বহুল প্রতীক্ষিত ট্রাম্প-কিম বৈঠক বিশ্ববাসীর স্বাগত

Posted on by 0 comment

7-4-2018 5-55-18 PMসাইদ আহমেদ বাবু: কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিল, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসানের পর অবশেষে গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় এই ঐতিহাসিক বৈঠক শুরু হয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা ও কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এটিই প্রথম বৈঠক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-দিনের শুরুটা হলো দুই নেতার ঐতিহাসিক করমর্দনের মাধ্যমে। দুই নেতা যখন পরস্পরের দিকে করর্মদনের জন্য এগিয়ে যায়, বিশ্ববাসী তখন অধীর আগ্রহে এই বিরল দৃশ্য অবলোকন করে।

এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা।
ট্রাম্প ও কিম শীর্ষ বৈঠকের পর একটি চুক্তিতে সই করেছেন যাতে বলা হয়েছে, দুদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। অন্যদিকে, কোরিয়া উপদ্বীপকে পরিপূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য উত্তর কোরিয়া এ চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছিল, যা উত্তর কেরিয়াকে ক্রমশ ক্ষুব্ধ করে তুলছিল। এ মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার ওপর সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হতো। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার অবসান ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘœ করতে ব্যয়বহুল ও খুবই উসকানিমূলক মহড়ার অবসান ঘটানো হবে।

এই সমঝোতাপত্রে আমেরিকা এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল হোটেল ক্যাপেলায় সেই একান্ত বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার বিশ্বাস, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে শিগগিরই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটা হবে বলে আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন কিম। তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে এখনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হচ্ছে না বলেই জানান। উত্তর কোরিয়ার সর্বাধিনায়ক কিম বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের এই প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। তারপরেও সমস্ত সংকট কাটিয়ে যে তারা আলোচনায় বসেছেন, তাতে তিনি খুশি। তাদের মধ্যে কথা হয়েছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে। দুই নেতার একান্ত বৈঠক শেষে দুদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। পারমাণবিক অস্ত্র থেকে শুরু করে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প ও কিম।

ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বেশ সুসংহত। এটি স্বাক্ষর করতে পেরে সম্মানিত বোধ করেছেন বলেও জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম বলেছেন, তারা একটি ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন ও অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৈঠককে সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।
চুক্তিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিম। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুনভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে, যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়া যুদ্ধবন্দিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দি চিহ্নিত হয়েছেন তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হবে।

উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেন, অবিশ্বাস্য একটি দেশ হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে তাদের। কিমের সঙ্গে আমার বৈঠক আন্তরিক, গঠনমূলক ও খোলামেলা ছিল। পরিবর্তন আসলেই সম্ভব। কিম এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মূল ঘাঁটি ধ্বংস শুরু করছেন। কিমের প্রশংসা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কিম খুবই প্রতিভাবান। তিনি খুব কম বয়সে একটি দেশের ক্ষমতায় এসেছেন এবং কঠোরভাবে দেশ পরিচালনা করেন। অপেক্ষাকৃত সংক্ষেপে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও কিমের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবন্দি মার্কিন সেনাসদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি এবং আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হব, তখন উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। আমি আসলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাই। তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া এই পদক্ষেপ নিতে চাই না।

দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকে কিমের সঙ্গে তার শীর্ষ পরামর্শকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেনÑ পিয়ংইয়ংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক কিম ওং কোল, উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ওং হো, কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান রি সু ওং। আর ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ জন কেলি।
তবে, শুরুও শুরু থাকে। সেই যুক্তিতে, আশায় বুক বাঁধাই বোধকরি এখন বিশ্বের কর্তব্য। ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং যে মুখোমুখি বসতে পারবে, কয়েক মাস আগে পর্যন্ত এটা নেহাত কল্পকথা ছিল। সেই অভাবিত ঘটনা যে শেষ পর্যন্ত ঘটল, কম কথা নয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সক্রিয় প্রচেষ্টা ছাড়া এটি সম্ভব হত না। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর সরকারের বিরাট কৃতিত্ব : দক্ষিণ-পূর্ব চীন সমুদ্র অঞ্চলে শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক স্থিতি বজায় রাখবার লক্ষ্যে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা। এমন অসাধারণ কূটনৈতিক প্রয়াস প্রমাণ করে, শুভ সংকল্পে কত কী হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে সাংবাদিকদের চার মিনিটের একটি ভিডিও দেখানো হয়। এটি খুবই অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। ভিডিওটি ছিল কোরীয় এবং ইংরেজি ভাষায়। সংবাদ সম্মেলনে মি. ট্রাম্প বলেছেন যে এই ভিডিওটি তিনি কিম জং-আনকে দেখিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সই হওয়া চুক্তি হয়তো আমেরিকা মানবে না, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ অনেক দেশের সঙ্গে আমেরিকা যা করেছে এক্ষেত্রেও তাই করতে পারে। ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন আমেরিকার খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল জোন্স। শেষ পর্যন্ত তার এই আশা বাস্তবায়িত হয় কি না, সে কথা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আপাতত কোরীয় উপদ্বীপে ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা কমেছে, পৃথিবীর সব মানুষই তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

Category:

Leave a Reply