দশম জাতীয় সংসদের ৪ বছর পূর্তি

06সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান দশম সংসদ সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রাণবন্তভাবে ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি। এই সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচন বর্জন করলেও গত চার বছরে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দশম জাতীয় সংসদে সক্রিয় ছিল ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল। অধিবেশনগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির পাশাপাশি নানা ইস্যুতে সরব হতে দেখা গেছে উভয় দলের সংসদ সদস্যদের। চার বছরে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির অবসান হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলও (জাপা) সরকারের মন্ত্রিসভায়Ñ এই বিবেচনায় চলতি দশম জাতীয় সংসদ ‘ব্যতিক্রমী’। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম একজন নারী স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
দশম সংসদের চার বছরে বড় ধরনের কূটনৈতিক সফলতা অর্জনের বিষয়টি সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের উদ্যোগে ঢাকায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বৃহত্তর দুটি সংগঠন কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) ও ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন হয়েছে। এই সংসদে গত চার বছরে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আলোচনায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষে বিলটি পাসের জন্য যখন সংসদে আসে, তখনও বিরোধী দল থেকে অনেক সংশোধনী আনা হয়, সেটার ওপর আলোচনাও হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাননীয় মন্ত্রীরা সেসব সংশোধনী গ্রহণও করেছেন এগুলো জনগণের কাছে ছিল খুব ইতিবাচক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে সকল দলের সদস্যদের মধ্যে এই যে আলোচনা এবং তার মধ্য থেকে একটা আইনকে চূড়ান্ত করাÑ সেই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে, ঠিক যখন বিলটা উত্থাপনের জন্য সংসদে আসে, সেই উত্থাপনের সময়ও বিরোধী দল অনেক সময় আপত্তি জানায় এবং মন্ত্রী সেটার উত্তর দেন, তারপর সংসদে ভোট পেয়ে সেটা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার জন্য এ বিষয়গুলো খুব সহায়ক প্রক্রিয়া।
তারপর বিরোধী দল গঠনমূলক সমালোচনার জায়গাটিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করছে। সবকিছুতেই তারা যে একমত তাও নয়; কিন্তু যে দ্বিমতটা তারা প্রকাশ করছেনÑ সেটা খুব সুন্দরভাবে তারা সংসদে উপস্থাপন করছেন। সরকার যেন সরকারের কাজগুলো আরও গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, সেক্ষেত্রে বিরোধী দল সহযোগিতা করছে। আবার বিরোধিতা বা যেখানে দ্বিমত আছে, সেখানে তারা সেটা সংসদে নির্বিঘেœ প্রকাশ করছেন। এই সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায়ও অনেক বিষয় উঠে এসেছে। বিরোধী দলের সদস্যরা যথেষ্ট ক্রিটিক্যালি সেগুলো সংসদে উপস্থাপন করেন। এসব ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র সদস্যদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে; তারাও প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিসের ওপর আলোচনা করছেন, কখনও কখনও তাদের মতামত গ্রহণও করা হয়। এগুলোর মধ্য দিয়েই সংসদ এগিয়ে যাচ্ছে।
বিরোধী দল হিসেবে জাপা বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ওয়াকআউট করেছিল। সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিলের প্রতিবাদে দলটি ওয়াকআউট করে। এছাড়াও তারা বিভিন্ন কারণে হাতেগোনা কয়েকবার ওয়াকআউট করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেওয়ায় সংসদের সবাই একই সুরে প্রশংসা করেছে। সংসদে সর্বসম্মত ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সংসদ একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধ স্বোচ্চার ছিল। ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবও এই সংসদে গৃহীত হয়েছে। সেভাবেই ২৫ মার্চকে দেশের ভিতরে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনিভাবে প্যালেস্টাইনের জনগণ যখন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তখনও তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সংসদ ‘বর্জন সংস্কৃতি’ অবসানকারী সংসদ বলে মনে করে সরকার ও বিরোধী দল।
গত চার বছরের ১৯ অধিবেশনে বৈঠক হয়েছে ৩২৮ দিন। এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা অধিবেশন ছিল প্রথমটি। ৩৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শেষ হয় ১০ এপ্রিল। আর সব থেকে ছোট অধিবেশন ছিল মাত্র ৫ কার্যদিবসের ১৫ ও ১৭তম অধিবেশন।
গত ৭ জানুয়ারি ১৯তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অধিবেশনেই দেশের নতুন ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা হয়। এই সংসদে এ পর্যন্ত ১২৮টি আইন পাস হয়েছে। বিল পাস, প্রশ্নোত্তরসহ অন্যান্য ইস্যুতেও সক্রিয় ছিলেন সংসদ সদস্যরা। সর্বশেষ ৪ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট পাস করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে এই সংসদ।
বিগত বছরগুলোতে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখতে একাধিকবার সংসদ বর্জন (ওয়াকআউট) করেছিল বিরোধী দল। সর্বশেষ চলতি অধিবেশনে ব্যাংক কোম্পানি আইন পাসের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন তারা। জাতীয় নির্বাচনের এ বছরের শুরু থেকেই অবশ্য সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিরোধী দল। প্রতিটি বিল উত্থাপন ও পাসের সময় তাদের রুটিন বিরোধিতাও অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের সদস্যরাই মাঝে মাঝে সরকারের নেওয়া জনবিরোধী সিদ্ধান্তগুলো কঠোর বিরোধিতা করে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখেন। বিভিন্ন ইস্যুতে দলীয় এমপিদের এই সংসদীয় আক্রমণে রীতিমতো বিব্রত হয়েছেন একাধিক মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতায় নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদ অতীতের যে কোনো সময়ের থেকে বেশ কার্যকর। এই সংসদের রেকর্ড সংখ্যক আইন পাসের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি বিরোধী দলও ভূমিকা রাখছে। তাদের সহযোগিতায় দেশে দুটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী স্বচক্ষে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিসহ অন্যান্য বিষয় দেখার সুযোগ পেয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে অনন্য সম্মান। তিনি আরও বলেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিদেশি অতিথিরা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর মাধ্যমে বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। যা আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখবে।
মাননীয় বিরোধী দলের নেতাও বাজেট আলোচনা, অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপরসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। এমনকি প্রধামন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরকালে এবং মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর পর্বেও তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। জনগণের অনেক সমস্যা তিনি সংসদে তুলে ধরেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি এই দশম জাতীয় সংসদের সংসদ নেতা, তিনিই কিন্তু প্রতি বুধবার ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়ার প্রচলন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত প্রশ্নোত্তরে অংশ নিচ্ছেন। সময়ে তুলনামূলকভাবে বিরোধী দলের সদস্যদেরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে দিয়েছে স্পিকার। কাজেই প্রশ্নকালগুলো ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। এবং অনেক সময় অনেক বিষয়ে তিনি দীর্ঘসময় বিস্তারিত উত্তর দেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত এবং প্রায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতিও আমরা সংসদে দেখতে পাই। কাজেই এগুলো খুব ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ‘প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি’, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবদানের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ ইত্যাদি। সেই বিষয়গুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব পাস হয়েছে।
জাতীয় সংসদ সবিচালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরাও অনেক ধরনের কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। যেমন অটিজমের ওপর প্রশিক্ষণে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বক্তব্য রেখেছেন। ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ কার্যক্রমের ওপর কর্মশালা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-কে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে কর্মশালা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যরা কাজ করছেন। বিশেষ করে সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মাতৃ-শিশু মৃত্যুরোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছেন। ‘এসপিসিপিডি’ প্রকল্পের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চার বছরে ৫০টি সংসদীয় কমিটির সহস্রাধিক বৈঠক হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৈঠক করেছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সবচেয়ে কম বৈঠক করেছে পিটিশন কমিটি। প্রথম দুই বছর কার্যপ্রণালি বিধি-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কোনো বৈঠক না হলেও গত দুই বছরে কয়েকটি বৈঠক করেছে।

Category:

Leave a Reply