প্রসারিত হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিগন্ত

Posted on by 0 comment

25মুহাম্মদ জমির: গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে অযথা অপরাজনীতি পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ জোরদারে শেখ হাসিনা সরকারের আন্তর্জাতিক দরকষাকষির চেষ্টাকে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিভ্রান্তিমূলক ব্যাখ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।
নবগঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক বিস্তৃত পরিম-লের অংশীদার হওয়া সংক্রান্তে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগও গত মাসজুড়ে কিছু সমালোচকের চক্ষুশূল হয়েছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩৬তম আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সফল উদ্বোধন ও সুন্দর পরিসমাপ্তি প্রশংসার পরিবর্তে তথাকথিত সমালোচকের ছিদ্রান্বেষণের শিকার হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সরকার কানাডা, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ, ভারতের গোয়া, ডাভোস, সুইজারল্যান্ডের মিউনিখ, জার্মানি এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক ও জাতীয় ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করেছে। সন্ত্রাস প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অভিবাসীদের সমস্যা নিরসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সম্পর্কিত বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ও কর্মকা-ে মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের যে সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
গত অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং-এর সফল সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারে সরকারের উক্ত পদক্ষেপসমূহেরই প্রতিফলন।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যে ধারায় বাস্তবায়িত হচ্ছে তাতে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল এবং দূর প্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকারই প্রতিফলিত হয়। বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরও এ বাস্তবতায় অনুধাবন করতে হবে। এতে বাংলাদেশ-ভারতের ইতিবাচক পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি গভীর ও বিস্তৃত সহযোগিতার যৌথ রূপরেখা অঙ্কিত হয়েছে। গত জুন ২০১৫-তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের পর এর ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ সফর পারস্পরিক স্বাভাবিক সৌজন্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে যে, মোদির বাংলাদেশ সফরকালীন ২২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এ চুক্তিগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং ভারতীয় জালমুদ্রা বিস্তাররোধ সংক্রান্ত চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত। উক্ত সফরে ভারত বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তাসহ বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
শেখ হাসিনার উক্ত সফরে ভারতের সাথে ৩৬টি ‘বাইলেটারেল ইন্সট্রুমেন্ট ইন দ্যা ফরমেট অব এগ্রিমেন্টস’, ‘মেমোরেন্ডাম আব আন্ডারস্ট্যান্ডিংস’ ও ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কয়েকটি ‘লাইন অব ক্রেডিট’ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয় যেগুলো আরও পাঁচ বছরের জন্য আরও অধিক সংখ্যক বর্ডার হাট স্থাপন, তথ্য ও প্রচার বিভাগ, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইসিটি, কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ গবেষণা, ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, জ্বালানি ও খনিজ সেক্টর, প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত (যৌথ প্রশিক্ষণ, তথ্য ও গবেষণা বিনিময়) এবং অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পর্কিত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন দিল্লিতে অবস্থানকালে গত ৮ এপ্রিল ২০১৭-তে এক যুক্ত বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয় যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হয়েছে। উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব, সমতা, আস্থা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে উভয় দেশের সম্পকোন্নয়ন জোরদার ও উভয় দেশের সর্বক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব এ আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল। এ ছাড়াও, এ অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখা, সমন্বিত সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের যৌথ আকাক্সক্ষাও বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়।
এ দিল্লি সফরে দুদেশই সহমত পোষণ করে যে, সন্ত্রাস এ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান হুমকি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সন্ত্রাসী নির্মূল, সন্ত্রাসী সংগঠন ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যেসব রাষ্ট্র বা সংগঠন সন্ত্রাস বিস্তারে আর্থিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে সন্ত্রাসে সমর্থন জোগায় এবং সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের আস্তানা গাঁড়তে সহযোগিতা করে, তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হবে। সন্ত্রাস নির্মূলে উভয় দেশের এ ঐক্যমত পাকিস্তানকে লক্ষ্য করেই হয়েছে মর্মে বিশ্লেষকগণের অভিমত।
উভয় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় আরও উন্নত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকা দুর্বৃত্তমুক্ত করা এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যেও কোঠায় নামিয়ে আনারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা অগ্রণযোগ্য এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখানে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিয়ে করার জন্য ফেরার সময় যুবতী ফেলানীর অনাকাক্সিক্ষত হত্যাকা- বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি স্মর্তব্য। হতাশাজনক হলেও সত্য যে, ফেলানী হত্যাকা-ের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেলেও ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় এখনও ফেলানীর হত্যাকারীদের বিচার হয়নি। এ প্রেক্ষিতে উভয় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় আরও উন্নত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া মানে শুধু চোরাচালানি, মানবপাচার ও মাদকপাচার প্রতিরোধই নয়, মানবাধিকার সমুন্নত রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ও ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে দুদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে ৩টি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষর করেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে কৌশলগত ও সামরিক ক্ষেত্রে দুদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধির স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সার্বভৌমত্ব ও সমতারভিত্তিতে কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালী করতে এ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষিতে, এই সফরে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ব্যবহারের নিমিত্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি ক্রয়ের লক্ষ্যে ভারত থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ‘লাইন অব ক্রেডিট’-এর জন্যও একটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষরিত হয়। এ অর্থ দিয়ে কেবল ভারত নয়, অন্য কোনো দেশ থেকেও সামরিক সরঞ্জামাদি ক্রয় করা যাবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এ সফর আরও একটি কারণে গুরুত্ব বহন করেÑ বাংলাদেশের একটি বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফরসঙ্গী হয়ে ভারতে যান। তারা ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সাথে পৃথক পৃথক সভায় মিলিত হন। দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে আলোচনা হয়। এ ছাড়াও, বাংলাদেশ থেকে কীভাবে ভারতে রপ্তানির বহুমুখী সুযোগ বৃদ্ধি করা যায়, আধাশুল্ক ও শুল্কবিহীন সম্পর্কিত বাধা অপসারণ করা যায় এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি রপ্তানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উত্তোলন করা যায়, বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকিং যোগাযোগ স্থাপন ও ভারতের বিদ্যমান কর কাঠামোর বেড়াজাল সহজতর করা যায় এ বিষয়গুলোও সভাসমূহে আলোচনা করা হয়। সমন্বিতভাবে মালামাল পরিবহনে স্থল শুল্ক স্টেশন ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে দুদেশের মধ্যে ঐক্যমত হওয়ায় ব্যবসাক্ষেত্রে আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসাক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভারতের জন্য পৃথক রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারত ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক মর্মে জানা যায়।
রিপোর্টে আরও জানা যায়, পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও বিকিরণ প্রতিরোধ, বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্র, দ্বিপক্ষীয় বিচারিক ক্ষেত্র, ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানক্ষেত্র এবং সিরাজগঞ্জ থেকে দাইখোয়া ও আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত প্রটোকল রুটে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কারিগরি তথ্যবিনিময় ও সহযোগিতার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ‘লাইন অব ক্রেডিট’ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও, জ্বালানি ক্ষেত্রসহ নদীপথে খননকাজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আরও কয়েকটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষরে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে।
যা-ই হোক, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি হলেও, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অযৌক্তিক ও অনড় অবস্থানের কারণে তিস্তা নদীর পানিতে ন্যায্য পাওনা আদায়ে বাংলাদেশের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ তিস্তা নদীর পানি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত না হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি চুক্তি হবে মর্মে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা সংক্রান্তে একটি ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই আশাবাদ পর্যাপ্ত আস্থা সৃষ্টিতে সহায়ক নয়। নরেন্দ্র মোদি যেভাবে স্থল সীমানা চুক্তি করাসহ তা বাস্তবায়ন করেছেন, সেরকমভাবে তার পক্ষ থেকে একটি সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির সব চুক্তি ও চেষ্টার সাথে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়।

অনুবাদ : আনিস মুহম্মদ, কবি-অনুবাদক

Category:

Leave a Reply