বাঙালির ভাষা শিল্প সংস্কৃতি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

03উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলা ভাষা সাহিত্যের চর্চা, বিকাশ, বাঙালি সংস্কৃতির বহমান উদার অসাম্প্রদায়িক ধারায় অনন্য সংযোজন বইমেলা গত ১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাসব্যাপী মেলা উদ্বোধনের পর বইয়ের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন তিনি।
বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে যোগ দেন যুক্তরাজ্যের কবি এগনিস মিডোস, ক্যামেরুনের ড. জয়েস এ্যাসউনটেনটেঙ, মিসরের ইব্রাহিম এলমাসরি ও সুইডেনের অরনে। একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি সচিব মো. ইব্রাহীম হোসেন খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মো. আরিফ হোসেন। অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষা সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা নিজেদের ভাষা শিল্প সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে না পারি আর তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। বাঙালির ভাষা শিল্প সংস্কৃতি শুধু বাংলাদেশের সীমানায় নয়, সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করতে হবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভাষা আন্দোলনের গৌরবকে ধারণ করে আছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সে ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুটি ভূখ-। উভয় অংশের মধ্যে প্রায় ১২০০ মাইল দূরত্ব। ভাষা সংস্কৃতি সবকিছুই ভিন্ন। জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা ছিলাম বেশি। এরপরও পাকিস্তানিদের দ্বারা আমরা শোষিত হচ্ছিলাম। আমাদের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি।
ভাষা আন্দোলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথা এখনও অনেকের অজানা। খুব একটা উচ্চারিত হয় না। প্রধানমন্ত্রী সে জায়গাটিতে আলো ফেলার চেষ্টা করেন। বলেন, বাঙালির মহান নেতা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ তিনি গঠন করেছিলেন। এবং তারই প্রস্তাবে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। এর পরপরই ধর্মঘট ডাকা হয়। তখন পিকেটিং করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ অনেকেই গ্রেফতার হন। এভাবেই দাবির আন্দোলন শুরু। বঙ্গবন্ধু বন্দিখানায় থেকেও, যখনই হাসপাতালে এসেছেন, ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রভাষার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ ‘পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনার নিয়োগ করতে হবে।’ পরবর্তী জীবনেও সে সংগ্রাম তিনি চালিয়ে গিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ’৫৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এবং বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। সেই শাসনতন্ত্রে কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। শহীদ মিনার তৈরির কাজও শুরু করেছিল। ভাষা আন্দোলন, ৬-দফা, এর ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রাম। দেশ পাওয়া। জাতির জনক মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়ের মধ্যে একটি প্রদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলেন। শিল্প সংস্কৃতি চর্চার সব রকম ব্যবস্থা করে যান তিনি।
ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা এগিয়ে নিতে নিজের গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। তখন আমরা জানতে পারি, কানাডা প্রবাসী দুই মাতৃভাষাপ্রেমিক বাঙালি, তাদের নামও সালাম এবং রফিক, একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সংগঠনের মাধ্যমে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু এজন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করতে হয় এবং এই আবেদন কোনো সংগঠনের পক্ষে করা যায় না। রাষ্ট্রের পক্ষে করতে হয়। বিষয়টি জানা মাত্রই আমাদের সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর প্রেক্ষিতে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্ববাসীর স্বীকৃতি পেয়েছি। এই ধারাবাহিকতা আমাদের বজায় রাখতে হবে। আমরা স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে এমন দেশ গড়তে চাই, যে বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক। যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ। এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা, তারাও তাদের নিজেদের মতো করে ভাষা সংস্কৃতির চর্চা করতে পারবে। এভাবেই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি। ইনশাআল্লাহ মাথা উঁচু করে চলব।
এবারও প্রধানমন্ত্রী নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সারাবিশ্বে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন বাংলা ভাষার লেখাগুলো অনুবাদ হচ্ছে। বিদেশি লেখকরা আসছেন আমাদের দেশে। তারা আমাদের সম্পর্কে জানছেন। এই আদান-প্রদানের প্রয়োজন আছে। এ প্রসঙ্গে জাতির জনকের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ হওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এভাবে নিজের দেশের ইতিহাস সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা যখনই সরকার গঠন করেছি, চেষ্টা করেছি ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখার জন্য।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় একাধিকবার আসে সামরিক সরকার প্রসঙ্গ। দেশের অগ্রগতি ও শিল্প সংস্কৃতি চর্চার বিপরীতে এই সরকারগুলো ‘আঘাত’ হয়ে আসে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সব সময়ই আমাদের ওপর আঘাত এসেছে। সামরিক শাসকেরা যখন আসে তখন বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, বাঙালি জাতির সাহিত্য চর্চা, বাঙালি জাতির মাথা তুলে দাঁড়ানোর অধিকারগুলোর দিকে মনোযোগ দেয় না। তারা ক্ষমতাকে কীভাবে নিষ্কণ্টক করবে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিছু লোককে খুশি করে। কিন্তু সার্বিকভাবে কীভাবে দেশ এগিয়ে যাবে, ভাবে না। পদক্ষেপ নেয় না। এরা না সংস্কৃতি চর্চা করতে জানে, না ভাষা চর্চা করতে জানে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা আসলে মানসিকতা একটু ভিন্ন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
পৃথিবীর সব দেশের সব মাতৃভাষার প্রতি নিজের অনুরাগের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একটি মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। যেসব ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, বিলুপ্তির পথে, সেসব ভাষা নিয়ে চর্চা সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ হচ্ছে এখানে। এ ধরনের কাজ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আলোকচিত্রে বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ গ্রন্থ দুটি তুলে দেওয়া হয়।
একই অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন : কবিতাÑ মোহাম্মদ সাদিক ও মারুফুল ইসলাম। কথাসাহিত্যÑ মামুন হুসাইন। প্রবন্ধÑ মাহবুবুল হক। গবেষণাÑ রফিকউল্লাহ খান। অনুবাদÑ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যÑ কামরুল হাসান ভূঁইয়া ও সুরমা জাহিদ। ভ্রমণকাহিনিÑ শাকুর মজিদ। নাটকÑ মলয় ভৌমিক। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিÑ মোশতাক আহমেদ। শিশুসাহিত্যÑ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ। অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে ১ লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরে তিনি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধাবিকাশ ও সুস্থ বিনোদনের জন্য তৈরি অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্ম কিশোর বাতায়ন কানেক্ট এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব একসেসিবেল ডিকশনারির উদ্বোধন করেন। এটুআই-প্রোগ্রামের ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র থেকে অনলাইন প্লাটফর্মেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এবারও মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং বই সংগ্রহ করেন বেশ কিছু বইয়ের লেখক শেখ হাসিনা।

Category:

Leave a Reply