পানি সর্বরোগের নিয়ামক

Posted on by 0 comment

52উত্তরণ প্রতিবেদন: ১. মানুষের দেহ প্রধানত পানি ভিটামিন এবং মিনারেল দ্বারা পরিচালিত সুপার মেশিন। মানবদেহের ওজনের ৭২ শতাংশ পানি, ৮ শতাংশ নানারকম ভিটামিন এবং মিনারেল। বাকি ২০ শতাংশ হাড় এবং মাংসপেশি। দেহের অভ্যন্তরে সকল প্রকার রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া, হজম, পুষ্টি গ্রহণ, বর্জ্য ও বিষ ত্যাগ প্রভৃতি পানি দ্বারা সংঘটিত হয়। অতএব, শরীরে পানির প্রভাব অপরিসীম। পানি যেমন রোগ বহন করতে পারে, তেমনি রোগ তাড়িয়েও দিতে পারে। তাই বলা হয় পানির আরেক নাম জীবন।
২. রক্ত শরীরের ওজনের ৭ শতাংশ, সাধারণত ৪.২৫ থেকে ৭.৫০ লিটার রক্ত শরীরে থাকে আর এই রক্তের ৮০ শতাংশই পানি। রক্ত ছাড়া মানুষ এক মুহূর্ত বাঁচতে পারে না। কারণ, এই রক্ত ঘণ্টায় ৬০ হাজার মাইল বেগে সমস্ত শিরা এবং উপশিরার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে প্রতিটি কোষে পুষ্টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। সিংহভাগ পানি আছে বলেই পানিতে দ্রবণীয় সব ভিটামিন, মিনারেল এবং এম্যাইনো এসিড শরীরে যেখানে প্রয়োজন সেখানে পৌঁছে দিতে সক্ষম। যদি পানির পরিমাণ কম হয়ে যায়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য অর্গান থেকে শুষে নিয়ে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখে। এটা যখন ঘটে তখন অন্য অর্গানগুলোর পানির স্বল্পতা দেখা দেয় এবং তার নিজস্ব কার্যক্রম বিঘিœত হয়। শরীরের সমস্ত সংকটপূর্ণ সময়ের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অবশ্যই বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় কোনো মানুষ যদি তার স্বাভাবিক কাজকর্মে যেমনÑ সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনোরকম ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম ছাড়া সারাদিন রুটিন অনুযায়ী কাজকর্ম করে তবে সারাদিন শরীর থেকে ২.২৫ লিটার পানি মলমূত্র, ঘাম এবং নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। অতএব, শরীরের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ২.৫-৩.০০ লিটার পানি সারাদিন পান করা প্রয়োজন।
৪. মানুষের ব্রেনে ৮০ শতাংশের বেশি পানি থাকে। ব্রেনটা যেন পানির মধ্যে ডুবে আছে। শরীরের সব ধরনের কার্যক্রম ব্রেনের নির্দেশে সম্পাদিত হয়ে থাকে। প্রতি মুহূর্তে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নার্ভাস সিস্টেমের মাধ্যমে আলোর গতিতে নির্দেশ দেয় এবং তথ্য আদান-প্রদান করে। যে নার্ভের মাধ্যমে ব্রেন দেহের বিভিন্ন জায়গায় তথ্য আদান-প্রদান করে সেই নার্ভের ৯৫ শতাংশ পানি এবং সামান্য পরিমাণ মিনারেল আছে। শরীরে পানির পরিমাণ স্বাভাবিক লেভেল থেকে কমে গেলে প্রেরিত বার্তা বা সংকেত পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘিœত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্ধারিত লেভেল থেকে ৫ শতাংশ পানি শরীর থেকে কমে গেলে বেশির ভাগ মানুষ ৩০ শতাংশ এনার্জি বা কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলে।
৫. বর্তমান বিশ্বের গতিময় জীবনে বেশির ভাগ নর-নারী প্রয়োজনীয় পানি পান করে না অথবা পারিপার্শ্বিকতার কারণে প্রয়োজনীয় পানি পান করা হয়ে ওঠে না। ফলে পানি স্বল্পতার কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এ ধরনের পানিশূন্যতা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকলে অনেক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। রোগগুলোর মধ্যে হাঁপানি, এলার্জি, মাইগ্রেন, আর্থারাইটিস, কোলেস্ট্রেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, ক্লান্তি বোধ, মাথাব্যথা, হাইপারটেনশন, অবসাদ, উদ্যমহীনতা এবং প্রবীণদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস উল্লেখযোগ্য। সাধারণত এ ধরনের রোগগুলোর উপসর্গ দেখা দিলে ঔষধ সেবন না করে সারাদিন ৮-১০ গ্লাস পানি (প্রতি গ্লাস ২৫০ মিলি) পান করলে এসব রোগ থেকে সহসাই মুক্তি পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, প্রতিকাপ চা পান করলে দুই কাপ পানি শরীর থেকে কমে যায়। (এক কাপ চা পান করলে দুই কাপ পানি পান করতে হবে)।
৬. পানির স্বল্পতা হলে শরীর অনেক রকম চিহ্ন, নিদর্শন এবং সংকেত দিয়ে থাকে। যেমনÑ পিপাসা, মুখ ও জিহবা শুকনো, অবসাদ, গাঢ় রঙের প্র¯্রাব, অনিয়মিত মূত্রত্যাগ, প্র¯্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শুষ্ক চামড়া, ঢিলা চামড়া, কুঁচকানো চামড়া, দ্রুত নাড়ির স্পদন, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, পেশির খিঁচুনি, দুর্বল পেশি, চোখ বসে যাওয়া, মাথা হালকা বোধ হওয়া, নারীদের মাসিকের বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। যারা ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত ও নির্ধারিত পানি পান করতে পারে না তাদের ওপরের উপসর্গ দেখা দিলে কোনা ঔষধ ব্যবহার না করে যদি শুধু বিশুদ্ধ পানি পান করেন, তা হলেই সুস্থতা অনুভব করবেন।

৭. শরীরে পানির কার্যক্রমÑ
ক. শরীরের সমস্ত কোষে পুষ্টি জোগান দিতে সাহায্য করে।
খ. যেখানে যে হরমোন প্রয়োজন সেখানে সেই হরমোন পানি দ্বারা পরিবাহিত হয়।
গ. শরীরে উৎপাদিত সব ধরনের বর্জ্য এবং টক্সিন, নিঃসরণ নালীতে পরিবহন করে।
ঘ. শরীরের অভ্যন্তরে যত রকমের রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া হয়, সেখানে পানি মিডিয়ার ভূমিকা পালন করে থাকে।
ঙ. শরীরের তাপ নির্দিষ্ট পরিমাণে ধরে রাখতে পানি সাহায্য করে। যদি তাপ বেশি হয়ে যায়, তা হলে শরীরের অভ্যন্তরের পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে চামড়া এবং ফুসফুস দিয়ে বেরিয়ে যায়, ফলে শরীরের তাপ আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
চ. পানি শরীরের বিভিন্ন অর্গান এবং হাড়ের সন্ধিস্থলে কুসনের মতো কাজ করে। যদি কোনো সময় জোরে আঘাত লাগে তখন পানি ক্ষতির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে।
ছ. শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সন্ধিস্থলে পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করে।
জ. সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হজম প্রক্রিয়া। হজম রসটা ৮০ শতাংশই পানি।
ঝ. এসবগুলোর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শরীরের অভ্যন্তরে সমস্ত কার্যক্রম পানি ছাড়া সংঘটিত হয় না।

৮. সহজভাবে পানি পান করার নিয়মÑ
ক. ভোরে ৬০০ মিলি কুসুম গরম পানিতে এক চা-চামচ লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে শরীরের অভ্যন্তরে ধোয়া-মোছার কাজ করে।
খ. প্রতি এক ঘণ্টা পরপর পানি পান করলে শরীরের প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা পূরণ হয়।
গ. খাবারের ১৫ মিনিট আগে এক গ্লাস এবং খাবারের ৩০ মিনিট পর এক গ্লাস পানি পান করতে হবে এবং রাতে শোয়ার আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস পানি পান করতে হবে (খাবারের সাথে পানি পান করবেন না)।
ঘ. দিনের মধ্যে অন্তত দুবার এক গ্লাস গরম পানিতে এক চা-চামচ লেবুর রস মিশিয়ে (খালি পেটে) পান করতে হবে। লেবুর প্রধান উপাদান সাইট্রিক এসিড। পাকস্থলিতে প্রবেশ করার পর হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অষশধষর-তে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় চঐ-এর মাত্রা বজায় রাখে, যা শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঙ. সব সময় শরীরের তাপের (নড়ফু ঃবসঢ়বৎধঃঁৎব) সাথে সমতা রেখে পানি পান করা উচিত। ঠা-া পানি শরীরের অভ্যন্তরে কোমল অর্গানে প্রচ- শক/ধাক্কা দেয়, তখন তার স্বাভাবিক কার্যক্রম অল্প সময়ের জন্য থমকে যায়। কুসুম গরম পানি শরীর সহজেই গ্রহণ করে এবং কাজে লাগাতে পারে।
চ. চা কিংবা কফি পানে অভ্যস্তদের প্রতিকাপ চা/কফি পান করার পর এক গ্লাস বাড়তি পানির প্রয়োজন হবে।
ছ. চা কিংবা কোমল পানীয় দিয়ে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করা যাবে না। তবে ফলের রস, সবজি স্যুপ পানির পরিপূরক।
বিশুদ্ধ পানি দ্বারা চিকিৎসা
জাপানে পানি চিকিৎসা (ঐুফৎড়-ঃযবৎধঢ়ু) বেশ জনপ্রিয়। সে দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, শুধু বিশুদ্ধ পানি দিয়ে নি¤েœর রোগগুলো শতভাগ নিরাময় করা যায়। যেমনÑ মাথাব্যথা, শরীরে বিরামহীন ব্যথা বা যন্ত্রণা, হার্টের রোগ, বাত ব্যথা, দ্রুত হৃদস্পন্দন, অতিরিক্ত ওজন, অ্যাজমা, টিবি, কফরোগ, মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কঝিল্লির প্রদাহ) কিডনি এবং মূত্রবিষয়ক রোগ, বমি, গ্যাসট্রিক, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, সব ধরনের চোখের রোগ, ক্যানসার, মস্তিষ্কের সমস্যাজনিত সব ধরনের রোগ, কান, নাক এবং গলার সব ধরনের সমস্যা।
চিকিৎসা প্রণালি
১. রাতে শোয়ার আগে ভালোমতো দাঁত ব্রাশ করতে হবে।
২. ভোরে উঠে দাঁত ব্রাশ করার আগে অধোয়া মুখে ৬০০ মিলি কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে পান করতে হবে এবং এক ঘণ্টা পেট খালি রাখতে হবে।
৩. এক ঘণ্টা পর দাঁত ব্রাশ করে নাস্তা গ্রহণ করতে হবে। নাস্তা স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া বাঞ্চনীয়।
৪. প্রতিবার খাবারের ১৫ মিনিট আগে এক গ্লাস পানি পান করতে হবে এবং খাবার শেষ করে ৩০ মিনিট পর এক গ্লাস পানি পান করতে হবে।
৫. এ ছাড়া রাতে শোয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস হালকা কুসুম গরম পানি পান করতে হবে।
৬. ‘পানি চিকিৎসাকালীন’ (ধিঃবৎ ঃযবৎধঢ়ু) সময়ে মাছ, মাংস, মুসুর ডাল, ঠা-া পানীয়, পোলাও, ভুনা, তেলে ভাজা ফাস্টফুড, যে কোনো শুকনো ঠা-া খাবার, বাসি খাবার, সাদা ময়দার তৈরি যে কোনো খাবার, চিনি এবং চিনির সব ধরনের খাবার এবং আইসক্রিম বর্জন করতে হবে।
৭. সব খাবার গরম গরম খেতে হবে।

যে কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীর প্রথম সপ্তাহে তিন দিন এবং পরের সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন পানি চিকিৎসা নিতে হবে। সব ধরনের প্রোটিন বর্জন করতে হবে তা হলে ৩০ দিনের মধ্যে সেরে যায় অনেক রোগ। অনেক সমস্যা নিয়ে যারা আছেন তাদের জন্য পানি চিকিৎসা একটি নিরাপদ চিকিৎসা। তাই অনেক কিছুর মাঝে যদি শুধু পানি দিয়েই শুরু করি দিনটা।

আলমগীর আলম
ন্যাচারোপ্যাথি সেন্টার
ফ্লাট বি-৭, ৮৩ নয়া পল্টন, ঢাকা, মোবাইল : ০১৬১১০১০০১১

Category:

Leave a Reply