ড্রাগন ফল : আয়ের নতুন সম্ভাবনার উৎস

uttaranরাজিয়া সুলতানা: নামটি একটু অন্যরকমÑ পিটাইয়া বা ড্রাগন ফল। ফলটি দেখতে ড্রাগনের চোখের মতো বলেই এমন নাম। ভিটামিন সি’র মাত্রা বেশি, তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, মানসিক অবসাদ দূর করে এবং ত্বক সুন্দর রাখতে সাহায্য করে। ফলটি আমাদের দেশীয় নয়। কিন্তু আমাদের আবহাওয়ায় অভিযোজিত। বাণিজ্যিকভাবেও সফল। এই ফল উৎপাদন করে একজন তৃণমূলের প্রান্তিক কৃষকও হয়ে উঠতে পারেন সাম্বলম্বী।
ড্রাগন এক ধরনের ফণীমনসা (ক্যাকটাস) প্রজাতির ফল। গাছের কোনো পাতা নেই। ফুল হয় সাদা রঙের। দেখতে অনেকটাই নাইট কুইন ফুলের মতো। এই ফুল মূলত রাতের বেলা ফোটে। এই ফুলে দারুণ সুগন্ধ রয়েছে। ফুল থেকে লাল রঙের ডিমের আকৃতির ফল গঠিত হয়। ড্রাগন ফলের খোসা বেশ নরম। পাকা ফলের শাঁস খুব নরম ও ভেতরে কালো জিরার মতো ছোট ছোট বিচি থাকে। ড্রাগন ফল খেতে হালকা মিষ্টি।
যদিও ড্রাগন ফলটি থাইল্যান্ডের জাতীয় ফল। তবে ড্রাগন ফল এসেছে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। তবে বর্তমানে এগুলো পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়ায় ব্যাপক চাষ হচ্ছে। এছাড়া ওকিনাওয়া, হাওয়াই, ইসরায়েল, প্যালেস্টাইন, উত্তর অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ গণচীনেও ড্রাগন চাষ চোখে পড়ে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে।
ড্রাগন ফল দুই প্র্রকার। যথাÑ টক স্বাদের ও মিষ্টি স্বাদের। মিষ্টি স্বাদের ফলবিশিষ্ট ড্রাগন ফলের আবার ৩টি প্র্রজাতি রয়েছেÑ লাল ড্রাগন ফল বা পিটাইয়া। ফলের খোসার রং লাল, শাঁস সাদা। এই প্র্রজাতির ফল বেশি দেখা যায়। কোস্টারিকা ড্রাগন ফল। ফলের খোসা ও শাঁসের রং লাল। হলুদ ড্রাগন ফল। ফলের খোসা হলুদ রঙের ও শাঁসের রং সাদা। ড্রাগন ফল স্বাদে টক, এগুলো টক ড্রাগন ফল বা ‘গাওয়ার পিটাইয়া’ নামে পরিচিত। আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলে এগুলো পাওয়া যায়। খুব টক বলে মেক্সিকো ও আমেরিকার লোকেরা ওই ড্রাগন ফলের রসে বিভিন্ন শরবত তৈরি করে।
উপযোগী জাত বাণিজ্যিকভিত্তিতে সফলভাবে চাষ করার জন্য বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে অবমুক্তায়িত বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল) চাষ করা ভালো। এছাড়া হলুদ ড্রাগন ফল ও কালচে লাল ড্রাগন ফলও চাষ করা যায়। প্র্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলের সাদা বা লাল অংশে ২১ মিগ্রা ভিটামিন সি, ৩ গ্রাম আঁশ, জলীয় শতাংশ ৮৭ গ্রাম, প্রোটিন ১.১ গ্রাম, ফ্যাট ০.৪ গ্রাম (বলতে গেলে ফ্যাট নেই) এবং কার্বোহাইড্রেট ১১.০ গ্রাম পাওয়া যায়। প্র্র্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে যে পরিমাণ ভিটামিন সি পাওয়া যায় তা একটি কমলার সমান বা ৩টি গাজরের চেয়ে বেশি। এই ফলের কালো বীজে থাকে ল্যাক্সেটিভ ও পলিআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হজমে সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়ক। এছাড়াও রয়েছে প্রতি ১০০ গ্রাম ড্রাগন ফলে ০.০৪ মিগ্রা ভিটামিন বি ১, ০.০৫ মিগ্রা ভিটামিন বি-২, ০.০১৬ মিগ্রা ভিটামিন বি-৩, ১.৯ মিগ্রা আয়রন, ক্যালসিয়াম ৮.৫ মিগ্রা এবং ফসফরাস ২২.৫ মিগ্রা। এক কথায় ড্রাগন ফল হলো স্টোর হাউস অব ভিটামিন। ক্যালোরি এবং ফ্যাট কিন্তু খুবই কম। তাই ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীরাও খেতে পারেন। শুধু তাই নয়Ñ নিয়মিত ড্রাগন ফল খেলে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই এই ফল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অতি উত্তম। ড্রাগনে আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্ত শূন্যতায় এবং পানি শূন্যতায় খুবই কার্যকরী। প্রচুর ফাইবার থাকায় পেটের পীড়া এবং লিভারের জন্যও উত্তম।
ড্রাগন আমাদের দেশীয় নয়। তবে অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন। আমাদের দেশে বেলে দোআঁশ থেকে নোনা মাটিÑ সব জায়গায় সফলভাবে জন্মে। সফল চাষাবাদের জন্য এর চাষ পদ্ধতিটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ফণীমনসা বা ক্যাকটাস জাতীয় গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই প্র্র্রথমেই উঁচু জায়গা নির্বাচন করতে হবে। শুষ্ক জলবায়ু দরকার ও মাঝারি বৃষ্টিপাত ভালো। তবে অধিক বৃষ্টি হলে ফুল ঝরে যায় ও ফলে পচন ধরে। রোদ, খোলামেলা জায়গা প্র্রচুর জৈবসারে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। ড্রাগন ফলের চারা তৈরি খুব সহজ। বীজ দিয়ে চারা তৈরি করা যায়। তবে সেসব চারায় ফল ধরতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই কাটিং করে শাখা কলম করে চারা তৈরি করা উত্তম। বয়স্ক ও শক্ত শাখা এক থেকে দেড় ফুট লম্বা ও তেরছা করে কেটে বালি বা বেলে দোআঁশ মাটিতে বগিয়ে দিলে ২০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তা থেকে শিকড় গজায়। তবে কাটিং রাখার জায়গায় শেড বা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মাটিতেও রস থাকতে হবে। কাটিং সাধারণত মরে না, তাড়াতাড়ি ফল ধরে। কাটিং থেকে উৎপাদিত গাছে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ফল ধরতে শুরু করে। জমি ভালোভাবে চাষ ও সমান করে ৩ মিটার পরপর সবদিকে সারি করে চারা লাগাতে হবে। চারা রোপণের মাসখানেক আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। প্র্র্রতি গর্তে ৪০ কেজি পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার, ১০ গ্রাম করে জিপসাম, জিঙ্ক সালফেট ও বোরাক্স সার দিতে হবে। বছরের যে কোনো সময় চারা লাগানো যেতে পারে। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে লাগালে ভালো হয়। প্র্রতি গর্তে ৪টি করে চারা লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। চারা লাগানোর পর খুঁটি বা পিলার পুঁতে দিয়ে ড্রাগন ফল গাছ বেঁধে দিতে হবে। কেননা ড্রাগনের গাছের কা- লতানো প্রকৃতির। ৩টি পদ্ধতিতে খুঁটি দিয়ে গাছটি সাপোর্ট দিতে হয়।
ক. ভিয়েতনাম পদ্ধতি
খ. ফ্লোরিডা পদ্ধতি
গ. শ্রীলংকা পদ্ধতি।
ভিয়েতনাম পদ্ধতিতে পিলারের চারদিকে কাটিংকৃত কলম চারা লাগিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে দিতে হয়। ফ্লোরিডা পদ্ধতিতে দুই পাশে দুটি খুঁটি পুঁতে মোটা তারের ওপর জাংলার মতো তৈরি করে গাছ জাংলায় তুলে দিতে হবে। আর শ্রীলংকা পদ্ধতিতে পিলার পুঁতে দিয়ে চারা লাগিয়ে দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে দিতে হয়। পিলারের চারদিকে বাঁশের ম্যাচারের ওপরে মোটর গাড়ির পুরাতন টায়ার দিয়ে তার ওপর গাছের শাখাগুলোকে বাড়তে দেওয়া হয়। ড্রাগন ফলগাছ খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে। একটি এক বছর বয়সী গাছ ৩০টি পর্যন্ত শাখা তৈরি করতে পারে। চার বছর বয়সী গাছ প্র্রায় ১৩০টি শাখা তৈরি হয়। ড্রাগন ফলের গাছ সাধারণত ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এক একটি ফলের ওজন ১৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২-১৮ মাস পর একটি গাছ ফল ধারণ করে। ফল সংগ্রহের পর ৪০-৫০টি প্রধান শাখায় প্রত্যেকটিতে এক-দুটি সেকেন্ডারি শাখা রেখে বাকিগুলো কেটে দিতে হয়। গাছের আকার ও শাখা-প্রশাখা কর্তনের কার্যক্রম দিনের মধ্যভাগে করাই ভালো। কর্তন করার পর অবশ্যই যে কোনো ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় বিভিন্ন ধরনের রোগবালাই আক্রমণ করতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে মাটি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। দুই সারির মাঝে পানি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নালা রাখতে হবে। এসব নালার মুখ আটকে মাঝেমধ্যে পানি ভরে রেখে দিলে সেখান থেকে গাছের শিকড় পানি পাবে। ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সের একটি গাছে ৫ থেকে ২০টি ফল পাওয়া যায়; কিন্তু পূর্ণবয়স্ক একটি গাছে ২৫ থেকে ১০০টি ফল পাওয়া যায়। হেক্টরপ্রতি ফলন ২০ থেকে ২৫ টন। নতুন আসা এই ফলের গাছে তেমন কোনো রোগ ও পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায় না। তবে কখনও কখনও শিকড় পচা, কা- ও গোড়া পচা রোগে গাছ আক্রান্ত হয়। গোড়ায় অতিরিক্ত পানি জমে গেলে মূলে পচন দেখা দেয়। তখন গাছকে টান দিলে মূল ছাড়া গাছ উঠে আসে। ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এই রোগ হয়। এই রোগ দমনের জন্য ছত্রাকনাশক যেমনÑ বেভিস্টিন, রিডোমিল, থিওভিট ইত্যাদির যে কোনো একটি ২ গ্রাম প্র্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে প্র্রয়োগ করতে হবে। ড্রাগন ফলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খুব একটা চোখে পড়ে না। মাঝেমধ্যে এফিড ও মিলিবাগের আক্রমণ দেখা যায়। এরা গাছের কচি শাখা ও পাতার রস চুষে খায়। ফলে রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পোকা দেখা দিলে সুমিথিয়ন বা ম্যালাথিয়ন প্র্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মিলি ভালোভাবে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
একবার বাগান স্থাপন করলে অনায়াসেই ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। সাধারণত বছরে একবার ফলন পাওয়া যায়। তবে শীতের সময়টায় যদি দিনের আলোর পর প্রায় ৪ ঘণ্টা করে প্রতি গাছের খুঁটিতে লাইট ব্যবহার করা গেলে সারাবছরই ফল পাওয়া সম্ভব। লাভ খরচের প্রায় দ্বিগুণ। তাই রপ্তানিযোগ্য এই ফলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। ইচ্ছে করলে বাড়ির ছাদে বা টবে সৌখিনভাবেও ড্রাগন ফলের চাষ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে প্রফেসর ড. এমএ রহিম গবেষণার উদ্দেশ্যে ড্রাগন ফলের কয়েকটি জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড থেকে ২০০৭ সালে। সেসব গাছ দিব্যি ফল দিচ্ছে। এই সফলতার ওপর ভিত্তি করে সেন্টার থেকে এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন আমাদের কৃষিবান্ধব সরকার। তবে প্রচারেই প্রসার এই ধারাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের সামনে ফলটিকে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই ফলটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখতে পারবে।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, শেরে বাংলা কৃষি ইউনির্ভাসিটি, প্ল্যান্টপ্যাথলজি, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com

Category:

Leave a Reply