বাঙালির ৭০ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তরাধি­কার : আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্জন

Posted on by 0 comment

PddMশামসুজ্জামান খান: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে গেলে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পটভূমির কথা মনে রাখতে হবে। প্রধানত ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান (১৯৪৭) ছিল রাষ্ট্র-বিজ্ঞানের সংজ্ঞার নিরিখে অবৈজ্ঞানিক এবং ভৌগোলিকভাবে এক উদ্ভট রাষ্ট্র। তদুপরি, প্রথম থেকেই এই রাষ্ট্রে ব্যক্তিমানুষ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা বৃহৎ নানা আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সাধারণভাবে দেশের সকল অংশের গরিব-দুঃখী-মজলুম জনতার প্রতি ঔপনিবেশিক কায়দায় যে অন্যায়-অবিচার-বৈষম্য এবং অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী রাষ্ট্রীয় নিপীড়নমূলক কর্মকা- চালু করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও বহুত্ববাদী (চষঁৎধষরংঃরপ) গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম (১৯৪৯) হয়।
আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী আদর্শগত উপযুক্ত ভিত্তি এবং রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য থেকেই এর সাংস্কৃতিক নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়। বহু জাতি, উপজাতি এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার দেশ পাকিস্তানের শাসকচক্র সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক মতলব হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে যে এককেন্দ্রিক স্বৈরশাসন চালু করে তাতে স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক সুষম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বা নানা নৃগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মুক্তধারা সৃষ্টি ছিল অসম্ভব। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পাঞ্জাবি আধিপত্যবাদী আমলা, সামরিকচক্র ও বৃহৎ জোতদারেরা নিজেদের আধিপত্য ও কায়েমী স্বার্থকে স্থায়ীভাবে জারি রাখার লক্ষে পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু বাঙালি-জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা এমনকি অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার স্বৈরাচারী একতরফা ঘোষণা প্রদান করে। আর প্রথম রাতেই বিড়াল মারার কায়দায় ১৯৪৮-এ প্রথম সফরে এসে এই ঘোষণা দেন ‘পাকিস্তানের জনক’ স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ওই বছরই পাকিস্তান গণপরিষদে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তৎকালীন বিরোধী দলের সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি তুললে যে-ভাষায় তার উত্তর দেন তা শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, এক তথাকথিত স্বাধীন দেশে ঔপনিবেশিক কোনো ভূখ-ের শাসকেরা কোনো প্রজাকে যে ভাষায় অপমান করেন তার কথা মনে করিয়ে দেয়। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও অধিকৃত দেশের শিখ-ী শাসকের মতো প্রভুদের সুরে সুর মেলান।
এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার ছাত্র, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। এই ক্ষোভ-বিক্ষোভের রাজনৈতিক রূপ প্রকাশ পায় ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে। তখনও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে যেসব ছাত্রনেতা ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাদের অনেকেই এক বছর পরে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করে নেতৃপদে বৃত হন। শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ এদের মধ্যে অন্যতম। অতএব, বলা যায় পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিরোধকল্পে একটি শক্তিশালী নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠন ও তাকে বাঙালির গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষা ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দÑ মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের লক্ষ্য।
পূর্ব-বাংলার ভাষা-আন্দোলন একই সঙ্গে ছিল একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যনির্ভর জাতীয় আন্দোলন এবং বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা রক্ষার মরণপণ লড়াই। ফলে, পূর্ববাংলার অধিকারবঞ্চিত মানুষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে মূল বিস্ফোরক উপাদান হিসেবে তার মাতৃভাষা ও হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার বিষয়টি যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেরই চেহারা লাভ করে। পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী, চক্রান্তকারী শাসকগোষ্ঠী ১৯৪৮-এর ভাষা-আন্দোলনের ওই রূপটি বুঝতে না-পারায় বা বুঝতে না-চাওয়ায়, ১৯৫২ সালে তাদের তল্পিবাহক পূর্ববঙ্গ সরকারের গুলি করে ছাত্রহত্যার ফলে পূর্ববাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটায়। রাজনীতি ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন পাকিস্তানের এক ধরনের ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে ছিল এক অবধারিত বিষয়। পাকিস্তানিরা পূর্ববাংলার ওপর যে তীব্র শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেয় তার সঙ্গে তথাকথিত ‘পাকিস্তানি সংস্কৃতি’ প্রবর্তনের নামে বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান ধারাকে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রয়াস পায়। সংস্কৃতির ওপর এই আঘাতকে বাঙালি কোনোদিন মেনে নেয়নি।

দুই
পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলন (১৯৪৮-৫২) এবং সমসামরিক ক’টি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, যথা : পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, ঢাকা (১৯৪৮-৪৯), পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন, চট্টগ্রাম (১৯৫১), পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন, কুমিল্লা (১৯৫২) এবং পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, ঢাকা (১৯৫৪) বাঙালির রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনই শুধু ঘটায়নি, রাজনৈতিক দিক- নির্দেশনার কাজও করেছে। ১৯৪৮-এর ৩১ ডিসেম্বর ও ১৯৪৯-এর ১ জানুয়ারি ঢাকায় কার্জন হলে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম দিনে মূল সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৎকালীন দুটি রাজনৈতিক বিষয়কেও সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন। ভাষা-আন্দোলনের কথা মনে রেখে তিনি বলেন : ‘স্বাধীন পূর্ববাংলার স্বাধীন নাগরিকরূপে আজ আমাদের প্রয়োজন হয়েছে সর্বশাখায় সুসমৃদ্ধ এক সাহিত্য। এই সাহিত্য হবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়। পৃথিবীর কোনো জাতি জাতীয় সাহিত্য ছেড়ে বিদেশি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে যশস্বী হতে পারেননি। ইসলামের ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিকেই পারস্য আরব কর্তৃক বিজিত হয়েছিল, পারস্য আরবদের ধর্ম নিয়েছিল, আরবি সাহিত্যেরও চর্চা করেছিল। কিন্তু তার নিজের সাহিত্য ছাড়েনি।’ অন্যদিকে ওই সম্মেলনে পূর্ববাংলায় বসবাসকারী বাঙালি হিন্দু মুসলমানের জাতিসত্তার অমোঘতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা লুঙ্গি-টুপি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’
উপর্যুক্ত সাহিত্য বা সংস্কৃতি সম্মেলনেও বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং তার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ওপরই বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে। এর সমর্থক সংখ্যার সিংহভাগ ছিল গরিব-দুস্থ, নিম্নআয়ের লোক এবং নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্তসমাজ আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও জোট কৃষক সম্প্রদায়। আর এই দলের নেতৃত্ব ছিল দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজের হাতে। এই সমাজ স্বভাবতই সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতন। ফলে ভাষা- আন্দোলন তাদের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিক সঙ্গে এদের সহজ সংযোগ থাকার ফলে শুধু ভাষার প্রশ্নে নয়, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ও তার সঙ্গে রাজনীতিকে সম্পৃক্ত করে নেবার একটা প্রবণতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়। এই প্রবণতা থেকেই বাংলা-অঞ্চলের আঞ্চলিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিত্বের ওপর জোর পড়ে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের জুলুম, নির্যাতন ও তীব্র অর্থনৈতিক শোষণের বিপরীতে গড়ে ওঠে বাঙালি ঔপনিবেশিক কায়দায় জাতীয়তাবাদ। ফলে আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রায় একক ও অনন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ এই রাজনৈতিক ধারাকে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে মূলধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। বাঙালির এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামের এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ উপযোগী সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে।

তিন
ঞযব ড়িৎফ ‘ইবহমধষ’ যধং ধ যরংঃড়ৎু, যধং ধ ঃৎধফরঃরড়হ ড়ভ রঃং ড়হি. ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে দেয়া ভাষণে ‘পূর্ববাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখার কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান উপর্যুক্ত উক্তি করেন। এই উক্তির মধ্যদিয়ে শেখ সাহেবের রাজনৈতিক চিন্তা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে স্বীকার করেও নিয়েছেন; কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে পূর্ববঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যাক এমনটি তিনি কখনও চাননি। কারণ, তিনি বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করেন। এই ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করে পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করে তোলাই তার অন্বিষ্ট। বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই তিনি সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম-অত্যাচারকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। বাংলাদেশকে সামনে রেখেই তিনি তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার বিন্যাস ঘটিয়েছেন এবং তার সংস্কৃতিচিন্তাই আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিচিন্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও উপর্যুক্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববাংলার মধ্যবিত্ত বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিগত হাজার বছরের অর্জনকে অঙ্গীভূত করে নিয়েছিল। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিন খান ভাসানীর উদ্যোগে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন (৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি) এবং তিন দিনব্যাপী (৮, ৯, ১০ ফেব্রুয়ারি) এক বিরাট আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে পূর্ববাংলার খ্যাতনামা শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মিসর, জাপান প্রভৃতি দেশের বিদ্বজ্জন অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন এই সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন : ‘আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং তার ফল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক (দার্শনিকও বটে) ভিত্তিভূমি নির্মাণের ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার অন্যতম। জাতি মাত্রেরই সংস্কৃতি আছে। বাঙালি জাতি একটি সুপ্রাচীন যৌথ সংস্কৃতির অধিকারী। এ সংস্কৃতিতে আদিবাসী, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান প্রভৃতি সকল সম্প্রদায় ও বর্ণের বিশিষ্ট অবদান আছে। বাঙালি জাতির যৌথ উদ্যমে ও আয়োজনে শত শত বছরব্যাপী গ্রহণ ও বর্জনের মাধ্যমে সৃজিত বাঙালির আলাদা জাতীয়সত্তা ও সংস্কৃতির প্রতি বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক দৃষ্টি প্রথম আকর্ষণ করে কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন।
এই সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে বাঙালির জনপ্রিয় তরুণ নেতা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট লোকশিল্পীকে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন সুনামগঞ্জের বিখ্যাত মরমী বাউল শিল্পী শাহ আবদুল করিম। শেখ সাহেব এই সম্মেলনে একটি লিখিত ভাষণও দেন।

চার
১৯৬১-এর দশকের প্রথম থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই, এমন একটা চিন্তা বঙ্গবন্ধুর মাথায় আসে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে প্রস্তুত করতে থাকেন। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি এজন্য ৬-দফা ঘোষণা করেন, স্বাধীনতার প্রাথমিক কাজগুলো করার জন্য ছাত্রলীগের ক’জন বিশ্বস্ত নেতাকে নিয়ে নিউক্লিয়াস গঠন করেন এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক কর্মকা- জোরদার করেন। এক্ষেত্রে বিস্ময়ের সঙ্গে একটা বিষয় আমরা লক্ষ্য করিÑ সাধারণত কম্যুনিস্ট ও বামপন্থি নেতারা তাদের রাজনীতিতে সংস্কৃতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে সংস্কৃতির প্রতি তেমন প্রবল ঝোঁক দেখা যায় না। বঙ্গবন্ধু এদিক থেকে ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী এক নেতা। রাজনৈতিক গ্রন্থের সঙ্গে তিনি গল্প-উপন্যাসও যথেষ্ট পড়তেন। শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ ছিল। এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকশিল্পীদের সঙ্গেও তার সখ্য ও প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে অন্তরের যোগ না থাকলে এটা হয় না। সাহিত্য-শিল্পের উন্নতি অগ্রগতির লক্ষ্যে তিনি প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সরকারপ্রধান হিসেবে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ এফডিসি, শিল্পকলা একাডেমি এবং সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কথা বলা যায়। শুধু তাই না, এসব প্রতিষ্ঠার কী কাজ করবে সেসব বিষয়েও তিনি ভেবেছিলেন। যেমন তার বন্ধু প্রখ্যাত শিল্পী কলিম শরাফীকে তিনি বলেছিলেন : ‘শিল্পকলা একাডেমি করে দিলাম; এর প্রধান কাজ হবে আমাদের দেশের লোকশিল্পসমূহ সকল রকম শিল্পকর্মের নমুনা সংগ্রহ করে তার ওপর গবেষণা করা।’ এই সব দেখে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস’র একটা কথা মনে হয়। এঙ্গেলস বলেছিলেন, ‘যে-কোনো সুস্থ সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ স্বাধীনতাকে সংহত করে।’ মনে হয় যেন একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। ফলে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৭ সালে পূর্ববাংলায় রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করায় তিনি শুধু যে বিচলিত হয়েছিলেন তাই না, জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ও বাংলার অধ্যাপক শ্রী অজিত কুমার গুহের সঙ্গে পরামর্শ করে এক বড় আকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে বলেন। সে অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। আকস্মিকভাবে তাতে রবীন্দ্রসংগীতও পরিবেশন করা হয়। নিষেধের বেড়াজাল এভাবে ভেঙে দেয়ায় গভর্নর মোনায়েম খাঁ ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। অজিতবাবুকে কলেজ ছাড়তে হয়, অধ্যক্ষ বদলি হন এবং কিছুদিনের মধ্যে কলেজটিকে সরকারি কলেজ করা হয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবশত কবিকে তিনি ‘কবিগুরু’ বলতেন। বক্তৃতা বিবৃতিতে কবির কবিতা আওড়াতেন। এই শ্রদ্ধার কারণেই রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’কে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করেন।
নজরুলের প্রতিও ছিল তার শ্রদ্ধা প্রগাঢ়। বাঙালির মুক্তিমন্ত্র ‘জয় বাংলা’ তিনি নজরুল থেকেই নিয়েছিলেন। স্মর্তব্য যে, কৈশোরে বঙ্গবন্ধু স্বদেশী আন্দোলনের ফরিদপুর জেলার কিছু নেতাকর্মীর সংস্পর্শে আসেন। এই নেতাদের একজন ছিলেন মাদারীপুরে পূর্ণচন্দ্র। তিনি সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে ধৃত হন। তার মুক্তি উপলক্ষে লেখা গানে নজরুল ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। বঙ্গবন্ধুর মনে হয়তো শব্দটি গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া নজরুলের ‘বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক’ তো ছিলই। অসুস্থ ও নির্বাক কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকার যথাযোগ্য মর্যাদা দেখায়।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনীতি ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলেছে। এ ব্যাপারে আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের দারুণ মিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য দল সংস্কৃতির দাহ্যগুণ উপলব্ধি করেছিল বলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে লৌহদৃঢ় ঐক্য গড়ে ওঠে তাতে সংস্কৃতির অবদান বিরাট। এ বিষয়টি লক্ষ করেই তখনকার এক সোভিয়েত তাত্ত্বিক মস্কোতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশিয়ান সাহিত্য সম্মেলনে আমাকে বলেছিলেন : ‘তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এটা শিখিয়েছে যে, সৃষ্টিশীল জাতীয়তাবাদ দুই বিপরীতকে একত্র করে নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ এবং সুকান্তের সমান্তরাল ব্যবহার আমাদের জন্য এক চমৎকার শিক্ষা।’ আসলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রবীন্দ্রনাথ নজরুল, সাধারণ মধ্যবিত্তের বাঙালিত্ব এবং গ্রামবাংলার মানুষের লোক-সংস্কৃতিকে ৩টি স্তরে বিন্যস্ত করে যে ঐকতানের সৃষ্টি করেন তা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
পাঁচ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সংস্কৃতির একটা রূপরেখা তৈরি করে দেন। তার মূল কথাগুলো এ-রকমÑ

১.    ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক অধিবেশনে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।’
২.    ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।
৩.    আমরা বাঙালি। আমরা ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছি।
৪.    আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র, আমরা চাই না শোষকের গণতন্ত্র।
৫.    আমরা সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে দরিদ্র নই।… স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মর্যাদাকে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।… বিশ্বের স্বাধীনতালব্ধ জাতিগুলির মধ্যে আমরা এদিক থেকে গর্ব করতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা-আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম হাতে হাত ধরে অগ্রসর হয়েছে। আজকে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, তখন সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছে আমার প্রত্যাশা আরও অধিক। যারা সাহিত্যসাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাদেরকে দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হবে হবে।… সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা, সাহিত্যশিল্পকে কাজে লাগতে হবে তাদের কল্যাণে। (১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণ)।

১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কৃতিক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তার শাসন আমলেই নাটকের সেন্সরশিপ তুলে নেওয়া হয়। দেশের গরিব-দুস্থ গ্রামীণ লোকশিল্পীদেরও একুশে পদক দেওয়া হয়। ফলে এই সম্মানজনক পদক পান ঢোলশিল্পী বিনয় বাঁশি জলদাস, কবিয়াল ফণি বড়–য়া ও বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিম। হাসিনা সরকার ১৯৯৬-২০০১-এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও সংস্কৃতিবলয়ের যে কার্যক্রম শুরু করেছিলেন, তা বাস্তাবায়িত হলে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সমন্বিত সাংস্কৃতিক ধারা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের যে যুগল চিত্র প্রস্ফুটিত হতো, তা আমাদের স্বাধীনতাকে অনিঃশেষ শক্তি জোগায়। জোট সরকার এই পরিকল্পনা বন্ধ করে রেখেছে।

Category:

Leave a Reply