ডেঙ্গু জ্বর : আছে সহজ প্রাকৃতিক চিকিৎসা

PM2আলমগীর আলম: দেশজুড়ে এখন আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। এই জ্বর যা ব্রেকবোন ফিভার নামেও পরিচিত, একটি সংক্রামক ট্রপিক্যাল ডিজিজ, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অসুখটি প্রাণঘাতী ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভার-এ রূপান্তরিত হয়, যার ফলে রক্তপাত, রক্তের প্লাটিলেট মাত্রা কমে যায় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম-এ পর্যবসিত হয়, যেখানে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কম থাকে। আমরা ইতোমধ্যে জেনে গেছি, ডেঙ্গু প্রজাতি এডিস দ্বারা পরিবাহিত হয়। প্রধানত A. aegypti নামক মশকী (স্ত্রী মশা) এই রোগের জন্য দায়ী। যেহেতু কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই মশার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ ও মশার সংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস এবং মশার কামড়ানো সম্ভাবনা কমানোর মাধ্যমে প্রতিরোধ প্রয়োজন।
অ্যাকিউট ডেঙ্গুর চিকিৎসা ধীর প্রকৃতির, স্বল্প বা মাঝারি রোগের ক্ষেত্রে রিহাইড্রেশন ওরাল বা ইন্ট্রাভেনাস পদ্ধতিতে ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড এবং আরও প্রবল ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন।
ডেঙ্গু জ্বরের ঘটনা ১৯৬০ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ১০ কোটি লোক এতে আক্রান্ত হয়। ১৭৭৯ সালে এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এর ভাইরাসঘটিত কারণ ও সংক্রমণ বিষয়ে বিশদে জানা যায় বিংশ শতকের প্রথম ভাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় থেকে ডেঙ্গু দুনিয়াজোড়া সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এবং ১১০টিরও বেশি দেশে মহামারীর আকার নেয়। শিশু ও ছোট বাচ্চাদের মধ্যে রোগ বেশি দেখা যায় এবং অন্যান্য সংক্রমণের তুলনায় এটি বাচ্চাদের পক্ষে বেশি সাধারণ আর এর পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে ভালো। এতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিপদ বেশি। যাদের ক্রনিক অসুখ আছে যেমনÑ ডায়াবেটিস ও অ্যাজমা তাদের পক্ষে ডেঙ্গু প্রাণঘাতী হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর বা ফ্লু আমাদের দৈনিন্দন জীবনে যে কোনো মুহূর্তে প্রবেশ করে ফেলতে পারে, সাধারণ জ্বর কখনও সিজেন চেঞ্জের সময় হয়, বৃষ্টিতে ও পরিবেশগত কারণে, আবার নানান পানিবাহিত কারণেও জ্বর হয় বা কোনো বড় ধরনের রোগের আগমনী বার্তা নিয়েও জ্বর হয়ে থাকে। কিন্তু ডেঙ্গু সাধারণত বৃষ্টিভেজা পরিবেশে বাড়তে থাকে, এডিস লার্ভা স্বচ্ছ পানিতে তৈরি হয়, দিনের বেলায় কামড়ায়।
প্রথমে এই জ্বর নিয়ে আমরা সাধারণত ওষুধের দোকান থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট এনে খেয়ে ফেলি, অতি সাধারণভাবে আমরা দু-তিন দিন ঔষধ খেয়ে জ্বরের মাত্রাটি কমিয়ে আনার চেষ্টা করি, ডেঙ্গু জ্বর এমন কোনো সাধারণ জ্বর নয়, যা শুধু সিটামল টাইপের ওষুধ খেলে কমবে, এর নানান সিম্পটম থাকে যার দরুন বমি, র‌্যাশ, চোখের ভিতরে রক্ত জমা, শরীরে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। আর ফ্লু জ্বরে গলায় শ্লেষ্মা জমে, কণ্ঠ চিকন হয়ে ওঠে, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে; কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়।
এই যে আমার জ্বর এলো, কেন এলো, কী ছিল জ্বরের পিছনে, জ্বরের সাথে আর কী সমস্যা হয়েছেÑ এসব হিসাব করি না। আমরা গা গরম তা কমানোর জন্য নাপা বা সিটামল খেয়ে শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেললেই মনে করি সুস্থ হয়ে গেছি। অথচ ডেঙ্গুর কারণে রক্তের প্লাটিলেট কমতে থাকে, যা খুবই ভয়ঙ্কর অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে, তখন শরীরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে।
মনে রাখা প্রয়োজন, এই যে আমাদের মাঝে জ্বর বা ফ্লু আসে আবার চলে যায়, কোথা থেকে আসে কোথায় চলে যায়, অপ্রয়োজনী কিছু টেস্ট দিয়ে আমাদের অনুমানভিত্তিক চিকিৎসা করা হয়, গত বছর হাজার হাজার চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত মানুষ টের পেয়েছে। সত্য কথা বলতে কী আমাদের এখানে টেস্ট করানোর অভ্যাস নেই, যা আমাদের আক্রান্ত ভাইরাসের সঠিক তথ্য দিতে পারে, যার দরুন জ্বর নিয়ে দেরি করে ফেলা হয় আর বিশেষ করে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। যার দরুণ রোগীর সমস্যা বেড়ে যায়, সেই সাথে শরীরে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীরে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হলে কোনো মানুষই স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করতে পারে না, বিশেষ করে বমি হয়ে যায়। তাই তখন সর্তক থাকতে হয় খাওয়ার ক্ষেত্রে। তখন আমাদের সামাজিক অবস্থা হলোÑ জ্বর হলে বেশি খাবার খেতে দেওয়া হয়, তখন মনে হয় যে খেলেই বুঝি শক্তি চলে আসবে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে। আসলে ব্যাপারটি উল্টো। তখন দরকার শুধুমাত্র ভিটামিন ‘সি’ আধিক্য তরল খাদ্য গ্রহণ একমাত্র উপায়। ডেঙ্গু বা ফ্লু ভাইরাসজনিত সকল জ্বরের জন্য খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেসার একটি উত্তম প্রাকৃতিক উপায়, যা আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু জানে বাঁচবে তা নয়, নানান ঔষধ এবং হয়রানি থেকেও মুক্তি পাবেন।

কী করবেন?
আকুপ্রেসার : আকুপ্রেসার করতে পারেন, এর জন্য কোনো পয়েন্ট জানা প্রয়োজন নেই, আপনার হাতের তালুতে এবং আঙ্গুলে আস্তে আস্তে করে ম্যাসাজ করুন, লক্ষ করবেন যে হাতুর তালুর মাঝ স্থানে একটু ব্যথা অনুভূত হবে ছবিতে দেওয়া পয়েন্টগুলো বেশি চাপ দিন। সেখানে কেন্দ্র ধরে পুরো তালুতে পাঁচ মিনিট ম্যাসাজ করুন, তারপর কবজির নিচের অংশে এক মিনিট বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিন গুনে গুনে ৫০ বার, এভাবে দুই হাতে ১০ মিনিট সারাদিনে তিনবার ছয় ঘণ্টা অন্তর আকুপ্রেসার করুন। ছবিতে পয়েন্ট দেওয়া হলো।

খাদ্যপথ্য
প্রথমে আপনার জন্য তিন দিন কোনো ধরনের স্বাভাবিক খাবার, যা আমরা খেয়ে থাকি তা বন্ধ করতে হবে।
খাদ্য তালিকা : যখন থেকে টের পাবেন আপনার জ্বর তখন থেকেই স্বাভাবিক খাবার বন্ধ করে এক গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে এক টেবিল চামচ লেবুর রস মিশিয়ে এক ঘণ্টা পরপর চার ঘণ্টায় চার গ্লাস কুসুম গরম পানি ও লেবুর রস খাই। এতে শরীরে জ্বরের প্রকোপ কমে আসবে, বমি কমে আসবে, ডায়রিয়া হলে তাও কমে আসবে। তারপর সারাদিন দুই ঘণ্টা পরপর এক গ্লাস কুসুম গরম পানি এক টেবিল চামচ লেবুর রস ও এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে সারাদিন আট গ্লাস পানি পান করুন, মাঝে একটি কচি ডাবের পানি পান করুন। তাতে শরীরের মিনারেলের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। রাত ৮টা অবধি এই পানিটুকু পান করে আর কোনো ধরনের খাদ্য গ্রহণ না করে শুয়ে পড়–ন। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার আগের দিনের মতোই একই কাজ করুন। দ্বিতীয় দিন শরীরে ক্ষুধা বেশি লাগবে; কিন্তু শরীর হালকা অনুভূত হবে। সকালে চার ঘণ্টায় এক ঘণ্টা অন্তর লেবু পানি খেয়ে একটি কচি ডাবের পানি পান করুন, দুপুরে একটি শসা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে খেতে হবে, তাতে শরীরে ডিহাইড্রেশন থাকবে না, সাথে এদিন আট গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে আট টেবিল চামচ লেবুর রস, আট টেবিল চামচ মধুই প্রধান খাদ্যপথ্য। এর বাইরে কোনো কিছু খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তৃতীয় দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার একই কাজ করুন দুপুরে এক ঘণ্টা পরপর এক গ্লাস কমলা, জাম্বুরা, আনারস বা লেবুর জুস, একটি কচি ডাবের পানি পান করুন এবং এক বাটি কুচি করে কাটা শসা, এটাই দুপুরের খাবার, তারপর রাত অবধি আনারস, কমলা, ডালিম, মাল্টা, লেবু, আমড়া ফলের জুস খান রাত আটটা অবধি। এভাবে তৃতীয় দিন পার করে পরের দিন সকালে পেট ভরে মিক্সড ফ্রুট (রকমারি ফল) খান এক বাটি। দুপুরে স্বাভাবিক খাবারে ফেরত চলে আসুন।
এই তিন দিনে আপনার শরীর থেকে অজানা অচেনা অনেক ধরনের বর্জ্য বেরিয়ে যাবে, মাথা ধরে থাকবে, প্রচ- ক্ষুধা লাগবে, শরীর দুর্বল লাগবে ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিলেও আপনি নিয়মটি পালন করুন।
চতুর্থ দিন আপনার শরীরে যা ঘটবে তাতে আপনি আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। ডেঙ্গু কমে যাবে, জ্বর ফ্লু থাকলে তা চলে যাবে, শরীরে সকল ধরনের অস্বস্তি কেটে যাবে, শরীর হালকা হয়ে যাবে, শক্তি পাবেন, শরীরের সকল ব্যথা চলে যাবে, পেটে গ্যাসের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। চোখে জ্যোতি বাড়বে, মাথা হালকা লাগবে। ডেঙ্গু জ্বর তাড়ানোর প্রথম ধাপ পার করে আপনি হয়ে উঠবেন আত্মবিশ^াসী। মাত্র তিন দিন এ নিয়মটি পালন করলে আপনি আপনার হাতের আকুপ্রেসার পয়েন্টগুলো যেখানে চাপ দিলে ব্যথা অনুভব করতেন এখন আর সেখানে ব্যথা পাবেন না। দ্বিতীয়ত শরীরে কোনো ধরনের সমস্যা অনুভব করবেন না। আপনার পেটের সকল ধরনের সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন।
এই প্রাকৃতিক নিয়মটি পালনে মনোবলটাই জরুরি আর কিছু নয়। এর চেয়ে সহজ পদ্ধতিতে আপনার এই জটিল সমস্যা দূর করার আর কোনো সহজ পদ্ধতি নেই।
এ নিয়মটি মেনে চার দিন পর আধুনিক টেস্ট করে দেখুন আপনার ডেঙ্গু আছে কি না, আমরা পরীক্ষিত এতে ডেঙ্গু কমে যায়, তখন শরীরে কোনো ধরনের উপসর্গ থাকে না, অস্বস্তি কমে যায়, রোগ নিরাময় হয়ে যায়।

লেখক : ন্যাচারোপ্যাথি ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

Category:

Leave a Reply