প্রয়াতজনদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

aaaমুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী জেনারেল জ্যাকব
aaa    50 aaaএকাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে রাজি করিয়ে নিজ হাতে দলিলের খসড়া লিখেছিলেন যিনি, বাংলাদেশের বন্ধু সেই ভারতীয় জেনারেল জেএফআর জ্যাকব আর নেই।
কিছুদিন অসুস্থতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই লেফটেন্যান্ট জেনারেল গত ১৩ জানুয়ারি সকালে দিল্লির একটি সামরিক হাসপাতালে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে পূর্ব পাকিস্তানের রণাঙ্গনে সরাসরি যোগ দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। ঢাকা দখলের মূল পরিকল্পনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ছিলেন ভারতীয় সেনানায়করাও। জেনারেল জ্যাকব তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় চিফ অব স্টাফ।
‘সারেন্ডার ইন ঢাকা, বার্থ অব এ নেশন’ এবং ‘অ্যান ওডেসি ইন ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বইয়ে জ্যাকব লিখে গেছেন সেইসব আগুনঝরা দিনের কথা, যে পথ ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এএকে নিয়াজী ঢাকার তখনকার রেসকোর্স ময়দানে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মুক্তিযুদ্ধে ‘এস ফোর্স’-এর অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার কেএম সফিউল্লাহ বলেন, জেএফআর জ্যাকবের সহযোগিতাতেই ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজীর আত্মসমর্পণপত্রের খসড়া তৈরি এবং এ সংক্রান্ত সব আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করা হয়। জ্যাকব একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা। পাকিস্তানি বাহিনীর বিপর্যয়ের শুরুতেই জ্যাকব তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কখন, কোথায় ও কীভাবে আত্মসমর্পণ করবে সেটাও ঠিক করেছিলেন তিনি। জ্যাকব বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সফল হতে হলে এর ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা দখল করতে হবে আগে। তাই নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারেই ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে রণাঙ্গনে এগিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি, যদিও সেনা সদরদফতর তার পরিকল্পনাকে উচ্চাভিলাষী বলেছিল।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রসরমান ভারতীয় সেনা কন্টিনজেন্ট শত্রুর প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে দ্রুততার সাথে ঢাকার দিকে এগিয়ে যায়, যা ভেঙে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল। মাত্র ছয় দিনের মধ্যে মূল লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। শত্রুর অবস্থানের তথ্য আগেভাগে জানিয়ে ও বিপদসংকুল জলাভূমিগুলো এড়ানোর পথ দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সেনাদের অগ্রযাত্রায় গতি সঞ্চার করেন। জ্যাকব ফার্জ রাফায়েল জ্যাকবের জন্ম ১৯২৩ সালে। ১৯৪১ সালে ১৮ বছর বয়সে ব্রিটিশ সরকারের অধীন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নাম লেখান জ্যাকব। তিন যুগের সৈনিক জীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশ নেন জ্যাকব। সাহসিকতার জন্য পেয়েছেন নানা পদক। গোয়া ও পাঞ্জাবের গবর্নরের দায়িত্বও তিনি পালন করেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানানোর উদ্যোগ নিলে ২০১২ সালের ২৭ মার্চ আরও ৮৩ জনের সাথে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা নেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফআর জ্যাকব।
সম্মাননা নেওয়ার পর ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফআর জ্যাকব মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে স্যালুট দেন। দর্শকসারি জয় বাংলা সেøাগানে মুখরিত হয়ে উঠলে তিনিও বলেনÑ ‘জয় বাংলা’।
এর আগে ২০০৮ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন জ্যাকব। সে সময় ভারতীয় হাইকমিশনে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অসাধারণ বীরত্বের সুবাদেই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ¯্রফে তুমুল দেশপ্রেম পুঁজি করেই একটা শক্তিশালী নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে 51 copyএনেছে তারা। আমরা তাদের সাহায্য করেছি, আমরা তাদের সহযোদ্ধা। কিন্তু তাদের লড়াইটা তারা নিজেরাই লড়েছে। চেতনার পুরোটা ঢেলে দিয়েই তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় স্বাধীনতাযুদ্ধে জেনারেল জ্যাকবের অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, বাঙালি জাতি তাকে চিরকাল মনে রাখবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন প্রকৃত বন্ধুকে হারিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক : বাংলাদেশের মুক্তির লড়াইয়ে অবদান রাখা ভারতের সেনা কর্মকর্তা জেএফআর জ্যাকবের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতি তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
এক শোক বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের এক অকুতোভয় সেনানীকে হারালাম। মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল জ্যাকবের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন
51-bঅর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন (৭১) আর নেই। বাংলাদেশ সময় গত ৩ জানুয়ারি দিবাগত রাত পৌনে ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের কেভেল্যান্ড কিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। রিডো বাইপাস সার্জারি ও ভাল্ভ পরিবর্তনের জন্য প্রায় এক মাস আগে সেখানে ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মারা যান দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে যাওয়া এই অর্থনীতিবিদ।
মৃত্যুর আগে মাহবুব হোসেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের উপদেষ্টা, নির্বাহী পরিচালক, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) সামাজিক গবেষণা বিভাগের পরিচালক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
মাহবুব হোসেন স্ত্রী পারভিন হোসেন, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। তার ছেলে তানভীর হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অব আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট, বড় মেয়ে শাওন হোসেন বায়োটেকনোলজিস্ট ও ছোট মেয়ে শারমিন ব্র্যাক ইপিএলের পরিচালক হিসেবে কর্মরত।
বাবা ডা. কোবাদ আলী মালিতা ও মা ফাতেমা জোহরার ঘরে ১৯৪৫ সালে ভারতের নদীয়া জেলায় জন্ম নেন মাহবুব হোসেন। সেখান থেকে ¯œাতক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ¯œাতকোত্তর ও যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এশিয়ান সোসাইটি ফর এগ্রিকালচার ইকোনমিস্টের নির্বাচিত সভাপতি হয়েছিলেন অধ্যাপক মাহবুব হোসেন। এ ছাড়া তিনি বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল নলেজ অ্যাডভাইজরি কমিশনের সদস্য, বাংলাদেশ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা-বিষয়ক বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন।
১৯৯১ সালের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন-বিষয়ক যে টাস্কফোর্স গঠন করেছিল, মাহবুব হোসেন তার দারিদ্র্য বিমোচন-বিষয়ক কমিটির সভাপতি ছিলেন।
ফরেন পলিসি (এফটি) ২০১৩ সালে বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির যে তালিকা প্রকাশ করে, তাতে মাহবুব হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি উৎপাদন বিষয়ে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তাকে চিহ্নিত করে। খাদ্যনীতি-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফপ্রি, ইরি, এফএও থেকে তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তার একক ও যৌথভাবে মোট ১২টি বই এবং ২০০-এর মতো প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সবুজ বিপ্লবের প্রভাব, সেচপাম্পের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন নিয়ে একাধিক গবেষণাধর্মী বই এবং গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন মাহবুব হোসেন। ১৯৭৩ সাল থেকে দেশের ৬৫টি গ্রামের পরিবর্তন বিষয়ে মাহবুব হোসেন একটি চলমান গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বাংলাদেশ ও বিশ্বের চাল উৎপাদন এবং চালের অর্থনীতি নিয়ে তিনি নিয়মিত গবেষণা করছিলেন।
মাহবুব হোসেনের মৃত্যুতে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেন, উন্নয়ন সংক্রান্ত ইস্যুতে বিশ্বের যে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের সুগভীর ধারণা ছিল, ড. মাহবুব হোসেন ছিলেন তাদের অন্যতম। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার জীবনটাই ছিল এক সাফল্যগাথা।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর নূরুল ইসলাম
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূরুল ইসলাম আর নেই। গত ২২ জানুয়ারি রাত ৮টায় রাজধানীর রায়েরবাজারের মিতালী রোডের বাসায় ইন্তেকাল করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ২৩ জানুয়ারি বাদ জোহর চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়। আওয়ামী লীগের এই নেতা ছিলেন অবিবাহিত। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নূরুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এক শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর দলে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিলে আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান নূরুল ইসলাম। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রামে বিভিন্ন সময়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করার সময় নূরুল ইসলাম হাতে পোস্টার লিখে রাজপথে হয়ে ওঠেন পোস্টার নূরুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নূরুল ইসলাম এটেম্পট টু মার্ডার মোনায়েম খান মামলার ১ নম্বর আসামি ছিলেন। যে মামলায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন ২ নম্বর আসামি। নূরুল ইসলাম বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়ে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ হারাল একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রামী নেতাকে। বিবৃতিতে তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

আওয়ামী লীগ নেতা এমএ আজিজ
52পঁচাত্তর-উত্তর আওয়ামী লীগের অন্যতম সংগঠক, স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, ১/১১-পরবর্তী সময়ের সাহসী সৈনিক, পুরনো ঢাকার কৃতী সন্তান ভাষাসৈনিক একুশে পদকপ্রাপ্ত মরহুম পিয়ারু সরদারের সুযোগ্য সন্তান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ গত ২৩ জানুয়ারি পরলোক গমন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই হৃদরোগে ভুগছিলেন এমএ আজিজ।
প্রয়াত রাজনীতিক এমএ আজিজ স্ত্রী ও তিন ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। বাদ মাগরিব বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রথম জানাজা এবং বাদ এশা বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। দুটি জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানেই ছিল শোকার্ত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ঢল। বর্ষীয়ান রাজনীতিক এমএ আজিজের মৃত্যুর খবরে তার পুরান ঢাকার নিজ বাসভবনে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বিকেলে ওই বাসভবনে গিয়ে প্রথমেই এমএ আজিজের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রয়াত এই নেতার দোতলার বাসায় গিয়ে সেখানে শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না ও সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রায় আধাঘণ্টা সেখানে অবস্থান শেষে গণভবনে ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এদিকে এমএ আজিজের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন। শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী এবং নিবেদিতপ্রাণ একজন নেতাকে হারাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের পরবর্তী দুঃসময়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করতে এমএ আজিজের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মরহুমের সাহসী ভূমিকার কথা জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
আজিজের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি, ঢাকার সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি, হাজি মো. সেলিম এমপিসহ দলীয় নেতাকর্মীরা হাসপাতালে ছুটে যান।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে গত আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এমএ আজিজ। ১৯৮৭ সালে মোজাফফর হোসেন পল্টুর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। ২০০৩ সালে সম্মেলনে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ঢাকা মহানগরের সভাপতি নির্বাচিত হলে ওই কমিটিতে সহ-সভাপতি হন আজিজ। ২০০৭ সালে মোহাম্মদ হানিফ মারা যাওয়ার পর এমএ আজিজকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১২ সালে কাউন্সিল হলেও নতুন কমিটি গঠিত না হওয়ায় এমএ আজিজ আগের মতোই ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এমএ আজিজের বাবা পুরান ঢাকার বিলুপ্ত পঞ্চায়েতের নেতা পেয়ারু সরদার ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় প্রথম শহীদ মিনার তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন। তার বড় ছেলে উমর বিন আবদুল আজিজ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর।

পরলোকে সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদ
53-aনির্ভীক সাংবাদিক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সদ্য নির্বাচিত সভাপতি আলতাফ মাহমুদ (৬২) আর নেই। গত ২৪ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে সাংবাদিক সমাজে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, দুই মেয়ে, অসংখ্য সহকর্মী ও আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।
আলতাফ মাহমুদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
ঢাকায় ডিআরইউ ও জাতীয় প্রেসকাবে দু’দফা জানাজা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তার লাশ গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপায় পাঠানো হয়। সেখানে দু’দফা জানাজা শেষে তার লাশ বাবার কবরের পাশে গত ১৫ জানুয়ারি দাফন করা হবে হয়। জানাজা শেষে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন ও মামুনুর রশীদ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন প্রমুখ এবং জাতীয় প্রেসকাবসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে প্রয়াত এই সাংবাদিক নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দৈনিক ডেসটিনির নির্বাহী সম্পাদক আলতাফ মাহমুদ সাংবাদিকতায় আসেন গত শতকের সত্তরের দশকে। তিনি দীর্ঘদিন সাপ্তাহিক খবরের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন। এ ছাড়া অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নে (ডিইউজে) পাঁচবার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন আলতাফ মাহমুদ। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন নেতা।

পরলোকে একাত্তরের যোদ্ধা জেনারেল কৃষ্ণা রাও
53-bএকাত্তরের বন্ধু ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল কেভি কৃষ্ণা রাও (৯২) পরলোকগমন করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। গত ৩০ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দিল্লির সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। জেনারেল কৃষ্ণা নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে সন্ত্রাস দমনে ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত একটি মাউন্টেন ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন ব্রিগেড ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়ে সিলেট তথা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল শত্রুমুক্ত করতে ভূমিকা রাখে। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে পদক পান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরের বন্ধু, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের অন্যতম শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা জেনারেল কেভি কৃষ্ণা রাওয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল রাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা জাতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তিনি প্রয়াত জেনারেলের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

Category:

Leave a Reply