ফাস্টিং (উপবাস) শরীরের নবজন্ম দেয়

Posted on by 0 comment

প্রয়োজন অনুযায়ী উপবাসের কারণে শরীরের অনেক জটিল সমস্যাই সমাধান হয়ে যায়, এটা একটা ম্যাজিক যে শুধু উপবাসের কারণে অনেক রোগ দূর হয়ে যায়।

54আলমগীর আলম: মানুষের শরীরে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ যেমন জরুরি তেমনি শরীরের প্রয়োজনে উপবাস থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই উপবাস ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, থাকতে হবে শরীরের প্রয়োজনে। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে যে উপবাস রাখা হয় তা রোজা, যা সারাদিন কোনো ধরনের আহার ব্যতিত এবং পানিও পান নিষেধ। কিন্তু শরীর সুস্থ রাখার জন্য যে উপবাসের কথা বলা হচ্ছে, তা উপবাস থাকাকালীনও পানি পান করতে হবে, শরীরকে কখনও ডিহাইড্রেশন করা চলবে না এবং উপবাস থাকতে হবে ২৪ থেকে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। প্রয়োজন অনুযায়ী উপবাসের কারণে শরীরের অনেক জটিল সমস্যাই সমাধান হয়ে যায়, এটা একটা ম্যাজিক যে শুধু উপবাসের কারণে অনেক রোগ দূর হয়ে যায়।
বিশেষ করে পেটের অনেক রোগই উপবাসে দূর হয়, তেমনি মেটাবলিক সিস্টেম, ইউমিউনিটি সিস্টেমকে ঠিক করে ক্ষুদামন্দা, রক্তের ভারসাম্য বজায় রেখে ওজন কমাতে সাহায্য করে, সাথে শরীরে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরে পেতে অত্যন্ত কার্যকর, রক্তের ভেতরের যত ধরনের বর্জ্য বাস করে তা বের হয়ে পড়ে, তাই এই উপবাসকে বলা হয় ডিটক্সিফিকেশন।

55উপবাসের নিয়ম
ক্স উপবাস করার নিয়ম হচ্ছে, ভোরে ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস কুসুম গরম পানি পান, তার দুই মিনিট পর এক গ্লাস কুসুম গরম পানি, এক চামচ মধু, একটি লেবুর রস মিশিয়ে পান, তার দুই মিনিট পর আরও এক গ্লাস কুসুম গরম পানি পান করতে হবে। ঠিক দুই ঘণ্টা পর এক গ্লাস কুসুম গরম পানি, এক চামচ মধু, একটি লেবুর রস মিশিয়ে পান। এভাবে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রতি দুঘণ্টা পরপর এই এক গ্লাস কুসুম গরম পানি, এক চামচ মধু, একটি লেবুর রস মিশিয়ে পান করে যেতে হবে। আর কোনো ধরনের খাবারের প্রয়োজন হবে না।
ক্স দ্বিতীয় দিনও সকাল থেকে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি, এক চামচ মধু, একটি লেবুর রস মিশিয়ে পান করতে হবে প্রতি দুই মিনিট পরপর।
ক্স তৃতীয় দিনও একই পদ্ধতিতে পানি পান করে যেতে হবে। তিন দিনের উপবাস হচ্ছে একটি ভারসাম্যমূলক, চার দিনেরটা হচ্ছে যদি পেটের বেশি পরিমাণে অসুখ থাকে আর পাঁচ দিনের উপবাস হচ্ছে, যারা কোনো ক্রোনিক সমস্যায় ভুগছেন তারা পাঁচ দিন উপবাস করবেন। উপবাস শেষ করে পরের দিন আধাবেলা যে কোনো ফল খেয়ে কাটিয়ে স্বাভাবিক খাবারে ফিরে আসবেন। এতে শরীরের ডিটক্সিফিকেশন হয়ে যাবে, শরীর থেকে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে।

উপবাসের দরুণ যে সমস্যা হতে পারে
উপবাসের সময় প্রথম দিন একটু খারাপ লাগে, বিশেষ করে বিকেল থেকে মাথাব্যথা, শরীর গরম গরম ভাব, প্রচ- ক্ষুদা লাগে, এটি হচ্ছে চোখের খাদ্য নেশা, শারীরিক কোনো দুর্বলতা হবে না; কিন্তু ক্ষুদা লাগবে। দ্বিতীয় দিন আর কোনো সমস্যা হবে না, তৃতীয় দিন দুপুরের পর থেকে একটু দুর্বল লাগবে, অনেকের পাতলা পায়খানা হবে, কারও যদি পেটে আমাশয় থাকে তা হলে তা বেড়ে যাবে; কিন্তু ঘাবড়ানো যাবে না, এটা ডিটক্সিফিকেশনের জন্য অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ, এই পেট পরিষ্কার হলে শরীর হালকা হবে এবং মূল কাজের কাজটি হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম দিন ও দুর্বল লাগবে; কিন্তু কোনো সমস্যা হবে না।

উপবাসের দরুণ তাৎক্ষণিক ফল
ক্স এই উপবাস শেষে দেখা যাবে শরীর হালকা হয়ে যাবে।
ক্স শরীরে কোনো ব্যথা থাকলে তা কমে আসবে।
ক্স পেটের কোনো অস্বত্বি থাকবে না।
ক্স শরীরে যে কোনো ব্যথাই থাকুক না কেন তা কমে আসবে।
ক্স আর্থারাইটিস থাকলে কমে আসবে।
ক্স ইউরিক এসিড কমে যাবে।
ক্স শরীরের ত্বকের রং বদলাবে, উজ্জ্বলতা বাড়বে।
ক্স ওজন কমবে ৩ থেকে ৫ কেজি, কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।
ক্স রক্তের ভেতরে জমাট হয়ে থাকা নানান বর্জ্য বেরিয়ে আসবে, রক্ত দূষণমুক্ত হবে।
ক্স শরীর এসিডিক কন্ডিশন থেকে অ্যালকালাই কন্ডিশনে ফিরে আসে।

এসব হবে দৃশ্যমান আর অদৃশ্যে থাকবে শরীরে সেল গঠনের প্রক্রিয়া ঠিক হয়ে উঠবে, শরীরে মৃত সেল বেরিয়ে আসবে, নতুন সেল তৈরি হবে, রক্তের অভ্যন্তরে সুঠাম গঠন তৈরি হবে, বিশেষ করে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন, পেটের অভ্যন্তরে পরজীবীগুলো নতুন কাঠামোয় তৈরি হবে, শরীর এসিড কন্ডিশন থেকে অ্যালকালাই ফর্মে আসবে আর অ্যালকালাই পরিবেশে ক্যানসারের জীবাণু বাড়ে না বরঞ্চ মারা যায়, সাথে শরীরে বিষ-বেদনা কমতে শুরু করে। শরীরে টিউমারের বাড়ন্তভাব কমে আসবে, এলার্জি থাকলে কমবে, পেটে গ্যাস হওয়ার সম্ভবনা কমে আসবে। এই উপবাস অনেকটা নবজন্ম হিসেবে শরীরটাকে তৈরি করবে।
আর এই নবজন্ম শরীরটাকে যতœ নিতে হবে, যে যে কারণে অনেক সমস্যা বাধিয়ে শরীরকে রোগাকান্ত করে ফেলেছিলেন সেই অভ্যাসগুলো ত্যাগ করে শরীরের প্রয়োজনীয় যতœ নিতে হবে।
উপবাস হচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়মে শরীরের শুদ্ধতা আনার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া। তাই এটি করতে ইচ্ছাই যথেষ্ট, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এর কোনো গুরুত্ব নেই, এই আধুনিক চিকিৎসকরা পরামর্শ দেবেন, খাবেন আর ওষুধ খাবেন; কিন্তু আমরা দেখেছি ওষুধ খেয়ে মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার সংখ্যা অনেক কম। বিশেষ করে ক্রোনিক সমস্যাগুলোতে বলাই হয়Ñ যতদিন বেঁচে থাকবেন ওষুধেই বেঁচে থাকবেন। কিন্তু উপবাস এমনই একটি অস্ত্র, যা দিয়ে ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিও দূর করা সম্ভব।
উপবাস বছরে তিন মাস অন্তর করা উত্তম, আর যারা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগছেন, একাধিক ওষুধে জীবনযাপন করছেন, তারা প্রথমে একসাথে তিন দিন উপবাস করে পরবর্তীতে প্রতি সপ্তাহে একদিন করে শরীরকে অ্যালকালাই অবস্থায় ফিরিয়ে আনলে শরীরে একটা ম্যাজিক ঘটে যাবে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ দ্বারা ঠিক করা যায় না। কোনো ধরনের ওষুধ ছাড়া সম্পূর্ণ ঘরোয়া পদ্ধতিতে আপনার শরীরের সবচেয়ে দামি একটা কাজ করতে পারবেন শুধু এই উপবাস দ্বারা। তাই ডাক্তারের কাছে না ছুটে বাসায় নিজেই চেষ্টা করে দেখুন।

লেখক : ভাইস চেয়ারম্যান, ন্যাচারোপ্যাথি সেন্টার, ঢাকা

Category:

Leave a Reply