প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে স্বাগত

00মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩নং দফা এবং ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগের ফলে দীর্ঘদিন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য থাকায়, এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তারা দেশবাসীকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে যে, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে ‘অবিলম্বে শূন্যপদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দান করতে হবে।’
এখানে দুটি অসত্য তথ্য পরিবেশন করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রথমত; প্রধান বিচারপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে উক্ত শূন্যপদে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অর্পণের কথা থাকলেও, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কোনো সময় নির্ধারণ করে দেয়নি সংবিধান। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে শূন্যপদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি ও স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি কতদিন ‘ভারপ্রাপ্ত’ থাকবেন তারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতএব, এখানে সময়সীমা কোনো সমস্যা নয়। দ্বিতীয়ত; সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। অথচ বিএনপি, একশ্রেণির আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্র ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন’ করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ঢালাও অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকেই ক্ষুণœ করেন নি, সরকারের ওপর অহেতুক দোষারোপ করে চলেছেন।
আমরা সংবিধানের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান; কিন্তু দুটি বিষয়ে রাষ্ট্রপতির রয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কারও সাথে পরামর্শ না করে যেমন নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি প্রধান বিচারপতি নিয়োগেও তিনি স্বাধীন এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে এ কথা লেখা নেই যে, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। সংবিধানে আছে ন্যূনতম ১০ বছর সুপ্রিমকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, অথবা বিচার বিভাগে ন্যূনতম ১০ বছর কাজ করেছেন, এমন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। এর নিরগলিতার্থ দাঁড়ায় হয়, বিচার বিভাগে (সেটি হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নাও হতে পারে) ১০ বছর কাজ করেছেন অথবা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার অধিকার রাখেন। এ ব্যাপারে যেমন কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই, তেমনি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ারও সুযোগ নেই।
আর একটি বিষয়ে সকলের পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হোক বা অন্য কোনো বিচারপতিই হোন, প্রধান বিচারপতি পদে কারও নিয়োগই ‘পদোন্নতি’ বলা অসাংবিধানিক। কারণ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের যখন আপিল বিভাগে নিয়োগ করা হয়, সেটি কার্যত এক ধরনের পদোন্নতি।
কিন্তু প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ কোনো পদোন্নতি নয়। যদি পদোন্নতিই হতো তা হলে জ্যেষ্ঠতম বাধ্যতামূলক হতো। অথবা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধান। সংবিধানে বিচারপতিদের পদোন্নতির কোনো বিধান নেই।
যেহেতু সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো বিধান নেই এবং জ্যেষ্ঠতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সে কারণে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিকে পদোন্নতি ধরা যাবে না। বস্তুত, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অ্যাপয়েন্ট করেন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাকে ফ্রেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা নতুন নিয়োগ দান করা হয়েছে। আমরা অবশ্য এটা লক্ষ করেছি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগ থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের যে কনভেনশন বা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, সেটিই অনুসরণ করেছেন।
আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আশা করি, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর বিএনপি ও স্বার্থান্বেষী মহল আর এটা নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সকল বিতর্কের অবসান ঘটাবেন।
আমরা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, তিনি সংবিধান, ন্যায়নীতি ও বিচার বিভাগকে সমুন্নত রেখে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সফল হবেন।

Category:

Leave a Reply