প্রয়াতজন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

31

জাতীয় অধ্যাপক ডা. এমআর খান

উত্তরণ প্রতিবেদন : বাংলাদেশে শিশু চিকিৎসার পথিকৃৎ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এমআর খান আর নেই। গত ৫ নভেম্বর বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে কয়েক মাস ধরে ভুগছিলেন। তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র মেয়ে দৌলতুন্নেসা ম্যান্ডিসহ অসংখ্য ছাত্র, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। গত ২৭ নভেম্বর সাতক্ষীরার রসুলপুরের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ডা. এমআর খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী।
ডা. এমআর খান বাংলাদেশে শিশু চিকিৎসার পথিকৃৎ। তার জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরার রসুলপুরে। এমআর খান নামে তিনি পরিচিত হলেও তার পুরো নাম মো. রফি খান।
১৯৫৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে। তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিটিএমঅ্যান্ডএইচ, এমআরসিপি, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসিএইচ, ঢাকার পিজি থেকে এফসিপিএস, ইংল্যান্ড থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন।
এমআর খান পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এমআর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এই ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠা করেছেন শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল, যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, নিবেদিতা নার্সিং হোমসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান ‘আধূনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে।
সাতক্ষীরা সদরের প্রাণনাথ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় (পিএন স্কুল) থেকে ১৯৪৩ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে ১৯৪৫ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এরপর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে এমবিবিএস পাস করে সাতক্ষীরায় ফিরে আসেন তিনি।
১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি দূরসম্পর্কের আত্মীয় আনোয়ারা বেগম আনুর সাথে এমআর খানের বিয়ে হয়। পরের বছর উচ্চশিক্ষার জন্য সস্ত্রীক বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট ও এডিনবরা গ্রুপ হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে আবার দেশে ফিরে পরের বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশুস্বাস্থ্য) পদে যোগদান করেন। এমআর খান ১৯৬৯ সালে আবার সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগে যোগ দিয়ে পরের বছর অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ-আইপিজিএমআরের (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালকের দায়িত্ব পান।
অধ্যাপক ডা. এমআর খান ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগ দেন। এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার ছিল অনন্য ভূমিকা। ওই বছরই আবার আইপিজিএমআরের শিশু বিভাগের অধ্যাপক হন। ১৯৮৮ সালে অধ্যাপক ডা. এমআর খান তার সুদীর্ঘ চাকরিজীবন থেকে অবসর নেন। এমআর খান শিশুরোগ চিকিৎসা ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে প্রকাশিত প্রকাশনায় তার জীবনপঞ্জি অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯১ সালে ম্যানিলাভিত্তিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অ্যাসোসিয়েশন অব পেডিয়াট্রিকস থেকে পদক পান তিনি। ১৯৯২ সালে তিনি শেরে বাংলা জাতীয় স্মৃতি সংসদ স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন। তিনি দেশ-বিদেশে উল্লেখযোগ্য মেডিকেল কলেজের উচ্চতর ডিগ্রি/সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর এফসিপিএস, ডিসিএইচ ও এমসিপিএস পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কের বাসভবনে নিজ চেম্বারে প্রতিষ্ঠা করেন নিবেদিতা মেডিকেল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ লিমিটেড। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় সব সম্পত্তিই দান করেছেন সাতক্ষীরা জেলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে তার ৩৭টি গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়েছে। শিশুরোগ চিকিৎসা সংক্রান্ত ৭টি বই লিখেছেন, যেগুলো দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে ক্যামব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়ালে। পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অনেক পুরস্কার।

Category:

Leave a Reply