বঙ্গবন্ধু : স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক

Posted on by 0 comment

8-1-2017 8-22-19 PMজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসে তার নিজের স্থানটি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। কথাটা দুভাবেই সত্য। Sheikh Mujib is the Product of the History and he has Oreated the History.. বাংলাভাষী পূর্ব বাংলার মানুষ ভোট দিয়ে পাকিস্তান এনেছিল। পাকিস্তানের প্রতি তাদের মোহ ছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই সেই মোহ ভাঙতে শুরু করে। তরুণ শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম জীবনে মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান।
কিন্তু এই মানুষটিই হয়ে উঠলেন ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নির্মাণের প্রাণপুরুষ। আঞ্চলিক বৈষম্য, মাতৃভাষার ওপর আঘাত, ফ্যাসিবাদী শাসন, গণতন্ত্রহীনতা সর্বোপরি বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শ্বেতাঙ্গদের মতো বর্ণবাদী ঘৃণা ও জাতিগত নিপীড়ন পূর্ব বাংলার মানুষের পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ৬-দফা ও স্বাধিকারের চেতনা বাঙালিদের মনে একটি নতুন জাতিচেতনার জন্ম দেয়। পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গ হলেও তারা কিন্তু অতীতে ফিরে যেতে, অর্থাৎ অখ- বাংলা বা ভারতে ফিরে যেতে চায় নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতীয় বাঙালিরা এথনিক দিক থেকে বাঙালিত্বের গৌরব বহন করলেও, তাদের রাষ্ট্রচেতনায় আছে ‘ভারতীয়তা’। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার বাঙালিদের মনে প্রোথিত করেন একইসঙ্গে জাতিত্ব ও জাতিরাষ্ট্রের চেতনা।
৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে বাংলাভাষী মানুষ তারা একটা জাতি হতে চেয়েছিল। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়।… যা আমাদের একত্রে ধরে, পরিণত করেছে এক জাতিতে, তা হচ্ছে আমাদের শুধু এই জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়ার ঐকান্তিক কামনা।” বাঙালির এই ঐকান্তিক কামনা বা ইচ্ছেকে দেশপ্রেমের জারক রসে ভিজিয়ে ‘আত্মপরিচয়’ প্রতিষ্ঠার গৌরবে উজ্জীবিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রফেসর রাজ্জাক আরও বলেছেন, “পৃথিবীর সেই ছোট্ট অংশটির প্রেমে তিনি বিহ্বল ছিলেনÑ যার নাম হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ধরনের ভালোবাসা বিপজ্জনক হতে পারে। বঙ্গবন্ধুই তার প্রমাণ। এ ধরনের আবিষ্ট বিহ্বল ভালোবাসা একজনকে অন্ধ করে তোলে, বিশেষ করে সেই ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়ার সময়।” বস্তুত ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি জাতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে বরিত হওয়ার পর ১৯৭১-এর মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর, গোটা মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুই হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ আশা-আকাক্সক্ষা, লড়াই-সংগ্রাম, আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতীক। তার শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, জাতীয় ঐক্যের একমাত্র চৌম্বুকক্ষেত্র, ভাবাদর্শগত শিক্ষক এবং নতুন জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক।
বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো ‘প্রতীক’ হয়ে ওঠা আরও অনেক নেতা ছিলেন। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় আন্দোলনের নেতা আহমেদ শোয়েকার্নো (সে দেশের মানুষ তাকে বাংকার্নো বা ভাই কার্নো হিসেবেও অভিহিত করত), কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা জোমো কেনিয়াত্তা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কঙ্গোর প্যাট্রিস লমুম্বা প্রমুখÑ প্রায় সবাই নিজ নিজ দেশবাসীর কাছে বিপুল জনপ্রিয় এবং জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদের কথা বাদই দিয়ে জিন্নাহ ও গান্ধী প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, “উভয়েরই (জিন্নাহ ও গান্ধী) কোটি কোটি ভক্ত। এসব জনতার কেউই গান্ধী বা জিন্নাহকে তাদের নিজেদের বলে ভাবতে পারত না। এটাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিন্নাহ বা গান্ধীর পার্থক্য। বঙ্গবন্ধু জাতি আর তার মধ্যে একটা অবিভাজ্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আমি তোমাদেরই লোক’ হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর মধ্যেই অভিব্যক্ত হয়েছে বাঙালির ‘জাতি হওয়ার আকাক্সক্ষা’, অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধ, ঐতিহ্য-চেতনা, স্বদেশানুরাগ এবং বাঙালি জাতির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস যেমন তাকে মরণজয়ী সংগ্রামে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করেছে, আবার এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাসই তাকে তার নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্লিপ্ত করেছে। এটা একটা আত্মঘাতী প্রবণতা। নিরাপত্তাহীন নিরস্ত্র বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যার সুযোগ করে দিয়েছে তার এই আত্মঘাতী অন্ধ দেশপ্রেম ও বাঙালির প্রতি প্রশ্নাতীত ভালোবাসা।
বাঙালির জাতি হয়ে ওঠার সাগ্নিক জনগণের ভেতর থেকে উত্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বেহিসাবী ভালোবাসা, অতুলনীয় আত্মত্যাগ, সাহস, প্রজ্ঞা এবং বাঙালির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের কারণে বরিত হয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। শোকাবহ আগস্টে এই অন্ধ প্রেমিক বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমগ্র জাতির সাথে আমাদেরও নমিত শ্রদ্ধা। জয় বঙ্গবন্ধু।

Category:

Leave a Reply