বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী: ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর লক্ষ্য পানে

30মুফরাত রাহিন: ‘মারো কেন? বাবুকে নালিশ দিবো কিন্তু!’Ñ কথাটি বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রখ্যাত ‘মতিচূর’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। কথাটি তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিলেন লেখিকা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এভাবে মার খাওয়া যদি প্রতিরোধ না করা হয় তবে মার খেয়েই যেতে হবে।
বাংলার বাঘ বলে খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যখন ছোটবেলা নদীতে সাঁতার কাটতে যেতেন, তখন উনার মা চিন্তিত থাকতেন আর মানা করতেন নদীতে নামতে, তাতে কুমির আছে বলে। সে সময় ফজলুল হক বলতেন, ‘মা আমরা যদি নদীতে না নামি, তাহলে কুমির তাড়াবো কি করে?’ কুমির তাড়ানো বলতে সে সময়ের দখলদার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে প্রত্যেক জাতি নিজেদের অধিকার, ন্যায্য দাবি আদায় এবং তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে এসেছে। যুদ্ধ মানব সভ্যতার সাথেই জড়িত।
বাংলাদেশ। একটি স্বপ্নের নাম। কোটি কোটি বাঙালির স্বপ্নের দেশ। বিশ্বে বাঙালি জাতির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বীর বাঙালি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু উনার দূরদৃষ্টিতে বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। তাই দেশ রক্ষায় গঠন করেন সশস্ত্র বাহিনী এবং এর উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। মিসর থেকে নিয়ে আসেন ৪৪টি ট্যাংক, সংগ্রহ করেন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ প্রভৃতি। বাহিনীর সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করেন উন্নত প্রশিক্ষণের।
কিন্তু ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর থেমে যায় সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা। পিছিয়ে পড়ে উন্নয়ন।
১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা, গণতন্ত্রের মানস কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বাবার মতোই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী। তিনিও গুরুত্ব দিলেন সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে। শুরু হলো বাহিনীর অগ্রযাত্রা। একে একে সংগ্রহ করে দিলেন ফ্রিগেট, মিগ-২৯ এর মতো অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামাদি।
কিন্তু দেশ রক্ষার উন্নয়নের কারণে শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন তিনি। আবারও থেমে গেল সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা ২০০১ থেকে। চুরির মহাউৎসবে মেতে উঠল ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রের সরকার। দেশ রক্ষার তাগিদে জনগণের টাকায় কেনা মিগ-২৯ গোপনে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভরতে চাইল। শত্রুতাবশত নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ডিকমিশিং করে বসিয়ে রাখল।
২০০৮ সালে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ভূমিধস বিজয় নিয়ে ফিরে এলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে। উনার শক্তিশালী সাহসী নেতৃত্বে আবার পুরোদমে শুরু হলো সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন। তিনি প্রণয়ন করলেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’।
‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হয়ে উঠছে দক্ষ, চৌকষ, আধুনিক শক্তিশালী মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী।
নি¤েœ ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর কিছু দিক তুলে ধরা হলোÑ
ফোর্সেস গোল ২০৩০ (ঋড়ৎপবং এড়ধষ ২০৩০) হলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রদান। পরিকল্পনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর জোর দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ক্রয় তালিকা
ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ২০১০ সাল থেকে ক্রয়কৃত সমরাস্ত্রের তালিকাÑ

সেনাবাহিনী
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে নোরা বি-৫২কে২ এসপিএইচ; ৪৪টি এমবিটি ২০০০ ট্যাংক; ১৮টি নোরা বি-৫২ স্বয়ংক্রিয় কামান; ৩৬টি ডব্লিউএস-২২ মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেম; ৬৩৫টি বিটিআর-৮০ এপিসি; ২২টি অটোকার কোবরা এলএভি; ২ রেজিমেন্ট এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; কিউডব্লিউ-২ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; এফএন-৬ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯কে১১৫-২ মেতিস-এম; মেতিস-এম ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; পিফ-৯৮ ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট; এসএলসি-২ ওয়েপন লোকেটিং রাডার; দুটি ইউরোকপ্টার এএস৩৬৫ ডাউফিন হেলিকপ্টার; ৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; একটি সি-২৯৫ডব্লিউ পরিবহন বিমান; ৩৬টি ব্রামোর সি৪আই মনুষ্যবিহীন আকাশযান; ১০০টি ট্রাই শার্ক স্পিডবোট; একটি টাইপ সি কমান্ড ভেসেল।

নৌ-বাহিনী
দুটি টাইপ ০৩৫জি ডুবোজাহাজ; দুটি টাইপ ০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট; দুটি হ্যামিল্টন ক্লাস ফ্রিগেট; ৪টি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; ৫টি পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; একটি তেলবাহী ট্যাংকার; দুটি ডরনিয়ার ডিও-২২৮এনজি মেরিটাইম টহল বিমান; দুটি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার।

বিমান বাহিনী
১৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান; ১৬টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান; ৯টি কে-৮ প্রশিক্ষণ বিমান; ১১টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান; ৩টি এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান; ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার; ৫ ব্যাটারি এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; জেএইচ-১৬ রাডার; জেওয়াই-১১বি রাডার; ওয়াইএলসি-২ রাডার; ওয়াইএলসি-৬ রাডার; সেলেক্স আরএটি-৩১ডি রাডার।
সাংগঠনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
সেনাবাহিনী : সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারে ১০ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; পদ্মাসেতুর পাশে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা; পদাতিক বাহিনীকে ব্যালাস্টিক হেলমেট, কেভলার বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, নাইট ভিশন গগলস, আই প্রোটেক্টিভ গিয়ার, জিপিএস ডিভাইস, উন্নত যোগাযোগ যন্ত্র ও বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল দ্বারা সজ্জিত করা।
নৌ-বাহিনী : নৌবাহিনীর উড্ডয়ন শাখা প্রতিষ্ঠা; নৌবাহিনীর ডুবোজাহাজ শাখা প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারের পেকুয়ায় বানৌজা শেখ হাসিনা নামক ডুবোজাহাজ ঘাঁটি স্থাপন।
বিমান বাহিনী : ঢাকায় বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটি স্থাপন; কক্সবাজারে বিমান ঘাঁটি স্থাপন; বিমান বাহিনীতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র শাখা প্রতিষ্ঠা।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প : বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা; বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুতকরণ; বিডি-০৮ লাইট মেশিন গান প্রস্তুতকরণ; গ্রেন-৮৪ বিডি গ্রেনেড তৈরি; কামান ও মর্টারের শেল তৈরি; ৬০ মিমি ও ৮২মিমি মর্টার; এফএন-১৬ ঈগল ম্যানপ্যাড।
বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি : অরুনিমা বলীয়ান ট্রাক সংযোজন; খুলনা শিপইয়ার্ড; পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ জাহাজ নির্মাণ।
নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড : ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; স্পিডবোট নির্মাণ; আনন্দ শিপইয়ার্ড; তেলবাহী জাহাজ নির্মাণ; বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিকাল সেন্টার সম্পাদনা; এফ-৭ যুদ্ধবিমানের ওভারহোলিং; এমআই-১৭ হেলিকপ্টার।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সেনাবাহিনী : সেনাবাহিনীকে উত্তর, দক্ষিণ ও কেন্দ্রীয় কোরে ভাগ করা; পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পদাতিক ডিভিশন স্থাপন; কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে রিভারাইন ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড স্থাপন; দুই রেজিমেন্ট ট্যাংক ক্রয়; দূরপাল্লার ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়।
নৌ-বাহিনী : দুটি ফ্রিগেট ক্রয়; ৬টি টাইপ-০৫৬ কর্ভেট ক্রয়; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল ক্রয়; পটুয়াখালীতে বানৌজা শেরে বাংলা নামক সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি স্থাপন; দুটি ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি সামুদ্রিক টহল বিমান ক্রয়।
বিমান বাহিনী : এক ব্যাটারি মধ্যম পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়; মনুষ্যবিহীন আকাশযান ক্রয়; ৮টি মাল্টিরোল কম্ব্যাট এয়ারক্রাফট ক্রয়; এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১১৯ হেলিকপ্টার ক্রয়। [তথ্য সূত্র : ফোর্সেস গোল-২০৩০, উইকিপিডিয়া]
উল্লেখ্য হচ্ছে, ঐতিহ্য অনুযায়ী কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনীই তাদের পরিকল্পনার সব প্রকাশ করে না। মূল পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশই প্রকাশ করে আর সিংহভাগ গোপন রাখে। অর্থাৎ বলা যায়, উপরে উল্লিখিত পরিকল্পনা থেকে আরও কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী, দক্ষ, চৌকষ, মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ধারার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই প্রয়োজন।

Category:

Leave a Reply