বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারী

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMড. ইঞ্জিনিয়ার মাসুদা সিদ্দিক রোজী: পহেলা মে দিনটি পৃথিবীর অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা মে দিবস নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এ দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক আন্দোলন ও আত্মাহুতির এই দিন শ্রদ্ধার সাথে বিশ্বের প্রায় সব দেশে পালিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় দিবসটি পালন করা হয় না। আজকের এই লেখায় ১৮৮৬ সালে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে বলব। উনিশ শতকে কারখানা শ্রমিকরা সপ্তাহের ছয় দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রমই করত; কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগণ্য মজুরি। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যাধির আঘাতে মৃত্যুই ছিল নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে বলার মতো কেউ ছিল না তখন। ১৮০৭ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানায়; কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এই দাবি জোরাল করা যায় নি। এ সময় সমাজতন্ত্রের ধারণা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারেন। বণিক ও মালিক শ্রেণির এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠিত করেন Federation of Organized Trades and Laber Unions of the United States and Canada. ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন’স এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি ৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব পাস করে এবং মালিক ও বণিক আওতাধীন সফল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতিসংস্কারে উচ্চাকাক্সক্ষা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে; কিন্তু বণিক মালিক-শ্রেণির কোনো ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলামে একজন লিখেন, শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা ১৩ ঘণ্টাই করুক সে দাসই, যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থি দলও একাত্মতা জানায়। ১ মে’কে ঘিরে প্রতিবাদে-প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।
১ মে এগিয়ে এলে মালিক বণিক-শ্রেণি অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি তাদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে ১ মে মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নিতে পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহ্বায়নকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বাণিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১ মে সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রেস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল-মিটিং, ধর্মঘট বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছু মিলে ১ মে উত্তাল হয়ে ওঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোসট, আগস্ট, স্পিজ লই লিং-সহ আরও অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে আরও শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলকারী শ্রমিকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ। আন্দোলন চলতে থাকে। ৩ মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন। আগস্ট স্পিজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হন এবং ১১ জন আহত হন। পরে আরও ছয়জন মারা যান। পুলিশ বাহিনীও শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে, যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহিদ হন। পুলিশ হত্যা মামলা আগস্ট স্পিজ-সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং আগেই কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের ১৫ বছরের কারাদ- হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের আগে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কর্মকা-কে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে। পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের মতো তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য কমেনি। পুরুষের চেয়ে কম বেতন পাওয়া নারী শ্রমিক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। নারী শ্রমিক ২০০ টাকা কম পান পুরুষ শ্রমিক থেকে। পোশাক শ্রমিকদের নতুন কাঠামো তৈরির জন্য মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের আগেই শুরু হবে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি। সকাল সাড়ে ৫টায় ঘুম থেকে উঠে কর্মক্ষেত্রে যায়। আসে রাতে ৯-১০টা সময়। ৭ হাজার টাকা বেতন হলে ৩-৪ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকায় অনেক কষ্টে মাস কাটে। এভাবেই চলে তাদের মানবেতর জীবন। ন্যূনতম মজুরি তারা ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছে।
কুষ্টিয়ার খাজানগর জাঁতাকলে ১০ বছর ধরে কাজ করছেন কাঞ্চন বালা। তিনি জানেন না মে দিবস কী? শ্রম অধিকার কী? দেশের বৃহত্তম মোকামে কাজ করছেন ২০ হাজার শ্রমিক, বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে যা মজুরি পান তা দিয়ে কোনোরকমে চলে সংসার। সাপ্তাহিত ছুটিতেও বিরাম নেই, দিনের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়, ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কি নাÑ এসব প্রশ্ন অবান্তর। শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো দিবস মানা তাদের কাছে বিলাসিতার মতো। তিনবেলা খাবার জুটানোই বড় কথা। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদফতর কর্মকর্তারা চাতাল শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
সবাইকে নিয়ে সুখে থাকার আশায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য শত শত নারী শ্রমিক পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবে। তবে সেখানে যাওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার পাশাপাশি গৃহকর্তাদের নির্যাতনের মুখে অনেকে কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। অনেকেই আবার বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনসুলেটে গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩২ জন নারী শ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রতিদিন বাড়ছে এ সংখ্যা। এর আগে গত ২৯ মার্চ থেকে এক মাসে দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া ৫০২ জন নারী শ্রমিককে দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের শ্রম কাউন্সিলর সরোয়ার আলম। নতুন করে আশ্রয় নেওয়া ২০৯ নারীর মধ্যে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেটে রয়েছে ৭৮ জন, বাকি ২৫০ জন রয়েছেন রিয়াদ দূতাবাসে। এসব নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধভাবে শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশের দালালরা যে কাজের কথা বলে তাদের সৌদি আরবে এনেছে, সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের কাজ দেওয়া হয়নি। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন নারী বলেছে, তাদের কাউকে এসে হাসপাতালে নার্সের সহযোগিতা ও পিয়নের কথা বলা হলেও সেখানে যাওয়ার পর দেওয়া হয়েছে ক্লিনারের কাজ। আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশই মূলত গৃহকর্মী, ঠিকমতো বেতন পেতেন না।
সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে নারী শ্রমিকের নিরাপত্তার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে অভিবাসী নারীদের বাসায় না রেখে বিভিন্ন হোস্টেলে রাখা হবে। সেখান থেকে তারা কাজে যাতায়াত করবে, যার ফলে নারী অভিবাসীদের ওপর নির্যাতনের সম্ভাবনা কমে আসবে বলে মনে করছে বাংলাদেশের অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রামবো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, এর বেশি গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে সৌদি আরবে। এর বড় একটি অংশ নারী শ্রমিক। দেশে এখন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ব্যাপকাকারে নারী ঠিকা শ্রমিকরা কাজ করছে। এখানেও রয়েছে মজুরি বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী অধিকার ও মজুরি সাম্য প্রতিষ্ঠা এখনও চ্যালেঞ্জের বিষয়।

Category:

Leave a Reply