তারুণ্যের বাংলাদেশ : কখনও থমকে যাবে না

Posted on by 0 comment

নরেন্দ্র মোদির জনবক্তৃতা

33(c)উত্তরণ ডেস্কঃ  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুদিনের ঢাকা সফরের সর্বশেষ কর্মসূচি জনবক্তৃতা। গত ৭ জুন সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে। এখানে বক্তৃতা কিছুটা সংক্ষেপিতভাবে তুলে ধরা হলোÑ

ভাই ও বোনেরা, নমস্কার। কেমন আছো? আমরা তোমার সাথে আছি। আমরা তোমাকে সাথে নিয়ে চলব। আমার বাংলা কেমন?
আমার দুদিনের যাত্রা আজ শেষ হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে, সত্যি আমি সফর শুরু করতে চলেছি। আমার এ দুদিনের সফর চলাকালে যে সম্মান জানিয়েছেন, তা শুধু নরেন্দ্র মোদি নামের এক ব্যক্তির নয়, সোয়াশ কোটি ভারতবাসীর।
এ দুদিনের সফরের পর শুধু এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্ব সূক্ষ্মভাবে ময়নাতদন্ত করবে। কেউ হয়তো মাপকাঠি নিয়ে খতিয়ে দেখবে, কী হারালাম, কী পেলাম। কিন্তু একটি বাক্যে আমি বলবÑ লোকেরা বলতেন যে, আমরা খুব আশেপাশে রয়েছি। এখন বিশ্বকে স্বীকার করতে হবেÑ আমরা আশেপাশেও রয়েছি, একসাথেও রয়েছি।
আমার বাংলাদেশের সাথে একটি আবেগপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে। আমার জীবনে এবং রাজনৈতিক জীবনে যে পথপ্রদর্শন পেয়েছি, যার হাত ধরে চলেছি, তিনি হচ্ছেন ভারতমাতার সুপুত্র ও ভারতরতœ অটল বিহারি বাজপেয়িজি। আজ তাকে বাংলাদেশ বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছে। আর সম্মান পেয়েছি এক মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে; সম্মান পেয়েছি বঙ্গবন্ধু-কন্যার উপস্থিতিতে। আর সম্মান নেওয়ার সৌভাগ্য যার হয়েছে, যৌবনকালে রাজনীতির সাথে তার যোগাযোগ ছিল না। আমি সেই ব্যক্তি, অনেক দেরি করে রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছি; ১৯৯০ সালের আশেপাশে। ১৯৭১ সালে খবরের কাগজে পড়তাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে, এখানের গণহত্যায় যখন আপনাদের ক্ষোভ হতো, আমাদেরও রক্ত গরম হয়ে যেত। বাংলাদেশের সেই আহ্বান আমাদের উৎসাহিত করে। জীবনের প্রথমবার গ্রাম ছেড়ে দিল্লিতে ভারতীয় জনসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য আমি পাই।
বিশ্বে উন্নত যে দেশগুলো রয়েছে তার সম্পর্কে আলোচনা হয়, কিন্তু আমাদের মতো গরিব দেশের ওপর বিশ্বের নজর কম। বাংলাদেশ খুব কম সময়ে বিকাশের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এখানে রাজনৈতিক সংকট বারবার এসেছে, চড়াই-উৎরাই এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের পরই কঠোর লড়াই ছিল, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল। এই সমস্ত সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্দান্ত কাজ করেছে, দারুণ কাজ করেছে।
লোকেদের মনোসংযোগ এখানকার পোশাকের ওপর যায়। আমি চীনে গিয়েছিলাম। একটি রেডিমেড গার্মেন্টসের একজন সিইও আমাকে বলেছেন, মোদিজি, আপনার সোয়াশ কোটি মানুষের দেশ। আপনি কী করছেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? কী হয়েছে ভাই? তখন তিনি বললেন যে, আপনাদের পাশেই রয়েছে ১৭ কোটির দেশ; যারা তৈরি পোশাকে পৃথিবীতে ২ নম্বরে। মন থেকে বলছি, আমি এত আনন্দ পেয়েছিলাম, আমরা যারা দারিদ্র্যরেখার খুব কাছাকাছিÑ তাদের একজন সাথীÑ একজন প্রতিবেশী এত দুর্দান্ত কাজ করেছে, আমাকে অভিভূত করেছে। সূর্য ভারতের আগে বাংলাদেশের আকাশে ওঠে এবং তারপর তো আমাদের দেশে কিরণ যায়, তাই তো? আর এ জন্য এখানে যে বিকাশই হোক, যে উন্নতি হোক, যত উঁচুতেই উঠুক, তা আমাদের দেশে পৌঁছাবেই।
এজন্য আমি বলতে চাইÑ আজ দেখুন, কন্যাশিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হারÑ এসব বিষয়ে ভারতের অনেক রাজ্যকে বাংলাদেশ থেকে শিখতে হবে।
যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের গর্ববোধ হয়। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সৈন্যরা লড়েছে। যে বাংলাদেশের স্বপ্নকে আমার দেশের সৈন্যরা রক্ত দিয়ে বাস্তবায়ন করেছে, সেই দেশের উন্নতি হলে তা থেকে বেশি আনন্দের কিছু থাকতেই পারে না, গৌরবের কিছু হতেই পারে না।
আমি প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অভিনন্দন জানাই, তিনি শুধু একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেনÑ তা হচ্ছে বিকাশ, উন্নতি। আর ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুব সাধারণ কথা নয়, এটি কোনো ছোট সাফল্য নয়। আর এ জন্য যে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা শক্ত হয়েছে, যার ভিত্তি তৈরি হয়েছে, আমি স্পষ্ট ভাষায় বলিÑ এখানকার ভবিষ্যৎকে তৈরি করবে।
ভারত এবং বাংলাদেশ দুদেশই একটি বিষয়ে খুব সৌভাগ্যবান। ভারতের ৬৫ শতাংশ লোক ৩৫ বছরের কম বয়সী। আর বাংলাদেশেরও ৬৫ শতাংশ ৩৫ বছরের কম বয়সী। এটি শুভ শক্তিতে ভরা দেশ। এর যে স্বপ্ন, তাও তারুণ্যের শক্তিতে ভরপুর। যে দেশের কাছে এমন সামর্থ্য রয়েছে, আর বিকাশের জন্য উৎসর্গকৃত নেতৃত্ব রয়েছে এবং এগিয়ে চলার উৎসাহ আনে; আমি বিশ্বাসের সাথে বলতে পারিÑ বাংলাদেশের বিকাশযাত্রা কখনও থমকে দাঁড়াবে না।
আজ সময় বদলেছে, বিশ্ব বদলেছে। একটা সময় ছিল যখন বিস্তারবাদ কোনো দেশের শক্তির পরিচয় হিসেবে মনে করা হতো। কে কত ছড়িয়ে পড়বে, কে কোথায় পৌঁছাবে, কে কত অত্যাচার করবে তার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের শক্তি মাপা হতো। আজ সময় বদলেছে। এ যুগে এ সময়ে বিস্তারবাদকে কোনো স্থান দেওয়া হয় না। আজ বিশ্বে বিকাশবাদের প্রয়োজন রয়েছে।
এই যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থল সীমান্ত চুক্তি; তা কি শুধু জমি সংক্রান্ত বিবাদের সমাধান? যদি কেউ এটা মনে করেন ২-৪ কিলোমিটার জমি এদিকে গিয়েছেÑ এটা কিন্তু সেই সমঝোতা নয়। এটা সেই চুক্তি, যা মনকে যুক্ত করেছে। পৃথিবীতে সব যুদ্ধই হয়েছে জমির জন্য। আপনাদের পর্যটনমন্ত্রীর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, আমরা বৌদ্ধ সার্কিট শুরু করতে চাই পর্যটনের জন্য। বৌদ্ধ ছাড়া ভারতও অসম্পূর্ণ। যেখানে বুদ্ধ রয়েছেন সেখানে যুদ্ধ হতে পারে না। আর এ জন্য সারাবিশ্ব জমির জন্য লড়তে পারে, মরতে পারে। কিন্তু আমরা দুটি দেশ, যারা এ জমিকেই আমাদের বন্ধুত্বের সেতুবন্ধ হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। আমি এখানে আজকের একটি খবরের কাগজে দেখেছিÑ বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তিকে বার্লিনের দেয়াল ভাঙার ঘটনার সাথে তুলনা করেছে। এটা খুব বড়মাপের চিন্তাধারা। এ ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোথাও হলে অনেক আলোচনা হতো। হয়তো নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য রাস্তা তৈরি হতো। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করবে না; কারণ আমরা দরিদ্র দেশের মানুষ। কিন্তু গরিব হওয়া সত্ত্বেও যদি আমরা একজোট হয়ে চলি, তা হলে দুনিয়া স্বীকার করুক আর না করুক, দুনিয়াকে মানতে হবে যে, এ লোকেরাই নিজেদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে বিকাশের পথে।
এখানকার তরুণদের স্বপ্ন রয়েছে। সময় অনেক বদলেছে। আপনি যে কোনো তরুণকে তার প্রত্যাশা জিজ্ঞেস করুন; আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে আমরা যা ভাবতাম, সে উত্তর আপনি পাবেন না। তারা বিশ্বকে নিজের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে চায়। এটা আমাদের দায়িত্ব যে এখানকার তরুণদের স্বপ্ন দেখা, শিক্ষা ও বিকাশের পথে সুযোগ করে দিই। আজ এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, এটাই তো সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যা দেশকে জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা দিয়ে ভরিয়ে তুলেছে। আমি উপাচার্য মহোদয়কে বলছিলাম, আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করব। আগামীতে এটি ব্লু-ইকোনমির একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে। সমুদ্রের সাথে যুক্ত সার্কভুক্ত ৫টি দেশ একজোট হয়ে ব্লু-ইকোনমিকে সামগ্রিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, উন্নত করতে পারি। নেপালে সার্ক সম্মেলনে আমরা একটি প্রস্তাব পাস করতে চেয়েছিলাম যোগাযোগ বিষয়ে। তা হলো সার্কভুক্ত দেশগুলো যোগাযোগ করতে পারে, মুক্তভাবে আসা-যাওয়া করতে পারে। কিন্তু সবাই তো বাংলাদেশ নয়। কিন্তু আমি কি এর জন্য অপেক্ষা করে থাকব? সার্কে হয়তো এ সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কিন্তু বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, ভারত যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের মানতে হবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছিল এই যোগাযোগের মাধ্যমে। এভাবে সার্ক দেশগুলো এগিয়ে যেতে পারে। এজন্য রেল, সড়ক, বিমান ও সমুদ্রপথে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হবে। সমুদ্র ও নদীপথে যোগাযোগ না হলে ভারতে কিছু পাঠাতে হলে সিঙ্গাপুর হয়ে পাঠাতে হতো। এখন ভারত ও বাংলাদেশ পাশাপাশি রয়েছে। কোনো দেশ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, একা কেউ কিছু করতে পারে না। সমগ্র বিশ্ব একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য ভারত-বাংলাদেশ ভবিষ্যৎকে চিনতে পেরেছে। আমরা যে ২২টি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়; তা ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। আমরা বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হব। এজন্য বাংলাদেশের নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানাই।
যদি আমরা উপগ্রহের চিত্র নিই, সার্কের দেশগুলোকে অন্ধকার দেখা যায়। আমাদের এখানে কি আলো হওয়া উচিত নয়? এখানে গরিবের বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলা উচিত নয়? একসঙ্গে কাজ করে যদি আমরা বৈদ্যুতিক আলো জ্বালতে পারি, তা হলে আর অন্ধকার থাকবে না। ত্রিপুরায় যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করেছি, বাংলাদেশের সহায়তা ছাড়া তা সম্ভব হতো না। সেখান থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ। আরও ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের দুদেশের ওপর সূর্যের দয়া রয়েছে। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা সূর্যকে শক্তি হিসেবে পেয়েছি। এখানে যে মেধাশক্তি আছে তার সাথে ভারতের শক্তি যুক্ত করে এগিয়ে যেতে চাই। শনিবার (৬ জুন) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তারা মহাকাশে যেতে চান। আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আমাদের ছাড়া কীভাবে হবে? মহাকাশ গবেষণায় আপনাদের পাশে থাকতে চাই আমরা। আমাদের কাছে মহাকাশ গবেষণার যে শক্তি আছে, তা অবশ্যই বাংলাদেশের কাজে আসা উচিত। আমি সার্ক সম্মেলনে বলেছিলাম, ২০১৬ সালের মধ্যে আমরা একটা সার্ক স্যাটেলাইট ছাড়ব, তা থেকে যেন এখানকার কৃষক ও জনগণ ঘূর্ণিঝড়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের তথ্য পান। আমরা সার্ক স্যাটেলাইট নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বাংলাদেশ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এখানকার প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যÑ সবাই নারী। এটা দেখে এখানকার পুরুষদের হিংসা হয়। এটা শুনে গর্ব হয়, অনেক উন্নত দেশেও নারীদের সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেওয়া হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ বারবার নারীদের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়; পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়াতেও নারী নেতৃত্বের জয়জয়কার। উন্নত বিশ্বের এমন হলে তা নিয়ে হৈচৈ হয়ে যেত। কিন্তু দুনিয়াকে আমাদের দেখাতে হবে যে, নারীর ক্ষমতায়নে আমরা পিছিয়ে নেই। আমি দুদিন থেকে এখানে সেখানে যাচ্ছিলাম। আমি দেখেছি যে বিলবোর্ডে লেখা আছে ‘আই অ্যাম মেড ইন বাংলাদেশ’। আপনাদের মহিলা ক্রিকেটার সালমা খাতুন নারীদের ক্ষমতায়ন ও তারুণ্যের শক্তিকেই পরিচয় করায়।
আর যখন শুনি কতই গর্বই হয়, বাংলাদেশের ছেলে সাকিব আল হাসান। ক্রিকেটে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি; ভারতসহ অন্য যে কোনো ক্রিকেট দল আপনাদের ছোট করে দেখতে পারে না। দেরি করে এসেও ক্রিকেটে বিশ্বের শক্তিশালী দেশের সমকক্ষ হয়েছে বাংলাদেশ। গরিব পরিবারের দুই কন্যা নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজনীন এভারেস্ট ঘুরে এসেছে। এটা বাংলাদেশের শক্তি।
যখন বাংলাদেশে এসেছি, তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা হবেই। আমি বিশ্বাস করি, পাখি, বাতাস আর পানিÑ এ তিনটার ভিসা দরকার হয় না। পানি রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে না। মানবিক মূল্যের ওপর আলোচনা করে পানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা একজোট হয়ে কাজ করব।
কখনও কখনও সীমান্তে দুপক্ষে উত্তেজনা হয়। যে কোনো নির্দোষের মৃত্যু দুঃখের। গুলি এখান থেকে চলুক আর ওখানে চলুক; তার তো কোনো দোষ নেই। আমাদের সীমান্তে যাতে এমন ঘটনা না হয় সেজন্য একজোট হয়ে কাজ করব। আমরা মানবপাচার বিষয়ে কঠোরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করব। বেআইনি আসা-যাওয়ার কারণে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। আমরা দুদেশ মিলে এ ব্যাপারে চিন্তা করেছি। জাল নোট অন্য কেউ তৈরি করছে, অন্য কেউ তার অর্থ নিচ্ছে; বাংলাদেশে তার জন্য বদনাম হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের কাজকে কোনোভাবে এগিয়ে নিতে দেবে না। আমি বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, প্রশংসা করছি। এই তো বিষয়, যা আমাদের একই সাথে চলতে আমাদের সাহসকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং আজ একই সাথে চলি, কাল একই সাথে দৌড়াব। শুধু তাই নয়; বিকাশের নতুন উচ্চতা আমাদের পার করতে হবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমরা যে সহযোগিতা করছি, তা বাড়াতে চাচ্ছি। এবার আমরা লাইন অব ক্রেডিট ২০০ কোটি ডলার করেছি। আমরা এটা করার সাহস পেয়েছি এজন্য যে, যদি কেউ লাইন অব ক্রেডিট ভালোভাবে কাজে লাগায়, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ। আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভারতের লোকেরা এখানে আসুক, বিনিয়োগ করুক। এখানকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুক। এখানকার যে কাঁচামাল তার মূল্য সংযোজন ঘটুক। এখানকার অর্থনীতির বিকাশ হোক এবং ভারত-বাংলাদেশের যে বাণিজ্য ব্যবধান দূর করুক। আমরা চাই না বাংলাদেশ ভারত থেকে জিনিস নিক। আর বাংলাদেশ থেকে কম জিনিস যাক। আমরা চাই একই পরিমাণ দ্রব্য আদান-প্রদান হোক।
জাতিসংঘ তাদের ৭০ বছরপূর্তি উৎসব করবে। জাতিসংঘের জন্মের সময় বিশ্বের পরিস্থিতি আলাদা ছিল। সে সময় শিল্প বিপ্লব হয়। আজ ইন্টারনেট বিপ্লবের সময়। সময় বদলেছে; কিন্তু জাতিসংঘ সেই আগের জায়গাতেই রয়েছে। ৭০ বছর পালনের সময় জাতিসংঘ বিশ্বকে অন্যভাবে দেখবে। ভারত-বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের সমস্যার ব্যাপারে নজর দিক।
আমরা অনেক কিছু বুঝলেও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ কীভাবে মোকাবেলা হবে তা বুঝতে পারছি না। জাতিসংঘও এ বিষয়ে আমাদের পথ দেখাতে পারছে না। আমি খুশি যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন নারী হয়েও সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্সের কথা বলছেন। এজন্য তাকে অভিনন্দন। সন্ত্রাসবাদের কোনো সীমানা নেই, অঞ্চল নেই। ভারত ৪০ বছর ধরে এর মোকাবেলা করছে। এসব করে সন্ত্রাসবাদীরা কী পেয়েছে? সন্ত্রাসবাদ মানবতার শত্রু। আমরা যে ধর্মেরই হই না কেন; সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে একজোট হয়ে লড়াই করা প্রয়োজন।
শুধু বাংলাদেশ-ভারত নয়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পর্যটন বাড়াতে হবে, উৎসাহ জোগাতে হবে। পর্যটন সারা পৃথিবীকে একত্রিত করে। আর সন্ত্রাসবাদ বিশ্বকে আলাদা করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারত এখনও স্থায়ী সদস্যপদ পায়নি। পৃথিবীর ৬ ভাগের ১ ভাগ মানুষ ভারতে। কিন্তু বিশ্বের শান্তির বিষয়ে আলোচনা করার অধিকার সে দেশের নেই। এটা কী ধরনের চিন্তা-ভাবনা? ভারত সেই দেশ, যে জমির জন্য কারও ওপর হামলা করেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১৩ লাখ ভারতীয় জওয়ান জড়িত ছিল। কিন্তু তা ভারতকে বাঁচানোর জন্য নয়, ভারতে অঞ্চল বাড়ানোর জন্য নয়। অন্য দেশের জন্য লড়েছে, ৭৫ হাজার সৈন্য শহীদ হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব আমাদের জিজ্ঞাসাই করছে না শান্তির জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৫ লাখেরও বেশি ভারতীয় সৈন্য যুদ্ধে করেছে। আর সে সময় বাংলাদেশের সন্তানরাও লড়াই করেছে। আমাদের শহীদ হয়েছে ৯০ হাজার জওয়ান। আজও জাতিসংঘ গর্ব করে বলে, শান্তিরক্ষীর জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করে ভারতীয় সৈন্যরা। তাদের নিয়মানুবর্তিতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতকে লড়তে হচ্ছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যখন নিজেদের রক্ত বইয়ে দিচ্ছিলেন তখন কেউ জানত না বাংলাদেশ নামে কোনো রাষ্ট্র হবে কিনা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রত্যেক বাঙালি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিল। এখানে যারা মুক্তিযোদ্ধারা বসে রয়েছেন, তাদের আমি প্রণাম করি। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতের সেনাবাহিনী লড়াই করেছিল। তখন এটা বোঝাও যায়নিÑ সে রক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের, না ভারতীয় সেনাবাহিনীর। আর ইতিহাস দেখুন, যে দেশ বাংলাদেশের ওপর অত্যাচার করেছিল, তাদের ৯০ হাজার সেনাবাহিনীকে ভারতের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল। যে পাকিস্তান প্রত্যেক দিন ভারতের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে, জঙ্গিবাদকে উৎসাহ জোগায়, সেই পাকিস্তানের হাজার হাজার সৈন্য ভারতের কাছে ছিল। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের মঙ্গল চিন্তা করেছিলাম। আমরা বাংলাদেশের ভূমি পাকিস্তানের ওপর গুলি চালানোর জন্য ব্যবহার করিনি। বরং আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে লড়েছি। কারণ আমরা চেয়েছিÑ বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এগিয়ে যাক। এ জন্য আমাদের সমস্যার কথাও চিন্তা করিনি। আমরা বরং পাকিস্তানের ৯০ হাজার সৈন্য ফেরত দিয়েছি। ভারত বিশ্বশান্তির জন্যই তা করেছে। এই দৃষ্টান্তই যথেষ্ট যে, ভারত বিশ্বশান্তির প্রতি কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই ভারতের জন্য স্থায়ী সদস্যপদ খুলে দেওয়া উচিত।
ভারতের একটা কথা রয়েছেÑ দোলনায় বাচ্চা যেভাবে চলে তা দেখে বোঝা যায় ভবিষ্যতে বাচ্চা কীভাবে চলবে। গত বছর মে মাসে যখন আমার সরকারের জন্মও হয়নি, আমার সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে সার্ক দেশগুলোকে সম্মানের সাথে আমন্ত্রণ জানাই। এর মাধ্যমে আমরা একটা বার্তা দিতে চেয়েছিÑ সার্ক দেশের সাথে সবাই একসাথে চলতে চাই।
আসলে এটি এমন একটি অঞ্চল যেখানে বিশ্বকে দেওয়ার অনেক কিছু রয়েছে। শিল্পকলা, সংস্কৃতি, খাদ্যÑ আরও অনেক কিছুতে মিল। ভাবতে পারেন, একই ব্যক্তি দুটি দেশের জাতীয় সংগীত রচনা করেছেন! এটা খুশির কথা, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী এবং আমার চিন্তাধারা সম্পূর্ণ এক। আমার চিন্তাধারা কেবল বিকাশ, বিকাশ, বিকাশ। তারও একই চিন্তাÑ উন্নতি উন্নতি উন্নতি। তিনি আমাকে বলেছেন, ২০২১ সালে বাংলাদেশ যখন সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে, তখন আমরা সেই উন্নতির জায়গায় পৌঁছতে চাই। আপনি যদি বাড়ি বানান, দেয়াল যদি বিল্ডিং হয় আর প্রতিবেশীর দেয়াল যদি কাঁচা হয় তা কতক্ষণ টিকবে? বাংলাদেশের কিংবা ভারতের শক্তি যতই হোক না কেনÑ বাংলাদেশ-ভারতকে একজোট হয়ে লড়তে হবে, যাতে উভয় দেশে কোনো সংকট না আসে।
আমার এই সফরে সময় হয়তো কম হয়ে গেছে। কিন্তু আমার জন্য এই সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অনেকেই বলেছেন, সময়টা কম হয়ে গেছে। অনেকে বলেছেন, যদি আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতেন খুব ভালো হতো। মমতাজি বলেছেন, বাংলাদেশের আতিথেয়তা কখনও ভুলতে পারবেন না। আমি এটা সত্যিই বুঝতে পেরেছিÑ এটা দারুণ আতিথেয়তা। আমি আবার বাংলাদেশে আসব। আপনাদের আড়ং রয়েছে, আমি যাইনি। নোয়াখালীতে মন চায় চলে যেতে, যেখানে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী মিউজিয়াম। আমার আরও মন চায় আমি রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি যাই। তারপর পদ্মা নদীতে ঘুরব। বিশেষ করে যুবকদের সাথে আড্ডা করব। আড্ডা ছাড়া বাংলাদেশের যাত্রা অসম্পূর্ণ।
কবিতা দিয়ে আমি শেষ করছিÑ আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরেÑ এই বাংলায়। যে স্বপ্ন আমি দেশের জন্য দেখি, সে স্বপ্ন আমি আপনাদের জন্য দেখি।

জয় বাংলা জয় হিন্দ

Category:

Leave a Reply