বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত

Posted on by 0 comment
57

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের প্রথম বাংলাদেশ সফর

বাংলাদেশ সরকার দুই রাষ্ট্র… প্যালেস্টাইন একটা রাষ্ট্র হবে, ইসরায়েল একটা রাষ্ট্র হবে; এই যে বহু আগে গৃহীত যে সিদ্ধান্ত, তার প্রতি পুনরায় সমর্থন ব্যক্ত করে।

রাজীব পারভেজ: প্রতিটি ফিলিস্তিনের চোখে বাংলাদেশ এক প্রিয় নাম। কারণ গোটা বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে দেশ ইসরায়েলকে তার পাসপোর্টে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এ কথা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিটি সদস্য জানে। এজন্য বাংলাদেশকে এরা সবাই যেমন একনামে চেনে, তেমনি প্রতিটি ফিলিস্তিনি গভীর ভালোবাসার টানে জীবনে একবার অন্তত বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে চায়। কিন্তু দখলদার ইসরায়েলের দমন-পীড়ন ও নানা বাধানিষেধ  ও বৈরিতার কারণে আপাতত সেই আশা পূরণ হওয়ার নয়।
মহান ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি সেখানে দেওয়া তার বিখ্যাত ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমার একহাতে জলপাইয়ে পাতা (শান্তি), অন্যহাতে ফিলিস্তিনের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ধারণ করে আছে। আমার হাত থেকে জলপাই পাতাটিই নিন।’ এর অর্থ হলো, ‘আমাকে অস্ত্র ধরতে বাধ্য করবেন না। এর পরেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশই পিএলও-কে স্বীকৃতি দেয়। আসলে আপনি ফিলিস্তিনকে সমর্থন করছেন মানে ন্যায়বিচারকে সমর্থন করছেন। যখন ইসরায়েলকে সমর্থন করছেন তখন শয়তানকে সমর্থন করছেন। এখন গোটা বিশ্বে এটি পরিষ্কার হয়ে গেল, কে শয়তান আর কে ফেরেস্তা। কার আধিকার কে হরণ করছে। কে দখলদার আর কে এর ভুক্তভোগী।’
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, ফিলিস্তিন বা প্যালেস্টাইন সরকারিভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্স শহরে নির্বাসনে ঘোষিত একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপাক্ষিকভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ১৯৮৮ ঘোষণার সময়ে কোনো অঞ্চলেই পিএলও’র নিয়ন্ত্রণ ছিল না, যদিও তারা যে অঞ্চলগুলো দাবি করেছিল আন্তর্জাতিকভাবে সেগুলো ইজরায়েলের দখলে ছিল। আরবরা দাবি করেছিল, ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ দ্বারা প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন বিভাগ যেভাবে প্রস্তাবিত হয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিন ভূখ- ছাড়াও ইসরায়েল শাসনাধীন অঞ্চলও ছিল এবং জেরুজালেমকে ঘোষিত রাষ্ট্রের রাজধানী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
গত ১ থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে আসা ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার পক্ষ থেকে সমর্থন অটুট থাকার কথা জানান। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনের নিন্দাও জানানো হয় বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ১৯৬৭ সালের মানচিত্র অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দিয়ে আসছে। কোনো স্বার্থের ভিত্তিতে নয়, সংবিধানে বলা আদর্শের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামে বাংলাদেশের এই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবেও বাংলাদেশ সমর্থন দিয়েছিল। সফরে শেখ হাসিনার সাথে মাহমুদ আব্বাসের একান্তে আলোচনার পর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়, যাতে দুই দেশের যৌথ কমিশন গঠনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
বাংলাদেশ সরকার দুই রাষ্ট্র… প্যালেস্টাইন একটা রাষ্ট্র হবে, ইসরায়েল একটা রাষ্ট্র হবে; এই যে বহু আগে গৃহীত যে সিদ্ধান্ত, তার প্রতি পুনরায় সমর্থন ব্যক্ত করে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য বাংলাদেশের যে ‘চিরন্তন’ সমর্থন আছে, তাও অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয় এবং নতুন করে সেটেলমেন্ট হওয়ার যে উদ্যোগ ইসরায়েল নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নিন্দা জানান। শেখ হাসিনা এর আগেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। কয়েক বছর আগে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের নেতা ইয়াসির আরাফাতের গভীর বন্ধুত্বের কথাও মাহমুদ আব্বাসের সাথে বৈঠকে স্মরণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইয়াসির আরাফাতের যে সমর্থন, তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও ইয়াসির আরাফাতের যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল, সে বিষয়টিও এবারকার বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
গাজায় বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার বাংলাদেশ
গত বছরে ফিলিস্তিন অধিকৃত গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বর্বরতা, হত্যাযজ্ঞ ও আগ্রাসনের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানায় বাংলাদেশ। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতা ও জীবননাশী সহিংসতার ঘটনায় বাংলাদেশ গভীরভাবে মর্মাহত হয়। বিমান হামলায় মর্মান্তিকভাবে বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের কঠোর নিন্দা জানিয়ে গাজায় বেসামরিক লোকজনের ওপর নৃশংসতা বন্ধে উভয়পক্ষকে সর্বোচ্চ সহনশীলতা প্রদর্শনের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। আরব অঞ্চলের শান্তি পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ অনুযায়ী ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে জাতিসংঘ গৃহীত প্রস্তাবনার সাথে বাংলাদেশ একমত পোষণ করে। এজন্য চলমান সমস্যা সমাধানে আগের মতো শান্তি প্রক্রিয়া পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে সংলাপে বসার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে ইসরায়েল কর্তৃক প্যালেস্টাইনি ভূমি দখল অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং রাজধানী পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র পাবে ফিলিস্তিনি জনগণ।
ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরোচিত অমানবিক, বীভৎস বিমান ও মর্টার হামলা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতিসংঘ কূটনীতিক তৎপরতা চালালেও তাতে তেমন কোনো অগ্রগতি না হওয়া বিশ্ব শান্তির জন্য এক অশনিসংকেত। তা ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিকমহলের আহ্বান উপেক্ষা করে এই হামলা অব্যাহত রাখার যে ঘোষণা ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান দিয়েছেন তা বিশ্বের শান্তি রক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অব্যাহত হামলার কারণে ফিলিস্তিনের গাজায় এখন মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। যা বিপন্ন মানবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে। ওই এলাকার জনগণ আরও হামলার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে খোলা জায়গায় অবস্থান করে মানবেতর ও আতঙ্কের মাঝে দিনাতিপাত করে। হাসপাতালগুলো লাশের সারি আর আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে। যা বিশ্ব বিবেককে তখন নাড়া দিয়েছে।
সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিবৃতি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ এবং বামপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শুরু করে, ডানপন্থি ইসলামি দলগুলো সবাই গাজায় ইসরায়েলি সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানায়। ‘গাজায় হত্যা বন্ধ কর’, ‘শিশু হত্যা বন্ধ কর’, ‘স্টপ কিলিং ইন গাজা’, ‘স্টপ কিলিং ইন চিলড্রেন’Ñ এসব প্লাকার্ড হাতে বাংলাদেশে এবং বিভিন্ন দেশের মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ স্লোগান দিয়ে শহরের রাস্তার পাশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এবং সরকার প্রথম থেকেই সর্বদা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণকে বাংলাদেশি সরকার ও জনগণ সবসময় সম্মানের চোখে দেখে।
১৯৮০-র দশকে ফিলিস্তিনের জন্য বাংলাদেশি যোদ্ধারা
১৯৮০-এর দশকে ফিলিস্তিনের হয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়ায়ে শরিক হতে স্বেচ্ছায় ছুটে গেছিল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে। তাদের এই অবদান ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে মোটেও নগণ্য নয়। অন্যায়-অবিচার, জুলুম-হত্যা আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দাঁড়িয়েছে ফিলিস্তিনের পাশে। তখনকার চরম গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের সাথে অস্ত্র হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়া থেকে শুরু করে অস্ত্র-রসদ বহন এমনকি পাহারার কাজও করেছিল এসব বাংলাদেশি যুবকরা। ইউএস লাইব্রেরি অব কংগ্রেস-এর তথ্যমতে, প্রায় ৮ হাজার বাংলাদেশি যুবক সে সময় প্যালেস্টাইনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সাথে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। অনেক তরুণ যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্যও যুদ্ধে অংশ নেন। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি সাহসী তরুণ প্রাণ শাহাদাৎবরণ করেন।

Category:

Leave a Reply