বঙ্গবন্ধুর, কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment

মুনতাসীর মামুন:

5-7-2018 7-06-57 PM(তৃতীয় অংশ)
দেশের মানুষের অদৃষ্টপরায়ণতা নিয়ে তিনি বারবার আক্ষেপ করেছেন এবং যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন যা এখনো তোলা হয়, তার উত্তর আহমদ শফিরা দিতে পারবেন না। এই অভিজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুকে শিখিয়েছে আহমদ শফিদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান শুধু নয় তা খারিজ করতে, আইন করে। অন্যদিকে, একই অভিজ্ঞতা তার কন্যার থাকা সত্ত্বেও তিনি মেনে নিয়েছেন আহমদ শফিদের তত্ত্ব ও কর্তৃত্ব, যা দেশের মানুষকে আবার অদৃষ্টপরায়ণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অদৃষ্টপরায়ণতা ও উন্নয়ন পরস্পরের বিপরীত। এ সত্য যখন বর্তমান শাসকরা বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারাই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছেন।
১৯৬৬ সালের জুনের বন্যায় সারাদেশ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি একদিকে ব্যথিত অন্যদিকে ক্ষুব্ধ অদৃষ্টনির্ভরতা দেখেÑ “এই দেশের হতভাগা লোকগুলি খোদাকে দোষ দিয়ে চুপ করে থাকে। ফসল নষ্ট হয়েছে, বলেÑ আল্লা দেয় নাই, না খেয়ে আছে, বলেÑ কিসমতে নাই। ছেলেমেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, বলেÑ সময় হয়ে গেছে বাঁচবে কেমন করে! আল্লা মানুষকে এতো দিয়েও বদনাম নিয়ে চলেছে।” [পৃ. ১১০]
তিনি লিখেছেন, ক্রগ কমিশন বাঁধ দিতে বলেছে তা কার্যকর করলে সমস্যা চুকে যায়। অনেক দেশে তা করেছেও। এবং সেখানে বন্যা রোধ হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কমে গেছে। “এ কথা কি করে এদের বোঝাব! ডাক্তারের অভাবে, ওষুধের অভাবে, মানুষ অকালে মরে যায়Ñ তবুও বলবে সময় হয়ে গেছে। আল্লা তো অল্প বয়সে মরবার জন্য জন্ম দেয় নাই। শোষক শ্রেণি এদের সমস্ত সম্পদ শোষণ করে নিয়ে এদের পথের ভিখারি করে, না খাওয়াইয়া মারিতেছে। না খেতে খেতে শুকায়ে মরছে, শেষ পর্যন্ত না খাওয়ার ফলে বা অখাদ্য খাওয়ার ফলে কোনো একটি ব্যারাম হয়ে মরছে, বলে কিনা আল্লা ডাক দিয়েছে আর রাখবে কে?” [পৃ. ১১০]
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেনÑ “কই গ্রেট বৃটেনে তো কেউ না খেয়ে মরতে পারে না। রাশিয়ায় তো বেকার নাই, সেখানে তো কেউ না খেয়ে থাকে না, বা জার্মানি, আমেরিকা, জাপান এই সব দেশে তো কেউ শোনে নাইÑ কলেরা হয়ে কেহ মারা গেছে? কলেরা তো এসব দেশে হয় না। আমার দেশে কলেরায় এত লোক মারা যায় কেন? ওসব দেশে তো মুসলমান নাই বললেই চলে। সেখানে আল্লার নাম লইবার লোক নাই একজনও; সেখানে আল্লার গজব পড়ে না। কলেরা বসন্ত কালা জ্বরও হয় না। আর আমরা রোজ আল্লার পথে আজান দিই, নামাজ পড়ি, আমাদের ওপর গজব আসে কেন? একটা লোক না খেয়ে থাকলে ওই সব দেশের সরকারকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। আর আমার দেশের হাজার হাজার লাখ লাখ লোক দিনের পর দিন না খেয়ে পড়ে আছে, সরকারের কোনো কর্তব্য আছে বলে মনে হয় না। তাই আমাদের দেশের সরকার বন্যা এলেই বলে ‘আল্লার গজব’।”
এই যে হতভাগা দেশের মানুষÑ এ চিন্তা তাকে একদিকে পীড়িত, অন্যদিকেও উজ্জীবিত করেছে। পীড়িত এ কারণে যে, বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে এদের অজ্ঞতা। উজ্জীবিত এ কারণে যে, এসব মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। এসব ভাবনা থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে ‘সোনার বাংলা’ প্রত্যয়টি এবং সাতই মার্চের বক্তৃতায় প্রথম এসেছে মুক্তির কথা, তারপর স্বাধীনতার কথা। ১৯৭২ সালে দেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, মানুষ শোকাহত শুধু নয় ক্ষুধার্ত। তখন তিনি প্রথমে যে ‘কমিশন’ করলেন তা হলো শিক্ষা কমিশন। কারণ, শিক্ষা সংস্কৃতিই মানুষকে উন্নীত করতে পারে এবং সেটি একমাত্র শিক্ষা কমিশন, যা বলেছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাই যথার্থ শিক্ষা।
আজ এত বছর পর মনে হয়, আমরা ভুলটা কোথায় করছি? ভুলটা হচ্ছে, নিয়তিবাদকে আমরা প্রশ্রয় দিয়েছি। শিক্ষা সংস্কৃতি ছাড়া যে আসলেই মানসিক উন্নয়ন হয় না তার প্রমাণ কয়েক বছর আছে, সাঈদীকে চাঁদে দেখা এবং দাঙ্গা লুটপাট শুরু করা।
বঙ্গবন্ধু বারবার আক্ষেপ করেছেন একদল বাঙালির সব সময় বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। লিখেছেন তিনিÑ “বাংলাদেশ শুধু কিছু বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতকদের জন্যই সারাজীবন দুঃখভোগ করল।… ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত এই মাটির ছেলেদের ধরিয়ে দিয়ে ফাঁসি দিয়েছে এ দেশের লোকেরাইÑ সামান্য টাকা বা প্রমোশনের জন্য।… জানি না বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে এই সোনার দেশকে বাঁচানো যাবে কিনা!” [পৃ. ১১২]
না, যাবে না, যায়ওনি। ১৯৭১ সালে এই বাঙালিদের একাংশ যখন লড়ছে, তখন আরেক অংশ পাকিস্তানি সেনাদের নওল কিশোর হিসেবে থেকেছে ও মানুষ হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও বাঁচেন নি। সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ দেশে এখনো প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ পাকিস্তানে বিশ্বাস করে এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এ কারণে, আমার বারবার মনে হয়েছে, আমাদের নিশ্চয়ই জেনেটিক কোনো গ-গোল আছে। না হলে বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর একমাত্র দেশ হবে যেখানে স্বাধীনতার পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তির রাজনীতি করার অবাধ অধিকার।
জেলে বসে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বারবার মনে হয়েছে জাতির এই পরস্পর বিরোধিতার কথা। হ্যাঁ, তিনি ক্ষুব্ধ, বারবার তাই এ ধরনের মন্তব্য ফিরে ফিরে এসেছেÑ “জেলের মধ্যে বসে এ কথা চিন্তা করে লাভ কি? যার সারাটা শরীরে ঘা, তার আবার ব্যথা কিসের! গোলামের জাত গোলামি কর। আমি কারাগারে আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ‘আরামেই’ আছি। ভয় নাই। মাহমুদ আলি, জাকির হোসেন, মোনায়েম খান, আবদুস সবুর খান, মহম্মদ আলী এ রকম অনেকেই বাংলার মাটিতে পূর্বেই জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে।” [পৃ. ১৬৪]
তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য সত্য হয়েছে।
কারাগার ভরে উঠেছে ছয়দফার নেতাকর্মীদের নিয়ে। নেতাদের সবাই গ্রেপ্তার হয়েছেন আমেনা বেগম ছাড়া। স্বভাবতই নেতা শেখ মুজিব অস্থির। তিনি জেলারদের অনুরোধ করেন এসব বন্দিদের ন্যায্য সুবিধা দিতে। তারা আশ্বাস দেয়। কিছু করে না। তার অন্তর্দহন বাড়ছে। লিখছেনÑ “কারো সাথে আলাপ করার উপায় নাই। সান্ত¦না দেয়ারও কেউ নাই। কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে? অন্যান্য রাজবন্দিরা বিভিন্ন জায়গায় এক সাথে যাবে, কিন্তু আমাকে কারো কাছে দেয়া চলবে না। সরকারের হুকুম।… আমাদের দলের আর যাদের গ্রেপ্তার করে এনেছে তাদের সবচেয়ে খারাপ সেলে রাখা হয়েছে। এদের খাবার কষ্টও দিচ্ছে। মাত্র দেড় টাকার মধ্যে খেতে হবে।” [পৃ. ৭৮]
“আমি বই নিয়ে বসে পড়লাম। মনে করবেন না বই নিয়ে বসলেই লেখাপড়া করি। মাঝে মাঝে বইয়ের দিকে চেয়ে নাকি সত্য, মনে হবে কত মনোযোগ সহকারে পড়ছি। বোধহয় সেই মুহূর্তে আমার মন কোথাও কোনো অজানা অচেনা দেশে চলে গিয়েছে। নতুবা কোনো আপনজনের কথা মনে পড়েছে। নতুবা যার সাথে মনের মিল আছে, একজন আর একজনকে পছন্দ করি, তবুও দূরে থাকতে হয়, তার কথাও চিন্তা করে চলেছি। হয়তোবা দেশের অবস্থা, রাজনীতির অবস্থা, সহকর্মীদের উপর নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে ভাবতে ভাবতে চক্ষু দুটি আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে।” [পৃ. ১০৭]
যেমন চিত্তরঞ্জন সুতারের কথা ধরা যাক। বরিশাল জেলে ছিলেন, এখন ঢাকা জেলে। মিলিটারি কনফাইনমেন্ট। বঙ্গবন্ধু লিখছেনÑ “বরিশাল জেলে ছিলেন। মাসে অন্তত পক্ষে স্ত্রী ছেলের সাথে দেখা হতো। তা আর হবে না। কষ্ট দেও যত পার। আমাদের আপত্তি নাই। আমরা নীরবে সবই সহ্য করব ভবিষ্যৎ বংশধরদের আজাদীর জন্য। আমাদের যৌবনের উন্মাদনার দিনগুলি তো কারাগারেই কাটিয়ে দিলাম।” [পৃ. ১০৬]
ন্যাপ কর্মী আবদুল হালিমকে জেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। বিকেলে হাঁটছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই হালিমকে দেখতে পেলেন। “আমি এগিয়ে যেয়ে ওর মাথায় হাত দিলাম, খুবই জ্বর। বললাম, “হালিম তুমি যে দলই কর পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তোমার দান আছে। ১৯৪৯ সালে তুমি আমার সাথে আওয়ামী লীগ করেছ, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছ, তোমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হয় খবর দিও। লজ্জা করো না। তোমার ত্যাগকে আমি শ্রদ্ধা করি।” [পৃ. ১৪৪]
রণেশ মৈত্রের সঙ্গে দেখা। তার কুশল জিজ্ঞেস করতে বললেন, “কি আর খবর না খেয়েই [সন্তান-স্ত্রী] বোধহয় মারা যাবে। স্ত্রী ম্যাট্রিক পাস। কাজকর্ম কিছু একটা পেলে বাঁচতে পারত; কিন্তু উপায় কি! একে তো হিন্দু হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তারপর রাজবন্দি, কাজ কেউই দিবে না। একটা বাচ্চা আছে। বন্ধু-বান্ধব সাহায্য করে কিছু কিছু, তাতেই চালাইয়া নিতে হয়। গ্রামের বাড়িতে থাকার উপায় নাই। মৈত্র কথাগুলো হাসতে হাসতে বলছেন। মনে হলো তার মুখ দেখে এ হাসি বড় দুঃখের হাসি।” [পৃ. ১৫৭]
রণেশ মৈত্রের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল সেদিনই তিনি বলেছিলেন, “পাবনা যাবেন বোধ হয়। বন্ধু মোশতাককে পাবনায় জেলে নেয়া হয়েছিল। বোধ হয় সেখানেই আছে, কেমন আছে জানি না। তাকে খবর দিতে বলবেন।” [ঐ]
আরো একজনকে বলেছিলেন, ‘বন্ধু’ মোশতাকের খবর নিতে। অনেক বিষয়ে যার এত স্বচ্ছ দৃষ্টি, মোশতাকের বেলায়ই তার দৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল অস্বচ্ছ যার দাম তাকে প্রাণ দিয়ে দিতে হয়েছে।
এত কিছুর পরও তিনি প্রকৃতি উপভোগ করেন। তার বর্ণনাও রাখেন। এ গদ্য মনে হবে কবিতাÑ “দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে। রৌদ্র একটু উপরে উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভাল লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দুর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠছে। সবুজ ঘাসগুলো বাগানের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলো না তুললে গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরো কয়েকজনকে ডেকে আনি।” [পৃ. ১১৭]
মোরগ-মুরগি আর মুরগির বাচ্চাগুলো খেলা করে। ছোট কবুতরের বাচ্চাটাও ওদের সঙ্গে থাকে। কাক এলে মোরগ কাককে ধাওয়া করে আর এসব দেখে তার মনে হয়Ñ “এক সাথে থাকতে থাকতে একটা মহব্বত হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ অনেক সময় বন্ধুদের সাথে বেঈমানী করে। পশু কখনো বেঈমানী করে না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় পশুরাও বোধহয় মানুষের চেয়ে একদিক থেকে শ্রেষ্ঠ।” [পৃ. ১১৮]
মীর্জা নুরুল হুদা মন্ত্রী। তিনি এক ভাষণে ছয়দফার বিরুদ্ধে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য : “মন্ত্রিত্বের লোভে ভদ্রলোক এত নিচে নেমে গিয়েছেন যে একটা দলের বা লোকের দেশপ্রেমের উপর কটাক্ষবোধ করতেও দ্বিধা করলেন না।” [পৃ. ১২২]
যেসব আমলারা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছে তাদের সম্পর্কে মন্তব্য, “আমাদের দেশের এই শিক্ষিত চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আছে পদোন্নতির জন্য তারা কত যে সংসার ধ্বংস করেছে তার কি কোনো সীমা আছে?” [পৃ. ১২৭]
এ কথা যে এখনো কত সত্য তা কে না জানে।
বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন বারবার ঘুরে-ফিরে এসেছে আমলা এবং জেল কর্মচারীদের জুলুম, সরকারের নির্যাতন প্রভৃতি। তাঁর এই অভিজ্ঞতার নির্যাস ৭ মার্চের বক্তৃতায় খুঁজে পাওয়া যায়। ওই বক্তৃতার পটভূমি ছিল ২৫ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা।
বাঙালির প্রতি তিনি অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ১৯৭৫ সালেও করেছেন। আবার ক্ষণে ক্ষণে বাঙালির প্রতি মমত্ববোধেও আচ্ছন্ন হয়ে গেছেন। যে কারণে তিনি বলেছিলেন ১৯৭২ সালে, যেÑ আমার দুর্বলতা আমি বাঙালি ও দেশকে ভালোবাসি।
জেলের অত্যাচারে ত্যক্ত হয়ে লিখেছেনÑ “কি নিষ্ঠুর এই দুনিয়া! এরাই তো আমাদের ভাই, চাচা, প্রতিবেশী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায় হলে এদের বংশধররা সুযোগ-সুবিধা পাবে। এদেরকে বাদ দিয়ে তো কেউ অধিকার ভোগ করবে না। যারা মৃত্যুবরণ করল আর যারা পঙ্গু হয়ে কারাগারে এসেছে, জীবনভর কষ্ট করবে আমাদের সকলের জন্যই। কেন এই অত্যাচার? কেনইবা এই জুলুম।” [পৃ. ১৫২]
এ প্রশ্ন আমরা নিজেদেরও করি। ১৯৫২ সাল থেকে পর্যন্ত কতো মানুষ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাংলাদেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। নতুন সমাজ ব্যবস্থা নির্মাণের আশায় কতোজন বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, পঙ্গু হয়ে গেছেন পুলিশি হামলায়। কতো সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা আমাদের ইতিহাসের বিবরণে এদের কথা তেমনভাবে তুলে ধরি না। যে কারণে ইতিহাসটা আর সাধারণ মানুষের থাকে না।
আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন করেছি তখন এদের কথাই মনে রেখেছি এবং সাহস পেয়েছি। বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিল গরিবরা। আর বঙ্গবন্ধু গরিবদের কথা সব সময় বলে এসেছেন। মনে রেখেছেন, ১৯৭৫ পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতাগুলি পর্যালোচনা করুন, দেখবেন, সাধারণের অধিকারের কথাই বারবার এসেছে। এবং গরিবদের প্রতি অত্যাচার মাঝে মাঝে তাকে ক্রোধান্বিত করে তুলছে। ৮ জুলাই লিখেছেনÑ “মনকে শক্ত করতে আমার কিছু সময় লাগল। ভাবলাম সব সময় ক্ষমা করা উচিত না। ক্ষমা মহত্তের লক্ষণ, কিন্তু জালেমকে ক্ষমা করা দুর্বলতারই লক্ষণ।” [পৃ. ১৫২]
এ কথা তিনি বলছেন বটে। কিন্তু সারাজীবন ক্ষমাই করে এসেছেন। কেননা, তার আবার এও মনে হয়েছে, ক্ষমা মহত্তের লক্ষণ। ‘জালেম’দের প্রতি শৈথিল্য পরে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তার বুক এত বিশাল যে, দরদ ছাড়া অন্যকিছু ছিল গৌণ। তাঁর পরম শত্রুও স্বীকার করেছেন, তাঁর মতো উদার রাজনীতিবিদ বাংলাদেশে খুব কমই জন্মেছেন।
এরি মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্নো ক্ষমতাহীন হয়েছেন। এর কিছুদিন পরই আবির্ভাব হবে সুহার্তোর। ইন্দোনেশিয়া তখন প্রায়ই খবরের বিষয়। এ কারণে, ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাবলি তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। লিখেছেন ৬ জুলাইÑ “ইন্দোনেশিয়ার পিপলস কংগ্রেস আজ সুকর্নোকে আজীবন প্রেসিডেন্টের পদ হইতে অপসারিত করিয়েছে। তবে তিনি আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অন্যতম বিশাল রাষ্ট্রে আজ কমিউনিজম, লেনিনবাদ ও মার্ককবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের বাড়াবাড়ির জন্যই আজ ইন্দোনেশিয়া এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হইয়াছে। বাড়াবাড়ি করে ক্ষমতা দখল করতে যেয়েই এই অঘটন ঘটল, লাখ লাখ কম্যুনিষ্ট কর্মীদের জীবন দিতে হলো।… দুনিয়ার ডিকটেটরদের চোখ খুলে যাওয়া উচিত।…” [পৃ. ১৪৯]
এরপর সুহার্তো ক্ষমতা দখল করে সিআইয়ের সাহায্যে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যা চালায়। বঙ্গবন্ধুর তখন সুহার্তোও যে ডিকটেটর হয়ে উঠবেন তা মনে হয়নি। কারণ, সবকিছুই তিনি আইয়ুব খানের শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখেছেন। কিন্তু সুহার্তোর গণহত্যা পরবর্তীকালে নিশ্চয় তার মনে রেখাপাত করে এসেছে। হয়ত এ কারণেই তিনি বাংলাদেশে কম্যুনিষ্ট পার্টি ও ন্যাপের ঐক্য করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনতে চেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। ১৩ জুলাই লিখেছেনÑ “একই সমাধান একই সমাধান, গুলি করা। ভারতবর্ষে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাইয়া আটজনকে হত্যা করেছে। কয়েকশত লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। জনসাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বামপন্থী দলগুলির ডাকে প্রতিবাদ দিবস পালন করতে যেয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিল। শত শত কর্মী গ্রেপ্তার হলো। কংগ্রেস নেতারা সারাজীবন জেল খেটেছিলেন। গুলির আঘাত নিজেরাও সহ্য করেছেন। আজ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে তারা আবার জনগণের উপর গুলিবর্ষণ করতে একটুও কার্পণ্য করেন না। আমরা দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি। অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারাও চেয়ে কম নয়।” [পৃ. ১৫৯]
বঙ্গবন্ধু সরকারও কিন্তু একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ভিয়েতনামের পক্ষে মার্কিনবিরোধী এক মিছিল করেছিল। সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলেও গুলি চলে। দুইজন তরুণ নিহত হন। কদম ফোয়ারায় তাদের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিফলকও লাগানো হয়েছিল। আজ সেই স্মৃতিফলকও নেই। এটি এক ধরনের বৃত্ত। ক্ষমতায় না থাকার সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে গুলি। আবার রাস্তায় থেকে ক্ষমতায় গেলে, তখনও অন্যায় নীতির কারণে মিছিল হলে তাতে গুলি। এদিক থেকে অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন। জানি না এই বৃত্ত শেখ হাসিনার পক্ষে ভাঙা সম্ভব হবে কি না। যদি হয় তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে এবং তিনিও স্মরিত হবেন। [চলবে]

Category:

Leave a Reply