বাঙালির জয় কবিতার জয়

2-6-2019 8-13-23 PM

জাতীয় কবিতা উৎসব ২০১৯

উত্তরণ প্রতিবেদন :
কবিতা মানেই জীবনের ধারাভাষ্য। কবির বাণীতেই উদ্ভাসিত হয় সুদূর অতীত থেকে সমকাল। কবিতার আশ্রয়েই কবিরা লড়ে যান অমানবিকতার বিরুদ্ধে। চারপাশে যখন ছায়া নামে শঙ্কার তখন কাব্যবীজের স্ফুরণে জেগে ওঠেন আলোর পথযাত্রীরা। এভাবেই সত্য ও সত্তাকে একসঙ্গে প্রকাশ করেন কবি, সৃষ্টি হয় কবিতা। শব্দের পিঠে শব্দের সংযোজনে উচ্চারিত হয় অন্তর্নিহিত বিষয়। সেই শব্দমালায় থাকে দ্রোহ, প্রেম ও সময়ের দিনলিপি। সময়ের ওই দিনপঞ্জিকেই বেছে নিল জাতীয় কবিতা উৎসব। অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার বারতায় উচ্চকিত হলো বাঙালির বিজয়গাথা। শিল্পিত উচ্চারণে ব্যক্ত হলো কাক্সিক্ষত স্বদেশের স্বপ্নগাথা, আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা। দিনভর দেশ-বিদেশের কবিদের কবিতা পাঠে মুখরিত হলো উৎসব। ‘বাঙালির জয় কবিতার জয়’ সেøাগানে গত ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় ৩৩তম এই উৎসব।
হাকিম চত্বর নামে পরিচিত ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে ১ ফেব্রুয়ারি শীতের রোদেলা সকালে বাঙালির বিজয়ের প্রতিধ্বনিত জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত দুদিনব্যাপী উৎসব। এবার এই উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ, ডা. শামসুজ্জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হক ও মতিউর রহমানকে। সারাদেশের কবিদের সঙ্গে ৩৩তম এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন ভিন দেশের ২০ কবি। ৩৩তম উৎসব উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরী। উদ্বোধনী দিনেই হয়েছে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি পরিবেশনা ও মুক্ত আলোচনায় সাজানো ৬টি অধিবেশন। পারস্পরিক ভাববিনিময়ের পাশাপাশি দিনব্যাপী বিভিন্ন পর্বে কবিরা পাঠ করেছেন কবিতা। আমন্ত্রিত কবিদের সঙ্গে নিবন্ধনের মাধ্যমে স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নিয়েছেন দেশের নানা প্রান্তের কবিরা। ছিল অন্য ভাষার কবিতা পাঠ ও খ্যাতিমান বাকশিল্পীদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি পর্ব। সকাল থেকে রাত অবধি খ্যাতিমান কবিসহ নানা বয়সী কবিতাপ্রেমীদের বিপুল উপস্থিতিতে সরব ছিল উৎসব আঙিনা। ৩০০ নিবন্ধিত কবির মধ্যে প্রথম দিনেই কবিতা পড়েছেন দু-শতাধিক।
জাতীয় কবিতা উৎসব উদ্বোধন করেন গীতিময় কবিতার কবি আসাদ চৌধুরী। পরিষদ সভাপতি মুহাম্মদ সামাদের সভাপতিত্বে উৎসবের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন রুবী রহমান। সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য দেন তারিক সুজাত। বিগত বছরের প্রয়াত শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন আমিনুর রহমান সুলতান। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় কবি বেলাল চৌধুরী, চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আলোকচিত্রী ও চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন, ব্যান্ডসংগীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুসহ প্রয়াত গুণীজনদের। এর আগে বেলা ১০টা থেকে শুরু হয় কার্যক্রম। শীতের রোদমাখা সকালে কবিরা পদব্রজে এগিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসানের সমাধি প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বায়ান্নর ভাষা শহিদদের প্রতি নিবেদন করেন সশ্রদ্ধ ভালোবাসা। এরপর হাকিম চত্বরে এসে সবাই মিলে পরিবেশন করেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। সেই সুরে তাল মিলিয়ে উত্তোলিত হয় জাতীয় পতাকা ও পরিষদের পতাকা। মঞ্চ থেকে বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা গেয়ে শোনান একুশের গান ও উৎসব সংগীত ‘হাজার বছরের চর্যার পরি/বাঙালির জয় কবিতার জয়’।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ সামাদ আগামী বছর থেকে ১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি পর্যায়ে জাতীয় কবিতা দিবস হিসেবে ঘোষণার আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালির বিজয়ের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, বাঙালির মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার, জেলহত্যার এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ অনুন্নত দেশ থেকে উঠে এসেছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ২০১৮-এর ডিসেম্বরে আসে আরেক যুদ্ধÑ নির্বাচনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে ভয় পেয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় দেশ-বিদেশের মাটিতে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু-কন্যার আহ্বানে দেশের কবি-শিল্পী-কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-শিক্ষক-নারীকর্মী-অভিনয়শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়। তারা ছিনিয়ে আনে বিজয়। জাতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এ এক নতুন বিজয় বাঙালির, নতুন বিজয় কবি ও কবিতার। বাংলাদেশে আর কোনোদিন যেন মুজিববিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অন্ধকারের শক্তি মাথা তুলতে না পারেÑ এখন আমাদের সেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। এ কারণেই ৩৩তম জাতীয় কবিতা উৎসবের বারতা ‘বাঙালির জয়, কবিতার জয়’।
সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে তারিক সুজাত বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্সটারনাল পাবলিসিটি উইংয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা দরকার। একজন কবি-লেখকের প্রধান দায়িত্ব তার সৃজনশীল ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সেই সৃষ্টিকর্ম নিজ দেশ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। আজ পর্যন্ত আমাদের দেশের লেখকদের সেরা সাহিত্যকর্ম নিয়ে কোনো রাইট ক্যাটালগ তৈরি করে কোনো আন্তর্জাতিক বইমেলায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাহলে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া জাতির সাহিত্যকর্মের বিশ্বের সংযোগ ঘটানোর দায়িত্ব কে নেবে? প্রগতির পক্ষে কবিদের চিরকালীন অবস্থানটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কবিরা চিরকালই অবস্থান নিয়েছে প্রগতিশীলতার পক্ষে। আপসের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার কোনো নজির আমাদের নেই। তাই তিন দশকের বেশি সময় কবিরা এই উৎসবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। উৎসবে অংশ নেওয়া বিদেশি কবিরা স্ব-স্ব ভাষায় অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের কবিদের কবিতা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কবিতার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে বিশ্বময়।
উদ্বোধনী দিনের মুক্ত আলোচনা ও কবিতা পাঠ পর্বে অংশ নেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা কবি জ্যোতির্ময় দত্ত, মিনাক্ষী দত্ত, সেমন্তী ঘোষ, সুমন গুণ, দিলীপ দাস, মৃণাল দেবনাথ, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, শোভা দেববর্মণ, দীপক হালদার ও বিধানান্দ পুরকায়স্ত। কবিতা পাঠে অংশ নেন তুরস্কের কবি তারিক গুনারসেল, যুক্তরাজ্যের কবি ক্লারি বুকার, চীনের তানজিয়ান কাই, শ্রীলংকার জয়শঙ্কর সুব্রমনিয়াম, ইরাকের আলী আল সালাহ, মালয়েশিয়ার মালিম ঘোজালি, স্পেনের জুলিও পাভানেত্তি, উরুগুয়ের অ্যানাবেল ভিলার, কঙ্গোর কামা কামান্দা ও নেপালের পুষ্প কাহনাল।
উৎসবে স্প্যানিশ কবিতা পড়েন কামা কামান্দা। একই ভাষায় নারীদের উৎসর্গ করে কবিতা পড়েন কবি অ্যানাবেল ভিলার।
১ ফেব্রুয়ারি প্রথম দিন রাত ৯টা পর্যন্ত চলে মুক্ত আলোচনা ও কবিতা পাঠে সজ্জিত উৎসব। বেলা ১টায় শুরু হয় নিবন্ধনের মাধ্যমে কবিতা পাঠের প্রথম পর্ব। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সমাগত নবীন-প্রবীণ কবিরা মেলে ধরেন স্বরচিত কবিতাসম্ভার। এ পর্বের সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী কবি কাজী রোজী। এ পর্বের অন্য ভাষার কবিতা নিয়ে মঞ্চে আসেন কবিরা। পাঠ করেন চাকমা, মনিপুরী, পাংখোয়া কিংবা রাখাইন ভাষার কবিতা। এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন দিলারা হাফিজ। শুধু আমন্ত্রিত কবিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত কবিতা পাঠের তৃতীয় পর্বের সভাপতিত্ব করেন জাতিসত্তার কবিখ্যাত মুহম্মদ নুরুল হুদা। প্রথম দিনের কবিতা পাঠের চতুর্থ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন মহাদেব সাহা। রাত ৮টায় শুরু হওয়া আবৃত্তি পর্বের মাধ্যমে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন। কবিতাপ্রেমীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দেয় আমন্ত্রিত আবৃত্তি শিল্পীদের অংশগ্রহণের এই পর্ব। দেশের খ্যাতনামা বাচিকশিল্পীদের কণ্ঠস্বরে উঠে আসে দেশ-বিদেশের বরেণ্য কবিদের কবিতা। সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী, নন্দিত অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে হয় প্রথম দিনের সমাপনী অধিবেশনটি।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনের সকাল শুরু হয় সেমিনারের মাধ্যমে। কাব্যনাটক বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাজেদুল আউয়াল। এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। বেলা সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের দ্বিতীয় সেমিনার। বাঙালির জয় বাংলা কবিতার জয় বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করবেন কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতিত্ব করেন ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। বেলা আড়াইটায় নিবন্ধিত কবিদের অংশগ্রহণে কবিতা পাঠের পঞ্চম পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি কাজী রোজী। নিবন্ধিত কবিদের কবিতা পাঠের ষষ্ঠ পর্বে সভাপতিত্ব করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। ছড়াকার আসলাম সানীর সভাপতিত্বে আমন্ত্রিত ছড়াকারদের নিয়ে ছড়া পাঠের সপ্তম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। বিকাল সাড়ে ৫টায় ২০১৮ সালের জাতীয় কবিতা পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর হাতে। সন্ধ্যায় শিহাব সরকারের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠের অষ্টম পর্বে অংশ নেন অতিথি কবিরা। আমন্ত্রিত কবিদের অংশগ্রহণে কবিতা পাঠের নবম পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাপনী দিনের শেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে কবিতার গান। সুরের পথ ধরে কবিতা থেকে নির্মিত হয়েছে অনেক গান। সেসব গান শোনাবেন দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পীরা। এ পর্বে সভাপতিত্ব করবেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার।

Category:

Leave a Reply