বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ৬৯ বছর : ইতিহাসের রেখাচিত্র

Posted on by 0 comment

june2018রায়হান কবির * ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন। আহ্বায়ক : নঈমউদ্দিন আহমদ। স্থান : ফজলুল হক হল।
*  ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট। শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার।
* ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পূর্ব বাংলা সফরে এসে জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা। ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ। এ বছর ১১ সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে আবার আটক করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
* ১৯৪৯ : টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শামসুল হকের জয় লাভ। মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী পরাজিত। মুসলিম লীগে ভাঙনের সূত্রপাত।
* ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। এপ্রিলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন।
* ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনে অবস্থিত হুমায়ূন সাহেবের বাসভবন রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত। ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ। প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। জেলে থাকা অবস্থায় এই দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন।
* ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের দুই বছর জেল হয়েছিল।
* ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন; কারাবন্দি শেখ মুজিবের নির্দেশনা। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ অগণিত আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে শহীদ।
* ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের যৌথ সম্মেলন। সম্মেলনে শর্তসাপেক্ষে দুই দল একীভূত হয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
* ১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।
* ১৯৫৩ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যুক্তফ্রন্টে অংশগ্রহণ ও ২১-দফা অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়।
* ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২১-দফা প্রণয়ন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী। ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ। ১৫ মে আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাতে ৩০ মে ৯২(ক) ধারা জারি এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত। তীব্র দমননীতি।
*  ১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। এই কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ।
*  ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যথাসময়ে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।
ক্স ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠন। ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন।
* ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দলে প্রকাশ্য মতবিরোধ। কাগমারী সম্মেলনের পর ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। অন্যদিকে ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার শাবিস্তান হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। এই কাউন্সিলে ভাসানীর পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু গৃহীত হয় না। দল থেকে পদত্যাগ করলেও কাউন্সিল ভাসানীকেই সভাপতি করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
*  ১৯৫৭ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। শেখ মুজিবসহ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার। ২৭ অক্টোবর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার অপসারণ, জেনারেল আইউব খানের ক্ষমতা দখল।
*  ১৯৫৯ সালের ৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ। গোপনে সহকর্মীদের কাছে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন শেখ মুজিব।
*  ষাটের দশকের শুরুতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ছাত্রলীগ নেতাদের গোপন নিউক্লিয়াস গঠন। শেখ মুজিবের অনুমোদন।
* ১৯৬১ রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগ। রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।
*  ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগ নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি। সামরিক শাসন শিথিল। ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো আলাদাভাবে পুনরুজ্জীবিত না করার সিদ্ধান্ত। ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে ওঠে।
*  ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর পর এনডিএফ কার্যকারিতা হারায়। ১৯৬৪ সালের ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা। এই সভায় দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত। পুনরুজ্জীবিত দলে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন। এনডিএফ-পন্থি নেতাদের আওয়ামী লীগ ত্যাগ।
* ১৯৬৪ সালের ৬, ৭ ও ৮ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
*  ১৯৬৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-বিরোধী আন্দোলন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত ১৬ জানুয়ারি ১৯৬৪ ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ এবং দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে একই শিরোনামে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়Ñ যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।
*  ১৯৬৪ সালে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি বা সম্মিলিত বিরোধী দলÑ ‘কপ’ গঠন। আইউব খানের বিরুদ্ধে মহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে ‘কপ’-এর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন। প্রতিনিধি পদে নির্বাচনে কপ প্রার্থীদের জয় লাভ; কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে পরোক্ষ নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয়। সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি জোরদার।
*  ১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আলোকে ১১-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১১-দফা দাবি কার্যত ভবিষ্যৎ ৬-দফা দাবিরই ভিত্তি রচনা করে।
*  ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ। পূর্ববাংলা অরক্ষিত ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন।
*  ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। ৬-দফা বিরোধিতা করে মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের আওয়ামী লীগ ত্যাগ।
* ১৯৬৬ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে ৬-দফা অনুমোদন। আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। সারা বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমানের ঝটিকা সফর। একাধিকবার গ্রেফতার, মুক্তি আবার গ্রেফতার।
* ১৯৬৬ সালের ৮ মে আইউব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে জামিন অযোগ্য নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে। একই সাথে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদসহ সারাদেশে বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার।  ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। সর্বাত্মক হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। পাশবিক হিং¯্রতা নিয়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হরতালে ঢাকার রাজপথ শ্রমিক-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়। শ্রমিক মনু মিয়াসহ কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন।
*  ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল অধিবেশন হয়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নয়; বরং দলকে চাঙ্গা রাখার জন্যই এই কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল। কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে ৬-দফায় প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
*  ১৯৬৭ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে একটি নতুন কমিটি গঠিত।
*  ১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দুদিনব্যাপী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
*  ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব গং’ তথা আগরতলা মামলা দায়ের। শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর। বিচার শুরু।
*  আইউব-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ ৬-দফা ভিত্তিক ১১-দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে। সংগ্রাম পরিষদে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), এনএসএফ-এর একাংশ এবং ডাকসু।
* ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ১১-দফা দাবিতে ছাত্র-গণ-আন্দোলনের শুরু। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান। গণজাগরণের ব্যাপকতা। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রভৃতি বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকে ছাত্রসমাজের হাতে। ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্তভাবে কারাগার থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিলাভ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত।
* ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইউবের পতন। ইয়াহিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ এবং পুনরায় মার্শাল ল’ জারি।
*  ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
*  সামরিক শাসনের মধ্যেই পাকিস্তানে নির্বাচনের ঘোষণা। এলএফও জারি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ১৯৭০ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু নির্বাচনকে ৬-দফার পক্ষে ‘গণভোট’ বলে ঘোষণা করেন।
*  ১৯৭০ সালের ৪ ও ৫ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে ১ হাজার ১৩৮ কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই কাউন্সিলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৬-দফা আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
* ১৯৭০ সালের ৬ জুন হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং এই কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
* ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আওয়ামী লীগের জয়লাভ। ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮৭টি আসনে জয়লাভ। সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনও পায় আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি অর্জন। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত।
* ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি বিশাল জনসভায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথবাক্য পাঠ করান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
* ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া কর্তৃক অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদসভা স্থগিত ঘোষণা। প্রতিবাদে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই ১-দফা দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন।
* ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ, পল্টনের জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা বাংলাদেশে পাঁচ দিনব্যাপী হরতাল পালন।
*  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা।
* বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রশাসন হাতে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনা করে নির্দেশাবলী প্রণয়ন করেন এবং তা বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করেন।
*  ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব বাংলার সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। এদিন সর্বত্র মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়তে থাকে স্বাধীন সোনার বাংলার নতুন পতাকা। বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন।
* ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা ভেঙে যায়। ওই দিন রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শুরু। সারাদেশে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ।
*  ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইপিআরের ওয়্যারলেস মারফত গোপনে ওই ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।
*  ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক সভায় মিলিত হন। বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ। তারা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন দেন এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। বঙ্গবন্ধু সর্বাধিনায়ক।
*  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননকে ‘মুজিবনগর’ (অস্থায়ী রাজধানী) ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত। জাতীয় সংগীত হিসেবে প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়।
*  ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর কাছে ৯৩ হাজার পাকবাহিনীর সদস্যের আত্মসমর্পণ। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মুজিবনগর সরকার সদস্যদের ঢাকায় আগমন এবং দায়িত্ব গ্রহণ।
*  ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
* ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। শুরু হয় যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন।
*  ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান।
*১৯৭৪ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ দলের কর্মকর্তা পদে থাকতে পারবেন না বিধায় বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। সৃষ্টি হয় গণতন্ত্র চর্চায় নতুন ঐতিহ্য।
*  ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’।
*  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একটি বিচ্ছিন্ন অংশকে নিয়ে খুনি মোশতাক-রশিদ-ফারুক চক্রের অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা। পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।
*  খুনি মোশতাক স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি, সামরিক আইন জারি, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি।
ক্স ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত]

Category:

Leave a Reply