নীতির প্রশ্নে আমি কখনও আপস করব না

uttaran

জাতীয় শোক দিবসে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী প্রেতাত্মারা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের ইতিহাস বিকৃত করেছিল, দেশকে উল্টো পথে নিয়ে গিয়েছিল সেসব প্রেতাত্মারা এখনও সক্রিয়। তাদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু নীতির প্রশ্নে আমি কখনও আপস করিনি, করবও না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ বেয়েই আমরা দেশকে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবই।
জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গত ৩১ আগস্ট বিকেলে গণভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মরণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তার এই দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।
সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত ও উসকানি দিয়ে একটি মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় নেমে পড়ে। ছোট্ট ছোট্ট ছাত্রদের ঘাড়ে পা রেখে অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। এদের অনেকে না-কি আবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। আমার প্রশ্নÑ অনেক জ্ঞানী-গুণী ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা ওই সময় কী করেছেন? আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি। সেই প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা ও গুজব ছড়িয়ে আন্দোলনে উসকানি দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এই উসকানি ও গুজবের ফলে কত শিশুর প্রাণ যেতে পারত, কত শিশুর ক্ষতি হতে পারত কেউ কী তা ভেবে দেখেছে? তিনি বলেন, আমরা যখন গুজব সৃষ্টিকারী ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলাম তখন দেখলাম অনেকের হাহাকার! আন্তর্জাতিক কত চাপ। কিন্তু আমি ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করি। দেশের স্বার্থে কোনো ছাড় নেই। আমার বাবা-মা’র কাছ থেকে শিখেছি নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নেই, করবও না। দেশে-বিদেশের সবাইকে তা মনে রাখতে হবে। তিনি বলেন, আমার রাজনৈতিক জীবনে গ্রেনেড হামলা, গুলি, বোমা হামলাসহ অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আমাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমি কোনো কিছুর পরোয়া করিনি। কারণ আমার আত্মবিশ্বাস আছে যে, আমি সত্য ও ন্যায়ের পথে। দেশের মানুষের কল্যাণ ও তাদের মুখে হাসি ফোটানোই আমরা রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য থেকে কেউ আমাকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে নিজেদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলে ন্যায়-প্রগতি ও শান্তির পতাকা উড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরেই আমরা বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলেছি, স্বল্পোন্নত বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের কাতারে। আমরা আর বেশিদিন থাকব না। তোমরাই (ছাত্র) দেশের ভবিষ্যৎ। তোমাদেরই আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। নিজেদের একেকজন আদর্শিক নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আদর্শ নিয়ে নিজেকে গড়ে তুললে ইতিহাসে তোমরাই মূল্যায়ন পাবে, স্থান পাবে। কিন্তু ধন-সম্পদের দিকে গা ভাসালে হারিয়ে যাবে। ছাত্রলীগের অনেক নেতাই আদর্শচ্যুত হয়ে হারিয়ে গেছে, অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিসহ নানা দলে চলে গেছে।
শিক্ষাই একমাত্র সম্পদ এ-কথাটি সবসময় মনে রাখার জন্য ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দেশের প্রতিটি অর্জনের পেছনে ছাত্রলীগের বিরাট অবদান রয়েছে। আইয়ুব-ইয়াহিয়া, জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে শহিদের তালিকা দেখলে দেখা যাবে, এক্ষেত্রে শহিদের তালিকায় ছাত্রলীগেরই বেশি সদস্য রয়েছে। তাই ছাত্রলীগকে আদর্শিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না, কেউ সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু শিক্ষাই একমাত্র সম্পদ, যা কেউ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারে না। তাই ছাত্রলীগের প্রতিটি সদস্যকে সর্বাগ্রে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্র ও ইতিহাস বিকৃতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ১৫ আগস্টের মাত্র ১৫ দিন আগে শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর চাকরিস্থল জার্মানিতে গিয়েছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই এক রাতে আমরা সব হারিয়ে এতিম হয়ে গেলাম। কিন্তু আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করা হয়নি। উল্টো অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া ইনডেমনিটি দিয়ে বিচারের পথ বন্ধ করে দেয় এবং খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমাকে দেশে ফিরতে দেয়নি জিয়া। রিফিউজি হিসেবে আমাদের দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট শুধু জাতির পিতাকেই হত্যা করা হয়নি, এ হত্যাকা-ের মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ইতিহাসকে হারিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু খুনিদের দোসরদের কোনো ষড়যন্ত্রই বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ সত্যকে কখনও মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণে তার অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য, তাদের কল্যাণ ও ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। নিজে কী পেলাম বা কী পেলাম না, সেই হিসাবের অঙ্ক কষার আমার কোনো সময় নেই। দেশের মানুষকে কতটুকু দিতে পারলাম সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। যারা দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করে, কল্যাণে কাজ করে, একদিন ইতিহাসই তাদের মূল্যায়ন করে। তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরেই আমরা বাংলাদেশকে তার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবই।

Category:

Leave a Reply