প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উৎপাদন এবং সম্ভাবনা

Posted on by 0 comment

54রাজিয়া সুলতানা: কৃষি খাত বর্তমান সরকারের সাফল্যাঙ্কের অন্যতম মাইলফলক। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দিন দিন কমছে আবাদযোগ্য জমি। কিন্তু তারপরও বাড়ছে কৃষি উৎপাদন। এর মধ্যে স্বাধীনতার পর এ দেশে শুধু ধানের উৎপাদনই বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। হেক্টরপ্রতি ধানের বাম্পার ফলনে বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। মোট ধান উৎপাদনে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। বর্তমান সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ এবং পরিশ্রমী কৃষক ও মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানীদের যৌথ প্রয়াসেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ফলে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ কোনো চাল আমদানি করেনি। বরং শ্রীলংকায় চাল রপ্তানি শুরু করেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ৬৭টি ধানের জাত, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ১৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। আর ১১৫টি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ পর্যন্ত ব্রি ও বিনার বিজ্ঞানীরা মোট ১৫টি প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু ৯টি, খরাসহিষ্ণু ২টি ও বন্যাসহিষ্ণু ৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন তারা। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৩ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে। এর নাম ব্রি৬২ ও ব্রি৬৪। জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চালে কেজিপ্রতি ২৪ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে, যা থেকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ শরীরের চাহিদার ৪০ শতাংশ জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে ব্রি’র গবেষকরা গোল্ডেন রাইস নামের ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। উদ্ভাবিত এসব জাতের মধ্যে হাইব্রিড ধানের ধরন রয়েছে ৪টি। উন্নত জাতের ধানের মধ্যে ৮ থেকে ৯ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে ৭-৮টি জাত। ৮টি জাতের উৎপাদনক্ষমতা ৬-৭ টনের বেশি। হেক্টরপ্রতি ৫ টন উৎপাদন হয় ১২টি জাতের। ৩ টনের বেশি উৎপাদন হয় মাত্র ৩টি জাতে।
তিন মৌসুমে চাষাবাদেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও বিপুলভাবে চাষাবাদ শুরু না হলেও খরাসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু, লবণাক্ততাসহিষ্ণু, শীতসহিষ্ণু ধানের জাত ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে ফলন, জীবনকাল ও বীজের মান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঠিক রাখা হয়েছে। আর এজন্য ধান গবেষণায় কৃষকের আস্থা ও বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে ব্রি। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশার বাণী নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)-এর সহায়তায় বন্যাসহিষ্ণু বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ জলমগ্ন থাকলেও স্বাভাবিক ফলন দিতে সক্ষম। গবেষকরা জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যাসহিষ্ণু ধানের নতুন এই জাতটি চাষ করা হলে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ বন্যাকবলিত এলাকা ধান চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। উল্লিখিত জাত দুটির রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও অনেক কম। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ৪৪ বছরে বোরো চাষের উপযোগী ধান চাষের জমি কমেছে। কিন্তু বেড়েছে ধানের উৎপাদন। ব্রি’র উফশী আধুনিক ধানের জাত (শীতকালীন) ৮২ শতাংশ, গ্রীষ্মকালীন ৩৬ শতাংশ এবং প্রতিস্থাপিত আমনের বর্ষাকালীন ধান চাষ হচ্ছে ৪৭ শতাংশ এলাকায়। ব্রি’র উফশী আধুনিক জাত প্রতিবছর ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে ১৯৭০-৭১ উৎপাদন বছরে যেখানে দেশে ধান হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টন, সেখানে ২০১২-১৩ উৎপাদন বছরে তা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৪৮ লাখ টনে। এ বৃদ্ধি ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ উৎপাদন বছরে পৌনে ৪ কোটি টনে গিয়ে পৌঁছেছে। ২০১৫-১৬ উৎপাদন বছরে ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে।
উফশী এবং হাইব্রিড স্পর্শকাতর হওয়ায় বাংলাদেশে মৌসুম ভেদে নাবী, আগাম, স্বল্পমেয়াদি, লবণসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু, জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাতের ধানের চাষাবাদের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। প্রবর্তন হচ্ছে নতুন নতুন শস্য বিন্যাস। গুঁড়া ইউরিয়ার পরিবর্তে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহার বাড়ছে। আবিষ্কার ও ব্যবহার হচ্ছে ধান বপন, রোপণ, মাড়াই-ঝাড়াইয়ের কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রসহ নানা আধুনিক যন্ত্রপাতির।
১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ব্রি নাম ধারণ করে। ব্রি’র মাধ্যমেই বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাস ও কৃষি মনস্তত্ত্ব বদলে যায়। কৃষি গবেষণার সূচনাপর্বে ধানের উৎপাদন ছিল হেক্টরে ১ টনের কাছাকাছি। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে প্রতিহেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন হতো ২ টন। এখন উৎপাদন হচ্ছে হেক্টরপ্রতি ৪ টনেরও বেশি।
২০২১ সালে বাংলাদেশ ৫০ বছরে পা রাখবে। সুবর্ণজয়ন্তীর এই লগ্নে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে আমরা কোন অবস্থানে দেখতে চাই, সেটাই বস্তুত ভিশন ২০২১-এর মূল কথা। নতুন সহ¯্রাব্দে পদার্পণের পর ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এক নিরাপদ বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়। জাতিসংঘ যেমন মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)-এ ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করা শুরু করে, বাংলাদেশও তেমনি এই বৈশ্বিক উন্নয়ন শোভাযাত্রায় সহযাত্রী হিসেবে অংশ নিতে ভিশন ২০২১-এর ব্যানার নিয়ে এগিয়ে এসেছে। স্বদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এক মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে মেলে ধরতে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাতে নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলছে বর্তমান সরকার।
বাংলাদেশ শুধু ডিজিটালের দিকেই এগোচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও এগিয়ে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ কোটি টন চাল উৎপাদন। দুই বছর আগেও এই উৎপাদন ছিল সাড়ে ৩ কোটি টনের নিচে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মাননাপত্র দিয়ে সম্মান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সফরকারী পরিচালক রোনি কোফিম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের পক্ষে ২০ মে ২০১৫ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করে সম্মাননাপত্রটি হস্তান্তর করেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড্যাভিড জে স্কোরটন স্বাক্ষরিত সম্মাননাপত্রে বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে, খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বিতা অর্জনে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানকে সমর্থন জানানো হয়।
বর্তমান সরকার তার সুপ্রসারিত টেকসই কৃষিনীতির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলছে। সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ অনুয়ায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও বর্তমান জনগণবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
একই গাছে ৬ মাসে দুবার ধান
জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবিত এক গাছে দুবার ধান ফলনের জিন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। একই জমিতে একবার ধান চাষ করলে দুবার ফসল পাওয়া যাবে। প্রথমবার ধান কাটার পর ওই গাছেই পুনরায় ধান হবে। মাত্র ছয় মাসেই কৃষকের ঘরে ফসল উঠবে দুবার। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামে ড. আবেদ পরীক্ষামূলকভাবে এই ধান চাষ শুরু করেছেন। জানা গেছে, একটি ক্ষেতে প্রথমে বোরো ধানের চারা রোপণ করে পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। সঠিকভাবে সেচ ও পরিচর্যার ১৩০ দিনের মধ্যে ৮৫ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার উচ্চতার গাছে প্রথমবারের মতো ফসল (ধান) বেরিয়ে আসে। পরে মাটি থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পরিকল্পিতভাবে ওই ধান কেটে ফেলতে হয়। ক্ষেতে নতুন করে চাষাবাদ ছাড়াই পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে পরবর্তী ৫২ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ফলন মেলে। প্রথমবার ধান কেটে নেওয়ার পর দেখা যায় প্রতিহেক্টরে ৬ দশমিক ৪ টন এবং দ্বিতীয়বার ৩ টন উৎপাদিত হয়।
কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ও জীবন-জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ঋদ্ধজ্ঞান-মেধা, কৃষকের শ্রম-ঘাম, যথাযথ তদারকি, সর্বোপরি সরকারের সদিচ্ছায় ধান উৎপাদনের এই রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। আর এতে পাল্টে গেছে জাতীয় জিডিপির গ্রাফ। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে শুধু কৃৃষি খাতে জিডিপির অবদান ২১ শতাংশ। আর কৃষিশ্রমে ৪৮ শতাংশ। কৃষির অনুষঙ্গ বিভাগে সামগ্রিক পরিসংখ্যান ৫৬ শতাংশ। পরিশেষে বলতেই হয়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো।

Category:

Leave a Reply