প্যারিস অন প্লানেট সম্মেলন

Posted on by 0 comment

43সাইদ আহমেদ বাবু: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্যারিসে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় সারাবিশ্ব। ২০০৯-এ ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে যা সম্ভব হয়নি। উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর দায় কোন দেশ কতটা নেবে, সেই প্রশ্নে কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ভেস্তে গিয়েছিল। পারল প্যারিস। ১৯৬টি দেশ ১৩ দিন ধরে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন ২০১৭ আলোচনা করে সামনে নিয়ে এলো এক চূড়ান্ত খসড়া। যাতে বলা হলো, পৃথিবীর তাপমাত্রা যেন বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে সেটি নিশ্চিত করাই হোক বিশ্বের লক্ষ্য। তবে সকলের ইচ্ছে উষ্ণায়নকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমায় বেঁধে রাখা। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এজন্য যথেষ্ট অনুদান দেওয়া ও পাঁচ বছর অন্তর উষ্ণায়নের পরিস্থিতি বারবার দেখার কথাও বলা রয়েছে খসড়ায়। ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। সব দেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। সবাই মোটামুটি একটা মতৈক্যে পৌঁছাতে পেরেছে। মনে হয়, সবাই বুঝতে পেরেছে এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন কম-বেশি সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন ‘মনুমেন্টাল সাকসেস’Ñ এ কথার একটা গুরুত্ব আছে। প্রতিটি দেশের বিভিন্ন প্রকার ধ্যান-ধারণা, মত-পথ ছিল। সবাইকে মতৈক্যে আনা সত্যি একটা কঠিন কাজ। বাংলাদেশের দাবি ছিল বেশি অর্থ পাওয়ার। এই শতাব্দীতে যেন তাপমাত্রা না বাড়ে, তাপমাত্রার বৃদ্ধি যেন দেড় ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ থাকে। শিল্পোন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সে জন্য আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।
উষ্ণায়ন থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে এটাই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক খসড়ায়, যাতে সায় দিয়েছে ভারত, চীন এবং জি-৭৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোও। কার্বন নির্গমনের প্রশ্নে উন্নত বনাম উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রচেষ্টায় এই প্রথম মধ্যপন্থা দেখাল প্যারিসের সম্মেলন। ১৩ দিনের মাথায় এখানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন ফঁব পেশ করলেন খসড়া প্রস্তাব। আহ্বান জানালেন খনিজ তেল ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রোধ করা এই ‘ঐতিহাসিক’ খসড়া গ্রহণ করুক প্রতিটি দেশ।
তবে শুধু ভারত, বাংলাদেশ, চীন বা সৌদি নয়, পৃথিবীকে বাঁচাতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ওলাঁদ। তিনি জানান, এ রিপোর্টের পরিকল্পনা দেশগুলো গ্রহণ করলে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে অনেকটাই রোধ করা যাবে। আর তা না হলে পুনরায় ব্যর্থ হবে পৃথিবীকে বাঁচানোর এই উদ্যোগ। ২০০৯ সালে কোপেনহাগেনের জলবায়ু সম্মেলন ভেস্তে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ওলাঁদ বলেন, ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে এই খসড়াই যে এ মুহূর্তে একমাত্র আশার আলো তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন বান কি মুনও। তার কথায়, কোটি কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে। জাতীয় স্বার্থের খাতিরেই এবার আমাদের বিশ্বজুড়ে এক হওয়ার সময় এসেছে। প্যারিস চুক্তির ভিন্নতা অন্য চুক্তিগুলোর চেয়ে প্যারিস চুক্তির প্রধান পার্থক্য হচ্ছে এর সময়কাল বেশি। এতে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর ২০২০ সালের মধ্যে চুক্তিতে অনুমোদন দেওয়া দেশগুলোকে কার্বন নির্গমন নির্দিষ্ট সীমায় নামাতে হবে।
এই চুক্তির ভিত্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থ ও প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করবে ধনী দেশগুলো। বাংলাদেশ ছিল জি-৭৭ গ্রুপে। এ ছাড়া অন্যান্য গ্রুপের মধ্যে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপ, শিল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপ, দ্বীপরাষ্ট্রের গ্রুপ ইত্যাদি। বাংলাদেশ জি-৭৭ গ্রুপের মাধ্যমে মতামত তুলে ধরেছে। কোপেনহেগেনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের তাপমাত্রা যেন দেড় ডিগ্রির বেশি বৃদ্ধি না পায় সেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্যারিস চুক্তিতে বিষয়টি বিভিন্নভাবে এসেছে। এটা আমাদের একটা সফলতা বলা যেতে পারে। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের আওতায় জলবায়ু সনদ তৈরি হয়। বাংলাদেশসহ ১৯৫টি দেশ এতে স্বাক্ষর করে। এই সনদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ১৯৯৭ সালে আরেকটা সনদ তৈরি হয়, একে কিয়োটো প্রটোকল বলে। এখানেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। কিয়োটো প্রটোকলে পৃথিবীর জন্য কিছু কল্যাণকর বিষয় ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন, তাতে এই পরিবর্তনের জন্য বিশ্বের ধনী দেশগুলোকেই দায়ী করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ছে দরিদ্র দেশগুলোয়। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) এই বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়।
বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে এই সম্মেলনে মিলিত হন বিশ্ব নেতারা। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অংশ নিয়েছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্ব নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে বেঁধে রাখার উদ্যোগে নেওয়া হবে, যাতে তা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয়।
ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ান প্লানেট সামিটে নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশগুলোর প্রতি আমি আহ্বান জানাতে চাই, জলবায়ু সংকটে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইতিহাসের দায় মেটাতে তারা যেন তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। কেবল যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা এই পৃথিবীকে নিরাপদ করতে পারি।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জলবায়ু প্রশ্নে আমাদের যৌথ অঙ্গীকার ও উদ্যোগ শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে, সাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় উদ্যোগ গ্রহণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা। গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের উদ্যোগে জাতিসংঘে ‘গ্লোবাল প্যাক্ট ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট’ চালুর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ এ ভয়াবহ আপদের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রতিরোধ ও অভিযোজনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে আমাদের টেকসই উন্নয়ন কৌশলে এটিকে মূল ধারায় রাখা হয়েছে।
এই সম্মেলন থেকে শেখ হাসিনা বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ২ শতাংশ বনাঞ্চল বৃদ্ধি করে বিদ্যমান ২২ থেকে ২৪ শতাংশে উন্নীতে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের মোট আয়তনের ২২ শতাংশ বনভূমিকে আগামী পাঁচ বছরে ২৪ শতাংশে নিয়ে যেতে সরকার প্রয়োজনীয় বনায়ন কর্মসূচি নেবে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন সংরক্ষণে ৫ কোটি সাড়ে ৭ লাখ ডলারের প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের জিডিপির ১ শতাংশ ব্যয় হওয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের কৃষিকে আমরা জলবায়ু সহিষ্ণু করছি। আমরা শহরে পানি সরবরাহে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কাজ করছি।
সহিংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল সংখ্যক জনগণকে আশ্রয় দিতে গিয়ে দেশের উপকূল অঞ্চলের জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টি ‘বিরাট’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের ১০ লাখের বেশি নাগরিক আশ্রয় নেওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে কক্সবাজারে ১ হাজার ৭৮৩ একর বনভূমিতে এসব বাস্তুচ্যুত মানুষকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। প্রলম্বিত এই উদ্বাস্তু সমস্যা ওই অঞ্চলে আমাদের বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে সেখানে পরিবেশ সুরক্ষা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
এ শীর্ষ সম্মেলনে ১০০ বিশ্ব নেতাসহ বেসরকারি সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে তার অঙ্গীকারের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

Category:

Leave a Reply