নাটেশ্বর দেউল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রত্ন আবিষ্কারের একটি

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেন, ওয়ারী বটেশ্বরের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। সেই ওয়ারী বটেশ্বরের পরই বিক্রমপুরের নাটেশ্বর। তিনি বলেন, হাজার বছর আগের পুরনো শহর নাটেশ্বরকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। 

41উত্তরণ প্রতিবেদন: মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর দেউল পৃথিবীর সেরা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি। বাকি খনন কাজ শেষ হলে শতাব্দী প্রাচীন এই বৌদ্ধ নগরী ‘বিশ্বঐতিহ্যে’র তালিকাভুক্ত হবে। এ ছাড়া বৌদ্ধ প-িত অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও জায়গা করে নেবে। গত ৬ জানুয়ারি বিকেলে নাটেশ্বর গ্রামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিন জুং, পরিচালক গু ওয়াইমিন ও হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ব্যুরোর চিফ চি ইউবিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ, মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার। সংবাদ সম্মেলনের আগে অতিথিরা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘুরে দেখেন।
সংবাদ সম্মেলনে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপটির পূর্ব বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ মিটার। এর মধ্যে ৪২ মিটার দৈর্ঘ্যরে উত্তর ও দক্ষিণ বাহুর অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে। অবশিষ্ট ম-পসহ অষ্টকোণাকৃতির ৩টি স্তূপের খনন বাকি আছে।
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৫ দশমিক ২ মিটার আয়তনের কেন্দ্রীয় স্তূপ (প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ২ মিটার, কোণাকুণি বাহুর দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৬ মিটার), বাংলাদেশের বজ্রমান বৌদ্ধ মতবাদের ক্রুশাকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে পরিচিত। ৮ সংখ্যার প্রাধান্য থাকায় অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কারটি অষ্টমার্গ স্তূপ। কারণ বৌদ্ধধর্মে অষ্টমার্গ যেমনÑ চিন্তা, সৎ কর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, প্রতœতত্ত্ব খনন কাজে অন্যান্য আবিষ্কার হলোÑ পূর্ব দিকে প্রবেশ পথসহ ১১ মিটার/১১ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, উত্তর দিকে প্রবেশ পথসহ ৭টি মিটার/৭ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, তদসংলগ্ন ইট বিছানো মেঝেসহ ৪ দশমিক ৮ মিটার এবং ২ দশমিক ৪ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ। দক্ষিণ দিকে প্রবেশপথসহ আরও একটি কক্ষ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রতœবস্তুর ভিত্তিতে বলা যায় যে, স্তূপ কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশ পথটি ছিল উত্তর দিকে। এর আগে আবিষ্কৃত কারুকার্যময় মন্দির ও সীমানা প্রাচীরটিও উল্লেখযোগ্য।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৩-১৮ উৎখননে ৫ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকা উন্মোচিত হয়েছে এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রতœবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। আমেরিকার বেটা পরীক্ষাগারে ২৬টি কার্বন-১৪ পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দুটি সময়কাল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রথম পিরিয়ড ৭৮০-৯৫০ খ্রিস্টাব্দ, যা শুরু হয়েছিল দেব রাজবংশের সময় (৭৫০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং টিকে ছিল চন্দ্র রাজবংশ (৯০০-১০৫০) পর্যন্ত। নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দ্বিতীয় পিরিয়ড হলো ৯৫০-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, যা চন্দ্র, বর্ম (১০৮০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং সেনদের (১১০০-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ) শাসন পর্যন্ত টিকে ছিল। তাম্রশাসন অনুসারে চন্দ্র, বর্ম ও সেনদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। প-িত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বিক্রমপুরের নাম পাওয়া যায় তিব্বতের ঐতিহাসিক সূত্রে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেন, ওয়ারী বটেশ্বরের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। সেই ওয়ারী বটেশ্বরের পরই বিক্রমপুরের নাটেশ্বর। তিনি বলেন, হাজার বছর আগের পুরনো শহর নাটেশ্বরকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সে সঙ্গে এই প্রতœতাত্ত্বিক খনন কাজের পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

নাটেশ্বর সংরক্ষণে আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকছে : অর্থমন্ত্রী
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে ঐতিহ্য অন্বেষণ (প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র) বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা কাজ শুরু করে। রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে (প্রাচীন বজ্রযোগিনী) বিক্রমপুরী বৌদ্ধ বিহারের ৬টি ভিক্ষু কক্ষ, একটি ম-প ও পঞ্চস্তূপ আবিষ্কৃত হয়। ২০১৩ সাল থেকে টঙ্গিবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বর দেউলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন চলমান। প্রায় ১০ একর ঢিবিতে উৎখনন কাজের বিশালতা ও সংরক্ষণের কথা চিন্তা করে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতœতত্ত্ব ইনস্টিটিউটকে আমন্ত্রণ জানায়। ২০১৩-১৮ যৌথভাবে উৎখননে ৫ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকায় উৎখনন হয়েছে এবং ইতিহাস পুনর্গঠনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রতœবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপ, ৩টি অষ্টকোণাকৃতির স্তূপ; ইট-নির্মিত অতি সুন্দর ৪টি রাস্তা, চারদিকে ৪টি স্তূপ হলঘর পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অষ্টকোণাকৃতির কেন্দ্রীয় স্তূপ। এছাড়া বিভিন্ন পরিমাপের ৪টি কক্ষ এবং অন্যান্য স্থাপত্যিক নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে।
‘সদ্য আবিষ্কৃত প্রাচীন বৌদ্ধ নগরীর নানা নিদর্শন আবিষ্কার বিক্রমপুরের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’ গত ৬ জানুয়ারি নাটেশ্বর গ্রামে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খননে আবিষ্কৃত প্রতœবস্তু নিয়ে প্রেস কনফারেন্সে এই ঘোষণা দেন বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্মিক খনন ও গবেষণা প্রকল্প ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন। এতে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম, অধ্যাপক ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান, চীনা গবেষক অধ্যাপক চাই এবং গেস্ট অব অর্নার হিসেবে অংশ নেন মি. জিনসহ চীনা একটি গবেষক দল।
অতিথিবৃন্দ আবিষ্কৃত পুরাকীর্তি ঘুরে দেখেন। অতিথিরা নাটেশ্বরে আবিষ্কৃত প্রতœতাত্ত্বিক নিদের্শনা দেখে অভিভূত হন। আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি প্রতœতাত্ত্বিক এই কাজে তার সহযোগিতার আশ্বাসের কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেছেন, মহেঞ্জোদারো’র আদলে নাটেশ্বর বৌদ্ধ নগরীকে সংরক্ষণের জন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকবে। সেই লক্ষ্যে একটি প্রকল্প করে নাটেশ্বরের সাথে খনন কাজে সম্পৃক্ত একটি টিম মহেঞ্জোদারোতে পাঠানো হবে। তারা যাতে প্রশিক্ষিত হয়ে আসতে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতœতত্ত্ব ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। প্রতœতত্ত্ব ইতিহাসের যে ভুল-ত্রুটি আছে সেগুলো দেখিয়ে দেয় এবং আমরাও চেষ্টা করছি এখানে এই প্রতœতাত্ত্বিক আবিষ্কার তার মাধ্যমে আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার।
আমরা নাটেশ্বর এসে দেখতে পাই যে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কতটা উন্নত জীবনযাপন করতেন। এখনও আমরা দেখতে পেলাম দেড়শ ফুট রাস্তার। মানে তখনকার সময়ের রাজপথ। তখন তো রাস্তা ছিল ছোট, গাড়িও ছিল ছোট ছোট, রাজপথও ছোট। এটাকে আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমার যতটুকু মেয়াদ রয়েছে এর মধ্য এখান থেকে কয়েকজন পর্যবেক্ষণ দলকে প্রশিক্ষণ ও সমৃদ্ধিশালী করতে মহেঞ্জোদারোতে পাঠানো হবে সেই ব্যবস্থাটা আমি করে যেতে চাই। যাতে প্রশিক্ষণ শেষে বিক্রমপুরের এই নাটেশ্বরে কিছু করতে পারি। আমাদের দেশে অনেক কম আছে এই রকম পুরাকীর্তি।
তিনি বলেন, আমরা বিক্রমপুরে ইতোমধ্যে জাদুঘর তৈরি করেছি। এখন নাটেশ্বরের প্রাচীন শহরটাকে তৈরি করব। পুরনো শহর যেটা নাটেশ্বর, এটাকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেটা আমাদের শিখতে হবে, করতে হবে, এইটাই আমাদের আগামীর দায়িত্ব। এটা যাতে পালন করা যায়, তার জন্য আমার মেয়াদকালে আমি কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যেতে চাই।

Category:

Leave a Reply