বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও বিশ্বায়নে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment

june2018গোলাম কুদ্দুছ: বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। আর এই জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি হলো আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন পুরনো ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’-এ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম দিয়ে সংগঠনটি জন্মলাভ করে। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। কৌশল এড়িয়ে সরাসরি অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে ধারণ করল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্র। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে আমাদের সংস্কৃতির উপাদান নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। মনে রাখতে হবে, জাতিরাষ্ট্রের কাঠামো রাজনৈতিক কিন্তু ভিত্তিটা হলো সংস্কৃতিÑ যার সূত্রপাত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
আলোচ্য নিবন্ধে আলোকপাত করতে চাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা, বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার আওয়ামী লীগ কি ভূমিকা পালন করেছে। সরকারের ভেতরে-বাইরে সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখছে আওয়ামী লীগ।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার সংগ্রাম
যে কোনো জাতির সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো তার ভাষা। ভাষার অধিকার কেড়ে নেয়া গেলে সে জাতি আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। প্রতিবাদের ভাষা থেকে যায় অজ্ঞাত। মূক ও বধির সম সে জাতিকে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করা যায় সহজেই। পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা নির্ধারিত হবার আগেই যখন উর্দু ও ইংরেজিকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ব্যবহার করা শুরু হলো মূলত তখনই বাঙালিরও ঘুম ভাঙতে শুরু করে। আর এ ঘুম ভাঙাতে গিয়ে ১৯৪৭ সালের ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় যুব সম্মেলন, আর ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে জন্ম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এ দুটি সংগঠন গড়ে তোলায় মূল ভূমিকা পালন করেন ছাত্র ও যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ‘বাংলা’র প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। প্রতিবাদে ২ মার্চ শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। এই সংগঠনের আহ্বানে ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় প্রথম সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১১ মার্চ ধর্মঘট সফল করতে গিয়ে যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৬৩ জন নেতাকর্মী কারারুদ্ধ হন। ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ৮-দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হলে কারাবন্দিরা মুক্তিলাভ করেন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক সাধারণ ছাত্রসভায় ৮-দফার চুক্তিনামায় ৩টি সংশোধনী এনে তা বাস্তবায়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজীমুদ্দীনের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। উক্ত ছাত্রসভার সভাপতি এবং একমাত্র বক্তা ছিলেন আপসহীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।
মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের অনুসারীরা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে এম দাস লেনস্থ ‘রোজ গার্ডেন’-এ এক প্রতিনিধি সম্মেলনে মিলিত হয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করেন। সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কারারুদ্ধ যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এই সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবাবলীতে ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ’কে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনেও আওয়ামী লীগ এবং এর নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি মিলনায়তনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ছাত্র, যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের এক সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এবং এর সমমনা সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের দিক-নির্দেশনা এবং আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে বন্দী মুক্তির দাবিতে ‘আমরণ অনশন’ পালন ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূণ।
৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সকল কমিটি এবং দেশবাসীকে যথাযথ মর্যাদায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানান।
১৯৫৩ সালে ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহের অলকা সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে ৪২ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়। ইশতেহারের ৮ম দফায় ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা’ এবং ১৬-দফায় ‘২২ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় ছুটির দিবস ঘোষণা করা’র প্রস্তাব গৃহীত হয়।
১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর অনেক আলাপ-আলোচনার পর হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ২১-দফায় ছিল ভাষা সংক্রান্ত। ১নং দফায় বলা হয়েছে ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হইবে।’
১৭নং দফায় বলা হয়Ñ “বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে যাঁহারা মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার গুলিতে শহিদ হইয়াছেন তাঁহাদের পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ ঘটনাস্থলে একটি শহিদ মিনার নির্মাণ করা হইবে এবং তাহাদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে।”
১৮নং দফায় বলা হয়েছেÑ “২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস ঘোষণা করিয়া উহাকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হইবে।”
১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। এরপর দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র সম্পর্কে আর কোনো দ্বিধা থাকল না।

বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা
১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে ইতোপূর্বে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’কে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করার একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এ সঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির সদস্যরা হলেনÑ
১. ড. কুদরাত-ই-খুদা ২. ড. কাজী মোতাহার হোসেন ৩. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ৪. ড. এনামুল হক ৫. খান বাহাদুর আব্দুর রহমান ও মুহম্মদ বরকতুল্লাহ, ডেপুটি সেক্রেটারি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
যুক্তফ্রন্ট সরকারের এ সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়নের পূর্বেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল সংবিধানের ৯২-ক ধারা প্রয়োগ করে ৩০ মে ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল করে কেন্দ্রের শাসন জারি করে। এর ফলে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ৩ জুন ১৯৫৫ কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রত্যাহার করে এবং ৬ জুন আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের দ্বিতীয়বারের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ আবার শুরু হয়। ২৬ নভেম্বর ১৯৫৫ যুক্তফ্রন্ট সরকার ‘বাংলা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকার শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহম্মদ বরকতুল্লাহ-কে প্রস্তাবিত বাংলা একাডেমির স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করেন এবং একই সাথে আরও ৯ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দান করা হয়।
যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসের বটতলায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। ড. মুহম্মদ এনামুল হক বাংলা একাডেমির প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগ এবং ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যদি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত না হতো তবে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব হতো না।

শহিদ মিনার নির্মাণ
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারীদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে পূর্ববঙ্গ সরকারের পূর্তমন্ত্রী আবদুস সালাম খান ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে, শহিদ বরকতের নিহত হবার স্থানের পাশেই একটি শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য স্থান বাছাই করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ দৈনিক সংবাদ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘নতুন খবর’ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ১৯৫৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় পূর্ববঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি ও যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নির্ধারিত স্থানে শহিদ মিনার নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঐ বছরেরই ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের শরিক দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সরকার পূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এ. জব্বারকে শহিদ মিনার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করে। এ সময় সরকার শহিদ মিনারের নকশা নির্মাণের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা ছিলেন, গ্রিক স্থপতি ভক্সিয়াডেস, শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও প্রধান প্রকৌশলী এ. জব্বার। কমিটি ইংল্যান্ড ফেরত শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশাকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করে। হামিদুর রহমানের এই নকশার ভিত্তিতেই ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় এবং ১৯৫৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই শহিদ মিনারের ভিত, মঞ্চ এবং ৩টি স্তম্ভ নির্মাণের কাজ করা হয়। এ ছাড়াও শহিদ মিনারের জন্য হামিদুর রহমান হাজার বর্গফুটের একটি ‘মুর‌্যাল’ এবং শিল্পী নভেরা আহমেদের ৩টি ভাস্কর্যের কাজও ঐ সময়ে শেষ করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগ সরকারকে হটিয়ে সামরিক শাসক ক্ষমতা দখল করলে আপাতত শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আজম খানের উদ্যোগে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা অনুযায়ী শহিদ মিনারের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত হয়। ১৯৬৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নবনির্মিত এই শহিদ মিনারের উদ্বোধন করেন, শহিদ বরকতের মাতা হাসিনা বেগম।
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনকারী ছাত্রদের দ্বারা বরকতের নিহত হবার স্থানে অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদ মিনার নির্মিত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল বেলা তা উদ্বোধন হওয়ার পর ঐদিনই নুরুল আমিন সরকার তা ভেঙে ফেলে।

সর্বস্তরের বাংলা ভাষা চালু
আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনসমূহ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা তার যথাযোগ্য মর্যাদা পায়নি সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়ে।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। গণতান্ত্রিক বিধিবিধান অনুযায়ী তিনিই তখন পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। সে সময়ে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘একুশের স্মরণ সপ্তাহ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন প্রসঙ্গে বলেন,
“বুদ্ধিজীবীরা পরিভাষা দিন আর না দিন, আওয়ামী লীগ যেদিন রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করিবে সেই দিন হইতেই সরকারি অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হইবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করবো নাÑ তা হইলে সর্বক্ষেত্রে কোনোদিনই বাংলা চালু করা সম্ভব হইবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু ভুল হইবে কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।”
[সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১]
বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে তুলে ধরায় বঙ্গবন্ধুর প্রয়াস আমরা বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৫২ সালের ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর চীনের তৎকালীন রাজধানী পিকিং-এ আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের বিপুল করতালির মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন,
“আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।… শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহিদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন।”
[সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, লেখক এম এ ওয়াজেদ মিয়া, পৃ. ২০৫]
জাতিসংঘের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান যিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ গণরায়ে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করার পর যতবারই জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান করেছে, প্রত্যেকবারই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। শেখ হাসিনা শুধু ভাষণ প্রদান করেই তার দায়িত্ব শেষ করেন নি তিনি বিশ্বের প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের ভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাফতরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি উত্থাপন করেন। আমরা বিশ্বাস করি তার এই দাবি একদিন বাস্তবায়িত হবেই।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এক ঘোষণায় ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বাঙালি জাতির জন্য এ এক গৌরব-মর্যাদার বিষয়। এখন থেকে পৃথিবীর সকল জাতির মানুষ মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মদানকে স্মরণ করে নিজ নিজ মাতৃভাষাকে ভালোবাসবেÑ চর্চা করবে এ হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য। মাতৃভাষাকে অবহেলা নয়Ñ ভালোবাস, চর্চা কর।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহারের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এ সময়ে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই বাংলায় অনুবাদ করার লক্ষ্যে বাংলা একাডেমিতে অনুবাদ সেল গঠন করা হয়। সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বিভিন্ন প্রকাশকও অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশে আগ্রহী হয়। বঙ্গবন্ধু সরকারের এই নীতি ও উদ্যোগের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বক্তব্যের মধ্যেও। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৫২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষার ব্যবহার’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী এক আলোচনা চক্র উদ্বোধনকালে উচ্চতর শিক্ষাÑ বিশেষ করে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ে মাতৃভাষার ব্যাপক প্রচলনে সহায়তা করার জন্য দেশের শিক্ষক ও ভাষাতত্ত্ববিদদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, উচ্চরত শিক্ষার সর্বস্তরে যত শীঘ্র সম্ভব মাতৃভাষা চালু করা হইবে ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল। তিনি আরও বলেন যে, স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই সরকার বাংলা ভাষাকে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে এবং সরকারি অফিস-আদালতেও বাংলা ভাষা চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।… অফিস-আদালতে বাংলা ভাষাকে পুরোপুরি চালু করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বাংলা টাইপ রাইটার সংগ্রহ করার জন্য সরকার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন বলিয়াও তিনি জানান। রাষ্ট্রপতি পরিভাষা ও প্রতিশব্দ তৈরির ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়া বলেন যে, যে সকল শিক্ষক ও ভাষাবিদ বাংলা ভাষার উন্নয়নে গবেষণা, অনুবাদের কাজে নিয়োজিত রহিয়াছেÑ বর্তমান সরকার তাহাদিগকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রহিয়াছে।
[সূত্র : দৈনিক সংবাদ ও ইত্তেফাক, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২]
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার এ সময় ‘বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করে। ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বোর্ড প্রাঙ্গণে ‘উচ্চতর ডিগ্রি পর্যায়ে মাতৃভাষা শিক্ষা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ড. মুহাম্মদ কুদরাত-ই-খুদা। অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. মাজহারুল ইসলাম, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শিল্পী কামরুল হাসান ও ড. আনিসুজ্জামান।
[সূত্র : দৈনিক সংবাদ ও ইত্তেফাক, ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২]

আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের ১৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করায় এটি আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। সে কারণে এ সম্মেলনকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হিসেবে অভিহিত করাই সমীচীন বলে মনে করি। ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা ৩টায় সম্মেলনের মূল মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন কবি জসিমউদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী। সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নেন ভারতের প্রবীণ-নবীণ বিখ্যাত সব লেখক এবং শিল্পীরা। লেখক অন্নদা শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন শ্রী মনোজ বসু, মন্মথ রায়, শ্রীমতি রমা চৌধুরী, আশুতোষ ভট্টাচার্য, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, অজিত কুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ মিত্র, দেব নারায়ণ গুপ্ত, জীবেন্দ্র সিংহ রায়, বিনয় সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সবিতাব্রত দত্ত, প্রবোধ কুমার ভৌমিক, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ সেন, আশীষ সান্যাল, সুমিত্রা সেন, মায়া সেন, প্রদীপ কুমার ঘোষ প্রমুখ।
এই সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক নবজাগরণ সৃষ্টি করা। নতুন চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধের বিকাশে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের দায়িত্ব, ভূমিকা এবং করণীয় সম্পর্কে প্রতিটি বক্তাই মূল্যবান মতামত প্রকাশ করেন। প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেনÑ
“… আজকে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, তখন সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছে আমার প্রত্যাশা আরো অধিক। যারা সাহিত্য সাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাদেরকে দেশের জনগণের চিন্তা-চেতনা, আনন্দ-বেদনা এবং সামগ্রিক তথ্যে তাদের জীবনপ্রবাহ আমাদের সাহিত্য ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এ দেশের দুঃখি মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা। সাহিত্য শিল্পকে কাজে লাগাতে হবে তাদের কল্যাণে। আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে  রন্ধ্রে যে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা বিস্তার হয়েছে আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে ধরুন, দুর্নীতির মূলোচ্ছেদে সরকারকে সাহায্য করুন। আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোদিন কোনো মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না।”
[আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ২০১৭, প্রধান সম্পাদক শামসুজ্জামান খান, প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, পৃ. ৪৪]
১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং ক্ষমতালোভীদের ষড়যন্ত্রে সপরিবারে নিহত হন। থেমে যায় প্রগতির চাকাÑ রুদ্ধ হয় স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। অনেক রক্ত ক্ষয়ের পর আমরা আবার সঠিক পথে চলতে শুরু করি। ২০১১ সালের ২৬ জুন শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে ‘দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন সাহিত্য’ বিষয়ে তিন দিনের এক আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের। উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে ২০১৫ সাল থেকে বাংলা একাডেমি নিয়মিতভাবে আয়োজন করছে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বাংলা একাডেমির আয়োজনে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদেশি লেখকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জার্মানির সাহিত্যিক হান্স হার্ভার, ফরাসি লেখক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, বেলজিয়ামের সাহিত্যিক ফাদার দ্যতিয়েন এবং ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ভাষাবিদ ড. পবিত্র সরকার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেনÑ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো এই বাংলা একাডেমিতেই আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যার উদ্বোধক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন যে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন তা আজও আমাদের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক।’
সেই থেকে প্রতিবছরই বাংলা একাডেমি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট
২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করে। এ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলোÑ
১. দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ।
২. পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ভাষা ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। ভাষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৩. বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ।
৪. বিভিন্ন ভাষা বিষয়ে অভিধান ও কোষগ্রন্থ প্রকাশ এবং হালনাগাদকরণ।
৫. বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার লেখ্যরূপ প্রবর্তন।
৬. পৃথিবীর সকল ভাষার বিবর্তন বিষয়ক গবেষণা, গবেষণা জার্নাল প্রকাশ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন।
৭. ভাষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষা করা।
৮. বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণমালার জন্য একটি আর্কাইভ নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা।
৯. পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস, নমুনা ও তথ্যসংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা।
১০. ভাষাবিষয়ক জাদুঘর নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা।
বাঙালির বাংলা, বাংলা বাঙালিরÑ এই অমোঘ সত্যকে ধারণ করে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিবেদিত রয়েছে। ক্ষমতায় থাকা না থাকার চাইতেও বড় হলো বাঙালির স্বার্থ। আজ সে কারণেই লক্ষ জনতার সামনে উদাত্ত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতে পারেনÑ “আমি পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রিত্ব চাই না, আমি চাই বাঙালির অধিকার।” স্বাধীন বাংলাদেশে আত্মপরিচয়কে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করায় হাজার বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতিকেও সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। আলোচ্য নিবন্ধে বর্ণিত কর্মকা-ের বাইরেও বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে সংস্কৃতি নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সোনার লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন গঠন, বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন গঠন, বিটিভিকে আধুনিকীকরণের প্রকল্প গ্রহণ, মঞ্চ নাটকের প্রমোদকর রহিতকরণসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করণ। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো ‘সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়’ নির্মাণের উদ্যোগ। শিল্পকলা একাডেমিতে আধুনিক মঞ্চ নির্মাণ, চিত্রশালার আধুনিকীকরণ, বাংলা একাডেমি আধুনিকীকরণ, চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ, হাতিরঝিলকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিকমানের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণসহ অসংখ্য উদ্যোগ, যা আমাদের সংস্কৃতি বিনির্মাণে অসামান্য অবদান রাখবে। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ নির্মাণ ও এর উদ্বোধন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন ধারার সূচনা করল।

Category:

Leave a Reply