পদ্মায় স্বপ্নের সেতু : শত্রুর মুখে ছাই

Posted on by 0 comment

17উত্তরণ প্রতিবেদন: অবশেষে দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মাসেতু। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে প্রথম স্প্যান (সুপার স্ট্রাকচার) খুঁটির (পিয়ার) ওপর স্থাপন করা হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে ১০টার মধ্যেই সেতুটির জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮নং খুঁটির ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই স্প্যানটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর অগ্রগতির আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এই মাহেন্দ্রক্ষণটিতে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, সেতু সচিব আনোয়ারুল ইসলাম, সেতুটির প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম, পদ্মাসেতুর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, সেনাবাহিনীর জেনারেল আবু সাইদ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের কোম্পানির প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বেলা সোয়া ১১টায় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পাশের সেতুর জাজিরা জেডিতে নেমে সাংবাদিকদের সার্বিক বিষয়ে ব্রিফিং করেন। মন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বাসনোর মধ্য দিয়ে আকাশে কালো মেঘ কেটে দৃশমান হয়েছে পদ্মসেতু। সকল বাধা উপেক্ষা করে সেতুর কাজ এগিয়ে চলেছে। যথাসময়েই সেতুর কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ পর্যন্ত পুরো সেতুর কাজ সাড়ে ৪৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে অন্য স্প্যানগুলোও উঠবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে খুব শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সেতুর কাজ যাতে এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ না থাকে সেই জন্য তার নির্দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে সেতুর স্প্যান উঠানো হয়েছে। সেতু সচিব বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পিয়ারের গভীরতা বৃদ্ধি বা প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তার মানে সেতুর ডিজাইনের পরিবর্তন নয়।
এদিকে স্বপ্নের পদ্মাসেতু দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রকল্পস্থলে বিশেষ পরিবেশ বিরাজ করছে। এই সাথে সংশ্লিষ্টরা আনন্দে উদ্বেল। এই দৃশ্য দেখার জন্য অনেকে পদ্মায় এলেও সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। তবে দূর থেকেই অনেকে এই দৃশ্য অবলোকন করছে।
পদ্মাসেতুর সুপার স্ট্রাকচারবাহী ‘তিয়ান ই হাউ’ জাহাজের ৩ হাজার ৬০০ টন ক্ষমতার ক্রেনের সাথে এখনও স্প্যানটি বাঁধা রয়েছে। এটি বেয়ারিংয়ের সাথে নাটবল্টু ভালোভাবে স্থাপনের পরই ক্রেনটি সরিয়ে আনা হবে।
এর আগে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরের মাওয়ার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের ওয়ার্কসপ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর স্প্যানটি রওনা হয়। রাতে ২৩ নম্বর পিয়ারের কাছে এসে যাত্রাবিরতি করে। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে রওনা হয়ে দুপুরে এটি ৩০ ও ৩১ নম্বর পিয়ারের মাঝামাঝি স্থানে নোঙ্গর করে। ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায় জাহাজটি স্প্যান নিয়ে হাজির হয় ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি। সন্ধ্যার আগেই খুঁটি দুটির ঠিক ১ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে রাখে। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টায় এটি স্থাপন শুরু করে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্যান্য স্প্যানও উঠানো শুরু হবে। এখন ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ৬টি পিয়ার সম্পন্ন পর্যায়ে। শিগগিরই শেষ হচ্ছে ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিয়ারের কাজ। ৩৮ পিয়ারের সাথে যুক্ত হয়ে এই দুই পিয়ার ধরে আরও দুটি স্প্যান বসবে শিগগিরই। স্প্যানের মাঝ বরাবর নিচের লেনে চলবে ট্রেন। ওপরে কংক্রিটের চারলেনের সড়কে চলবে গাড়ি। তাই এই স্প্যানের ওপরে রাস্তা এবং নিচে ট্রেন লাইন স্থাপন করা হবে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মাসেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৪৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সেতুতে মোট ৪২টি পিলার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টি পিলার নির্মাণ করা হবে নদীতে। দুটি নদীর তীরে। নদীতে নির্মাণ করা প্রতিটি পিলারে ৬টি করে পাইলিং করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১২৭ মিটার পর্যন্ত। একটি পিয়ার থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুতে দুটি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এছাড়া দু-পাড়ের সংযোগ সেতুসহ সেতুটি ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আগামী বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকৌশলীরা জানান, নদীতে মূল সেতুর মোট ২৪০টি পাইলের মধ্যে ৭৫টি পাইল বসেছে। এছাড়াও দু-পাড়ের দুটি ট্রান্সজিশন পিয়ারের ৩২টির মধ্যে ১৬টি স্থাপন হয়েছে। অর্থাৎ, জাজিরা প্রান্তে ৪২ নম্বর পিয়ারের ট্রান্সজিশন পিলারের ১৬টি পাইল বসে গেছে। এখন বাকি মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর ট্রান্সজিশন পিয়ারের ১৬টি পাইল। এটির কাজ এখনও শুরু হয়নি। ডিজাইন চূড়ান্ত হচ্ছে। এছাড়া জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সেতুর ১৮৬টি পাইল বসেছে। এখানে আর মাত্র ৭টি পাইল বাকি সংযোগ সেতুর (ভয়াডাক্ট) জন্য। আর মাওয়ায় এ পর্যন্ত সংযোগ সেতুর ১৭২টির মধ্যে ৭টি পাইল বসেছে।
পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান হচ্ছে ধূসর রঙে। তাই ধূসর রঙের ‘৭এ’ নম্বর স্প্যানটি বসার অল্প সময়ের পরই বসবে পরেরটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘৭বি’ নম্বর স্প্যানটির ফিটিং সম্পন্ন রয়েছে। এটিও শিগগিরই রং করা শুরু হবে। কারণ অক্টোবরের শেষ দিকে এই স্প্যানটি বসবে ৩৮ ও ৩৯ পিয়ারের। ইতোমধ্যেই ৩৯ নম্বর পিয়ারের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। শিগগিরই শেষ হবে এর কাজ।
পদ্মাসেতুর দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানান, দুটি হ্যামার এখন হরদম পাইল বসাচ্ছে। জাজিরা ও মাওয়া উভয় প্রান্তে পাইল বসেছে। আগামী নভেম্বর মাসের শেষ দিকে আরেকটি হ্যামার জার্মানি থেকে আসছে মাওয়ায়।
পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই হ্যামারটি ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই পাইল স্থাপনের কাজে যোগ দেবে। পদ্মাসেতুর ৪২টি খুঁটিতে প্রয়োজন হবে ৪১টি স্প্যান। প্রথম স্প্যানটি (৭এ) স্থাপন হলেও মাওয়ার কুমারভোগ আরও ৯টি স্প্যান রয়েছে। এর মধ্যে ফিটিং হয়েছে ৭টি। এছাড়া আরও ১২টি স্প্যান চীনে তৈরি রয়েছে। এগুলো পর্যায়ক্রমে মাওয়ায় আনা হবে। এছাড়া বাকি আরও ১৯টি স্প্যানও তৈরির প্রক্রিয়া চলছে চীনে।
শরীয়তপুরের জাজিরা পাড়ে দুটি পিলারের ওপর পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর খবরে বাপ-দাদার ভিটে-মাটি হারানো পদ্মা পাড়ের লোকজনসহ শরীয়তপুরে বইছে আনন্দের বন্যা। পদ্মাসেতুর দুটি পিলারে প্রথম সুপার স্ট্রাকচার (স্প্যান) বসানো হবে এমন খবরে ৩০ সেপ্টেম্বর ভোর থেকেই জাজিরার নাওডোবা এলাকায় পদ্মা পাড়ে লোকজনের ভিড় জমে। কীভাবে বসানো হবে, কারা এবং কেমনভাবে এটা বসাবে এ নিয়ে পদ্মা পাড়ে উপস্থিত সাধারণ লোকজনের মধ্যে ছিল নানা কৌতূহল।
সেতুটির ৩৭ ও ৩৮নং পিলারের ওপর স্প্যানটি স্থাপনের পর এখন দেখা যাচ্ছে পদ্মাসেতুর কাঠামো। ধূসর রঙের পদ্মাসেতুর এই স্প্যানটি ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এবং যা নদীর পানি থেকে এর উচ্চতা ৫০ ফুট। স্প্যানটি স্থাপনের কাজে ৩ হাজার ৬০০ টনের ক্ষমতার স্ট্রাকচারবাহী তিয়ান ই হাউ ক্রেনটি ব্যবহার করা হয়। খুঁটির ওপর বসানো স্টিলের তৈরি স্প্যানটির ওজন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন। পদ্মাসেতুতে ৪২টি খুঁটির ওপর মোট এ রকম ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। এই স্প্যানটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মাসেতু। এখন সেতুর ১৫০ মিটার আকৃতি দৃশ্যমান হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে এমন আকৃতি দেখা যাবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, পদ্মাসেতুর এই প্রথম স্প্যান বসানোর ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। তবে সেতুর এই প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি তার অনুভূতি ব্যক্ত করে সাংবাদিকদের বলেন, ওপারে যখন ঘন কুয়াশা, বিশ^ব্যাংক যখন পদ্মাসেতু ছেড়ে চলে যায়, সেদিন একটা অনিশ্চয়তার অন্ধকার ছিল, হতাশার মেঘ ছিল, অনেকে ভেবেছিলেন এই কুয়াশা কাটানো যাবে না। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন পদ্মাসেতু আর হবে না। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বীর কন্যা, দেশরতœ শেখ হাসিনা অসীম সাহসে সেদিনের মশাল হাতে নিয়েছিলেন। মহান আল্লাহর কাছে শোকরিয়া প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের সোনালি ফসল আজকের এই দৃশ্যমান পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতু এখন আর কোনো রঙিন স্বপ্ন নয়। পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। পদ্মাসেতুর কাজের অগ্রগতি ৪৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, স্প্যান যখন একটা বসে গেছে, আরও ৪০টি স্প্যান কয়েকদিন পরপর বসবে। যথাসময়ে আমরা পদ্মাসেতুর কাজ শেষ করব। জানা গেছে, ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতুর মোট ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। প্রত্যেক পিলারে ৬টি করে পাইল সাজানো। স্প্যানের ভেতরে থাকছে রেলপথ ও ওপরে সড়ক পথ। দ্বিতল পদ্মা বহুমুখী সেতুর পুরোটা হবে স্টিল আর কংক্রিট স্ট্রাকচারে। সেতুর ওপরের তলায় থাকবে চার-লেনের মহাসড়ক, নিচ দিয়ে যাবে রেললাইন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করে সেতুটি চালু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পদ্মাসেতুর পথে ছিল যত বাধা
পদ্মাসেতু বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আগে ‘দিনবদলের সনদ’ নামে আওয়ামী লীগে পক্ষ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার দেওয়া হয় সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মাসেতু নির্মাণের। ক্ষমতায় এসে সেই অনুযায়ী কাজও শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয় দুর্নীতির কথিত অভিযোগসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশের দীর্ঘতম এই সেতু নির্মাণে বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে চলে নানা জটিলতা। সরকার সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নিজস্ব অর্থায়নেই শুরু করে এই সেতুর নির্মাণযজ্ঞ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মাসেতুর জাজিরা অংশে একটি স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে পিলারের পর এখন এই সেতুর পাটাতনও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সরকার আশা করছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে।
পদ্মাসেতু নির্মাণে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে সরকারের তরফ থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে সব থেকে বেশি দোষারোপ করা হয়েছে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংককে। এছাড়া দেশীয় একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল বলে সরকারি দল থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ এসেছে। বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসকে এ জন্য দায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিল, অবৈধভাবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রধানের পদে থাকতে না পেরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পদ্মাসেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছেন।
জানা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই অনুযায়ী ১৯৯৮ থেকে ২০০০ এই সময়ে পূর্ব সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। এরপর ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ হয়। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া পয়েন্টে পদ্মাসেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালে জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মাসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মাসেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই নতুন করে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। পদ্মাসেতুতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় বিশ্বব্যাংক। সেই সাথে সহযোগী হতে চায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিপি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকা। ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সাথে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। এরপর ওই বছরের ১৮ মে জাইকা (৪০ কোটি ডলার), ২৪ মে আইডিবি (১৪ কোটি ডলার) এবং ৬ জুন এডিবি’র (৬২ কোটি ডলার) সাথে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়।
এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় বিপত্তি। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আসে দুর্নীতির অভিযোগ। ঋণচুক্তির পাঁচ মাসের মাথায় দুর্নীতির অভিযোগ এনে ওই বছর (২০১১) সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করে। তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম আসে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিষয়ে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ওপরও। বিশ্বব্যাংকের পথ অনুসরণ করে অন্য দাতা সংস্থাগুলোও। ঋণচুক্তি স্থগিতের সময় ঋণ পুনর্বিবেচনার জন্য দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ ৪টি শর্ত জুড়ে দেয় বিশ্বব্যাংক। এ সময় দুই দফায় বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতি’র কিছু তথ্য-প্রমাণও বাংলাদেশকে দেয়। সরকারের তরফ থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে নানা দেন-দরবার চলতে থাকে। চুক্তি বাতিল এড়াতে এ সময় যোগাযোগ সচিবকে সরিয়ে দেওয়াসহ কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপও নেয় সরকার। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সন্তোষজনক ব্যবস্থা ছিল না সেগুলো। ফলে, ২০১২ সালের ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয় আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশি ও প্রবাসীদের পদ্মাসেতু নির্মাণে সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে এগিয়েও আসেন। শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ। পরে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পদ্মাসেতুর অর্থ সংগ্রহে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকে দুটি করে ব্যাংক হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাংকের দেওয়া শর্ত অনুসারে এরই মধ্যে পদ্মাসেতুতে পরামর্শক নিয়োগের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই সময় বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল একাধিকবার ঢাকায় এসে দুদকের সাথে বৈঠক করে। এসব বৈঠকে নতুন নতুন শর্ত আসতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের সাথে দেন-দরবারের পাশাপাশি সরকার বিকল্প অর্থায়নের প্রচেষ্টা শুরু করে। নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগের কথাও এ সময় জোরেশোরে আলোচনা হতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের টালবাহানায় ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি সংস্থাটিকে এক সপ্তাহের সময় দিয়ে আল্টিমেটাম দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওই মাসের মধ্যে বিশ্বব্যাংক তাদের অবস্থান স্পষ্ট না করলে সরকার তাদের কাছ থেকে কোনো ঋণ নেবে না। তারা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করবে। পরে ৩১ জানুয়ারি সরকার পদ্মাসেতুর জন্য অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে বিশ্বব্যাংককে চিঠি দেয়। বিশ্বব্যাংকের কাছে অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহারের আগে-পরে মালয়েশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশ অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। তবে সেগুলো দেশের জন্য সাশ্রয়ী না হওয়ায় সরকার সেদিকে না গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। পরবর্তী অর্থবছরের (২০১৩-১৪) বাজেটে পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৪ সালের ১৮ জুন মূল সেতু নির্মাণে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সাথে চুক্তি সই করে সরকার। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী পদ্মাসেতুর মূল কাঠামো নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
পদ্মাসেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কানাডার আদালতে তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি বিশ্বব্যাংক। গত ১০ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত জানায়, পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

Category:

Leave a Reply