বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম

Posted on by 0 comment

PMমোহাম্মদ নাসিম: আমার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি হলোÑ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য অনুভব করা। এত বড় মহান নেতার স্নেহ ও সান্নিধ্য পাওয়া যে কোনো মানুষের জন্য গৌরবের। শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার, অনেকবার স্নেহ-আদর পাওয়ার। আমি যখন পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম তখনই বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল; আমাদের বাসায়। এরপর এতবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মহাপ্রাণ মহাপুরুষ। তিনি হাজার মানুষের মধ্যে একজনকে একবার দেখলেও পরবর্তীতে কয়েক বছর পর দেখা হলেও চিনতে পারতেন। তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। তিনি তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের তরুণ বা বৃদ্ধ যে-ই হোক, তাদের ডেকে কথা বলতেন। তিনি এমন নেতা ছিলেন পায়ে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর কঠিন পরিশ্রম করে বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকার কাদা-মাটি ঘেঁটে আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে তিনি সাহসিকতা দেখিয়ে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, আইয়ুবের সামরিক-বিরোধী আন্দোলন, ৬-দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা। সততার মূর্ত প্রতীক। একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এই মহামানবের সাথে অনেক ঘটনা বা স্মৃতিচারণা আছে। একটি কথা সব সময় স্মরণ করি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান মহামানব। ১৯৬৮-৬৯ সালে আমি পাবনায় ছাত্রলীগ নেতা থাকা অবস্থায় নকশালের কিছু সন্ত্রাসী আমাকে পাবনায় ছুরিকাঘাত করে। আমি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলাম, তখন বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে আমার পিতা মনসুর আলীর সাথে যোগাযোগ করেন। আমাকে বিমানযোগে ঈশ^রদী থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তখনকার সিটি নার্সিং হোমে (প্রখ্যাত ডা. টিএসএম-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত) ভর্তি করান। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, আমি যখন নার্সিং হোমে ভর্তি হলাম, তার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে তিনি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে আমাকে দেখতে আসেন। তার সাথে শহিদ তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি তখন শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আমি তখন অঝরে কাঁদছি। এর চেয়ে বড় কিছু জীবনে আর হতে পারে না। হাসপাতালে থাকাবস্থায় তিনি একাধিকবার আমাকে দেখতে এসেছেন। শেখ কামালকে দিয়ে ফলমূল ও খাবার পাঠিয়েছেন। সন্তানের মতো খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি তার কর্মীদের সমস্যার কোনো খবর পেলেই ছুটে যেতেন, সহায়তা করতেন; সে যে পর্যায়ের নেতাকর্মীই হোক-না-কেন।
১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি এবং আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী। একদিন আমার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তখনকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল) ভর্তি করি। তখন বাবাকে একটি অপারেশন করানো হয়। ভোরবেলা বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে আসেন এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন, আমাদের সাহস দেনÑ অপারেশন এখানে যতœসহকারে করা হবে। সে-সময়কার অনেক নেতাকর্মী, যারা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং অনেক সাধারণ মানুষ আছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর সাহায্য পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে সাহায্য পাননি এমন কোনো নেতাকর্মী নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন একজন সাহসী-সুদর্শন, ভরাট কণ্ঠের অধিকারী বাঙালি কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার শত্রু হলেও তাকে অস্বীকার করার শক্তি কারও ছিল না। শুধুমাত্র কয়েকজন বেইমান ছাড়া।
আমি শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে তার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তরুণ বয়স থেকেই ৩২ নম্বরে অনেকবার গিয়েছি। দুই পরিবারের একটি আত্মীয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সব সময় ছিল। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন, তিনি তার সহকর্মীদের শুধু রাজনৈতিকই নয়, সকলের পারিবারিকভাবে খোঁজখবর রাখতেন। বঙ্গমাতাও খোঁজখবর রাখতেন। সেই গুণটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাও পেয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন কর্মীদের খোঁজখবর রাখেন, দুর্দিনে পাশে থাকেন, তখন সেই নেতার জন্য সহকর্মীরা জীবন দিতেও পিছপা হয় না। সে-জন্যই ’৭৫-এ জাতীয় চার নেতা জীবন দিয়েছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানি করেন নি। আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধুকে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, মনে হতো আমাদের থেকেও তিনি তাকে বেশি ভালোবাসতেন। সন্তানদের থেকেও বঙ্গবন্ধুর সাথে একাত্ম ছিলেন তিনি। শত প্রতিকূলতা ও প্রলোভন সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গ ত্যাগের সামান্য চিন্তাও তাকে স্পর্শ করেনি কখনও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর আমার বাবাকে দেখেছি অঝর-ধারায় কেঁদেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেনÑ প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুনি মোশতাকরা সে-সুযোগ দেয়নি। জাতীয় চার নেতাকে কারাগারেই হত্যা করা হয়। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। সেই সুযোগ তারা পেলে এদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধু তত বেশি সমুজ্জ্বল থাকবেন বিশ^বাসীর কাছে। সাহস, ধৈর্য ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে কাছ থেকে দেখা, কাছে যাওয়া, আদর পাওয়া অথবা ধমক খাওয়াও হলো একজন কর্মীর জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম স্মৃতি এবং উপলব্ধি হলোÑ বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শেষ হওয়ার নয়। অনেক স্মৃতি রয়েছে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কাজ করি। তার কাছে আমাদের ঋণ স্মরণ করতে চাই। ১৫ আগস্টের শোকাবহ মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, ­­­আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক

Category:

Leave a Reply