দেশে দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

Posted on by 0 comment

PMfসাইদ আহমেদ বাবু: পৃথিবীতে অনেক ক্ষণজন্মা এবং মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে; এদের মধ্যে রয়েছেনÑ জর্জ ওয়াশিংটন, মোস্তফা কামাল পাশা, মহাত্মা গান্ধী, হো-চিন-মিন, ইয়াসির আরাফাত ও নেলসন ম্যান্ডেলা-সহ আরও অনেকে। এরা সবাই স্বপ্ন দেখেছেন স্বাধীন রাষ্ট্রের। আরও উন্নত দেশ ও স্বজাতির অধিকার আদায়ের জন্য। ঠিক তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুও স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের। মহাকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যারা মানবের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদেরই একজন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।
বিশ্বের দেশে দেশে যেমন কালজয়ী মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে, তেমনি তাদের অনেককেই প্রাণ দিতে হয়েছে আততায়ীর গুলিতে। বিশ্বে রাজনৈতিক হত্যার বহু নিদর্শন রয়েছে। যেমনÑ ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, চিলির আলেন্দে, যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং ও জন এফ কেনেডি, মিয়ানমার জেনারেল অং সান, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, সিংহলের প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দর নায়েক। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও গুপ্তহত্যার শিকার হন। ব্রিটিশদের বিদায়ের পরপরই ভারত ও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপরই স্বাধীনতার নায়কদের হত্যা করা হলো। ১৯৪৮ সালে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকা-ে নিহত হন ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। ‘কায়েদে আজম’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পাকিস্তানে কখনও জিন্নাহ এবং ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা বা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়নি, উপমহাদেশের অনেক নেতা হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন; কিন্তু তাদের ব্যক্তি-সিদ্ধান্তের নানা সমালোচনা থাকলেও কখনই সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে কালিমা লেপনের পর্যায়ে পৌঁছায় নি। হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়নি। উপমহাদেশে এমন রাজনৈতিক হত্যা কিংবা গুপ্তহত্যা কম হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যাপক জনপ্রিয় নেতারাও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-টি বিশ্বের অন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকা-। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নীলনকশার শিকার হয়ে তাদের মতোই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করেছে এদেশের সেনাবাহিনীর একটা ক্ষুদ্র অংশ। একটি বিষয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। সালভেদর আলেন্দেকে যখন হত্যা করা হয় চিলিতে তার বাসভবনে, তার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে ‘ধানমন্ডির ৩২ নম্বর’ বাড়িতে শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তাকে তার পরিবারের সদস্যদের, এমনকি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র ৯ বছরের রাসেলকে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিতে হয়েছে। শুধু দু-কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। তাদের ফিরে আসার ব্যাপারেও জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে। ওই বছরেরই জুলাই মাসে হত্যা করা হয় সৌদি আরবের কিং ফয়সলকে। তিনি এক বছরের মধ্যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখলমুক্ত করে পবিত্র আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। ধারণা করা হয়, সিআইএ ও ইসরায়েলের মোসাদের যুক্ত চক্রান্তে তিনি তার পরিবারের এক সদস্যের হাতে তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির সালভাদর আলেন্দে, ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট, ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, গুয়াতেমালার জ্যাকাবো আরবেঞ্জ কিংবা ঘানার কোয়ামে নক্রুমার তারা নিজ নিজ দেশে যখন সংস্কারের কর্মসূচি শুরু করেছেন, সিআইএ’র সাহায্য নিয়ে সেদেশের সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমাজতন্ত্রী ভাবাপন্ন নেতাদের বিভিন্ন সময় সিআইএ একে একে হত্যা করেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করানো হয়েছে শিখ বিছিন্নতাবাদীদের দ্বারা। আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করানো হয়েছে চরমপন্থি মুসলিম ব্রাদারহুডের জঙ্গিদের দ্বারা। যদিও বলা হয়, ইয়াসির আরাফাত রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এখন জানা যাচ্ছে, মোসাদের চরেরা তার শরীরে স্পের পয়জনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। এ সময়কালে শত ষড়যন্ত্র করেও সিআইএ কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করতে পারেনি। ফিদেল ক্যাস্ট্রো ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আপনজন। বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করতে গেলে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর উক্তি সবার আগে মনে পড়বে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, তার সিদ্ধান্ত, অবিচলতা নিয়ে বলতে গিয়ে ক্যাস্ট্রো বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি; কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।’

আব্রাহাম লিংকন
আব্রাহাম লিংকন ১৮০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আজীবন দাস প্রথার বিরোধিতা করেছেন। সংসদে তিনি এই প্রথা বাতিলের জন্য বক্তব্য উপস্থাপন করলে বিতর্কিত হন এবং ব্যর্থ হন। ১৮৪৭-৪৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৮৫৮ সালে তিনি মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মার্কিন রিপাবলিকান দলে যোগ দিয়ে স্টিফেন ডগ্লাসের বিপক্ষে প্রার্থী হন; কিন্তু নির্বাচনে হেরে যান। এ-সময় ‘লিংকন ডগ্লাস বিতর্ক’ এবং কৃতদাস প্রথা সম্পর্কে ক্যানসাস-নেব্রাস্কা আইনের ওপর বিতর্ক অল্পদিনের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় খ্যাতি এনে দেয়। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা ব্যাপক অর্থ-প্রতিপত্তি না থাকা সত্ত্বেও ১৮৬০ সালে রিপাবলিকানের হয়ে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নমিনেশন পান লিংকন, যেখানে তার প্রতিপক্ষ ছিল অনেক বেশি প্রভাবশালী। ডেমোক্রেটিক দলকে হারিয়ে ১৮৬০ সালে আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট হন লিংকন। ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ থেকে ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দাস প্রথাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন। ১৮৬১ সালের ১ জানুয়ারি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সই করার মধ্য দিয়ে লিংকন যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথা বিলুপ্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রায় ৩৫ লাখ ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। ১৮৬৩ সালে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নভেম্বর মাসে পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গ অঙ্গরাজ্যে তিনি একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণই ইতিহাসে বিখ্যাত ‘গেটিসবার্গ ভাষণ’ নামে পরিচিত এবং এটি পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত মাত্র ২ মিনিটের, ২৭২ শব্দের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর লিংকন বেশিদিন ক্ষমতায় ছিলেন না। কেননা তিনি আততায়ীর হাতে খুন হন নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল ফোর্ড থিয়েটারে একটি অনুষ্ঠানে নাটক দেখতে যান তিনি। সেখানে জন উইকস বুথ তার মাথার পিছনে গুলি করে হত্যা করে। বুথ লিংকনকে হত্যা করেছিল, কারণ সে কনফেডারেটের একজন সমর্থক ছিল এবং লিংকন ছিলেন কনফেডারেটের বিরোধী।

মহাত্মা গান্ধী
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো জনপ্রিয় নেতা হয়তো কেউ ছিলেন না। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তিদের একজন। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে তার ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম জনক তিনি। তার অহিংস সত্যাগ্রহের পথকে সম্মান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন ‘মহাত্মা’ শব্দটি। সেই তখন থেকেই বিশ্ববাসীর কাছে গান্ধী পরিচিত হন মহাত্মা গান্ধী নামে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন গান্ধী। ঘুরে দেখেছিলেন গোটা দেশ। বোঝার চেষ্টা করেছিলেন মানুষের সমস্যা। এরপর কংগ্রেসে যোগ দেন। তার নির্দেশেই স্বাধীনতার আন্দোলন করেছে জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু কোনোদিন কোনো পদ গ্রহণ করেন নি গান্ধী। মহাত্মা গান্ধী সব পরিস্থিতিতেই অহিংস মতবাদ এবং সত্যের ব্যাপারে অটল থেকেছেন। নিজের দলের সহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও অনশনে বসেছেন একাধিকবার। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে-সময় তিনি নতুন দিল্লির বিরলা ভবন মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। তার হত্যাকারী নথুরাম গডসে ছিলেন হিন্দু মৌলবাদী চরমপন্থি সংগঠন হিন্দু মহাসভার আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। হিন্দু মহাসভা বিভিন্ন কারণে গান্ধীর মতের বিরোধী ছিল। গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী তার দেহভস্ম বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রধান নদী যেমনÑ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, নীল নদ, ভোলগা, টেমস প্রভৃতিতে ভাসানো হয়।

সলোমন বন্দরনায়েক
সলোমন বন্দরনায়েক। সম্ভ্রান্ত সিংহলি-আমেরিকান খ্রিষ্টান পরিবারে তার জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৮৯৯ সালে। তরুণ আইনজীবী হিসেবে সিলন ন্যাশনাল কংগ্রেসে সক্রিয় ছিলেন। ১৯২৬ সালে কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সালে সিলন স্টেট কাউন্সিলে কর্মরত ছিলেন। সিংহলি সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি আগ্রহ থাকায় ১৯৩৬ সালে সিংহলা মহাসভা আয়োজন করেন। ১৯৪৬ সালে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টিতে যোগ দেন ও ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ মেয়াদে মন্ত্রী পর্যায়ের বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫১ সালে শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর সমসমাজ পার্টি, শ্রীলংকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়ে চারদলীয় জোট গড়েন ও প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে সিংহলিকে গ্রহণ করেন, ইংরেজি ভাষার অবনমন ঘটান, সাম্যবাদের উত্তরণ ঘটান ও পশ্চিমাবিরোধী রাজনীতির প্রবর্তন ঘটান।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেন। কাতুনায়েকে ও চীনা বে থেকে ব্রিটিশদের বিমান ঘাঁটি এবং ত্রিকোমালি থেকে নৌ ঘাঁটি গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য করেন। ঘরোয়া রাজনীতিতে অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হন ও ভাষার বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। ১৯৫৮ সালে সংখ্যালঘু শ্রীলংকান তামিলদের দাঙ্গার কবল থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হন। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯ তারিখে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ৬০ বছর বয়সে তালদুয়ে সোমারামা নামীয় একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

পাত্রিস লুমুম্বা
পাত্রিস লুমুম্বা ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি। তিনি ছিলেন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা ও সাহিত্যিক। পাত্রিস লুমুম্বা বেলজিয়াম অধিকৃত কঙ্গোতে ১৯২৫ সালের ২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল এলিয়াস ওকিত আসম্বো। ছাত্র হিসেবে মেধাবী লুমুম্বা ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন ও বৃত্তি পান। তিনি ফরাসি, লিংগালা, সোয়াহিলি ও সিলুবা ভাষা জানতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে লুমুম্বার সঙ্গে কঙ্গোর বুদ্ধিজীবী আর উদারপন্থি রাজনীতিকদের সঙ্গে জানাশোনার শুরু হয়। ১৯৪৭ সাল নাগাদ লুমুম্বাকে শ্রমিক ইউনিয়ন আর নানান বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায়। আফ্রিকাতে বর্ণ-সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়াসেও শামিল হন লুমুম্বা। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতেই ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী উদারপন্থি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। এ সময় তার কলমে আরও আসে কবিতা, কঙ্গো আর কালো মানুষের জন্য কবিতা। লুমুম্বার নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে গঠিত হয় দ্য ন্যাশনাল কঙ্গোলিজ মুভমেন্ট (এমএনসি)। সংগঠনের কাজে সারাদেশে ঘুরতে শুরু করেন লুমুন্বা। জনগণের মনের কথা পড়তে পারার সক্ষমতায় অনতিবিলম্বে লুমুম্বার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় অমোঘ সেই শব্দ, স্বাধীনতা। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে ঘানার আক্রাতে অনুষ্ঠিত প্যান-প্যাসিফিক পিপলস কনফারেন্সে যোগ দিয়ে কেবল কঙ্গো নয়, গোটা আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন লুমুম্বা। ১৯৫৯ সাল জুড়ে সব রাজনৈতিক দলকে মতৈক্যে আনতে সর্বশক্তি ব্যয় করেন তিনি। অনেক আঞ্চলিক দল নানা প্রদেশে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। ১৯৬০-এর মে মাসে জাতীয় নির্বাচনে লুমুম্বার প্রচেষ্টার পক্ষে কথা বলেনি। ১৩৭ আসনের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে লুমুম্বার এমএনসি মাত্র ৩৩ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কঙ্গোর আরেক জাতীয়তাবাদী নেতা জোসেফ কাসাভুবুর আবাকো দল পায় ১৩টি আসন। বিদ্যমান বাস্তবতায় নিরুপায় লুমুম্বা কাসাভুবুকে প্রেসিডেন্ট পদ দিয়ে নিজে হলেন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের এই নাজুক ধারাবাহিকতাতেই জুনে স্বাধীন হয় কঙ্গো। কঙ্গো হাতছাড়া হয়ে গেলেও কঙ্গোতে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম হয় এত দিনের প্রভুরা। কঙ্গোজুড়ে অরাজকতা ছড়িয়ে দেওয়ায় কাজে লাগানো হয় অনুগত রাজনীতিক ও সেনাবাহিনীকে। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লুমুম্বা ও কাসাভুবুকে পদচ্যুত করা হয়। ডিসেম্বরে গ্রেফতার হন লুমুম্বা। জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি লুমুম্বাকে। এরপর কঙ্গো চলে যায় সামরিক বাহিনীর হাতে। মাত্র ৩৫ বছরের একটি জীবন পেয়েছিলেন প্যাট্রিস লুমুম্বা। ক্ষণস্থায়ী সে জীবন উৎসর্গিত হয়েছিল জন্মভূমির স্বাধীনতার লড়াইয়ে।

জন এফ কেনেডি
১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পিতা জোসেফ পি. কেনেডি সিনিয়র-এর উৎসাহ আর সহযোগিতায় তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ডেমোক্রেটদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫২ সালে কেনেডি সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির মাঠে তার গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির হোতা রিচার্ড নিক্সনকে তিনি ১৯৬০ সালের নির্বাচনে পরাজিত করে মার্কিনিদের দুঃস্বপ্নের ইতি টেনেছিলেন। ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি ৩৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কেনেডি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কিউবার মিসাইল সঙ্কট, পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি, মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপনের প্রতিযোগিতা ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মতো বেশ কিছু বিষয় ঘটে। কেনেডি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ঠা-া লড়াইয়ের ইতি টানা ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে আসার চেষ্টা করছিলেন বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট কমানোর পক্ষেও ছিলেন কেনেডি। বর্ণবাদে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রকে একত্র করতে তিনি কাজ করেছেন। কেনেডি সমর্থন জানিয়েছেন সমান নাগরিক অধিকারের আন্দোলনকে। পাশে দাঁড়িয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গদের। সমালোচিত হয়েছেন, তবু বরাবর ওদের হয়েই কথা বলেছেন। বিখ্যাত হয়ে আছে তার সেই মন্তব্য : ‘একটা কালো বাচ্চা জন্মানোর পর, তার স্কুলে পড়ার সুযোগ একটা সাদা বাচ্চার অর্ধেক। কলেজে যাওয়ার সুযোগ তিন ভাগের এক ভাগ। কালোদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও সাদাদের এক-তৃতীয়াংশ। নিজের একটা বাড়ি হওয়ার স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও অর্ধেক। কালোরা সাদাদের থেকে শুধু চার গুণ এগিয়ে আজীবন বেকার থাকার সম্ভাবনায়!’ আফ্রিকান আমেরিকানদের আইনগত অধিকারের পক্ষে কেনেডি ছিলেন সোচ্চার। তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়ে কেনেডির তৈরি করা একটি বিলই পরে নাগরিক অধিকার আইন হিসাবে অনুমোদন পায়। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে এক মোটরশোভাযাত্রায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ৪৬ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র
কিংবদন্তি আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এর ফলে ১৯৫৯ সালে গান্ধীর জন্মস্থান ভারত সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। ১৯৫৫ সালে তিনি মন্টোগোমারি বাস বর্জনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৩ সালে ওয়াশিংটনে কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক মুক্তি, চাকরির সমতা অর্জন এবং সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার লক্ষ্যে কিং বেয়ারড রাস্তিন এবং আরও ৬টি সংগঠনের সহায়তায় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। প্রায় ৩ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কিং তার সেই বিখ্যাত ‘আই হেভ এ ড্রিম’ শীর্ষক ভাষণ দেন, যা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে একটা বিবেচিত হয়। এক বর্ণবাদী শ্বেতকায় আমেরিকান ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মার্টিন লুথার কিং-কে হত্যা করে।

চে গুয়েভারা
বিপ্লবী আর্নেস্ত চে গুয়েভারা ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও গ্রামে জন্ম নেন। মানুষের তরে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতেই সংগ্রামের পথ বেছে নেন চে গুয়েভারা। চে আর্জেন্টিনার নাগরিক হলেও কিউবার বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু চিকিৎসক চে গুয়েভারা ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের অন্যতম নায়ক। তিনি কিউবার মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর্জেন্টিনাকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে গোপনে কিউবা ত্যাগ করেন। আর্জেন্টিনার জঙ্গলে গোপন গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। তাতে আঁতকে ওঠে আমেরিকাসহ পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলো। চে’কে তারা মূর্তিমান আতঙ্ক মনে করলে তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। চে গুয়েভারা বিশ্ব ইতিহাসে যিনি বিপ্লবের এক মহানায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালে তাকে সিআইএ আহত অবস্থায় আটক ও ৯ অক্টোবর হত্যা করে।

ডাক্তার সালভাদর আলেন্দে
ডাক্তার সালভাদর আলেন্দের জন্ম চিলির ভালপ্যারাইসোতে, ১৯০৮ সালের ২৬ জুন। সিলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল গ্রাজুয়েট হন তিনি। আলেন্দে ছাত্র-জীবন থেকে চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে, হিটলারের অভ্যুত্থানের পর থেকে যে প্রচ- ইহুদি বিদ্বেষ তৈরি হয়, তখন তার প্রতিবাদ করে হিটলারকে এক টেলিগ্রাম পাঠান। ২৫ বছর বয়সে সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৩৩ সালে সোস্যালিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন চিলির একাধিক নির্বাচনে লড়েছেন ১৯৫২ সাল থেকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পপুলার ইউনিটি ফ্রন্ট গঠন করে তিনি জয়লাভ করেন। আলেন্দে সরকার গঠন করে চিলিতে উন্নয়নমূলক নানা সংস্কার আন্দোলন চালু করেন। আলেন্দে ক্ষমতায় এসে প্রথমেই চিলির সমস্ত তামার খনি এবং বিদেশিদের (বিশেষ করে মার্কিন) মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করেন ও এগুলোর জাতীয়করণ করলেন। বিদেশনীতিতে পরিবর্তন এনে কিউবা ও চীনের সাথে বৈদেশিক সম্পর্ক গয়ে তুললেন। দেশের জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য তিনি দ্রব্যমূল্যের দাম স্থির করে ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে দিলেন। আলেন্দের শক্তির মূল উৎস ছিল দেশের কৃষক-শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত জনগণ। তারা আলেন্দের এই পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানায়। চিলির প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি তার খনিজ সম্পদ। সেই সম্পদই আলেন্দের জন্য কাল হয়েছিল। সেখানে মার্কিন পুঁজির মূল বিনিয়োগ ছিল সর্বোচ্চ। চিলির তামার খনি ও অন্যান্য কারখানা জাতীয়করণের ফলে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলরা আলেন্দের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিছু সরকারি আমলা ও সেনাবাহিনীর একটা অংশ চলে যায় সিআইএ-র খপ্পরে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মদতপুষ্ট সামরিক রক্তাক্ত ক্যু-এর মাধ্যমে চিলির জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করা হয়। মিলিটারি জেনারেল পিনোচে ক্ষমতা দখল করেন, চিলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকার মদতপুষ্ট এক স্বৈরতন্ত্রী সরকার। আলেন্দের মৃত্যু হয় এই ক্যু-র ফলে। এই অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দেশের শীর্ষ মার্কসবাদী নেতাদের। ঘাতকরা সবাইকে খুন করে।

ইন্ধিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী
ইন্ধিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী বিশ্বব্যাপী যার পরিচিতি ইন্দিরা গান্ধী নামে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও মা কমলা নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা। এক বর্ণময় এবং গতিময় জীবনের অধিকারী ছিলেন ইন্দিরা। ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হন। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি চার-দফা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। একটি খারাপ সময়ে শক্ত হাতে রাষ্ট্রীয় অখ-তা রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিষাদময় পরিণতি বরণ করতে হয় ইন্দিরা গান্ধীকে। এই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ইন্দিরা গান্ধী তার জীবন দিয়েছেন। পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের অবমাননা আর খালিস্তানের স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ করে দেওয়ার প্রতিশোধস্বরূপ ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, সাৎওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিং নামে নিজের দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী। স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের পরের মাসে ‘র’-এর ডিরেক্টর মিসেস গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে থেকে শিখদের অপসারণ; কিন্তু সেই ফাইল যখন ইন্দিরা গান্ধীর টেবিলে পৌঁছায়, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে তিনি নোট লিখেছিলেন, ‘আরন্ট উই সেকুলার?’ অর্থাৎ, ‘আমরা না ধর্মনিরপেক্ষ দেশ?’ দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার উল্লেখযোগ্য সমর্থন ইতিহাসে চিরঃস্মরণীয়। ভারতের ইতিহাসে একটি করুণ, অনাকাক্সিক্ষত ও মর্মবিদারক ঘটনা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকা-।

ইয়াসির আরাফাত
ইয়াসির আরাফাত ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্ট মিসরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। আরাফাত ১৯৯৪ সালে আইজ্যাক রবিন ও শিমন পেরেজ-এর সাথে অসলো শান্তিচুক্তির জন্য একত্রে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০০২ হতে ২০০৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত আরাফাত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে তার রামাল্লার দপ্তরে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে থাকেন। ফিলিস্তিনি এই মহান নেতা ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রয়াত হন। ফ্রান্সে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যুকে এখনও রহস্যজনক মনে করেন ফিলিস্তিনি জনগণ। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ তাকে ষড়যন্ত্রের জালে ফেলে এবং শ্লো পয়জনিং করে হত্যা করে বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।

বেনজীর ভুট্টো
বেনজীর ভুট্টো ১৯৫৩ সালের ২১ জুন পাকিস্তানের করাচিতে এক ধনাঢ্য এবং রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মাতা ছিলেন বেগম নুসরাত ইস্পাহানি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে ঢেলে সাজান বেনজীর ভুট্টো ও তার মাতা নুসরাত ভুট্টো এবং যৌথভাবে তারা পার্টির কো-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে বেনজীর সিন্ধু প্রদেশের ব্যবসায়ী আসিফ জারদারিকে বিয়ে করেন। এ দম্পতি তিন সন্তানের জনক-জননী হন। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় বেনজীর সমর্থিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি। মাত্র ৩৫ বছরে প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করে ইতিহাস গড়েন বেনজীর ভুট্টো। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই বছরের মাথায় বিদেশি প্ররোচনায় বেনজীর ভুট্টোকে পদ থেকে অব্যাহতি দেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গুলাম ইসহাক খান। ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনে আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং বেনজীর ভুট্টো দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন। এ-সময় তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে আততায়ীর হাতে বেনজীরের ভাই মুর্তাজা ভুট্টোর হত্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল হয়ে পড়ে। বেনজীরকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ওয়াসিম সাজ্জাদ। এ-সময় তিনি ও তার স্বামী জারদারিকে গ্রেফতার করে কারাদ- দেওয়া হয়। ফলে আবারও তিনি নির্বাসনে লন্ডনে পাড়ি জমান। ২০০৭ সালে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ আর বেনজীর ভুট্টোর মধ্যে রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে এক দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে প্রায় আট বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ২০০৭ সালের অক্টোবরে করাচিতে ফেরেন বেনজীর ভুট্টো। পাকিস্তানের রাওলপিন্ডি ২০০৭ সালে নির্বাচনী জনসভায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে। এ ঘটনার ১০ বছর পর সেই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবান।

Category:

Leave a Reply