প্রয়াতজন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

Posted on by 0 comment

উত্তরণ প্রতিবেদন:

60(A)   মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সিডনি শনবার্গ
একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার খবর বিশ্বের সামনে তুলে ধরায় যিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন, সেই সিডনি শনবার্গ আর নেই। গত ৯ জুলাই নিউইয়র্কের পোকিপসি শহরে মারা যান পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী এই সাংবাদিক। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। ৬ জুলাই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন বলে তার এক বন্ধুর বরাত দিয়ে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
মার্কিন সাংবাদিক ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সিডনি শনবার্গের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর নেতারা। তারা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, নিউইয়র্ক টাইমস-এর দক্ষিণ এশীয় সংবাদদাতা হিসেবে শনবার্গ ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকায় পাকিস্তানি গণহত্যার খবর প্রথম সারাবিশ্বে প্রচার করেন। পরে অন্য বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। এরপরও সিডনি শনবার্গ ভারত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন লেখেন।
গত ১০ জুলাই রোববার পাঠানো এক শোকবার্তায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর নেতারা বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ওপর শনবার্গের প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনগুলো সারাবিশ্বে আলোড়ন তোলে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রমনা রেসকোর্সে পাকিস্তান বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণেরও একজন প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতারা এই আদর্শবাদী ও ত্যাগী সাংবাদিকের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।
১৯৭৫ সালে কম্বোডিয়ায় গণহত্যার সংবাদ সংগ্রহের জন্য সিডনি শনবার্গ পুলিৎজার পুরস্কার পান।
সাবেক সংসদ সদস্য
60(B)ডা. মান্নান
সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ডা. এমএ মান্নান গত ১৬ জুলাই দুপুরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ৮৪ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন আইপিজিএমআর-এ যোগদান করে দেশে প্রথম ¯œায়ুরোগ চিকিৎসার সূচনা করেন। তিনি ছিলেন নিউরোলজি ফাউন্ডেশন, ঢাকা; ইপিলেপসি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা। নিজ এলাকায় স্ব-অর্থায়নে গড়ে তোলেন ডা. আবদুল মান্নান মহিলা কলেজ, বশিরা মান্নান এতিমখানা, বেগম আম্বর আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলহাজ আম্বর আলী বহুমুখী সেবাকেন্দ্রসহ অর্ধ শতাধিক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে তিনি ২০০১ সাথে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি চিকিৎসা ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ডা. এমএ মান্নানের চতুর্থ জানাজা ১৯ জুলাই জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্চম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তার কর্মস্থল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাদ জোহর। পরে বনানী কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭ জুলাই বাদ এশা লেক সার্কাস কলাবাগানের মসজিদ বাক্কাতিল মোবারাকাতে। ১৮ জুলাই দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার নির্বাচনী এলাকা পাকুন্দিয়া উপজেলা সদরে বাদ জোহর, তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বাদ আসর কটিয়াদি উপজেলা সদরে কটিয়াদি ডিগ্রি কলেজ মাঠে।
সাবেক সংসদ সদস্য
60(C)আলী রেজা রাজু
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য আলী রেজা রাজু দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ১৫ জুলাই দুপুরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য অনুসারী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবেক সংসদ সদস্য আলী রেজা রাজুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
আলী রেজা রাজু দীর্ঘদিন ধরে কিডনিসহ নানা রোগে ভুগছিলেন।
রাজুর প্রথম নামাজে জানাজা ১৭ জুলাই বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ জুলাই তার মরদেহ যশোরে নেওয়ার পর সেখানে ঈদগাহ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে শহরের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা শাখার কমান্ডার রাজেক আহমেদ জানান, আলী রেজা রাজুর জন্ম ১৯৪৫ সালে যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুরে।
সংসদ সদস্য ছাড়াও আলী রেজা রাজু বিভিন্ন সময় যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, যশোর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র), যশোর পৌরসভার কমিশনার (কাউন্সিলর) নির্বাচিত হন।
তিনি ২০০৪ সালের কাউন্সিলে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় এক যুগ তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বীরকন্যা মুক্তিযোদ্ধা
61(B)শিরিন বানু মিতিল
অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, নারী নেত্রী শিরিন বানু মিতিল আর নেই। গত ২০ জুলাই মধ্যরাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই সম্মুখ সমরে নেমেছিলেন তিনি। বীরকন্যা প্রীতিলতাকে অনুসরণ করে তিনি পুরুষবেশে যুদ্ধে অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ২০ জুলাই রাত সাড়ে ১১টায় তিনি অসুস্থবোধ করলে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাত দেড়টায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মহীয়সী মুক্তিযোদ্ধার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ ২২ জুলাই সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হয়। সেখানে তার সহযোদ্ধারাসহ সর্বস্তরের জনগণ এই বীরকন্যার মরদেহে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদর্শন করা হয় অন্তিম সম্মান।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকহানাদারদের আক্রমণ শুরু হলে ২৭ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। পরদিন পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩৬ পাকসেনার সাথে জনতার তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ পাকসেনা নিহত এবং দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। ৯ এপ্রিল নগরবাড়িতে যুদ্ধের সময় পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকায় তার ছবিসহ পুরুষ সেজে যুদ্ধ করার খবর প্রকাশিত হয়। পরে পাবনা শহর পাকিস্তানি সেনারা দখলে নিলে তিনি ভারতে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত নারীদের একমাত্র প্রশিক্ষণ শিবির ‘গোবরা ক্যাম্পে’ যোগ দেন। পরে মেজর জলিলের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন।
কর্মসূত্রে শিরিন বানু বেসরকারি সংস্থা পিআরআইপি ট্রাস্টে ‘জেন্ডার অ্যান্ড গভর্নেন্স’ বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি চাইল্ড অ্যান্ড মাদার কেয়ার (সিএমসি) নামে একটি সেবাকেন্দ্রের সাথেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
মহাশ্বেতা দেবী
61(A)পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে গত ২৯ জুলাই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর। চোখের জলে বিদায় জানানো হলো লেখিকা-সমাজকর্মীকে। প্রয়াত সাহিত্যিকের অসংখ্য অনুরাগীর সাথে শেষ যাত্রায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি।
২৯ জুলাই সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে কলকাতার পিস হেভেন থেকে মহাশ্বেতার মরদেহ রবীন্দ্রসদনে আনা হয়। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে প্রয়াত সাহিত্যিককে শেষ শ্রদ্ধা জানান সাধারণ মানুষ, পাঠক-অনুরাগী থেকে রাজনৈতিক নেতারা। সেখানে অগণিত মানুষের সাথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং কলকাতার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় শেষ শ্রদ্ধা জানান তাকে।
প্রসঙ্গত দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ২৮ জুলাই কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে মৃত্যু হয় ৯০ বছর বয়সী এই কথাসাহিত্যিকের। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার সাথে কিডনিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল তার।
মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের অন্যতম বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি সাংস্কৃতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী। তার ব্যাপ্তি বিশাল কিন্তু এতটাই মাটির কাছাকাছি তিনি যে তার ঘনিষ্ঠ পাঠক ছাড়া তাকে জানা যায় না। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইকে নিয়ে বই লিখে প্রথম সবার নজরে আসেন মহাশ্বেতা দেবী। এরপর তিনি অসংখ্য গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তার লেখা অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ম্যাগসেসে পুরস্কার থেকে শুরু করে জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য একাডেমি প্রবর্তিত বহু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্ম বিভূষণের মতো জাতীয় সম্মানও। এ ছাড়া ২০০৭ সালে পেয়েছিলেন সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। বামপন্থি লেখক হিসেবে পরিচিত মহাশ্বেতা দেবী লেখালেখির পাশাপাশি আদিবাসীদের সমাজের জীবন মান উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছেন। বিশেষ করে লোধা ও শবরদের জীবনমান উন্নয়নে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে গিয়েছেন।

Category:

Leave a Reply