পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা সফর

Posted on by 0 comment

25উত্তরণ ডেস্ক : তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিস্তার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা করে চুক্তিটি সই করার কথাও জানান তিনি। গত ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় অভিন্ন নদীটির পানি বণ্টন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ আশাবাদের কথা শোনান।
দুপুরে গণভবনে পৌঁছার পর ফুল দিয়ে মমতাকে বুকে টেনে নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি নৌকা তুলে দেন। শেখ হাসিনা এ সময় বলেন, ‘নৌকা যেন চলতে পারে, খেয়াল রাখবেন।’ উত্তরে মমতা বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন। পানি যাতে যায়, সে জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখব। চিন্তা করবেন না।’ কথা বলার একপর্যায়ে ইলিশ কম পাওয়ার অনুযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী তখন বললেন, ‘পানি এলে ইলিশও যাবে।’ প্রায় ৪৫ মিনিটের এ বৈঠকের প্রথম ১৫ মিনিট মমতার সফরসঙ্গী ও প্রধানমন্ত্রীর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই তাদের কথা হয়। পরে ৩০ মিনিট একান্তে কথা হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনার পর গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তির বিষয়টি ছাড়াও বৈঠকে জঙ্গিবাদের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়গুলোও নিয়ে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন মমতা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য একটি কমিটি করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোনারগাঁও হোটেলে ব্যবসায়ীদের একটি সমাবেশে মতবিনিময় করেন। এরপর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে যমুনায় তার সম্মানে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এক চা-চক্রে যোগ দেন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের ‘বৈঠকী বাংলা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রায় চার বছর আগে যে রাজনৈতিক কারণে তার প্রতি তামাম বাংলাদেশির অভিমানের সৃষ্টি হয় সেদিন তা এক লহমায় ঘুচিয়ে দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই বাংলার সাহিত্য, শিল্প ও বিনোদন জগতের নক্ষত্র সমাবেশে তিনি জানিয়ে দেন, সীমান্ত বিল পাস হতে চলেছে। আর তিস্তা চুক্তি নিয়ে তার ওপর বাংলাদেশ যেন আস্থা রাখে। মমতা জানিয়ে দেন, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধে তিনি কাঠবিড়ালির ভূমিকা পালন করবেন। গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা নিয়ে আমাদের ভাগাভাগি করতে দেব না। দুপুরে দুই ঘণ্টার ‘বৈঠকী বাংলা’য় মুখ্যমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আসা অভিনেতা প্রসেনজিৎ, দেব, মুনমুন সেন, চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ, গায়ক নচিকেতা, ইন্দ্রনীল সেন, দুই মন্ত্রী ব্রাত্য বসু ও ফিরহাদ হাকিমদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, গায়িকা রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, অভিনেতা ফেরদৌস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আলী যাকের প্রমুখ। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনও উপস্থিত ছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বিকেলে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে তিনি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মমতা। সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতি বলেন, তার এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর সমাধান হবে। মমতা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পর্যটনের ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ রয়েছে। আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস এবং বাংলাদেশের খুলনা থেকে ভারতের কলকাতার মধ্যে ট্রেন সার্ভিস চালুর ব্যাপারে তার আগ্রহের বিষয়টি রাষ্ট্রপতি হামিদকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতায় ‘নজরুল তীর্থ’ এবং আসানসোলে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ নেওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এগুলো দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। এর আগে ১৯৯৮ সালে মমতা প্রথম বাংলাদেশ সফর করেন। তিন দিনের সফর শেষে ২১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় আসেন। রাত ৯টায় তাকে বহনকারী বিমান হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম।

Category:

Leave a Reply