বাংলাদেশ কে সৃষ্টি করেছেন?

Posted on by 0 comment

PMf আনিসুল হক: “সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। ভাবতে হবে আমাকে যেন মানুষ মনে রাখবে। কিন্তু মানুষ কেন মনে রাখবে, সেটি ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবাই তাঁকে মনে রেখেছে। এভাবেই সবাইকে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে।”Ñ কথাটা ঢাকায় এক ভাষণে বলেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম (প্রথম আলো ডট কম, ১৭ অক্টোবর ২০১৪)।
প্রতিটা জিনিসেরই একজন নির্মাতা থাকেন। এই চেয়ারটা কে বানিয়েছেন, এই টেবিলটা কে বানিয়েছেন, বলে দেওয়া যাবে। তেমনি যদি প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কে নির্মাণ করেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তো তাকে বলা হয়, জাতির জনক।
এ ধারণাটা নিয়ে আমি একটা ছড়া রচনা করেছি :

ফেইসবুকটা কে বানাল, বলতে পারো,
জানলে পরে উত্তরটা জলদি সারো
সবাই পারে, জবাব আসে দু-চার লাখ,
ফেইসবুকটা বানিয়েছেন জুকারবার্গ।

বলো তো কারা করল বিমান আবিষ্কার,
জবাব আসে, সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার,
রাইট ব্রাদার্স রাইট ব্রাদার্স দুজন ভাই।
কে আছে যার এই জবাবটা জানাই নাই?

বাংলাদেশটা কে বানাল বলো দেখি
সবাই জানে সবাই মানে জবাব একই
সূর্য তারায় উত্তরটা দহমান
শিরায় শিরায় জবাব নিত্য বহমান
স্বাধীনতার মানের সঙ্গে সহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমার্থক। ‘যারা ভোর এনেছিল’ কিংবা ‘উষার দুয়ারে’Ñ ইতিহাসভিত্তিক এই উপন্যাসগুলো লিখতে গিয়ে আমাকে ইতিহাসের অলিগলি রাজপথ পরিক্রম করতে হয়েছে। ইতিহাস যতই পড়েছি, ততই এই প্রত্যয় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশটাকে তিনি স্বাধীন করবেন বলে। তিনি তার সারাটা জীবন একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছেন, এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি। এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে তিনি বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তিনি ও আর তার পরিবার অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট-যাতনা ভোগ করেছেন; কিন্তু তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি, তিনি আমাদের স্বাধীন করে গেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি কখন দেখতে শুরু করেন?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের ভাষায়, “সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।” (অন্নদাশংকর রায়, ইতিহাসের মহানায়ক, প্রকাশক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২০১১)।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিল, পাকিস্তান আর ভারতÑ দুটো দেশ জন্ম নিল। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজ-উদ-দৌলা হলে যুবক শেখ মুজিব ডাকলেন তার ঘনিষ্ঠ ছাত্র-যুবা কর্মীদের। বললেন, “স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। এবার আমাদের যেতে হবে বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে। এই স্বাধীনতা স্বাধীনতাই নয়।”
বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭-এ পূর্ববাংলায় ফিরেই মুসলিম লীগ সরকার ও পশ্চিমাদের বাঙালি-বিরোধী অন্যায় PMf2আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলের নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি কারাবরণ করেন।
তার নেতা সোহরাওয়ার্দীও তাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মেনে নিতে; কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকেই গ্রহণ করতে। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, “শেখ মুজিবুর রহমান ডিজঅ্যাপ্রুভড দি সাজেশন অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী টু গিভ রিজিওনাল স্ট্যাটাস অব বেঙ্গলি। শেখ মুজিবুর রহমান রিসিভড দি সাজেশনস অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী থ্রু এ লেটার। অন্য কর্মীরাও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে একমত হলো না।” (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জীবন ও রাজনীতি, সম্পাদক : মোনায়েম সরকার)।
শেখ মুজিবের পেছনে গোয়েন্দারা ছায়ার মতো লেগে থাকত। তিনি কখন কী করতেন, সেই ’৪৮-’৪৯ সাল থেকেই তার সম্পর্কে রিপোর্ট করা হতো সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে। তাকে গ্রেফতার করা হতো। গ্রেফতারের পরই তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। তাকে জামিনের জন্য কোর্টে নেওয়া হলে সেখানেও ভিড় জমে যেত। তিনি সেই জনতার উদ্দেশ্যে আবার বক্তৃতা করতে শুরু করতেন মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে। ১৪ মার্চ ১৯৫১-এ শেখ মুজিবের গতিবিধি সম্পর্কে সরকারি নথিতে বলা হচ্ছে, “গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে গোপালগঞ্জ কোর্ট থেকে ১৪ মার্চ জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক ছাত্র মিছিল সহকারে তাকে নিয়ে বের হয়ে আসে ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবুর রহমান সভায় ভাষণ দেন। তিনি মওলানা ভাসানীসহ অন্যদের বিনাবিচারে আটক রাখার বিরুদ্ধে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। মুজিবুর রহমানকে সেদিনই গ্রেফতার করা হয়।… পরের দিন তাঁর মুক্তির দাবিতে গোপালগঞ্জে হরতাল পালিত হয়। স্থানীয় ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ও ফ্রান্স কর্তৃক মরক্কোর ওপরে নিপীড়নের প্রতিবাদে মিছিল করে। মিছিল শেষে সভায় শেখ মুুজিবের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।” (ইংরেজি থেকে অনুবাদ লেখকের) এই ছিল ওই সময়কার নিত্য চিত্র। শেখ মুজিব জেল-জুলুমকে পরোয়া করতেন না। সাহস, দেশপ্রেম আর আপসহীনতা ছিল তার রক্তের কণায়।
সরকারি গোয়েন্দারা তার মুচলেকা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, তিনি কখনও মুচলেকা দিতেন না, বলতেন, সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ তিনি করেই যাবেন। এখন সেই গোয়েন্দাদের সরকারি রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, তারা বলতেন, এই বন্দীর অবস্থান খুব শক্ত। তাকে টলানো যায় না।
১৯৫১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে খুলনা কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের রিপোর্ট দিচ্ছেন জনৈক গোয়েন্দা ২৬ ফেব্রুয়ারিতে, “হি ওয়াজ নট উইলিং টু এক্সিকিউট এনি বন্ড ফর রিলিজ ইভেন ইফ দি ডিটেনশন উড কজ হিম টু ফেস ডেথ। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ।” এই বাক্যগুলো খেয়াল করুন, যদি তার অন্তরীণ থাকাটা তার মৃত্যুও ডেকে আনে, তবু তিনি কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করবেন না। তার মনোভাব ছিল ভীষণ অনড়। যতবার যতজন গোয়েন্দা তার কাছে বন্ড স্বাক্ষর করাতে গেছেন, ততবার তারা একই মনোভাবের পরিচয় পেয়েছেন, একই কথা লিখেছেন। ২২ মে-র গোয়েন্দা রিপোর্টেও বলা হচ্ছে, “তিনি (মুজিব) তাঁর অতীতের রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে মোটেও অনুতপ্ত নন, বরং তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তাঁর মুক্তির পর একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাবেন। কী করবেন, সে-কথা জানাতে তিনি অনিচ্ছুক। মুক্তি পেতে তিনি খুবই আগ্রহী; কিন্তু মুক্তির জন্য কোনো বন্ডে তিনি সই না করার ব্যাপারে স্থিরচিত্ত। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ… তাঁর মনোভাব খুবই অনড়।”
শেখ মুজিব বারবার জেলে যেতেন, তাকে এক জেল থেকে আরেক জেলে বদলি করা হতো, জামিন নিয়ে বেরোনোর সময় কারাগারের ফটকে লোক জমে যেত, তিনি সেখানেই আবার সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করতেন, আবার তাকে জেলে পোরা হতো। কিন্তু তাকে দমানো যেত না।
তিনি তো কারাগারে। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে বেগম মুজিব ভাসতেন অকূল পাথারে। এমনও হয়েছে, আগের দিন শেখ মুজিব মন্ত্রী, কেন্দ্রের এক ঘোষণায় সরকারের পতন হয়ে গেছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সরকারি বাসা ছেড়ে দিতে হচ্ছে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেগম মুজিব পথে পথে ঘুরছেন, কেউ তাদের বাসা ভাড়া দিতেও সাহস পাচ্ছে না। বেগম মুজিবের অপরিসীম সাহস আর আত্মত্যাগের কাহিনি লিখতে গেলে পুরো একটা বই লিখতে হবে।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় কারাগারে বঙ্গবন্ধু অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। তাকে কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছিল না। তার হার্ট দুর্বল ছিল, জীবনহানির আশঙ্কা দেখা দিল। শেষে সরকার তার প্রতিজ্ঞার কাছে নতি স্বীকার করল। তিনি মুক্তি পেলেন। টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন। সে-সময়ের একটা ঘটনা তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেনÑ
“একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও রাসেল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকে। রাসেল চেয়ে থাকে। একসময় রাসেল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ রাসেল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে ঝুলে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন ও আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।”
এই ছিল বাস্তবতা। শেখ মুজিব লড়ছেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, তাই তাকে জীবনের অনেকটা সময় কাটাতে হচ্ছে কারাগারে, তার ছেলে তাকে ভাবছে আপার আব্বা। শেখ মুজিব যদি তার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে দেখতেন, বেগম মুজিব যদি তার পরিবারের সুখ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন যে কোনো সাধারণ নারীর মতো, তাহলে এই দেশটা এত সহজে স্বাধীন হতো না। বঙ্গবন্ধু নিজের প্রাণের ভয়ে কোনো দিনও ভীত ছিলেন না। ওই ১৯৫১ সালে কারাগারে জেরা করতে আসা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে তিনি যে কথা বলেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা-ই ছিল তার মূলমন্ত্র, যদি মৃত্যু আসে আসুক, তবু বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে কোনো আপস নয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার ফাঁসি হতে পারত, ওই সময় বন্দিশালায় তাকে গুলি করে মারার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তার নিজের ভাষায় “আমি দুই দুইবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। প্রথমবার আইয়ুব খানের বন্দিশালায়। ষড়যন্ত্রের মামলায়। আমার এক সাথী আমাকে সতর্ক করে দেয় যে সন্ধ্যাবেলা সেলের বাইরে গিয়ে নিয়মিত বেড়ানোর ব্যাপারটি বিপজ্জনক। পেছন থেকে গুলি করবে আর বলবে পালিয়ে যাচ্ছিল বলে গুলি করেছি। অন্যের বেলা ঘটেও ছিল ওরকম গুলি চালনা। দ্বিতীয়বার ইয়াহিয়া খানের কারাগারে। আমার সামনেই আমার কবর খোঁড়া হচ্ছে। বুঝতে পারছি যে আমার সময় ঘনিয়ে আসছে।” (অন্নদাশংকর রায়)।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে এভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। একাত্তর সালে যখন পাকিস্তানের কারাগারে তাকে আটকে রাখা হয়েছে, তখন তার মৃত্যুদ- স্থির হয়ে গিয়েছিল, তার জন্য সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। সামান্য আপস বাংলাদেশের মুক্তির পথকে বাঁকা আর দুর্গম করে তুলতে পারত। তা তিনি করেন নি।
অন্যদিকে আছেন বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। কী অসাধারণ এক নারীই না পেয়েছিলাম আমরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে! যার কথা ইতিহাসে আসে না। কারণ, নারী ও পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ আর অবদানের কথা থেকে যায় ইতিহাসের অন্তরালে। আমাদের ইতিহাসের দুটো খুব মাহেন্দ্রক্ষণে বেগম মুজিব নীরবে আমাদের ইতিহাসের গতি-প্রকৃতিকে ইতিবাচকভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একটা হলো ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময়। শেখ মুজিব তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। ওই সময় একটা গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছিল। সারাদেশে প্রচ- আন্দোলন হচ্ছে। আর এই সময় শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে যাবেন আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠক করতে! বেগম মুজিব তাড়াতাড়ি ডেকে পাঠালেন বড় মেয়ে হাসিনাকে। শেখ হাসিনার হাতে চিরকুট দিলেন। শেখ হাসিনাও সেই চিরকুটের বার্তাটা মুখস্থ করে নিলেনÑ যদি প্রহরীরা চিরকুট কেড়ে নেয়! বেগম মুজিবের বার্তাটা ছিল, সারাদেশের মানুষ তোমার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত, খবরদার তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না। যদি তুমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আস, আমি তোমার বিরুদ্ধে পল্টনে সভা করব। (শেখ হাসিনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা, মঞ্জুরুল ইসলাম, সময় প্রকাশনী)।
সেই বার্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ছাত্রী শেখ হাসিনা পৌঁছে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব সেদিন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গবন্ধু হিসেবে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এসেছিলেন।
একাত্তরের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় যোগ দিতে যাবেন বঙ্গবন্ধু। তিনি খুব অস্থির। একদিকে ছাত্র-জনতার প্রচ- চাপ, আজই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে। অন্যদিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে ওই ভাষণটির দিকে। আমরা আজ জানি, এমনকি আমেরিকার কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার ক্ষমতাকেন্দ্রও নির্ঘুম অপেক্ষা করছিল শেখ মুজিব কী বলেন তা জানার জন্য। ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স যদি আসে, তার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি মিলিটারি। এই অবস্থায় কী করবেন বঙ্গবন্ধু! নিজের ঘরে তিনি পায়চারি করছেন। বেগম মুজিব তাকে বললেন, তুমি এত অস্থির কেন। শুয়ে খানিকক্ষণ রেস্ট নাও। মুজিব শুয়ে পড়লেন। তাঁর মাথার কাছে মোড়া নিয়ে বসা শেখ হাসিনা, পায়ের কাছে বেগম মুজিব। বেগম মুজিব বললেন, তুমি তোমার নিজের বিবেকের কথা বলবা। তোমার সামনে লক্ষ মানুষের হাতে বাঁশের লাঠি, পেছনে বন্দুক। তুমি তা-ই বলবা, যা তোমার অন্তর বলতে চায়। শেখ মুজিব খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে উঠলেন। যাওয়ার আগে বেগম মুজিবের কপালে চুম্বন করলেন। খানিকটা দেরি করেই তিনি পৌঁছালেন সভামঞ্চে। মানুষ তখন অধীরভাবে প্রতীক্ষা করছে, নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, ‘কখন আসবে কবি?’
‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
… গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এত ত্যাগ, এত বীরত্ব, এত ভালোবাসা, এত প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষটি আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন! ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার ওই রাতে তিনি সাংবাদিক আতাউস সামাদকে বলেছিলেন, “আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডেপেন্ডেন্স, নাউ প্রিজার্ভ ইট।” (আজকের কাগজ, ২২.০১.৯৩)। আমাকে আতাউস সামাদ একাধিকবার বলেছেন, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, “আমি ইউডিআই দিচ্ছি (ইউনিলিটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্স বা স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণা)। আমি তোদের স্বাধীনতা দিয়ে গেলাম, যা তোরা রক্ষা কর।”
ইথারে ছড়িয়ে পড়ল সেই ঘোষণা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
১৯৭২ সালে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিগ্যেস করেছিলেন, “আজ এই মুহূর্তে অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সব চাইতে সুখী করেছিল?”
বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।”
ফ্রস্ট : আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন?
শেখ মুজিব : সমগ্র জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।
ফ্রস্ট : এমন দিনের স্বপ্ন আপনি কবে থেকে দেখতে শুরু করেন?
শেখ মুজিব : বহুদিন ধরে আমি এই স্বপ্ন দেখে আসছি।
তাকে হত্যা করার জন্য বারবার সব আয়োজন সম্পন্ন করেও পাকিস্তানিরা তাকে মারতে পারেনি! ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন, আমি শেষ কাজটা করে নিই, শেখ মুজিবের মৃত্যুদ-টা কার্যকর করি।
সেই মৃত্যুদ- সেদিন কার্যকর হয়নি। হয়েছে আরও চার বছর পরে।
আর তার প্রাণ কেড়ে নেবে বাঙালিরা, এটা বঙ্গবন্ধু কোনোদিনও ভাবতে পারেন নি। তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে, এসব তথ্য বিভিন্নভাবে তার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল, এমনকি ভারতীয়রাও এই তথ্য জানাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল। আমেরিকার অবমুক্ত নথি থেকে আমরা আজ তা জানি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিদের বিশ্বাস করতেন নিজের চেয়েও বেশি। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না, আর এটা তাকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব ছিল যে, কোনো বাঙালি তাকে আঘাত করতে পারে। তিনি বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি তার দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসেন। আর তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তিনি দেশের মানুষকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসা আর বিশ্বাস তার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যা করেছে যারা, তাদের ভাষা ছিল বাংলা, তাদের হাতে ছিল গরিব বাঙালির রক্ত পানি করা টাকায় কেনা অস্ত্র। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, শুধু বেগম মুজিব নন, শিশুপুত্র রাসেল, গর্ভবতী পুত্রবধূও রেহাই পায়নি সেই হত্যাকা-ের রাতে!
জাতির জনককে হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকেই পেছনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলো। তার নাম মুছে দেবার চেষ্টা হলো নানাভাবে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন তিনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির জাতির জনক। বিবিসি বাংলার জরিপে যে উঠে এসেছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, তা যথার্থÑ কারণ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তিনিই বাঙালিকে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।
আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কথা দুটো সমার্থক হয়ে উঠেছে।

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

Category:

Leave a Reply