টুকরো কথা টুকরো স্মৃতি

uttarann

জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেখ হাসিনা ও আমার কিছু স্মৃতি
* নাসিমা হক

uttaranবয়স যত বাড়তে থাকে ছেলেবেলার স্মৃতি তত মনে ভিড় করে আসে। সেই স্মৃতির সঙ্গে ভিড় করে আমার স্কুল আজিমপুর স্কুল (বর্তমানে আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ও স্কুলের বন্ধুদের স্মৃতি। আমরা আজিমপুর গভর্নমেন্ট স্টাফ কোয়ার্টারে আসি ১৯৫৮ সালে। তারপরই আমি আজিমপুর স্কুলে ক্লাস ফোরে ভর্তি হই।
স্কুল কাছে হওয়ায় আমরা কখনও দলবেঁধে, কখনও একা হেঁটেই স্কুলে চলে যেতাম। স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। সে ছিল আমাদের আকর্ষণ। অবশ্য আজিমপুরে সব বাড়ির সামনেই ছিল বড় বড় মাঠ।
বন্ধুরা তখন যেমন ছিল তেমনি এখনও আমাকে ভীষণ টানে। আজকাল স্কুলের বন্ধুদের কোনো পুনর্মিলনী থাকলে সব প্রোগ্রাম বাদ দিয়ে হাজির হয়ে যাই। কখনও মিস করি না।
আমাদের বন্ধুদের অধিকাংশই নিজের নিজের পেশায় খুব সফল হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে সফল, সার্থক হয়েছেন শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা বলছি। শেখ হাসিনা আজিমপুর গার্লস হাইস্কুলে আসেন সম্ভবত ক্লাস সিক্সে। তার আগে ছিল নারী শিক্ষা মন্দিরে।
স্কুলের দিনগুলো আমাদের কেটেছে পড়াশোনার পাশাপাশি গল্পের বই পড়ে, আড্ডা দিয়ে আর দুষ্টুমি করে। হাসিনা সে-সময় অনেক দুরন্ত ছিলেন।
টিফিনের সময় স্কুলের মাঠে বসে দল বেঁধে আড্ডা দেওয়া ছিল আমাদের কাজ।
আমার মনে পড়ে ’৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ডাকে আমরা একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে মিছিলে চলে গিয়েছিলাম।
সামরিক শাসক আইয়ুব খান দেশে মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিল। আমাদের ‘সমাজপাঠ’ নামে একটি বইতে এসব পড়তে হতো। ক্লাস নাইনে সমাজপাঠ পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর লিখতে গিয়ে হাসিনা ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র কঠোর সমালোচনা করে অনেক কিছু লিখে দিয়েছিলেন। হাসিনা যে খুবই দৃঢ়চেতা ছিলেন এ তারই প্রমাণ।
স্কুল থেকে খবর পেয়ে পরে তার গৃহশিক্ষককে এসে স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল।
স্কুলের আরও স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে, ’৬৪ সালে আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল স্কুলে ধর্মঘট করানোর ও পিকেটিং করার। ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের স্মরণে ঐ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। আমরা স্কুলের সামনে পিকেটিং করেছিলাম। ছাত্রীদের বলেছিলাম আজ স্কুলে ধর্মঘট, তোমরা ফিরে যাও। ছাত্রীরা অবশ্য আমাদের কথা শোনেনি। আমরা সফল হইনি। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ভালোভাবে নেয়নি। শেখ হাসিনা, আমি, নাসিমুন আরা হক (মিনু), সুলতানা কামাল (লুলু), কাজল, হোসনে আরা বেগম (হেলেন)-সহ আমাদের মোট ১০ জনকে স্কুল কর্তৃপক্ষ শোকজ করেছিল। বাকিদের সকলের নাম এখন আর মনে নেই।
১৯৬৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ ইত্যাদি কাজে একদিন স্কুলে গিয়েছি। সে-সময় হাসিনা হঠাৎ বললেন চল্, সবাই আমাদের বাড়িতে যাই। ওর ভেতরে এমন স্বতঃস্ফূর্ততা ও আন্তরিকতা ছিল। আমরা সাতজনÑ হাসি, বেবী, হেলেন, বুড়ি, মর্জিনা, নাসেহা ও আমি হাসিনার সঙ্গে ওদের বাড়ি গেলাম। ৩২ নম্বরে। দুপুরে সেখানে ভাত খেলাম। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের পরিবেশন করে খাওয়ালেন। শেখ রাসেল তখন ছোট্ট শিশু। বিছানায় শোয়া ছিল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেগম মুজিব ও শিশু রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা।
সেদিন আমরা অনেক আড্ডা দিলাম, ছাদে ও বাগানে বেড়ালাম। ছাদে হাসিনা ওর কাকার ক্যামেরায় আমাদের ছবি তুললেন। সে ছবি আমার কাছে এখনও আছে।
এসএসসির পর আমাদের স্কুল পর্ব শেষ হলো। আমরা ভর্তি হলাম বকশীবাজারে গভ. ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ)। এখানে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো। আমি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। আমরা পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়লাম।
তখন ছিল আইউব-বিরোধী তথা সামরিক শাসনবিরোধী উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময়। আমি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাধারণ সম্পাদক (১৯৬৫-৬৬) নির্বাচিত হই। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রলীগের সাঈদা গাফফার। তখন কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী ছিল।
আমাদের সময়ে আমরা কলেজে শহিদ মিনার নির্মাণ করেছিলাম। প্রিন্সিপাল তা পরের দিন ভেঙে দিয়েছিলেন।
পরের বছর ১৯৬৬ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা ঘোষণা করেছেন। ৬-দফার পক্ষে সারাদেশে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে সহ-সভানেত্রী পদে শেখ হাসিনা নির্বাচন করেন ও বিপুল ভোটে জয়ী হন।
হাসিনা ছিলেন অত্যন্ত মিশুক স্বভাবের এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমাদের শামসুন্নাহার। আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুরা অনেকেই শেখ হাসিনাকে ভোট দিয়েছিল।
শেখ হাসিনা দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে সহ-সভানেত্রী হিসেবে ছাত্রী সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের জন্য ছাত্রদের সংগ্রামে মুখর।
বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের লড়াইয়ে উত্তাল। প্রতিদিন ছিল সংগ্রাম ও মিছিলের কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমবেত হয়ে সেসব মিছিল শুরু হতো। কলেজ থেকে হেঁটে গিয়ে আমরা মধুর ক্যান্টিনে সভা-সমাবেশে বা শহিদ মিনারের মিছিলে যোগ দিতাম। সেই উত্তাল দিনগুলোতে এসব মিছিলে আমরা একসঙ্গে অনেক হেঁটেছি। আমরা ছিলাম মিছিলের সহযাত্রী।
এই সংগ্রামই পরে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
তার রেশ ধরে ’৭০-এর নির্বাচন এবং পরে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেখ হাসিনা প্রথমবার ১৯৯৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আজ ২০১৮ সালেও শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী, একটানা ১০ বছর ধরে দেশের কা-ারি। সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে আমি আমার বন্ধু, আমাদের বন্ধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ, সুস্থ ও কর্মময় জীবন এবং তার সুখ, শান্তি ও সাফল্য কামনা করি।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র এবং নারীনেত্রী

টুকরো কথার সামান্য ইতিকথা
* কাজী রোজী

uttaran2১৯৬৫ সাল, তোমার সাথে আমার সখ্যকাল। গভ. ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ, কত কত বসন্ত চলে গেছে, বৈশাখ চলে গেছে, ছুঁয়ে গেছে রাজনীতির ঢেউ। বদলেছে দেশ কাল সময়ের প্রেক্ষাপট। প্রায় প্রায়ই সাক্ষাৎ হয়েছে আমাদেরÑ হয়েছে কুশলবিনিময়।
ভাব আর ভালোবাসার উচ্চারণগুলো এবং নান্দনিক শব্দগুলো কলেজের সীমানার কৃষ্ণচূড়ার ডালে আজও আছে অমøান স্মৃতিময় বিশ^াস ছুঁয়ে। বন্ধু, বেশিদিন আগের তো কথা নয়। এই তো সেদিন দারুণ ষাটের দশক, ’৬৫, ’৬৬, ’৬৭, ’৬৮, ’৬৯-এর আন্দোলনের দিন।
আমরা ক’জন সতীর্থ কলেজে শহিদ মিনার গড়ব ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু প্রিন্সিপাল আপা বাঁধ সাধলেন। তিনি আটকে রাখলেন আমাদের কয়েকজন সতীর্থকে। বাইরে থেকে প্রতিবাদ উঠল সতীর্থদের ছেড়ে দিন, আমরা কাজ করব। তারপর আমরা মুক্তি পেয়েছিলাম এবং তোমার মনে পড়ে বন্ধু, আমরা আমাদের স্বপ্নের শহিদ মিনার গড়েছিলাম। শহিদ মিনার গড়ার এই সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন হাসিনা, মিনু ও জেলী প্রমুখ বন্ধুরা ।
একা একা বসে থাকা, একা একা কথা বলা, তোমার স্বভাবে সেটা ছিল না তা আমি জানি। তবুও এগিয়ে যাওয়া ফুরত নাÑ কথাও ফুরত নাÑ ক্যান্টিনে বসে আড্ডাও ফুরত না। ক্যান্টিনবয় মোহাম্মদ আলী আমাদের তাগিদ দিত ‘ঘণ্টা শেষ হয়েছে বাড়ি যান আফারা, আমি রুম পরিষ্কার করুম’। মনে পড়ে বন্ধু, সিঙ্গাড়াটুকু রেখে দিয়ে তুমি বলতে ‘চলো যাই, ওদের কাজ ওদেরকে করতে দিতে হবে’। আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা।
বন্ধু হাজার কথা বলা যায়, লক্ষ কথা বলা যায়, তবু কিছু কষ্টের কথা নীরবে নিভৃতে রয়ে যায়। সেই কষ্টগুলো অন্যরকম কষ্ট। ঝড়ের আলামত আছে ঝড় দেখা যায় না। ভিন্ন ভিন্ন রূপে তোলপাড় করে কুঠুরি হৃদয়, জানি বন্ধু। নির্যাতনের বেহালা বাদকও থেমে যায় আমাদের কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে।
পৃথিবীতে কিন্তু এতটা এরকম কষ্ট সবার নেইÑ সবার হয় না। বারবার তোমার জীবনকে ধ্বংস করে দেবার এত অপচেষ্টা সবার থাকে না। এখন তুমি মানবতার মাতা। এখন তুমি উন্নয়নের রোলমডেল। শিশু নারী যুব-তরঙ্গের ভাষা বুঝে নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা দেওয়ার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছ তুমি দেশ এবং বিদেশের সর্বত্র। নৌকার হাল ধরে আওয়ামী লীগের পাল তুলে দেশের নির্বাচনের বিজয় গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য অনবদ্য তোমার ভূমিকা। তুমি জন্ম-জন্মান্তরের অদম্য প্রতিভূ একজন। হাজার কথার বনলতা মনজুড়ে থাকলেও সব কথা বলা যায় না। আমরা যে ক’জন সতীর্থ বন্ধু ছিলাম সবাই এখন কে কোথায় জানি না। তবে টোকা দিলেই ঝরে যাব এরকম ফুল আমরা নই। আমরা এখন সব বুঝি, সব জানি, সব টের পাই। আমরা এখন বাংলার টেকসই নারীকুল।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট কবি

বঙ্গবন্ধু-কন্যাকে নিয়ে টুকরো স্মৃতি
* ডা. দীপু মনি

uttaran3বঙ্গবন্ধু-কন্যা তখন গৃহবন্দি ধানমন্ডি পাঁচ নম্বর সড়কের সুধাসদনে। ২০০৭-এর সম্ভবত জুনের শেষ সপ্তাহ তখন। দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রবেশাধিকার নেই সেই বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজনরা দেখা করতে পারেন। আমি তখন সেই বাড়িতে প্রতিদিন যাই। যাই বঙ্গবন্ধু-কন্যার ব্যক্তিগত চিকিৎসক পরিচয়ে।
তার কিছুদিন আগেই একদিন হঠাৎ করেই আমাকে আটকে দেওয়া হয়েছিল তার বাড়ি থেকে দুই মোড় আগে পাঁচ নম্বর সড়কের মাথায়। প্রহরারত পুলিশ কিছুতেই যেতে দেবে না নেত্রীর কাছে। ওপরের নিষেধ আছে। শুধু আমাকে নয়, সবার জন্যই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য, বলেছিল পুলিশ। আমি ভেতরে নেত্রীকে ফোন করে জানালাম, ‘আপা, ঢুকতে দিচ্ছে না।’ নেত্রী অনুরোধ করতে বললেন তার নাম করে। শুনল না। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই চলল। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলো। নেত্রীকে বললাম, ‘কিছুই তো শুনছে না, তবে কি চলে যাব আপা?’ নেত্রী এবার বললেন, ‘ওকে বলো, তুমি আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তোমাকে ঢুকতে না দিলে আমি এখনই বেরিয়ে আসছি রাস্তা পর্যন্ত।’ শুনেই তটস্থ হয়ে পুলিশ সদস্যটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে বলল, ‘এই কথাটা তো আগে বললেই পারতেন। যান, ভেতরে যান। এরপর যখনই আসবেন, এই পরিচয়টাই দেবেন।’ সেই থেকেই সাথে সাদা অ্যাপ্রোন আর রক্তচাপ মাপার যন্ত্র ও স্টেথেস্কোপ নিয়ে রোজ সুধাসদনে আমার যাতায়াত। দুপুরের কাছাকাছি সময়ে গিয়ে নেত্রীর সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলের মধ্যে বেরিয়ে আসা, এই ছিল ১৬ জুলাই ২০০৭-এর ভোরে নেত্রী গ্রেফতার হবার আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিনের রুটিন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও গেছি সুধাসদনে। নিচতলায় শেখ জামাল ক্রীড়াচক্রের কর্তাব্যক্তি একজন দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি চলে যাবার পর নিচতলায় বসেই কথা হচ্ছে। নেত্রী আমাদের রেলপথ নিয়ে কথা বলছেন। রেলপথের উন্নয়ন নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে চলেছেন। কোথায় কোথায় রেলসেতু হবে, কোথায় ডাবল গেজ হবে, কোথায় নতুন রেলপথ হবেÑ এমনভাবে বলে চলেছেন যে তিনি যেন চোখের সামনেই সারাদেশের রেলপথের ছবিটি স্পষ্ট দেখছেন। তার স্বপ্ন আর পরিকল্পনার কথা শুনতে শুনতে আমি দু-চোখের পানি সামলাতে পারলাম না। রাগ আর কষ্টের অদ্ভুত মিশ্রণ। নেত্রী উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছি কেন হঠাৎ করেই। রাগে-দুঃখে বললাম, ‘আপনাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। দুদিন বাদেই হয়তো গ্রেফতার করে জেলে নেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহু বছর ক্ষমতায় থাকার পাঁয়তারা করছে। ঘরে-বাইরে শত্রুরা ষড়যন্ত্র করছে। আপনাকে মেরে ফেলবে সুযোগ পেলেই। আদৌ নির্বাচন হবে কি না, গণতন্ত্রে দেশ ফিরবে কি না বা ফিরলেও কত বছরে, তার কোনো হিসাব নেই। আর আপনি কি না বন্দিদশায় বসে বসে রেলপথের উন্নয়ন, সাধারণ মানুষের চলাচল আর দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের সুবিধার পরিকল্পনা করছেন। আপনাকে গ্রেফতার করবে না তো আর কাকে করবে?’ বলতে বলতে উত্তেজনায় চোখের পানি নাকের পানি একাকার।
নেত্রী সস্নেহে শান্ত অথচ খুব দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘একটুও ভাববে না। ওরা আমার কিছুই করতে পারবে না। আমার দেশের জনগণ ওদের শাসন মানবে না। ওরা নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। জনগণ আমাদের ভোট দেবে। আমরা সরকার গঠন করব। পরিকল্পনা সব তাই এখন থেকেই করে রাখছি, যেন দায়িত্ব পাবার পর সময় নষ্ট না করতে হয়।’ আমি অবাক হয়ে তার কথা শুনলাম। মনে পড়ল কর্নেল শওকত আলী চাচার কথা। ’৬৯-এ বঙ্গবন্ধু (তখনও এ উপাধিতে তিনি ভূষিত হননি) আগরতলা মামলায় তার সাথে আরও যারা অভিযুক্ত ছিলেন তাদের ফাঁসিতে ঝুলবার আশঙ্কার জবাবে বলেছিলেন, ‘ভাবিস না, জনগণ এ প্রহসনের বিচার মানবে না। আমাদের আন্দোলন করে মুক্ত করবে। তারপর নির্বাচন দিতে সরকার বাধ্য হবে। আমরা জিতব। আমাদের ক্ষমতায় যেতে দেবে না। যুদ্ধ হবে। আমরা স্বাধীন হব।’ আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নেত্রীর কথাগুলো কি পিতার কথার মতোই সত্যে পরিণত হবে? কোন দৈববলে মানুষ এমন ভবিষ্যৎ দেখতে পারে? ইতিহাসবোধ আর মানুষকে বুঝতে পারার গভীরতা এবং আত্মবিশ্বাস কতটা জোরাল হলে কোনো নেতা বা নেত্রী এমন ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন?
মনে পড়ে, চোখ বন্ধ করে স্রষ্টার কাছে নীরবে সেদিন প্রার্থনা করেছিলাম, পিতার মতোই বঙ্গবন্ধু-কন্যার কথাও যেন সত্যি হয়। আর শুকরিয়া আদায় করলাম আল্লাহর কাছে, এমন নেত্রীর কাছে থাকবার, তার স্নেহ পাবার, তার কাছে থেকে রাজনীতি শিখবার, তার কর্মী হিসেবে দেশের জন্য কাজ করবার সুযোগ তিনি দিয়েছেন আমাকে। আমি ধন্য।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম       যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জন্মদিনে অফুরন্ত শুভেচ্ছা
*  সিমিন হোসেন রিমি

uttaran4প্রকৃতি এক অপার রহস্যের ভা-ার। সৌন্দর্যের অনন্ত এক লীলাভূমি। নীল আকাশ, উন্মুক্ত সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত, বনাঞ্চল, সবুজের অফুরন্ত সমারোহ। কী দারুণ শৃঙ্খলা প্রকৃতিতে। এই সমস্ত কিছুর মাঝেই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রাণের অস্তিত্ব নানা রূপে, বর্ণে, আচ্ছাদনে। যেখানে মানুষ মূল ভূমিকায়। এই মানুষ তার জীবন গড়ে, সমাজ গড়ে, রাষ্ট্র গড়ে। কবি নজরুলের অমর লেখনীর ছন্দে সুর বেজে ওঠেÑ “খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাটো শিশু আনমনে, খেলিছো…।”
এই ভাঙাগড়ার খেলায় যুগে যুগে, দেশে দেশে, ভিন্ন ভিন্ন সমাজে, অঞ্চল ভেদে প্রয়োজন হয় দক্ষ নাবিকের। যিনি শক্ত হাতে হাল ধরেন একটি সময়ের। সৃষ্টিকর্তা জানেন তিনি কখন কাকে দিয়ে কোন কাজটি করাবেন। কে হবে সেই নাবিক। তেমনি এক দক্ষ নাবিকের ভালোবাসার স্পর্শে আজ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। শুভ জন্মদিন প্রিয় মানুষ, প্রিয় বোন শেখ হাসিনা।
রাত-দিনের কোনো ভেদাভেদ নেই। কাজ, কাজ, শুধু কাজ। ক্লান্তিহীন বিরামহীন কাজ। বাংলার অনন্য বীর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর আকাক্সক্ষা ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন আমাদের বোন শেখ হাসিনা। এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন-অর্জন সকল কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। তার দৃঢ় কর্মোদ্যোগী নেতৃত্বে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। ১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে একটি মানুষও না খেয়ে থাকে না আজ। নিভৃত গ্রামের প্রান্তিক নারী আজ ঘর থেকে দুই পা বাড়ালে কমিউনিটি ক্লিনিকে পৌঁছে যায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়। দরিদ্র মানুষ আজ বিশ্বাস করার সাহস পায় ভবিষ্যতে সে আরও উন্নত জীবন পাবে। বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয় অন্ধকার রাত। মানুষের জীবনের অতি প্রয়োজনীয় এই বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। বিদ্যুতের এই আশাতীত কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বাংলাদেশের মানুষ আরও অনেক বড় স্বপ্নের জাল বোনে।
আমি যতবার দেখি প্রিয় আপার মুখ, আনন্দ-বেদনার দোলাচালে আমার মন দৃষ্টি মেলে আকাশের সীমাহীন বিশালতায়। বিস্মিত হই আমি বারবার। রবীন্দ্রনাথে স্বস্তি মেলে। আশ্চর্য কয়েকটি শব্দÑ “অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার বক্ষে বেদনা অপার”। কী অসীম ধৈর্য দিয়ে প্রাণান্তকর নিদারুণ নিষ্ঠুর বেদনাকে পাথর চাপা দিয়ে প্রতিমুহূর্তে চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। সকল মানুষের নিশ্চিন্ত সুখী আনন্দময় জীবন গড়ে তোলার প্রত্যাশায়। অঝর ধারার বেদনার নিজ অশ্রুকে আড়াল করে অন্যের অশ্রুমোচনে ক্লান্তিহীন তিনি। আমার কখনও মনে হয় ডিজনি সিরিজের ‘লায়ন কিং’য়ের সিংহ শাবক ‘সিম্বা’ তিনি। অপশক্তি আর নিকটজনের তীব্র ষড়যন্ত্রের মধ্যদিয়ে পিতার হত্যায় নির্বাসিত, বিতাড়িত সিম্বা। দেশজুড়ে চলতে থাকে অনাচার পিতার শারীরিক মৃত্যু হয়; কিন্তু ‘প্রমিজ ল্যান্ডের’ ভালো থাকার আকাক্সক্ষা, পিতার সেই আদর্শের মৃত্যু নেই। সময়ের ডাকে সাড়া দেয় সিংহ শাবক পিতার আশীর্বাদ স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব হয়ে পথ নির্দেশ করে তাকে। জয়ী হয় সিম্বা। নতুন ভোরের আলোয় আলোকিত হয় দেশ।
শুভ জন্মদিন আপা। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, অফুরন্ত শুভকামনা।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকর্মী
নোট : ছবি দুটি নাসিমা হকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

Category:

Leave a Reply