বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতার স্বীকৃতি

Posted on by 0 comment

5

উত্তরণ প্রতিবেদক: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে একটি দরিদ্র ভূখ-ের আপামর জনসাধারণ বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর সেই সংগ্রামের মাসে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে যুক্ত হলো অনন্য এক অর্জন। স্বাধীনতা লাভের ৪৭ বছর পর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) শ্রেণি থেকে বের হওয়ার যোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে জাতিসংঘের বিবেচনায় উন্নয়নশীল দেশের পথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) গত ১৭ মার্চ বাংলাদেশের এ যোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। ১৮ মার্চ জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনকে এ বিষয়ে চিঠি দেয় সিডিপি। বাংলাদেশ সময় ১৬ মার্চ শুক্রবার সকালে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনের একটি সূত্র এ খবর নিশ্চিত করে।
বিকেলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে এক ঘোষণায় বাংলাদেশের এ যোগ্যতা অর্জনের তথ্য লক্ষ্য করা যায়। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশ হবে বাংলাদেশ। নতুন এ অভিযাত্রায় সুযোগের পাশাপাশি অনেক চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাণিজ্য ও বৈদেশিক ঋণে যেসব বাড়তি সুযোগ রয়েছে, তার সবকিছু থাকবে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মানুষের জীবনমানের ক্রমাগত উন্নতি করা সম্ভব।
এর আগে বহু দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্য বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাÑ এ ৩টি সূচকেই যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ, যা এর আগে অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ঘটেনি। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার ও লাওস এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। ভুটান, সাও তোমে ও প্রিনসিপে এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জ দ্বিতীয়বারের মতো যোগ্যতা অর্জন করায় তাদের এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে সিডিপি।
প্রতি তিন বছর অন্তর সিডিপি এলডিসি দেশগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করে। বাংলাদেশ ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার পর্যালোচনায় যোগ্য হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করবে ওই কমিটি। এর তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ২০১৫ সালের জুলাই মাসে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়। মাথাপিছু আয়ের বিবেচনায় এ শ্রেণিকরণ করে বিশ্বব্যাংক। জাতিসংঘ তার সদস্য দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত (এলডিসি), উন্নয়নশীল এবং উন্নতÑ এ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে এলডিসি।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যালোচনা করবে সিডিপি। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ উত্তরণকে অনুমোদন দেবে। বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন যেভাবে আছে, তার কোনো বড় ধরনের ব্যত্যয় না ঘটলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে।
উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার সুবিধা জানতে চাইলে জাহিদ হোসেন বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় মর্যাদার। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে তার একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। বাংলাদেশকে সবাই তখন আলাদাভাবে বিচার করবে। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা রয়েছে। চ্যালেঞ্জের বিষয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে বাণিজ্যে যে অগ্রাধিকার পায় তার সবটুকু পাবে না। আবার বৈদেশিক অনুদান, কম সুদের ঋণও কমে আসবে। বাংলাদেশ তার সক্ষমতা দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে।
যেসব মানদ- পর্যালোচনা হলো : জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) গত ১২ থেকে ১৬ মার্চ এলডিসি দেশগুলোর ওপর ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা বৈঠকে বসে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাÑ এ ৩টি সূচকের দুটিতে উত্তীর্ণ হলে কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে শুধু মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতেও কোনো দেশ যোগ্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের যে মানদ- রয়েছে ওই দেশের মাথাপিছু আয় তার দ্বিগুণ হতে হবে।
২০১৮ সালের পর্যালোচনায় এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা হিসেবে মাথাপিছু আয়ের মানদ- ১,২৩০ ডলার। বিশ্বব্যাংক প্রণীত অ্যাটলাস পদ্ধতির হিসাবে গত তিন বছরের গড় মাথাপিছু আয় ওই পরিমাণ হতে হবে। জানা গেছে, ওই পদ্ধতিতে গত তিন বছরে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১,২৭২ ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মাথাপিছু আয় আরও বেশি। বিবিএসের হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় ১,৬০৫ ডলার।
এবারের পর্যালোচনায় মানবসম্পদ সূচকে যোগ্যতা নিরূপণের জন্য স্কোর ধরা হয় ৬৬ বা তার বেশি। বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৮। মানবসম্পদ সূচকে ৫টি বিষয়ের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেয় সিডিপি। এগুলো হলোÑ পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মৃত্যুহার, মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির হার, অপুষ্টিতে থাকা জনসংখ্যার হার, বয়স্কদের সাক্ষরতার হার এবং মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার। শেষেরটি ২০১৮ সালের পর্যালোচনায় যুক্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে যোগ্য হওয়ার নির্ধারিত স্কোর ছিল ৩২ বা তার কম। বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২৫। এ সূচকে ৮টি বিষয় বিবেচনায় নেয় সিডিপি। এগুলো হলোÑ জনসংখ্যা, উপকূলীয় এলাকায় জনসংখ্যার অনুপাত, দুর্গম এলাকা, পণ্য ও সেবা রপ্তানিতে অস্থিতিশীলতা, রপ্তানি পণ্য কেন্দ্রীভূত হওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার জনসংখ্যা, জিডিপিতে কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতের অংশ এবং কৃষি উৎপাদনে অস্থিতিশীলতা।

এই সাফল্য জনগণের : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিকে জনগণের প্রতি উৎসর্গ করেছেন। দেশের এই উন্নয়ন, সাফল্য ও অগ্রযাত্রা ধরে রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই অগ্রযাত্রাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। এই অর্জন যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়, এই যাত্রাপথ যেন থেমে না যায়, আমি শুধু এটুকুই আবেদন করব দেশবাসীর কাছে। আমরা গর্বিত জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই। আমরা তো যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? অন্যের কাছে কেন হাত পেতে চলব? আমরা যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি সেটা তো আজ আমরা প্রমাণ করেছি।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণেই বলেছিলেন, বাংলার মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। এই অর্জন বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন তাদের সকলের এবং জনগণের। কাজেই আমি মনে করি বাংলাদেশের জনগণই হচ্ছে মূল শক্তি। তাদের আমি অভিনন্দন জানাই। আর জনগণই পারে সব রকম অর্জন করতে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই হবে শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মর্যাদা পাবে। সেটাই আমার কামনা।
গত ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রদত্ত সম্বর্ধনা এবং এ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ঢোলের বাদ্যে সূচনা হয় উৎসবের। সাত দিনের এই উৎসবের উদযাপন চলছে ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগান নিয়ে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ থেকে উত্তরণের সুপারিশপত্রের রেপ্লিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ফজিতা ম্যানুয়েল কাতুয়া ইউতাউ কমন, ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম বক্তব্য রাখেন। ইউএনডিপি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আসীম স্টেইনারের একটি লিখিত বার্তাও অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতিসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের শুভেচ্ছায় সিক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেই সম্মেলন কেন্দ্রে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। আলোচনা পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
দেশের এই উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের এই অর্জন করতে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এই অর্জনের কথাগুলো যত সহজে বলা হয়, তত সহজে কিন্তু আসেনি। অনেক চড়াই-উৎরাই যেমন পার হতে হয়েছে তেমনি গ্রেনেড হামলাসহ তার ওপর বারবার হত্যা চেষ্টাও করা হয়েছে বলেও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি রূপক অর্থে বলেন, অনেক পথের কাঁটা পায়ে বিঁধিয়েও এগিয়ে যেতে হয়েছে। বারবার আঘাত এসেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি সেই গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে বারবার মৃত্যুকে দেখেছি; কিন্তু ভয় পাইনি কখনও। যে দেশে তার বাবা-মা-ভাইদের হত্যাকা-ের বিচারের পথকে রুদ্ধ করার জন্য খুনিদের ইনডেমনিটি দেয়া হয়, তারা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, ভোট চুরি করে এমপি হয়, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হবারও সুযোগ পায়Ñ সেখানে তিনি ভয় কেন পাবেন, পাল্টা প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলে তাকে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান। আজ সেখান থেকে বাংলাদেশকে তার সরকার উন্নয়শীল দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও জাতির পিতা বেঁচে থাকলে স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের পর্যায়ে চলে যেতে পারত। আগামী ২৬ তারিখ আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পূর্ণ হবে, আমাদের তো অনেক দিন লেগে গেল।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি জানি না আমার বাবা আজ বাংলাদেশের মানুষের এই অর্জনগুলো তিনি পরপার থেকে দেখতে পাচ্ছেন কি না। নিশ্চয়ই বাংলাদেশের এই অর্জনে লাখো শহীদের আত্মার পাশাপাশি তার বাবার আত্মাও শান্তি পাবে। দেশের এই উন্নয়ন কি বেহেশত থেকে বঙ্গবন্ধু দেখতে পারেন? মাঝে কিছু সময় চুপ করে তাকিয়ে থাকেন উপরের দিকে। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এখানে আসার আগে আমার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গে কথা বলছিলাম। আব্বা (বঙ্গবন্ধু) যে চেয়েছিলেন, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। বাংলাদেশের মানুষ উন্নত জীবন পাবে। বাংলাদেশের মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে, আজকে সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। আমরা একটা একটা দুয়ার পেরিয়ে এগিয়ে গেছি।
পিতা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তার শেখা রাজনীতির মূল শিক্ষাই জনকল্যাণ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা বলেন, মানুষ নানা কারণে রাজনীতি করে। কেউ রাজনীতি করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য, নিজের সমৃদ্ধ জীবনের জন্য। আমি রাজনীতি শিখেছি বাবার কাছ থেকে, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন করতে। নিজের ভাগ্যোন্নয়ন করতে নয়। আর আমার কাছে ক্ষমতা মানেই হচ্ছে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা। নিজের জন্য নয়, নিজের ভোগ বিলাস নয়, জনগণ যাতে একটু ভালো থাকে, সুখে থাকে, সুন্দর জীবন পায়Ñ সেটাই আমার মূল লক্ষ্য। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নেই তার নিরন্তর পথ চলা। কাজেই যতটুকু অর্জন এর সব কৃতিত্বই বাংলার জনগণের। তিনি বলেন, এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেই দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই।
দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছ থেকে সাড়া না পেলে, তাদের সহযোগিতা না পেলে, তারা যদি ভোট দিয়ে নির্বাচিত না করত তাহলে তো ক্ষমতায়ও আসতে পারতাম না। এই উন্নয়নের ধারাটা যেন অব্যাহত থাকে সেটাই কামনা করে তিনি বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ, দেশকে যেন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্তভাবে গড়ে তুলতে পারি। আর ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করব। আর সেই সময়ে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় তা আমরা উদযাপন করতে পারব। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার মহাসংগ্রামে তিনি ততদিন বেঁচে থাকবেন কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও আজকের যারা নতুন প্রজন্ম, দেশকে তারাই এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকার একটি রিপোর্ট উল্লেখ করে পূর্ববাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক খাতে বৈষম্যের চিত্র এবং বাঙালির অধিকার আদায়ে জাতির পিতার আন্দোলন-সংগ্রাম ও কারা নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘জাতির পিতার আকাক্সক্ষা ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলার মানুষ অন্ন পাবে, বস্ত্র পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবেÑ এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। তাই বঙ্গবন্ধু সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন সাধারণ মানুষের ভাগ্য ফেরানোর জন্য।’
শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা জানেন ১৭ মার্চ ছিল জাতির পিতার ৯৮তম জন্মবার্ষিকী। ঐদিন আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই সুসংবাদটি পাই। জাতির পিতার জন্মদিনে আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে! ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক আমাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দেয়। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সনদ পেল। তিনি বলেন, এতদিন অনেকেই আমাদের গরিব বলে উপহাস করেছে। একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করেছে। কিন্তু আজকে আমরা তাদের কাতারে উঠে এসেছি। এ অর্জন আন্তর্জাতিকমহলে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আমাদের অবস্থান শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বল্পোন্নত বা গরিব বলে কেউ আর অবজ্ঞা করতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অ্যাডহক-ভিত্তিতে পরিকল্পনা না নিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ১০ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণেই বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্রাজুয়েশন হয়েছে। আমরা সরকারের থেকে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছি। আমার কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে আমাদের পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রত্যেকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, যারা কাজ করেন তারা কিন্তু সরকারের মনোভাবটা বুঝতে পারেন। আর সেটা বুঝেই তারা কাজ করেন। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। কাজেই সরকার যখন আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে তখন তারাও অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে বলেই আজকে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতিতে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা আর পরমুখাপেক্ষী নেই। শতকরা ৯০ ভাগ নিজেদের অর্থায়নে আমরা বাজেট করতে পারি। যে বাজেট অতীতের থেকে ৪ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ কাজগুলো সফলভাবে করার জন্য তিনি সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে সকল উন্নয়ন সহযোগী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর প্রতিও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সকলের সহযোগিতাতেই আজকে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সরকার আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে জানিয়ে বলেন, ২০৩১ সাল নয়, ২০২৪ সালের মধ্যেই দেশ থেকে আমরা দারিদ্র্য বিতাড়িত করব। যে কৃষক কঠোর পরিশ্রম করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন, যেসব মৎস্যজীবী চতুর্থ সর্বোচ্চ মিঠার পানির মাছ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে রূপান্তরিত করেছেন, যেসব প্রবাসী তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাঠিয়ে পঞ্চম সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়ের দেশে পরিণত করেছেন, যে লাখ লাখ গার্মেন্টকর্মীর পরিশ্রমে দেশ আজ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, বাংলাদেশের আজকের অবস্থানের জন্যও তারাও কৃতিত্বের দাবিদার।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি সম্বলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। এ সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার এবং ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার ম-ল উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এরপর একটি ৭০ টাকা মূল্যমানের স্মারক নোট অবমুক্ত করেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, অর্থপ্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবির এ সময় উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এমপি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল মালেক এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা বেগম কামরুন্নাহার প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি ফটো অ্যালবাম তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে পৃথক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গ্রাজুয়েশনে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেনÑ জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, এডিবি প্রেসিডেন্ট তাকেহিকে নাকাও, ইউএসএআইডি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মার্ক গ্রিন এবং জাইকার প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিতাওকা। এছাড়া দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের পক্ষ থেকেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভিডিও বার্তায় শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধা, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জেলে, খামারি, ছাত্রছাত্রী, দিনমজুর, তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্বাগত বক্তব্যের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
এরপরই দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে একে একে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছায় স্নাত করা হয়। প্রথমেই রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। মন্ত্রিসভার পক্ষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এমপি, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, ১৪ দলের পক্ষে কেন্দ্রীয় মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।
এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বাংলাদেশ পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, পেশাজীবী, নারী সংগঠন, এনজিও প্রতিনিধি, শিশু প্রতিনিধি, প্রতিবন্ধী প্রতিনিধি, শ্রমজীবী প্রতিনিধি এবং মেধাবী তরুণ সমাজের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দেওয়া হয়। দেশের ক্রীড়াবিদদের পক্ষে ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান ফুলের তোড়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পীসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনার ঘোষণার পর ঢোলের বাদ্যে সূচনা হয় উৎসবের। সাত দিনের এই উৎসবের উদযাপন চলছে ‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগানে।

Category:

Leave a Reply