুসকুড়ি হিসেবে দেখা দেয়। কখনও কখনও হামের মতো র‌্যাশও দেখা দিতে পারে। জটিল পর্যায়ে মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প রক্তপাতও হতে পারে।
রোগটির জটিল পর্যায়ে প্রচ- জ্বর হয়। যা সাধারণত এক থেকে দুদিন স্থায়ী হয়। বুকে এবং অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটিতে (বর্ধিত ক্যাপিলারি শোষণ ও লিকেজের কারণে) প্রচুর পরিমাণে তরল জমে। ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে যায়। গুরুত্ব¡পূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ হ্রাস পায়। ফলে শরীরে বিকলতা এবং রক্তপাত হয়। চরম পর্যায়ে (৫ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে) শক (ডেঙ্গু শক সিনড্রোম) এবং হেমারেজ (ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার) ঘটে। তবে সেকেন্ডারি ইনফেকশনে বিপদের মাত্রা অত্যধিক।
২০১৮ হতে বাংলাদেশ বিশ্বের নানা দেশে ডেঙ্গু জ্বরে নতুন একটি সমস্যা যোগ হয়েছে। ডেঙ্গুতে লিভার আক্রান্ত হওয়া। ফলে রোগী দুর্বল বোধ করে, খেতে পারে না, বমি হয়, লিভার ব্যথা করে। এটি সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পর পর দেখা দেয় এবং পাঁচ-সাত দিনও থাকতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগের লক্ষণের ওপরই মূলত চিকিৎসানির্ভর করে। কখনও বাড়িতে ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি; আবার কখনও বা হাসপাতালে ভর্তি করে ইন্ট্রাভেনাস থেরাপি বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন করতে হয়। সাধারণত ইন্ট্রাভেনাস হাইড্রেশনের প্রয়োজন মাত্র এক-দুদিন হয়। তবে তা নির্ভর করে- urinary output
প্রসারের আয়তনিক বিশ্লেষণের ওপর। আগ্রাসী মেডিকেল পদ্ধতি, যেমনÑ ন্যাসোগ্যাস্ট্রিক ইন্টিউবেশন, ইন্ট্রামাসকুলার ইঞ্জেকশন এবং আর্টারিয়াল পাংচার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রধান কারণ ডেঙ্গু ভাইরাস রক্ত জমাটকারী অনুচক্রিকা তৈরি হতে দেয় না। ফলে কারণ এতে রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। জ্বর ও অস্বস্তি কমাতে শুধু প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) ব্যবহার করা যাবে। আর NSAID যেমন- আইবিউপ্রোফেন এবং অ্যাসপিরিন এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এগুলো রক্তপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধী টিকা কয়েকটি দেশে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই টিকা শুধু একবার সংক্রমিত হয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই কার্যকর। মূলত এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ও কামড় এড়িয়ে চলাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫টি মৌলিক একমুখী নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সুপারিশ করেছেÑ
১. প্রচার, সামাজিক সক্রিয়তা, জনস্বাস্থ্য সংগঠন ও সমুদয়সমূহকে শক্তিশালী করতে আইন প্রণয়ন;
২. স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিভাগসমূহের মধ্যে সহযোগিতা (সরকারি ও বেসরকারি);
৩. সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার করে রোগ নিয়ন্ত্রণে সুসংঘবদ্ধ প্রয়াস;
৪. যে কোনো হস্তক্ষেপ যাতে সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে হয়, তা সুনিশ্চিত করতে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং
৫. স্থানীয় অবস্থায় পর্যাপ্ত সাড়া পেতে সক্ষমতা বৃদ্ধি।
জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে ঘাতক মশা এডিস। মশা নয়; আসলে কয়েক প্রজাতির এডিস মশকী (স্ত্রী মশা) ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। এদের দুটি প্রজাতি ‘Aedes aegypti, Aedes albopictus’ এই ভাইরাসের মূল বাহক। Aedes aegypti মেজর এবং Aedes albopictu মাইনর। চেনার উপায় হলো Aedes aegypti-এর ওপরের অংশে দুটি সাদা দাগ এবং Aedes albopictus-এ থাকে একটি সাদা দাগ। এদের পায়েও কালো এবং সাদা চিহ্ন রয়েছে। এদের জীবনচক্রে ডিম, লার্ভা, পিউপা, এডাল্ট বা পূর্ণবয়স্ক এই ৪টি পর্যায় রয়েছে। সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ১৯-২৬ দিন সময় লাগে। এরা লার্ভা ও পিউপা অবস্থায় সাইফন নামক অঙ্গের মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়। লার্ভা ও পিউপা অবস্থায় এরা যখন পানিতে থাকে তখন সাইফনটি পানিতে ভাসিয়ে রাখে এবং বাতাস হতে শ্বাসকার্য চালায়। পরিণত অবস্থায় স্ত্রী মশা মেরুদ-ী প্রাণীর, যেমনÑ স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং এমন কী কিছু মাছের শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে। তবে মানুষের আশপাশে এরা থাকতে পছন্দ করে। অর্থাৎ বাড়িঘরের কাছাকাছি এদের বাস। তাই এদের হাউস মসকিউটও বলা হয়। সক্রিয় থাকে কেবল দিনের বেলায় অর্থাৎ কামড় দেয়। প্রধানত সূর্যাস্তের দুই ঘণ্টা আগে এবং সূর্যোদয়ের দুই ঘণ্টা পর মানুষকে কামড়ায়।
১৯টি জায়গায় এডিস মশা বেশি বসবাস করে থাকে বলে জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞ ভুপেন্দর নাগপাল। এগুলো হলোÑ পুরনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাংক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম বা ব্যারেল, অন্যান্য জলাধার, পোষা প্রাণীর পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের ব্লক, ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, গাছের ফোকর ও বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদে, অঙ্কুরোদগম উদ্ভিদ, বাগান পরিচর্যার জিনিসপত্র, ইটের গর্ত ও অপরিচ্ছন্ন সুইমিংপুল। এডিস মশা খুব অল্প পানিতে (৫ মিলি বা এক চা-চামচ পানি) ডিম পাড়ে, যা পানি ছাড়াও প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। ডিমের সংখ্যা ৬০ থেকে ১০০। তবে এক জায়গায় এরা সব ডিম পাড়ে না। অর্থাৎ এরা খুবই স্মার্ট, যাতে এক জায়গার ডিম নষ্ট হয়ে গেলে অন্তত অন্য জায়গার ডিম থেকে বাচ্চা রেব হয়। ডিম পাড়ার পর তা অন্তত এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এই এক বছরের মধ্যে স্বচ্ছ পানি পেলে আর সেই পানি তিন দিনের অধিক থাকলে ওই ডিম থেকে এডিস মশার বিস্তার ঘটতে পারে। ডিম হতে লার্ভা বের হয় প্রায় দু-তিন দিন পর। এডিস মশাকে লাজুক মশা নাম দিলেও মন্দ হয় না। কারণ তাদের স্বভাবসুলভ আচরণ। দিনের আলোয় বের হয় না। লুকিয়ে থাকে সাধারণত টেবিল, খাট, চেয়ার, সোফাসহ বিভিন্ন ফার্নিচারের নিচে, ফাঁক-ফোকরে, জানালা-দরজার পর্দা বা ঝুলিয়ে রাখা জামা কাপড়ের আড়ালে, আলমারি, ওয়্যারড্রবের পিছনে, ঘরের কোনায়-কোনায়, যেখানে একটু অন্ধকার। এরা কখনোই ঘরের দেয়ালে বসে না।
ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস (Dengue Virus) একটি মশাবাহিত এক সূত্রক বা আরএনএ (RNA) ভাইরাস। যাদের প্রত্যেকেই রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। ভাইরাসটির একটি সেরোটাইপ সংক্রমণ করলে সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে রোগী আজীবন প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করে; কিন্তু ভিন্ন সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সাময়িক প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করে। পরবর্তীতে ভিন্ন সেরোটাইপের ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত হলে রোগীর মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। কয়েক ধরনের টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়। আসলে ভাইরাসটি বা এর আরএনএ (RNA) প্রতিরোধী এন্টিবডির উপস্থিতি দেখেই ডেঙ্গু ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়। এই ভাইরাসের প্রাথমিক ধারক মানুষ; কিন্তু মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীদের মাঝেও সংক্রামিত হয়। বাহক মশা একবার কামড়ালেই সংক্রমণ হতে পারে। প্রথমে স্ত্রী মশা ডেঙ্গু আক্রান্তর রক্তপান করে নিজে সংক্রমিত হয় ও পেটে ভাইরাস বহন করে। প্রায় ৮-১০ দিন পর ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য কোষে ছড়িয়ে দিতে পারে। যার মধ্যে আছে মশার লালাগ্রন্থি এবং শেষে এর লালায় চলে আসে। সারাজীবনের জন্য আক্রান্ত হলেও মশার ওপর এই ভাইরাসের কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না। যখন একটা ভাইরাস বহনকারী ডেঙ্গু মশা একজন ব্যক্তিকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি মশার লালার সঙ্গে চামড়ার মধ্যে প্রবেশ করে। চামড়ার মধ্যে রয়েছে ল্যাঞ্জারহান্স কোষ, যা ডেনড্রাইটিক কোষের সমষ্টি। এর কাজ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে শনাক্ত করা। আর ডেঙ্গু ভাইরাসটি সেই কোষেই বাসা বাঁধে। এরপর ভাইরাসটি ল্যাঞ্জারহান্স কোষে ভাইরাল প্রোটিন ও মেমব্রেন প্রোটিনের বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে শ্বেতকণিকাতে প্রবেশ করে। এরপর সেখানে প্রজনন করে এবং যা সারাশরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত কোষকে রক্ষার জন্য সাথে সাথে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি হলো দেহের সৈনিক। সঙ্গায়িত করলে দেহে বহিরাগত পদার্থের বা প্রতিরক্ষা-উদ্দীপকের (অ্যান্টিজেন) উপস্থিতির প্রত্যুত্তর হিসেবে দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্র কর্তৃক উৎপন্ন এক ধরনের ইংরেজি ওয়াই-আকৃতির (গুলতির মতো দেখতে) প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন জাতীয় পদার্থই হলো অ্যান্টিবডি। অ্যান্টিবডিগুলো প্রতিরক্ষা-উদ্দীপকগুলোকে শনাক্ত করে এবং এগুলোকে তাদের ওয়াই-আকৃতির বাহুদ্বয়ের অগ্রপ্রান্তগুলো মাধ্যমে আবদ্ধ করে দেহ থেকে বিতাড়ন করার চেষ্টা করে। অ্যান্টিবডিগুলো লক্ষ লক্ষ ধরনের হতে পারে। এগুলো দেহের লসিকাকোষ নামক এক ধরনের কোষে স্বাভাবিকভাবেই উৎপন্ন হয়। তবে সম্ভবত ডেঙ্গু ভাইরাসের এই পদ্ধতির গতি শ্লথ করে দেবার ক্ষমতা আছে। এরপরও অ্যান্টিবডি ভাইরাল প্রোটিনকে শক্তভাবে বেঁধে ফ্যাগোসাইটোসিস (বিশিষ্ট কোষ দ্বারা ভক্ষণ ও ধ্বংস) প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে। কিন্তু কিছু অ্যান্টিবডি ভাইরাসকে ভালোভাবে বাঁধে না এবং ভাইরাসকে ফ্যাগোসাইটের অংশে পরিণত করে ধ্বংস না করে আরও প্রতিরূপ বানাতে সক্ষম করে তোলে। আর তখনই ঘটে যত বিপত্তি। ভাইরাসের সংখ্যা যায় বেড়ে। ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রক্তনালীগুলোর রক্ষাকারী কোষ কাজ বন্ধ করা বা কাজ করার পরিবেশ পায় না। ঘটে রক্ত তঞ্চন-এর বিশৃঙ্খলা। রক্তনালী থেকে বুক ও পেটের গহ্বরে লিকেজ হয় আর কো-অ্যাগুলেশনে জটিলতা বাড়ে। অন্যান্য অঙ্গও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সংক্রামিত অঙ্গের কোষগুলো মারা যায়। এর ফলেই রক্তের অনুচক্রিকা ব্যাপক হারে কমে যায়। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর, এডিস মশা, ডেঙ্গু ভাইরাস সম্পর্কে করণীয় কি একটু জেনে নেই। মার্চ এপ্রিল মাসে আমাদের দেশে বৃষ্টি শুরু হয়। আর এডিস মশার উৎসের অন্যতম একটি বৃষ্টির জমা পরিষ্কার পানি। প্রতিরোধক ব্যবস্থা তখন থেকেই নিতে হবে। আর এজন্যই সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) ইউনিট ২০১৯-এর মার্চ মাসেই রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। জানুয়ারিতে তারা ঢাকা শহরে একটি জরিপ সম্পন্ন করে। যেখানে তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে লার্ভা এবং প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশার উপস্থিতি দেখতে পায়। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, তারা উভয় সিটি কর্পোরেশনকে আগামী মাসগুলোতে প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। তারা ভবিষ্যতের প্রকোপ হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করে ফেব্রুয়ারি থেকে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে। তদুপরি জরিপ বলে চিকিৎসক ও নার্সরাও রেহাই পায়নি এই রোগের হাত হতে। তাহলে আমাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও সাবধান হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রচুর পরিমাণে ডেঙ্গু সচেতনতামূলক হেলথ বুলেটিন বের করছে। এগুলো স্কুল-কলেজ তথা দেশের প্রতিটি মানুষের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণকে জানাতে হবে এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির ভিতর ও এর আশপাশের পানি জমা পাত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পানি ফেলে উল্টে রাখতে হবে। নিয়মিতভাবে সপ্তাহে অন্তত দুদিন পাত্রগুলো ঘষেমেজে পরিষ্কার করতে হবে। সিমেন্টের ট্যাংক, চৌবাচ্চা, ড্রাম, মটকা, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব ও সরা বা ঢাকনা, প্লাস্টিক বা টিনের ফেলে দেওয়া পাত্র, ফুলদানি, ফ্রিজের নিচে পানি জমার পাত্র, ছাদে ফেলে রাখা পাত্র, ডাব বা নারিকেলের খোল ইত্যাদি যেখানে পানি জমতে পারে, তা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এলাকার নির্মাণাধীন বাড়ি ও এর আশপাশের পানি জমার স্থান বা পাত্রগুলো সবসময় ঢেকে রাখতে হবে। নিয়মিভাবে কমপক্ষে পাঁচ দিন পরপর পানি পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এডিস মশার জীবনচক্রের সময় ১২-১৫ দিন। নির্মাণাধীন ভবনের প্রজননস্থল ধ্বংস করে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।
নির্মাণ শ্রমিক, গৃহপরিচারক বা পরিচারিকা, আবর্জনা পরিষ্কারকারী, নিরাপত্তাকর্মী সর্বোপরি পরিবারের সকল সদস্য এবং এলাকার বাসিন্দাদের এই কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাতে মশারি টানাতে হবেই। রেহাই নেই দিনের বেলাও। দিনের বেলায় ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবসময় মশারির ভিতর রাখতে হবে, যাতে কোনোভাবেই মশা কামড়াতে না পারে। তাছাড়া হালকা রঙের কাপড় পরিধান করতে হবে। শরীরের বেশির ভাগ অংশ যাতে ঢেকে থাকে, সে-ধরনের কাপড় বাছাই করতে হবে। মসকুইটো রিপেলেন্ট বা মশা নিবারক ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধক নেট ব্যবহার করতে হবে। এক কথায় ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে ইনসেক্টিসাইডও ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে এডিস মশার প্রজনন স্থান শনাক্ত করতে হবে। এরপর বিভিন্ন লার্ভিসাইড যেমনÑ টেমোফস, পারমেথরিন, টেট্রামেথরিন, ডেল্টামেথরিন, কেরোসিন, ডিজেল ইত্যাদি যে পানিতে লার্ভা থাকতে পারে সেখানে উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এই লার্ভিসাইড বাজারে যে নামে কিনতে পাওয়া যায়, তা হলোÑ টেমপার ৫০ ইসি, এমবোস, টেট্রামেথরিন, ডেসিস, জেট এ ওয়ান, ডিজেল। তবে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে উপরিউক্ত ৬টি লার্ভিসাইডের মধ্যে অর্গানো ফসফেট লার্ভিসাইট ১.৫ মিলিলিটার/লিটার মাত্রা সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং এতে পরিবেশেরও তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। যেহেতু আমরা মশার জীবনচক্র জানি তাই লার্ভা ধ্বংসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় সাত দিন পরপর লার্ভিসাইড স্প্রে করলেই হবে। আর পূর্ণাঙ্গ মশা মারার জন্য ফগিং সিস্টেমে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঁচ-ছয় দিন পরপর স্প্রে করতে হবে। এমনটা যাতে না হয়, কয়েক সপ্তাহ মশা নিধনকর্মীর কোনো দেখা নেই। এরপর তথাকথিত ওপরমহলের চাপে দিন-রাত কোনো ব্রেক না দিয়েই লোকসম্মুখে ইচ্ছেমতো মশা মারার ঔষধ স্প্রে শুরু, যাতে বাদ পড়ে না হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীও। এতে ভেঙে পড়বে আমাদের ইকোসিস্টেম। কারণ অনেক উপকারী পোকা মারা যাবে। রেহাই পাবে না সৃষ্টির সেরা জীব মানুষও। কীটতত্ত্ব বিভাগ অন্যভাবেও চেষ্টা করছে মশা নিধনের। যেমন- জমা পানিতে গাপ্পি ((Poecilia reticulata)) বা copepods-এর চাষ করে, যা মশার লার্ভা খেয়ে ফেলে। Wolbachia প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা মশার বংশকে আক্রান্ত করানোর চেষ্টা চলছে তোড়জোড়ে।
বসে নেই চিকিৎসাবিজ্ঞানও। চলছে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিরাময়ের প্রচেষ্টা। তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে ডেঙ্গু বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ। ডেঙ্গু ভাইরাসের ৪টি সেরোটাইপের সবগুলোর মোকাবিলা করতে পারে- এমন ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ওপর অনেকগুলো প্রকল্প কাজ করছে। সবশেষে কাজ চলছে ভাইরাস ইন হিবিটর তৈরির। এই ইন হিবিটর ভাইরাসকে চামড়ায়ই প্রবেশ করতে দেবে না। সেদিন আর দূরে নেই- যখন আমরা ডেঙ্গু জ্বরকে প্রতিকার ও প্রতিরোধ দুইই করতে পারব।

লেখক : শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com
কৃতজ্ঞতা : প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ, কীটতত্ত্ব বিভাগ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা

Category:

Leave a Reply