দলছুট

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMফরিদুর রহমান : অনেক দূরে এলএমজি’র একটানা ঠা-ঠাÑ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মুনতাসিরের। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠে ভাবতে চেষ্টা করে সে কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, না-কি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল! অন্ধকারের মধ্যে ডাইনে-বাঁয়ে হাত বাড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে এখন কোথায়। বন তুলশি বা কানসিসার মতো নরম গাছপালা ছাড়াও ডান দিকে আকন্দ আটিশ্বরের হালকা ঝোপ-জঙ্গল হাতে ঠেকে। বাঁ হাতে ধরা এসএমজিটা কাছেই ভেজা মাটিতে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে। দু-পায়ের তলায় বালিমাটি আর ঠা-া জল-কাদার আভাস পায়। মুনতাসির বুঝতে পারে মুখটা নরম কাদামাটির মধ্যে গুঁজে রেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। বাঁ হাতের তলায় একটা কাঁটা গাছের খোঁচা থেকে বাঁচবার জন্যে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করতেই পাঁজরের ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে যায় তার।
রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণপুর ক্যাম্পে হাঁসের ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে আটজনের ছোট্ট দলটি দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে দিয়ালা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আগেভাগে বর্ডারে পৌঁছে যাওয়ায় দিয়ালার শরণার্থী শিবিরের কাছে টং দোকানে টিমটিমে হেরিক্যানের আলোয় বসে চা খেয়েছিল ওদের কয়েকজন। তখনই জানতে পারে গত এক সপ্তাহে দুবার সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। প্রথমবারে কোনো ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়বার দূর থেকে শরণার্থী শিবিরে গুলি চালিয়েছে। দিনের বেলায় তেমন লোকজন না থাকলেও গুলিতে দুবলহাটি কুমারপাড়ার বৃদ্ধ বৃন্দাবন পাল শিবিরের মধ্যেই মারা গেছেন। এছাড়া তাহমিনা নামে দশ-বারো বছর বয়সের এক কিশোরীর পায়ে গুলি লেগেছিল, তাকে বালুরঘাটে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মুনতাসিরের বুকের মধ্যে হঠাৎই ছ্যাঁত করে ওঠে। জানতে চায়, ‘মেয়েটার কী হয়েছে শেষ পর্যন্ত? বাঁচবে তো?’
‘কুনু খারাপ খবোর তো পাওয়া যায়নিÑ আল্লাহ বাঁচালে মোনে কয় ব্যাঁচে যাবে।’
বাঁশের অস্থায়ী মাচায় অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা বয়স্ক একজন জানান। আবুল কালাম কোলের ওপর স্টেনগান রেখে এক কোণায় বসেছিল। সে পরামর্শ দেয়। ‘তোমরাই বর্ডারের কাছে না থ্যাকে আরও ভিতরে সরে গেলেই তো পারিন।’
‘চেষ্টা করে দেখিছিÑ সরকারি জায়গা জুমি, ইস্কুল ঘর, পকর পাড় সব আগেই দখোল হ্যয়ে গেছে। সতীশ সরকারের একটা পুরানা চাতাল আর চক্রবত্তিঘেরে আমের বাগান পড়েই আছেÑ কিন্তুক দিবার চায় না।’
‘ইন্ডিয়ানরাও একোন বিরক্তরে বাÑ আর কতো ম্যানষেক জায়গা দিবে!’ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে শ্বেতশুভ্র চুলদাঁড়িওয়ালা একজন নিজে থেকেই ভারতীয়দের মনোভাব ব্যক্ত করেন।
ছয় গ্লাস চায়ের দাম হয়েছিল ষাট নয়া। মন্টুভাই চায়ের দাম দিতে গেলে দোকানি নিতে চায় না, ‘তোমাঘেরে পয়সা দ্যাওয়া ল্যাগবে না। তাড়াতাড়ি দ্যাশ স্বাধীন করিন, বাড়িত ফিরে যাবার প্যাল্লেই হামরা বাঁচি।’
‘হামাকেরে তো চেষ্টার কুনু ত্রুটি নাই চাচাÑ দোয়া ক্যরেন।’ দলনেতা সিরাজ ভাই উঠে পড়লে দলের সকলেই একে একে উঠে পড়ে।
বৃদ্ধ লোকটি দোয়া পড়ে সবার উদ্দেশে বাতাসে ফুঁ দিয়ে বলে, ‘ফি আমানিল্লাহÑ জয় বাংলা।’
সীমানা পিলার পার হবার খানিক পরেই সীতহার গ্রামের অনাবাদী জমি জঙ্গল পেরিয়ে দু-তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে পারে এমন পায়ে চলা পথের নিশানা পাওয়া যায়। ওরা আটজন আলপথের ডাইনে বাঁশে দুপাশে চারজন চারজন করে ভাগ হয়ে একটু আগেপিছে চলতে শুরু করে। গেরিলা দলের কখনোই এক লাইনে অথবা পাশাপাশি হাঁটার নিয়ম নেই। ট্রেনিং-ক্যাম্পের শিক্ষাগুলো যুদ্ধের মাঠে ঠিকঠাক মেনে না চলার কারণে বেশ কয়েকটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সিরাজ ভাই এসব ব্যাপারে ভীষণ কড়া। রাতের অন্ধকারেও সীতহারের আদিবাসী ছেলে মহিম মুরমু এখানকার পথঘাট ঠিক ঠাহর করতে পারে। তারপরেও কেমন করে যে এ্যাম্বুশে পড়ে গেল ওরা মুনতাসিরের মাথায় ঢোকে না।
রাইকালিপুর হাট থেকে দলটা তখনও আধা মাইল উত্তরে। মূল রাস্তা ধরে না এগিয়ে ওরা সড়কের পশ্চিম দিকে খাঁড়ির ঢালু পাড় ধরে ঝোপঝাড় পেরিয়ে খুব সাবধানে এগোতে থাকে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ঠিরিরি শব্দ আর দূরে কোনো পরিত্যক্ত বাড়ির উঠানে বেওয়ারিশ কুকুরের কান্না ছাড়া চারিদিকে শুনশান নীরবতা। আবছা আলো-আঁধারির মধ্যেই সিরাজ ভাইয়ের ইশারা পেয়ে পাড় ধরে ওরা তিন কিংবা চারজন হামাগুঁড়ি দিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই সারারাতের নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ঠা-ঠাÑ ঠা-ঠাÑ করে একসাথে অনন্ত গোটা দুই-তিনেক এলএমজি থেকে শুরু হয়ে এক নাগাড়ে গুলিবর্ষণ। মুনতাসির সম্ভবত উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। গুলির শব্দের সঙ্গেই সে মাটিতে শুয়ে পড়ে তারপর দ্রুত গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে যায়। বাঁ পাঁজরের নিচে চিনচিনে ব্যথার জায়গাটায় হাত দিতেই খানিকটা গরম তরল পদার্থ হাতে লাগে। হঠাৎ ওদের অবস্থান থেকে বিশ-পঁচিশ গজ সামনে আলোর ঝলকানির সাথে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ। দলের কেউ কি এগিয়ে গিয়ে গ্রেনেড চার্জ করেছিল! এরপর আর কিছু মনে করতে পারে না মুনতাসির।
বাড়ি থেকে একরকম পালিয়েই আসতে হয়েছিল তাকে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। চাকুরি ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত অপমানিত মানুষটি মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষণেক্ষণেই মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।
‘কি জানি বাপু! কবে কোন দিন দেশ স্বাধীন হবে সেই ভরসায় না থেকে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বোধহয় ঠিক হবেÑ তোর কি মনে হয়?’
যাকে প্রশ্ন করা সেই মুনতাসির কোনো উত্তর দেয় না, সে মনে মনেই পালাবার পরিকল্পনা করে। বুঝতে পারে সারাজীবন দশটা-পাঁচটা অফিস করে অভ্যস্ত বাবা একমাসেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। মা চান ছেলেরা যুদ্ধে যাক, কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলেকে যুদ্ধের মতো ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে বুক কেঁপে ওঠে। অগত্যা ছোট বোনের সাথে কথা বলে মুনতাসির। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলার পরে বলে, ‘মনে কর আমি যদি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আর ফিরে না আসি তাহলে তুই কি করবি?’
গত অক্টোবরে দশ পেরিয়ে এগারোতে পড়েছে তাহসিনা। ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তারপরে বলে, ‘তুমি কি বলো ভাইজান। তুমি না আসলে আমি তো কাইন্দা জারেজার হয়ে যাব!’ এবারে বিস্মিত হবার পালা মুনতাসিরের। ‘এই কথা তুই কোথায় পেলি?’
‘কোন কথা ভাইজান?’
‘এই যে কাইন্দা জারেজার…?’
ক্যান সেই দিন তুমি শোননি, দাদি পুঁথি পড়ে শোনাচ্ছিল…।’ এরপর সে নিজেই সুর করে বড় ভাইকে কয়েক লাইন শুনিয়ে দেয়।
‘লাখে লাখে মানুষ মরে, পলায় বেশুমারÑ পয়মাল হইল বসতভিটা আগুনে ছারখার
চারিদিকে শোকের মাতম দুনিয়া আন্ধারÑ ভাইয়ের শোকে বোনে হইল কাইন্দা জারেজার।’
মুনতাসিরের বুক ঠেলে কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে যায়। তার মনে হয় চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত গেরিলা হিসেবে সে জানে এ সময় সামান্যতম শব্দ করাও বিপজ্জনক। শত্রুরা কাছাকাছি কোথাও ওতপেতে আছে কি না কে জানে! সে যে দলছুট হয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো। গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে গেলে হয়তো পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু নড়াচড়া করতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। একই জায়গায় চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশে তাকিয়ে উত্তর দক্ষিণ আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। আশ্বিনের মাস শেষ হতে যাচ্ছে। কোথাও কোনো মেঘ নেই; কিন্তু ধ্রুবতারাটাও চোখে পড়ে না। একটা দিকচিহ্ন পেলে যত কষ্টই হোক ধীরে ধীরে উত্তরে সীমান্তের দিকে সরে যাওয়া যেত।
এলাকার মানুষ হলেও এ দিকের রাস্তাঘাট, খালবিল, এমনি হাট বাজারের সাথেও মুনতাসিরের তেমন পরিচয় নেই। ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ছুটিছাটায় বাড়িতে এসেছে পাঁচ-সাত দিনের জন্য। এবারে যুদ্ধ শুরু হবার পরে গ্রামে মাস খানেক কাটিয়ে একদিন বর্ডার পার হয়ে সোজা রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে। দেশের ভূগোল ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেছে সেই ভৌগোলিক ভূখ- রক্ষার লড়াই। সীতাহার, তারুলিয়া আর রাইকালিপুর হাটের নাম জানা ছিল। সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে আঁকা ম্যাপ দেখে পুরো টার্গেট এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এখন এই অন্ধকার রাতে গুলিবিদ্ধ আহত শরীরটাকে টেনে কোন পথে এগোবে সে!
দিয়ালা সীমান্ত থেকে যে পথটুকু তারা পাড়ি দিয়েছিল সেই পথ এবং হাঁটর গতি হিসাব করলে খাঁড়ির এই জায়গাটা রাইকালিপুর হাট থেকে আধ মাইল উত্তরে তারুলিয়া গ্রামের মাঝামাঝি। গ্রামটা বেশ বড়, কয়েক ঘর সম্পন্ন কৃষকের বসত ছিল এখানে। এখন না-কি বাড়ি বলতে কিছু মাটির দেয়াল, চাল কিংবা খুঁটির পোড়া বাঁশ, পরিত্যক্ত ঢেঁকি, লাঙ্গল আর মাটির ভাঙাচোরা হাড়ি কলসি। দরজা কপাট টিনের চাল লুটপাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারুলিয়ার উত্তরে সীতাহার গ্রামে ঢুকতেই খ্রিস্টান মিশনারিদের গির্জা। সীতাহার গির্জার চূড়ায় বিশাল ক্রুশচিহ্ন অনেক দূর থেকে দেখা যায়। গ্রামের আদিবাসি খ্রিস্টানদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলেও কেন যে বিধর্মী নাসারাদের এই উপাসনালয় এখন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তা পাকিস্তানিরাই ভালো বলতে পারবে। ক্রুশটা চোখে পড়লে খাড়ির পাড় ধরে ক্রলিং করে গির্জা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে বাঁকি পথটুকু হেঁটেও যাওয়া যেতে পারে। সীমান্তের গা ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে টহল দিতে সাহস পায় না পাকিস্তানিরা।
পাঁজরের নিচে যেখানে গুলি লেগেছে কোমর থেকে গামছা খুলে সেখানে পেঁচিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে মুনতাসির। এমনিতেই যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এ সময় মনোবল হারিয়ে ফেললে হয় এখানেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে মরে পড়ে থাকতে হবে আর না হলে ধরা পড়তে হবে শত্রুর হাতে। ডান দিকে কাত হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে মুনতাসির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওরা সবাই কি এতক্ষণে ক্যাম্পে ফিরে গেছে! দলছুট ছেলেটার কথা কেউ মনে করেনি, মরে পড়ে থাকলে লাশটাও তো খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারত। যুদ্ধ বড় নিষ্ঠুর খেলা। এখানে কেউ কারও বন্ধু নয়Ñ আর মুনতাসির তো এখানে এমনিতেই দলছুট। তাকে বাদ দিলে আর সবার ছাত্রজীবন শেষ। সবচেয়ে বেশি লেখাপড়া জানা মানুষ সিরাজ ভাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আক্কেলপুর বাজারে ছিট কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সব পুড়ে ছাই। দুই নিজামের একজন কালা নিজাম সাইকেল মেকার, অন্যজন ধলা নিজাম ম্যাট্রিক পাস করে মঙ্গলবাড়ি হাটের একটি ধানভাঙা কলের ম্যানেজার। এসএসসি পাস দ্বিতীয়জন কামরুল, খবরের কাগজের এজেন্সি চালায়। নিজে মালিক, নিজেই হকার। মাঝ মাঝে ঘুমের মধ্যেও হাঁক দেয়, ‘দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান…’ দেশ দুনিয়ার খবর সামান্য যেটুকু সেই রাখে। দলে প্রায় সবাই কৃষক পরিবার থেকে এলেও আবুল কালাম, মন্টু ভাই এবং মহিম মুরমু সরাসারি মাঠেই কাজ করত। তবে এদের কারোরই রাজনীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার একমাত্র ভাবনা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।
ক্যাম্পে মুনতাসিরের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল মুন। কামরুল খুব সমীহ করে ডাকতো ‘চাঁদভাই’। সেই কামরুলও কি একবার তার খোঁজ করবে না! রাতটা কি শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ! যা-ই হোক আকাশের চাঁদ তারা সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন কোনোভাবেই পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
রাত বোধহয় ধীরে ধীরে ফরসা হয়ে আসছে। বেশ দূরে, সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রামের আভাস দেখা যায়। আশপাশের ঝোপঝাড়গুলোও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। হাতের কাছে পড়ে থাকা এসএমজিতে পরম যতেœ হাত বোলায় মুনতাসির। এইখানে মরে পড়ে থাকলে অস্ত্রটাও খোয়া যাবে। দলে সবচেয়ে ভারী অস্ত্র বলতে তো দুটি সাব-মেশিনগান। একটা সিরাজ ভাই আর একটা মুনতাসিরের কাছে। বাকি ছয়জনের হাতে দুটি স্টেনগান আর চারটি থ্রি-নট-থ্রি। এ ছাড়া প্রত্যেকের কোমরে গোঁজা দুটি করে হ্যান্ডগ্রেনেড। পাকিস্তানি আর্মির টহলদল কিংবা সেতু কালভার্ট পাহারা দেওয়া রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালাবার জন্য এসব যথেষ্ট। কিন্তু এভাবে ফুটফাট গুলি চালিয়ে আর কতদিন! স্টেনগানগুলোকে খেলনা মনে হয় মুনতাসিরের। সাব মেশিনগানের রেঞ্জও এমন কিছু বেশি নয়। পঞ্চাশ গজের বাইর হলে টার্গেট তো মিস করেই, তাছাড়া পাকিস্তানি শয়তানগুলা যে হেলমেট মাথায় দেয় সেই হেলমেটে লাগলেও গুলি না-কি ছিটকে বেরিয়ে যায়। তার চেয়ে বরং থ্রি-নট-থ্রি ভালো। টার্গেটে হিট করতে পারলে জান নিয়ে পালাবার উপায় নেই।
খাড়ির উপরের রাস্তা পেরিয়ে গাছপালার ফাঁকে আকাশ ক্রমেই লাল হয়ে উঠছে। তাহলে এই দিকটাই তো পূর্ব দিক। বাঁ দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবছা আলোয় কুয়াশার আবরণ ভেদ করে চোখে পড়ে সীতাহার গির্জার মাথায় সাদা পাথরের ক্রশ। মাত্র আধা মাইল দূরে গির্জা চত্বরে ক্রুশেবিদ্ধ যিশু যেনো তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। নতুন করে সাহসী হয়ে ওঠে মুনতাসির। এবারে ক্রলিং-এর প্রস্তুতি হিসাবে নিজের দিকে একবার ফিরে তাকায় সে। সবুজ ঘাসের উপরে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত দেখে তার কোনো ভাবান্তর হয় না। নিজেই নিজেকে বলে ‘বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করা’ বোধহয় একেই বলে। বাঁ পাঁজরের রক্তভেজা জায়গাটা আরেকটু শক্ত করে বেঁধে নেয়। তারপর অতি সাবধানে নিঃশব্দে উঠে বসে। নাÑ ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে রাস্তার ওপার থেকে দেখার কোনো উপায় নেই।
হঠাৎ সে খেয়াল করে একদল পিঁপড়া সারিবদ্ধভাবে তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে কোথায় যেনো চলে যাচ্ছে। মানুষটা যে এখনও বেঁচে আছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পিঁপড়াদের ঝেড়ে ফেলতে একটা হাত তুলেই ফেলেছিল, পরক্ষণেই সে ভাবে, আহা থাকÑ আমার দেশের পিঁপড়া! সামনেই শীত আসছে হয়তো তাই খাবারের খোঁজে দল বেঁধে বেরিয়েছে। ওদের মেরে কি লাভ!
দূরে পরিত্যক্ত পোড়া বাড়িঘর আর কয়েকটা শিমুল শিরিষ গাছের ফাঁকে বিশাল একটা সূর্য আকাশজুড়ে আলোর আভাস ছড়িয়ে ক্রমেই আরও উপরে উঠে আসে। অপলক তাকিয়ে থাকে মুনতাসির। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি অসাধারণ সূর্যোদয় দেখবার জন্যে তাকে বাঁচতেই হবে! বুকের কাছে দুহাতে এসএমজিটা আঁকড়ে ধরে শ্বেতশুভ্র ক্রশ বরাবর ক্রলিং শুরু করে মুনতাসির।

Category:

Leave a Reply