প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

শোকের মাস আগস্ট। মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুকে এবং ১৫ আগস্টের শহিদদের স্মৃতি স্মরণ করবে। ইতোমধ্যে এ মাসটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। একইভাবে জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চও সর্বজনীন ‘শুভদিন’ আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে।
জাতীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ব্যাপক-বিশাল। ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন, বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের পোস্টার, ছবি প্রকাশ ছাড়া অসংখ্য স্মরণিকা ও স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বলা যেতে পারে, জন্ম ও মৃত্যুকে ঘিরে কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ মিলে বাংলা সাহিত্যের নতুন একটি শাখা-ই যেন গড়ে উঠেছে। ‘মুজিব সাহিত্য’। যেমন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘রবীন্দ্র সাহিত্য’। সাহিত্যের রচয়িতা কিন্তু শেখ মুজিব অথবা রবীন্দ্রনাথ নয়। এ সাহিত্যের নির্মাতা হলেন বাংলাদেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, এমনকি ছোট গল্প রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে নিঃসন্দেহে তা অতুলনীয়।
তারপরও কথা থেকে যায়। যাকে আমরা নানা অনুষ্ঠানে স্মরণ করি, এমনকি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটুকু স্মরণ করি।
আমাদের দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের পূজনীয় দেবতা ও দেবীর বিগ্রহ গড়ে নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। রবীন্দ্রনাথ এর বাহ্যিক আনন্দ-উৎসবের দিকটিকে ‘দুঃখপ্রবণ’ বাঙালিদের জীবনে ‘আনন্দ অবকাশ’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু তার একাধিক লেখায়, কবিতায় তিনি বিগ্রহ রূপী পাষাণ প্রতিমাকে ঘিরে বাঙালি হিন্দুর আনন্দকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন করেছেন, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে তাদের দেবত্ব-মহত্ত্বকে কতটা অনুসরণ করি?
কথাটা ঘুরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে অনুষ্ঠানের বিপুলত্ব এবং নিজেদের মুজিব অনুসারী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করা নিয়েও প্রশ্ন করা যেতে পারে। যে মানুষটিকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলে আমরা গৌরব অনুভব করি, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটা অনুসরণ করি।
বঙ্গবন্ধু তার অসংখ্য বক্তৃতায়, অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা’য় যেসব উপলব্ধির কথা বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের অনুসরণযোগ্য আচরণের কথা বলেছেন, যেসব নীতি-নৈতিকতাকে ‘মানুষ’ হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তার কতটা আমরা অনুসরণ করি?
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪-৭৫ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ধারণা বা কনসেপ্ট প্রচার করার সময় আওয়ামী লীগ কর্মীদের উদ্দেশ্যে যেসব কথা বলেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কেবল সমকাল নয়, বঙ্গবন্ধুর এসব বাণী, উপদেশ এবং নির্দেশনা, প্রতিটি মুজিব আদর্শের অনুসারী কর্মীর কাছে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অবশ্য পালনীয় বলে আমরা মনে করি।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন, যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে, যারা আমার গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, যারা দুর্নীতিবাজ, মজুতদার, চোরাকারবারী তারা ‘মানুষ’ না। যে মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে সেই সাম্প্রদায়িক পশু মানুষ না। যে ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করে আমার দলে তাদের স্থান নেই।
বঙ্গবন্ধু একটা কথা বারবার বলেছেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। আমরা যদি সোনার মানুষ না হই, আমরা যদি জনগণের আস্থাভাজন সেবক না হই, আমরা যদি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে না পারি তাহলে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তদান ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান সংশোধন করে সমগ্র জাতিকে এক প্লাটফরমে এনে বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭১, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, “… কিছু দুর্নীতিবাজ, কিছু ঘুষখোর, কিছু শোষক, কিছু ব্ল্যাক মার্কেটার্স বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে পারবো না, এ-কথা আমি বিশ্বাস করি না। যদি সকলে মিলে নতুন প্রাণ নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির নাজের করে আত্মসমালোচনা করে, আত্মসংশোধন, আত্মশুদ্ধি করে, যদি ইনশাল্লাহ কাজে অগ্রসর হন, বাংলার জনগণকে আপনারা যা বলবেন, তারা তাই করবে। আপনাদের অগ্রসর হতে হবে।…”
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জাতির পিতার নির্দেশিত পথে সোনার বাংলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বিপুল সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশ এখন উন্নয়নের সড়কে। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার এই উন্নয়ন অভিযাত্রাকেও কিছু সংখ্যক ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘শোষক’ এবং ‘ঘুষখোর’ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ব্যর্থ করে দেওয়া, মøান করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। জাতির পিতার উল্লিখিত কথাগুলো মনে রেখে আমাদের আত্মসমালোচনা, আত্মসংশোধন এবং আত্মশুদ্ধি করে এই দুর্নীতিবাজ, শোষক ও ঘুষখোরদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। কাজটা একমাস, একদিন বা একবছরের নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই আমাদের বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত ‘সোনার মানুষ’ হওয়ার সাধনায়, কেবল কথায় নয় কাজেও ব্রতী হতে হবে। আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজেরা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে, এই মহৎ কাজে অন্যদেরও উৎসাহিত করি। আর তাহলেই জাতির পিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হবে।

Category:

Leave a Reply