জেলহত্যার বেদনাবিধুর স্মৃতি

শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত।

PMবি. বি. বিশ্বাস: মাঝে মাঝে গুজব শোনা যেত যে, নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে বিশেষ করে জনাব তাজউদ্দীনকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে। জনাব তাজউদ্দীনের কানেও সে কথা পৌঁছেছিল। কিন্তু তবুও তাকে নির্বিকার দেখা গেল। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মাঠে প্রত্যহ তিন ঘণ্টা করে কাজ করেই চলেছেন।
শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত। পাছে যিনি এ খবর তাকে দিয়েছেন তিনি চিহ্নিত হয়ে যান। এজন্য বেগম তাজউদ্দীন দেখা করে যাওয়ার পরই তিনি ব্যাপারটি প্রকাশ করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই মনে করলেন যে, বেগম তাজউদ্দীন এ খবর দিয়ে গেছেন। এতখানি সুবিবেচনা তার ছিল।
১ নম্বর কামরার লোকদের কাছে পরে শুনেছি যে, এ খবর শোনার পর তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যবহারে বা কথাবার্তায় অবশ্য আমরা তা বুঝতে পারিনি। নিয়মিত দাবা খেলা চলছিল। জোর আত্মবিশ্বাস তার ছিল যে, এভাবে বন্দিজীবন বেশিদিন তাকে কাটাতে হবে না। সবসময় আমাদেরকে অনুরূপ আশ্বাসও তিনি দিতেন।
মাঠ পরিষ্কার করার কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অজস্র ইটের টুকরা মাটির সঙ্গে মিশে ছিল। নিজের হাতে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কাঁচি দিয়ে সেগুলি প্রায় সব পরিষ্কার করে ফেলেছেন। তিন-চারবার করে একেক জায়গা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন ঘাস লাগানোর পালা।
২ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে আমার জন্য অফিস কল এলো। ওইদিন ছিল রোববার। অফিস কলের কী কারণ থাকতে পারে চিন্তা করতে করতে পাহারাদারের সঙ্গে জেল অফিসে ঢুকলাম, শুনলাম জেলার ডেকেছেন।
জেলারের কামরায় ঢুকে দেখলাম, আরও চারজন লোক সেখানে বসা। তাদের কাউকেই আমি চিনি না। আমাকে কেন ডেকেছেন জিজ্ঞাসা করায় জেলার বললেন যে, তিনি দুঃখিত, আমাকে ঠিক ডাকেন নি। ডেকেছেন সিভিল সার্জন মি. সাহাকে। কিন্তু সাথে সাথে তিনি উপস্থিত অপরিচিত লোকদের কাছে আমার পরিচয় জানিয়ে দিলেন। ওই লোকগুলি খুব তীক্ষè দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। সাথে সাথে ফিরে আসলাম।
একটু দুশ্চিন্তায় পড়লাম। যে কাগজের টুকরা পাহারাদার নিয়ে এসেছিল তাতে আমার নাম পরিষ্কারভাবে লেখা। আমাকে না ডাকলে আমার পরিচয়ই বা ওই লোকগুলির কাছে দেয়ার কি আবশ্যকতা! ওই লোকগুলিই বা তীক্ষèভাবে আমাকে দেখল কেন! সবই আমার কাছে হেঁয়ালির মতো মনে হলো। নতুন জেলে ফিরে এসে দেখি জনাব তাজউদ্দীন বাইরে একটু ফাঁকা জায়গায় চেয়ারে বসে আছেন। খুব গরম। তদুপরি তিনি প্রায় ঘণ্টা তিনেক কঠোর পরিশ্রম করেছেন বলে সম্ভবত বাইরের হাওয়ায় বিশ্রাম করছেন। জেলগেটের ঘটনার কথা বললাম। তিনি হেসে উঁড়িয়ে দিলেন। বললেন, ও কিছুই নয়।
তখন আমাদের পুরনো রান্নাঘরটির টিনের চালে নতুন টিন দেয়ার তোড়জোড় চলছে। বাইরে রান্নার চুলো বানানো হবে। বাবুর্চিরা তাই মাঠ থেকে মাটি নিয়ে চুল্লি বানানো শুরু করেছে। জনাব তাজউদ্দীন ক্ষেপে উঠলেন। বাবুর্চিদের খুব গালিগালাজ করলেন। তিনি এত পরিশ্রম করে ইটের টুকরা ফেলে দিয়ে সুন্দর মাটি বের করেছেন, তা কি বাবুর্চিদের সুবিধার জন্য? তিনি কি তাদের বাপের চাকর ইত্যাদি। বস্তুত আমাদের ঘরের পশ্চিম দিকে আরও একটা মাঠ আছে। বাবুর্চিরা ইচ্ছা                   করলে সেখান থেকে অনায়াসে মাটি আনতে পারত। কিন্তু পরিশ্রম না করে একদম কাছের মাঠ থেকে মাটি নেয়াকেই     তারা বেশি পছন্দ করেছিল।
দুপুরে কিছুক্ষণ জনাব তাজউদ্দীনের সঙ্গে দাবাও খেললাম। তাকে যেন সামান্য অন্যমনস্ক মনে হলো। দুপুরে খাওয়ার পর ব্রিজ খেলতে বসলে জনাব কামারুজ্জামান আমাদের কাছে এসে কিছুক্ষণ বসলেন। তাস খেলতে আহ্বান জানালাম। কিন্তু না খেলে কিছুক্ষণ শুধু দেখবার কথাই বললেন। কিছুক্ষণ পর চলে গেলেন তিনি। জেলখানায় আসার পর থেকেই রাতে ভালো ঘুম হচ্ছিল না। প্রথমত এখানে অত্যধিক গরম। এক কামরায় প্রায় ২০ জন লোক থাকি। দক্ষিণ দিকে বড় বড় লাগানো দরজা ঠিকই; কিন্তু উত্তর দিকে ছোট একটা ভেন্টিলেটর ছাড়া আর কিছুই নেই। হাওয়া তাই ভেতরে ঢোকে না। তদুপরি আমাদের কামরার সামনেই সমান্তরালভাবে একটা সেলের দালান। দ্বিতীয়ত পারিপার্শ্বিকতায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন। এ মানসিক দুশ্চিন্তাও অন্য এক কারণ। এ ত্রিবিধ কারণে স্বভাবত ঘুম না হওয়ারই কথা।
বিশেষ করে প্রথম বেশ কিছুদিন গরমে অসহ্য কষ্ট পেয়েছি। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভ্যাস পায়জামা পরে শোয়া। পায়জামা পরার জন্য গরম আরও বেশি লাগত। তাই বাসা থেকে লুঙ্গি আনিয়েছি। দীর্ঘদিন পর লুঙ্গি পরে অনেকটা আরাম পেলাম। তুলনামূলকভাবে গরমও কম লাগল।
ঘুম কম হয় বলে মাঝে মাঝে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতাম। ভেলিয়াম-৫ আমার পক্ষে খুব সুবিধাজনক ছিল। ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে একটা ভেলিয়াম খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
হঠাৎ পাগলা ঘণ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। জেলখানায় কোনোরকম গোলযোগ বাধলেই জেল কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে দেয়। জেলে কোনো লোক হয় পালিয়ে গেছে অথবা কোথাও জেলবাসীদের মধ্যে মারামারি লেগেছেÑ এ ধরনের অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই পাগলা ঘণ্টি বাজানো হয়। কিছুক্ষণ পরই প্রজ্বলিত মশাল নিয়ে জেল পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করে ঘুরে বেড়ায়। তারপর আসে লাঠি নিয়ে দল বেঁধে। দরকার হলে লাঠিপেটাও করা হয়। পাগলা ঘণ্টার পর সবসময়ই হুইসেল বাজতে থাকে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ওইদিন রাত প্রায় ৩.৩০ মিনিটের সময় পাগলা ঘণ্টি বাজল। সাথে সাথে হুইসেলও বাজা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু ৪.১৫ মিনিটের মধ্যেও মশাল নিয়ে কোনো লোক এলো না। বাঁশি সমানে বেজেই চলল। আমরা খুব আতঙ্কিত হলাম। ঘরের সামনে দিয়ে যেসব জেল পুলিশ যাতায়াত করছিল, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বিশেষ কিছু বোঝা গেল না।
একজন জেল পুলিশ বলল যে, সে জেলগেট দিয়ে ঢোকার সময় ডিআইজির গাড়ি গেটে দেখে এসেছে। তার অনুমান, অতর্কিত পরিদর্শনে আসার জন্যই পাগলা ঘণ্টি বেজেছে। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘুমের ওষুধের ক্রিয়া তখনও আছে। একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হুড়মুড় করে কতকগুলো লোক আমাদের কামরায় ঢোকার শব্দে তন্দ্রা টুটে গেল। দেখি ১ নম্বর কামরার সকলেই আমাদের কামরায় ঢুকেছেন। কেবল নেই জনাব তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সকলেই দেখলাম ভয়ে কাঁপছেন।
কে একজন বাইরে থেকে বললেন, মনসুর আলী সাহেব আসুন, মনসুর আলী সাহেব!
ততক্ষণে বিছানার ওপরে উঠে বসেছি। দেখি, জনাব মনসুর আলী তাড়াতাড়ি একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ফালতু মোতালিবকে বলে একটা তসবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ক্ষীণ আলোয় তার চেহারা মলিনই দেখলাম। তাকে দেখার ভাগ্য আর কখনও হয়নি আমার। আমি মনে করলাম হয়তো বা রাজনৈতিক সমাধানকল্পে আলোচনা করার জন্য জনাব মনসুর আলীকে ১ নম্বর কামরায় নিয়ে গেছে। আমি আমার অভিমত ব্যক্তও করলাম। জনাব শেখ আব্দুল আজিজ রাগতভাবে বললেন যে, ঘটনা অন্যরূপ। আমি চুপ করে গেলাম।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে পরবর্তী ভবিতব্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সমস্ত কামরা নিস্তব্ধ, নিথর। প্রত্যেকের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জনাব মনসুর আলীকে আমাদের কামরা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর দু’মিনিট কালও অতিক্রান্ত হয়নি, হঠাৎ সমস্ত ঘর ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠল। এত কাছে থেকে আগে কখনও এমন আধুনিক সমর-অস্ত্রের গুলির আওয়াজ শুনিনি। কে যেন বলে ফেলল, ‘সব শেষ হয়ে গেল। সবাইকে মেরে ফেলেছে।’ দিশেহারার মতো আমরা দৌড়ে উত্তর পাশের বারান্দায় চলে গেলাম। বাইরে থেকে গুলি করলে এখানে অনেকটা নিরাপদ।
জনাব আজাহারউদ্দিন আহমদ প্রাক্তন এমপিএ এমন বেখেয়ালভাবে বিছানা ছেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন যে, মশারিসহ তিনি দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কাঁধের মাংস খানিকটা ছিঁড়ে ফেললেন। জনাব ফরিদ উদ্দিন আহমদ খাবার রাখার জন্য কোণের দিকে যে চৌকিটি ছিল তার নিচে ঢুকে গেলেন। সামনের দিকে মুড়ির টিন ও বাক্স এমনভাবে রাখা যে, বাইরে থেকে বোঝাই যাবে না যে, এর পেছনে কোনো লোক থাকতে পারে। আমি স্রেফ মাটিতে বসে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। সবাই যার যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। আমরা সবাই ধরে নিলাম যে, জীবন আমাদেরও             শেষ হয়ে যাবে।
এসব অস্ত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞ জনাব সাইদুর রহমান প্যাটেল বললেন যে, শব্দটা স্টেনগানের এবং একসঙ্গে অন্তত দুটো স্টেনগান দুটো চেম্বার খালি করেছে। অনেক দিন পরে ওই ঘরে ঢুকে ঘরের দেয়ালের গায়ে প্রায় ৫০টা বুলেটের দাগ দেখেছি।
১ নম্বর কামরার জনাব দেলওয়ার হোসেনের কাছে শুনলাম, অনেকক্ষণ একটানা বাঁশি বাজার পর হঠাৎ ওই কামরার বারান্দার তালা খোলার শব্দ শুনে সবাই আতঙ্কিত হলেন। ২ নম্বর তালা খুলে ঘরের দরজাও খোলা হলো। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। হঠাৎই একজন সুবেদার বলে উঠলেনÑ ‘আপনারা সকলে বেরিয়ে যান রুম থেকে। রুমে শুধু সৈয়দ সাহেব ও তাজউদ্দীন সাহেব থাকবেন।’ সকলে বেরিয়ে আসলেন। ছাত্রনেতা জনাব আব্দুল কুদ্দুস মাখনের শরীরে জ্বর ছিল। তাই তিনি গায়ে দেবার জন্য একটা চাদর খুঁজছিলেন এবং সে কারণে একটু দেরিও হচ্ছিল। কে একজন বলে উঠলেন, ‘ভেতরে কে আছে ধরে নিয়ে আয়।’
সবার অলক্ষ্যে জনাব তাজউদ্দীনও বেরিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তিন নম্বর কামরার সামনে থেকে তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সম্ভবত তিনি বুঝে ছিলেন, যে খবর তিনি পেয়েছিলেন, তা সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই একবার শেষ চেষ্টা করছিলেন। যদি ভিড়ের মধ্যে ৩ নম্বর কামরায় ঢুকে পড়া যায়। বিধি বাম। তা আর হলো না। তাকে ফিরে যেতে হলো সেই ১ নম্বর কামরায় যেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম একা বসে ছিলেন। ২ নম্বর কামরার একজন বললেন যে, জনাব মনসুর আলীকে নিয়ে যাওয়ার সময় সেখান থেকে জনাব কামারুজ্জামানকে নিয়ে যাওয়া হয় ১ নম্বর কামরায়। দরজার বাহির থেকে কে নাকি বলছিলেন, ‘কামারুজ্জামান, কামারুজ্জামানকে নিয়ে আস।’
কে একজন বললেন যে, তিনি শুনছিলেন, জনাব মনসুর আলীকে যখন ১ নম্বর কামরার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তো সেদিনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম।’ জনাব কামারুজ্জামানকে যখন কামরা থেকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়, তখন তিনি জায়নামাজের ওপর নামাজ পড়ছিলেন। পাগলা ঘণ্টা পড়ার পর প্রায় সকলেই যে যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকছিলেন।  ২ নম্বর কামরার কে যেন বলছিলেন যে, গুলি হওয়ার পর দুজনের মুখ থেকে কাতর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। একজন ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলছিলেন আরেকজন ‘মা মা’ বলছিলেন।
সামনে সেলের মধ্যে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে যিনি ১ নম্বর কামরার বরাবর সামনে থাকতেন, সম্ভবত তিনি বলেছিলেন যে, গুলিতে জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং জনাব কামারুজ্জামান সাথে সাথে মারা যান। তবে জনাব তাজউদ্দীন এবং জনাব মনসুর আলী বেঁচে ছিলেন। গুলির আওয়াজ আমরা শুনি প্রায় ৪.২০ মিনিটের সময়। তার পরপরই ফজরের নামাজের জন্য আজান পড়ে। সেলের লোকেরা বলছিলেন, কালো কালো পোশাক পরা লোকগুলি গুলি করে চলে যাওয়ার প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর অর্থাৎ ফজরের নামাজের পর আর একদল এসে বেয়োনেটে চার্জ করে সবাইকে। বেয়োনেট চার্জ করার পর অবশ্য আর কেউ বেঁচেছিলেন না। অনেকদিন পরে ওই ঘরের মেঝে এবং দেয়ালে বেয়োনেট চার্জের অনেক দাগ দেখেছি। ৩ নভেম্বর ভোরের দিকে একজন পাহারাদার এসে সংক্ষেপে জানিয়ে দিয়ে গেল, চারজনের মৃতদেহ ঘরের মধ্যে রয়েছে এবং রক্ত বারান্দা হয়ে সামনের ড্রেনে গড়িয়ে পড়ছে।
বেগম তাজউদ্দীন শনিবার দেখা করে গিয়েছিলেন। অসময়ের একটা কাঁঠালও দিয়ে গিয়েছিলেন। ডায়াবেটিসের রোগী হওয়া সত্ত্বেও জনাব তাজউদ্দীন রোববার সন্ধ্যার পর কাঁঠাল খেয়েছিলেন এবং কামরার সকলকেই খাইয়েছিলেন। যা কিছু বাড়ি থেকে আনত তিনি সবাইকে খাইয়ে তবে নিজে খেতেন। ওই দিন রাতে তিনি বেশ কিছুক্ষণ কোরআন শরিফ পড়েছিলেন।
২ নম্বর কামরার একজনের নিকট শুনলাম, জনাব কামারুজ্জামান ওই দিন মানসিক চঞ্চলতায় ভুগছিলেন। বেশ কয়েকবার বলেছেন, তাকে বোধহয় হত্যা করা হবে। জনাব তাজউদ্দীনের নিকট হত্যার কথা শোনার পর তিনি ওই গুজবে সত্যই বিশ্বাস করেছিলেন। চেয়ারম্যান জিম্মৎ আলীর গায়ের রং ছিল মিশমিশে কালো। ওই রাতে জনাব কামারুজ্জামান পাউডার দিয়ে চেয়ারম্যানকে সাজিয়ে অনেকক্ষণ আমোদ-ফুর্তি করেছিলেন।
২ নম্বর কামরার আরেকজনের কাছে শুনলাম, কালো পোশাক পরিহিত লোকেরা স্টেনগান প্রস্তুত করে ১ নম্বর কামরায় ঢুকলে জনাব তাজউদ্দীন বলে উঠেছিলেন, ‘একি করছেন! একি করছেন!’ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনাব তাজউদ্দীন ভাবতে পারেন নি ঘাতকের অস্ত্রে কারাগারে অসহায় অবস্থায় তার জীবনাবসান হবে। একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃহত্তম অবদান যাদের ছিল সেই চারজন নেতাকে আজ জীবন দিতে হলো কয়েকজন অপরিণামদর্শী সুযোগ সন্ধানী ঘাতকের হাতে। বাংলাদেশের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল কেউ বুঝল না। দেশবাসীকে তিলে তিলে মর্মে মর্মে অনুভব করতে হবে এ ক্ষতি। গোটা জাতিকে এর মাসুল দিতে হবে। বাঙালিকে কাঁদতে হবে। স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল মোহাম্মদী বেগ। এই মোহাম্মদী বেগই ছোটবেলায় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে একই মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছিলেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মৃত্যুর পূর্বে শুধু বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদী বেগ, তুমি!’ জুলিয়াস সিজারকে শেষ পর্যন্ত বন্ধু সহকর্মী ব্রুটাস অসি দিয়ে যখন আঘাত করেছিল, তখন তিনিও বলেছিলেন, ‘ণড়ঁ ঃড়ড় ইৎঁঃঁং!’ জানি না, নিহত চার নেতার মধ্যে অনুরূপ কেউ বলেছিলেন কি না তাদের ঘাতকদের সম্বন্ধে। নিষ্ঠুর গুপ্তহত্যার তদন্ত একদিন নিশ্চয়ই হবে। বিচারও হয়তো বা হবে। কিন্তু ফিরে আসবে না অমূল্য ৪টি প্রাণ আর কোনোদিন। এ ক্ষতি কত বড় বাঙালি একদিন বুঝবে। এ ক্ষতি অপূরণীয়। ৩ এবং ৪ নভেম্বর সারাক্ষণ আমাদের কামরার মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। সমস্ত নতুন জেল নিশ্চুপ, নিথর। শুধু মাঝে মাঝে তালা খুলে আমাদের খাবার দিয়ে যায়।
৪ তারিখে সকালের দিকে খবর পেলাম, মৃতদেহগুলি একটু ধোয়া-মোছা করে বাইরের বারান্দায় রাখা হয়েছে। ঘরটা পরিষ্কার করারও শব্দ পেলাম। আমাদের কামরার জানালা দিয়ে ১ নম্বর কামরার সামনের রক্ত মাখা কাপড়-চোপড়ও দেখা গেল। শুনলাম, এডিসি এবং এসপি এসে দেখে গেছেন। ঘরের এবং মৃতদেহগুলির ফটোও নিয়েছেন। ময়নাতদন্ত হয়ে গেল। ৪ তারিখে সন্ধ্যার দিকে বরফ ভাঙার আওয়াজ এবং বাক্স তৈরির শব্দও পেলাম। বাকি থাকল শুধু কবর দেয়া।
জেল কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানালাম মৃতদেহগুলি দেখার এবং শ্রদ্ধা জানানোর অনুমতি চেয়ে। একবার মনে হলো হয়তো বা অনুমতি পাওয়া যাবে। কিন্তু হলো না। রাত ১১টার দিকে মৃতদেহগুলি বাক্সবন্দি করে জেলগেটের দিকে নিয়ে গেল।
মুজিবনগরে একসঙ্গে কাজ করেছি দীর্ঘ ছয় মাস। জেলখানায়ও অনেকদিন একসঙ্গে কাটিয়েছে। সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভোগ করেছি। সকলে যেন এক পরিবারভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একের দুঃখে অন্যজন শুনিয়েছেন সান্ত¦নার বাণী। মাত্র ২০ হাত দূরে থাকা সত্ত্বেও আজ শোনাতে পারলাম না বিদায়ের বাণী, জানাতে পারলাম না শ্রদ্ধার্ঘ। এ যে কত বড় মর্মান্তিক, ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রাণস্পন্দন যেন থেমে গেছে আমাদের। গুমরে ফিরছে বোবা কান্না। ৩ নভেম্বর অনেকবার খবর দিয়েও জেল প্রশাসনের কোনো অফিসারকে আমরা পেলাম না। এতগুলি লোক অসহায়ের মতো নতুন জেলের মধ্যে কি অপরিসীম মর্মযাতনা ভোগ করেছি, একবার কেউ খোঁজ নিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ আমাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই এদের চাকরি।
রাত ৩টার দিকে হঠাৎ আমাদের কামরার দরজা খোলার শব্দ পেলাম। সারারাত কেউ ঘুমাই নি। আলো নিভিয়ে সকলেই চুপচাপ জানালার কাছে বসাÑ মৃত্যুডাক কখন আসে। জেল পুলিশের একজন একবার ঘরের বাতি জ্বালাতেও বললেন। কিন্তু কারও উঠবার ক্ষমতা ছিল না। বাতিও জ্বালানো হলো না, দরজা খোলার শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে উঠলেনÑ আবার কোন যমদূতের আবির্ভাব! না, ঘাতক নয়। জেলার নিজে তার অধঃস্তন কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে হাজির। দুরু দুরু বক্ষে সকলেই অপেক্ষা করছি। কিন্তু ২ নম্বর তালা খোলা হলো না। আমরাও একটু আশ্বস্ত হলাম। হঠাৎ ‘সামাদ সাহেব’ ‘সামাদ সাহেব’ বলে একটা আওয়াজ পেলাম। আবার সকলের হৃদকম্পন শুরু হলো। কিন্তু না। জেলার সামাদ সাহেবের সঙ্গে বিশেষ করে একটু কথা বলতে চান।
আমরা কেমন আছি জানতে চাওয়ায় সকলেই হতবাক হয়ে গেলাম। এত খবর দেয়ার পরও প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাকে পাওয়া যায়নি, তিনি রাত ৩টায় আমাদের খোঁজখবর নিতে আসবেনÑ এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। তিনি জানালেন যে, ২ নম্বর ক্যু ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক হয়েছেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীতও করেছেন। ১৫ আগস্ট তারিখের ক্যু-দলের সকলেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে হংকংয়ের দিকে চলে গেছেন। একটা কিছু হয়েছে, আমরা ওইদিন ভোরের দিকেই অনুমান করেছি। প্রায় এক ঘণ্টার মতো সারাক্ষণ মিগ উড়েছে। কেউ কেউ মিগকে সোজা ডাইভ দিতেও দেখেছেন। বুঝলাম, চূড়ান্ত খেলা তখনই হয়েছে।
পরবর্তীকালে বিমানবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের কাছে শুনেছি ওই দিনের ঘটনার কথা। তারা সেদিন অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেই কোর্ট মার্শাল করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২ নভেম্বর রাত ১২টার পরই ‘ক্যু’ দলটাকে জেনারেল খালেদ মোশাররফের দলের লোকেরা ঘিরে ফেলে। কিন্তু ট্যাঙ্ক তাদের দখলে থাকার দরুন কব্জার মধ্যে আনা যায় না। শেষ পর্যন্ত ৩ নভেম্বর ভোরে মিগ-এর সাহায্যে বোম্বিং করার ভয় দেখালে তারা আত্মসমর্পণ করে। তবে একটা শর্তে, তাদের সকলকেই সপরিবারে নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শর্ত মোতাবেক ৩ তারিখ রাত ১০-১১টার দিকে তাদের দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করে দেয়া হয়।
কেউ কেউ মনে করলেন, আমাদের মুক্তির লগ্ন সমাগত। জেল কর্তৃপক্ষের দেখা মেলাও ওই মতের সমর্থন করে। ইতোমধ্যেই আমরা বুঝে ফেলেছি, জেল কর্তৃপক্ষের আচরণ আমাদের ভবিষ্যতের মানযন্ত্র। যখন জেল কর্তৃপক্ষকে স্বাভাবিক সহানুভূতিসম্পন্ন দেখেছি তখনই বুঝেছি জেলের বাইরে এমন কিছু চলছে যা আমাদের পক্ষে শুভ। জেল কর্তৃপক্ষকে অহেতুক নির্দয় দেখলে এর উল্টোটাই আমরা ধরে নেই। জেল প্রশাসন যেন স্রোতের শেওলা। জল যেদিকে চলে শেওলাও সেদিকেই চলে। হাওয়ার সাথে চলে বলেই এর একটা নাম আমরা জেল বাসিন্দারা দিয়েছি ‘বাতাসী’। ৪ নভেম্বর রাত ১১টায় মৃতদেহগুলি জেলগেটে নিয়ে গেলে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এত কাছে থেকেও শেষবারের মতো একবার দেখতে পারলাম না। ওই রাতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের মৃতদেহ তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাসায় নিয়ে গেল। মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান সাহেবের মৃতদেহ পরের দিন সকালে তাদের দেশের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার হয়েছে বলে খবর পেলাম। আরও খবর পাওয়া গেল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের জন্য বায়তুল মোকাররমে গায়েবি জানাজা হওয়ার সর্ববিধ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। অজস্র লোকও সেখানে জমা হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহ আসলো না, আসলো সামরিক বাহিনীর হুমকি। সবাইকে ভয় দেখানো হলো যে, স্থান ত্যাগ না করলে গুলি করা হবে। ভগ্নমনে একে একে সবাই চলে গেলেন। সামরিক বাহিনীর লোকেরাই ওই দুজনের লাশ বনানীতে কবর দিলেন।
৫ নভেম্বর ভোর থেকে তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়িতে হাজার হাজার লোকের ভিড় হয় তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একপলক দেখার জন্য। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা বিমানবন্দরে অনুরূপ ভিড় হয়েছিল যখন মুজিবনগর হতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসে। সেদিন তিনি এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে আপন দেশে। আজ তিনি চলে গেলেন বিজয়ীর বেশে অজানা গন্তব্যে। আর তাকে দেখা যাবে না কোনোখানে।
[সংকলিত]

Category:

Leave a Reply