বর্ষায় বিকল্প পদ্ধতিতে সবজি চাষ

Posted on by 0 comment

51রাজিয়া সুলতানা: সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। ঋতু চক্রের আবর্তে নয়নাভিরাম দৃশ্য নিয়ে আগমন ঘটে বর্ষার। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে এই মনোরম দৃশ্য কখনও কখনও প্রান্তিক কৃষকদের চোখেও ঝরায় শ্রাবণের ঝরনা ধারা। কারণ এ সময় নেমে আসে আগাম বন্যা, সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি বর্ষা, উপকূলীয় এলাকার জলাবদ্ধতা, সাইক্লোন, অতি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্ষায় প্রকৃতিনির্ভর কৃষকগণ ফসল অনেক সময়ই যথানিয়মে ঘরে তুলতে পারেন না। আবার কখনও বা আবাদি জমি প্লাবিত হওয়ায় চাষাবাদই করতে পারেন না। ফলে অর্ধাহারে-অনাহারে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়। ফলে কৃষকদের চাষাবাদের জন্য বিকল্প ভাবনায় যেতে হয়।
পাশাপাশি বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতিবছর ২ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। ফসলের মাঠে গড়ে উঠছে শিল্প। আর শিল্পের জায়গায় হচ্ছে আবাসন। আবাসন হচ্ছে নাল জমিতেও। 52জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতভিটা তৈরি, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, যোগাযোগের জন্য রাস্তা ও শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের কারণে দেশে মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার অব্যাহত খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাই শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করা যাবে না। প্রয়োজন অব্যবহৃত উন্মুক্ত জায়গা ও পতিত স্থান শষ্য চাষের আওতায় আনা। এবং বর্ষাকালে প্রতিকূল পরিবেশে চাষাবাদ পদ্ধতিকে অভিযোজিত করা। আর এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে মাটিই লাগে না। এমনকি সার, বালাইনাশক, কোনো প্রকার হরমোনও ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এই প্রক্রিয়ায় পাওয়া যাবে সতেজ অর্গানিক শস্য। এই পদ্ধতির নামÑ ভাসমান চাষাবাদ বা হাইড্রোপনিক পদ্ধতি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় হাইড্রোপনিক একটি যুগোপযোগী উৎপাদন ব্যবস্থা। যার দ্বারা সহজে সতেজ বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যায়। এই পদ্ধতিতে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দীঘি ও উন্মুক্ত জলাশয় মৎস্য চাষের পাশাপাশি শস্য চাষ করা সম্ভব। বছরজুড়ে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার টেকসই বিকল্পও হতে পারে।
ভাসমান পদ্ধতিতে স্থানীয় কৃষকরা সম্মিলিত উদ্যোগে জমির পানিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কচুরিপানা, শ্যাওলা, দুলালীবন পচিয়ে সারি সারি কান্দি (আইল) তৈরি করে। পরে তার ওপর ফসল চাষ করেন। জলাভূমিতে প্রথমে কচুরিপানা এবং পর্যায়ক্রমে শ্যাওলা, কচুরিপানা ও দুলালীলতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে ২ ফুট পুরু ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়। ধাপে জৈব উপকরণ দ্রুত পচাতে ব্যবহার করা হয় সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সার। একেকটি ভাসমান ধাপ ৫০-৬০ মিটার দীর্ঘ ও দেড় মিটার প্রস্থে হয়। এই ধাপ চাষের উপযোগী করতে প্রায় সাত থেকে ১০ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। ভাসমান পদ্ধতিতে সরাসরি বীজ বপন সম্ভব হয় না। তাই প্রতিটি বীজের জন্য এক ধরনের আধার তৈরি করতে হয়। এর নাম দৌল্লা। এক মুঠো করে টেপাপানা (ছোট কচুরিপানা), দুলালীলতার মধ্যে নারিকেল ছোবড়ার গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় দৌল্লা। সাধারণত নারীরাই দৌল্লা তৈরি করে থাকেন। এই দৌল্লার মধ্যে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে মাচানে বা শুকনো জায়গায় রাখা হয়। এর আগে ভেজা জায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করা হয়। দৌল্লাগুলো এভাবে তিন থেকে সাত দিন সারি করে রাখা হয় এবং এরপর গজানো চারা ধাপে স্থানান্তর করা হয়। ধাপে স্থানান্তরের পাঁচ-ছয় দিন পর গজানো চারার পরিচর্যা শুরু হয়। এভাবে ভাসমান বা ধাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষকরা দুভাবে লাভবান হয়। প্রথমত; ২০ থেকে ২২ দিনের পূর্ণবয়স্ক চারা পাইকারি বাজারে বিক্রি করে এবং দ্বিতীয়ত; ভাসমান পদ্ধতি ব্যবহার করেই মাটিবিহীন অবস্থায় উৎপাদিত শাক-সবজি বাজারে বিক্রি করে।
ভাসমান পদ্ধতি ব্যবহার করে অত্যন্ত সার্থকভাবে লাউ, কুমড়া, করলা, ঝিঙে, শিম, বরবটি, পেঁপে, বেগুন, বাঁধাকপি, টমেটো ও শসা উৎপাদন করা যায়। আবার কখনও কখনও কৃষকরা পুরনো ধাপ কিনে এর ওপর কুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, টমেটো, লাউ, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক বা সাদাশাকের চাষ করে থাকেন। ইতোমধ্যে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ প্রক্রিয়া বরিশাল বিভাগ থেকে সিলেট, যশোর, মানিকগঞ্জ ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
শহরাঞ্চলেও মাটিবিহীন চাষাবাদ করা যায়। মাটির পরিবর্তে পানিতেই অবলীলায় জন্মানো যায় টমেটো, লেটুস, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, শসা, ক্ষীরা, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা, বেগুন, বামন শিম, তরমুজ এবং ঘাস জাতীয় ফসল ইত্যাদি। এই পদ্ধতিতে সারাবছর বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায়, খোলা জায়গায় পলি টানেল, টব, বালতি, জগ, বোতল, পাতিল, প্লাস্টিকের ট্রে, নেট হাউসে অনায়াসে সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদন করা যায়।
সাধারণত দুই উপায়ে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়Ñ সঞ্চালন পদ্ধতি এবং সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতি।
সঞ্চালন পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো যথাযথ মাত্রায় মিশ্রিত করে একটি ট্যাংকিতে নেওয়া হয়। এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ সঞ্চালন করে ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পাম্পের সাহায্যে এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে প্রথম বছর ট্রে, পাম্প এবং পাইপের আনুষঙ্গিক খরচ একটু বেশি হলেও পরবর্তী বছর থেকে শুধু রাসায়নিক খাদ্য উপাদানের খরচের প্রয়োজন হয়। ফলে দ্বিতীয় বছর থেকে খরচ অনেকাংশে কমে যায়। এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজিং লোহার ট্রের ওপর কর্কশিটের মধ্যে গাছের প্রয়োজনীয় দূরত্ব অনুসারে যেমনÑ লেটুস ২০ ী ২০ সেন্টিমিটার, টমেটো ৫০ ী ৪০ সেন্টিমিটার এবং স্ট্রবেরি ৩০ ী ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে গর্ত করতে হয়। উপযুক্ত বয়সের চারা স্পঞ্জসহ ওই গর্তে স্থাপন করতে হয়।
অন্যদিকে, সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে একটি ট্রেতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানগুলো পরিমিত মাত্রায় সরবরাহ করে সরাসরি ফসল চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে খাদ্য উপাদান সরবাহের জন্য কোনো পাম্প বা পানি সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে খাদ্য উপাদান মিশ্রিত দ্রবণ ও এর ওপর স্থাপিত কর্কশিটের মধ্যে ২-৩ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে এবং কর্কশিটের ওপরে ৪-৫টি ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে, যাতে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে এবং গাছ তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কর্কশিটের ফাঁকা জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারে। ফসলের প্রকারভেদে সাধারণত দু-তিনবার এই খাদ্য উপাদান ট্রেতে যোগ করতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সহজেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে প্লাস্টিকের বালতি, পানির বোতল, মাটির পাতিল ইত্যাদি ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায় সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করতে পারে। এতে খরচ তুলনামূলক অনেক কম হবে।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চারা উৎপাদনের জন্য যে স্পঞ্জ খ-টি ব্যবহার করা হয় তা সাধারণত ৩০ ী ৩০ সেন্টিমিটার সাইজের। এরপর ওই স্পঞ্জকে ২.৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২.৫ সেন্টিমিটার প্রস্থ বর্গাকারে, ডট ডট করে কেটে নিতে হয় এবং এর মাঝে ১ সেন্টিমিটার করে কেটে প্রতিটি বর্গাকারে স্পঞ্জের মধ্যে একটি করে বীজ বপন করতে হয়। যেসব সবজির বীজ অতি ছোট যেমন লেটুস, ফুলকপি, ইত্যাদি গুলোকে স্পঞ্জে বপনের পূর্বে অঙ্কুরোদগমের জন্য নি¤œলিখিত পদ্ধতিগুলোর একটি অনুসরণ করা হয়। পদ্ধতিগুলো হচ্ছেÑ ১. পেট্রিডিসে রেটিং পেপার দিয়ে তাতে বীজ ভিজিয়ে রাখা ২. ছোট ট্রেতে বালি নিয়ে তাতে বীজ বসানের পর ভিজিয়ে দেওয়া এবং ৩. নারিকেলের ছোবরা ভালোমতো গুঁড়া ও পরিষ্কার করার পর তা ছোট ট্রেতে নিয়ে তাতে বীজ বসানোর পর ভিজিয়ে দেওয়া।
অঙ্কুরোদগমের জন্য সেগুলোকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায়। মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় পানি দিতে হবে। বীজ বপনের আগে বীজকে ১০ শতাংশ ক্যালসিয়াম অথবা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হয়। বীজ বপনের পর স্পঞ্জকে একটি ছোট ট্রেতে রাখতে হয়। এই ট্রের মধ্যে পানি থাকবে ৫-৮ সেন্টিমিটার, যাতে স্পঞ্জটি পানিতে সহজেই ভাসতে পারে। চারা গজানোর দু-তিন দিন পর প্রাথমিক অবস্থায় ৫-১০ মিলিলিটার খাদ্যোপাদানে সংবলিত দ্রবণ একবার এবং চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর থেকে চারা রোপণের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ১০-২০ মিলিলিটার দ্রবণ দিতে হবে। এখন জানা দরকার খাদ্যোপাদানে সংবলিত দ্রবণটি আসলে কিসের মিশ্রণ। মিশ্রণটি হলোÑ প্রতি ১ হাজার লিটার পানির জন্য পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ২৭০ গ্রাম, পটাসিয়াম নাইট্রেট ৫৮০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম নাইট্রেট ১ হাজার গ্রাম, ম্যাগানেসিয়াম সালফেট ৫১০ গ্রাম, ইডিটিএ আয়রন ৮০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ৬.১০ গ্রাম, বরিক এসিড ১.৮০ গ্রাম, কপার সালফেট ০.৪০ গ্রাম, অ্যামনিয়াম মলিবটেড ০.৩৮ গ্রাম এবং জিংক সালফেট ০.৪৪ গ্রাম।
তবে জলীয় খাদ্য দ্রবণটি তৈরির সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে স্টোক সলিউসান তৈরি করতে হবে। এই স্টোক তৈরি করার সময় ক্যালসিয়াম নাইট্রেটকে পরিমাপ করে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দ্রবণকে স্টোক সলিউসান ‘এ’ নামে নামকরণ করতে হবে এবং অবশিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্যগুলোকে একসাথে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে স্টোক সলিউসান ‘বি’ নামে নামকরণ করতে হবে। ১ হাজার লিটার জলীয় দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে ১ হাজার লিটার পানি ট্যাংকে নিতে হবে। তারপর স্টোক সলিউসান ‘এ’ থেকে ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকের পানিতে ঢালতে হবে এবং একটি অধাতব দ-ের সাহায্যে নাড়াচাড়া করে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর স্টোক সলিউসান ‘বি’ থেকে আগের মতো ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকে নিতে হবে এবং আগের মতো অধাতব দ-ের সাহয্যে পানিতে স্টোক সলিউসানগুলো সমানভাবে মেশাতে হবে।
এ পদ্ধতিতে চারা রোপণের পর দ্রবণের পিএইচ (অম্ল) মাত্রা ৫.৮ থেকে ৬.৫-এর মধ্যে এবং ইসি (ক্ষার) মাত্রা ১.৫ থেকে ১.৯-এর মধ্যে রাখা দরকার। যদি পিএইচ-এর মাত্রা ৭.০-এর ওপরে হয় তবে আয়রন, ম্যাংগানিজ, মলিবডেনামসহ অন্যান্য মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে হাইড্রোক্লোরিক এসিড, অথবা ফসফরিক এসিড বা নাইট্রিক এসিড দিয়ে পিএইচ-কে কাক্সিক্ষত মাত্রায় রাখতে হবে। আবার পিএইচ যদি ৫.৮-এর নিচে নেমে যায় তবে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড অথবা পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড দিয়ে পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ইসি-এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে জলীয় দ্রবণে খাদ্য উপাদানের উপস্থিতির সাধারণ মাত্রা ইসি ১.৫-২.৫ ফং/স-এর মধ্যে রাখতে হবে। ইসি-এর মাত্রা যদি ২.৫ ফং/স-এর ওপরে চলে যায় সেক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি যোগ করতে হবে। ইসি যদি ১.৫ ফং/স-এর নিচে চলে যায় তবে খাদ্যদ্রবণ যোগ করে ইসির মাত্রা ১.৫-এর ওপর রাখতে হবে। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে পিএইচ ও ইসি মিটারের সাহায্যে পরীক্ষা করে পিএইচ এবং ইসি সমন্বয় করতে হবে। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে ওপর থেকে সুতা বা শক্ত রশি ঝুলিয়ে গাছ সোজা ও খাড়া রাখতে হয়। মনে রাখতে হবে, আকস্মিকভাবে জলীয় খাদ্য দ্রবণের পিএইচ এবং ইসি পরিবর্তন করা যাবে না। সাধারণত দ্রবণের তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে হওয়া দরকার। যদি দ্রবণের তাপমাত্রা বেড়ে যায় তবে শ্বসনের হার বেড়ে যায়, ফলে অক্সিজেনের চাহিদাও দারুণভাবে বাড়ে। ফলে দ্রবণের অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। সাধারণত দুপুরে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, কাজেই এ সময় তাপমাত্রা কমানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। চাষকৃত ফসলে বিভিন্ন পোকামাকড় আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এদের মধ্যে এফিড, লিফ মাইনার, থ্রিপস এবং মাকড় অন্যতম। প্রতিদিনের তদারকির মাধ্যমে এদের দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। তা ছাড়া অন্যান্য পরিচর্যা সাধারণ গাছের মতোই।
ভাসমান বা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ছোট এবং বড় পরিসরে স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিচ্ছন্নভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়। বাংলাদেশে এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো। আমাদের সংগ্রামী পূর্বপুরুষরা জীবিকার প্রয়োজনে তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে চাষের নানা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। অথচ এ জাতীয় হাইড্রোপনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ভবিষ্যতের চাষাবাদ পদ্ধতি হিসেবে এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। এটা আমাদের সমৃদ্ধ জাতিসত্তার প্রমাণ বহন করে। দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও পুষ্টি সমস্যা সমাধান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও রপ্তানিমুখী কৃষি পণ্য উৎপাদনে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের চাহিদামাফিক অত্যন্ত টেকসই একটি প্রযুক্তিই হলো ভাসমান বা হাইড্রোপনিক পদ্ধতি। চাইলে আপনিও চেষ্টা করতে পারেন।

Category:

Leave a Reply