বিএনপি এখন দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামির পকেটে

Posted on by 0 comment

প্রকৃত বিচারে এমনটা না হলে তারেক জিয়া যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান হয় কীভাবে! দ-িত মা ও ছেলেÑ দুজনই যে কতটা যোগ্য এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বায়োডাটার দিকে তাকালে। 

স্বখাত সলিলে খালেদা জিয়া

স্বখাত সলিলে খালেদা জিয়া

শেখর দত্ত: ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ^াস করে তারেক জিয়া গুরুতর রাজনৈতিক দুর্নীতির জন্য দোষী, মার্কিন জাতীয় স্বার্থের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’ ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর সুবিখ্যাত ওয়েবসাইট উইকিলিক্স যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের গোপন বার্তার এই তথ্যটি প্রকাশ করে। প্রকাশিত ওই গোপন বার্তায় ছেলে তারেক জিয়ার নাম থাকলেও মা খালেদা জিয়ার নাম ছিল না। নামটি উল্লিখিত বার্তায় না থাকলেও তখন দেশবাসী ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট আমলের অভিজ্ঞতা থেকে জানত খালেদা জিয়া নানা ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত এবং কতক মামলায় অভিযুক্ত। সুদীর্ঘ বছর আদালতে মামলা চলার পর এখন দেখা যাচ্ছে রসুনের গোড়া একই জায়গায়। মা ও ছেলে দুজনই দুর্নীতির দায়ে অপরাধী। তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা মা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়-উৎসাহ না পেলে তো আর ছেলে তারেক জিয়া তখন ‘হাওয়া ভবন’ বা ‘খোয়াব’-এর মতো দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কেন্দ্র বানাতে পারত না! পারত না গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের মতো ব্যবসায়িক পার্টনার কিংবা লুৎফুজ্জামান বাবরের মতো সন্ত্রাসী পার্টনার যথাস্থানে বসাতে!
মা ও ছেলে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া। বিএনপি-জামাত জোট ও বিএনপি দলের এক নম্বর ও দুই নম্বর নেতা। দুজনই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতের রায়ে দ-িত। লেখাটা যখন লিখছি, তখন বৃদ্ধা মা খালেদা জিয়া রয়েছেন ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে। জামিনের আবেদন করা হয়েছে হাইকোর্টে। জামিন পেয়ে তিনি বের হয়ে আসতে পারবেন কি না তা আদালতই বলতে পারবে। তবে মা যখন জেলে তখন পুত্র তারেক জিয়া রয়েছে বহাল তবিয়তে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে প্রবাসে, লন্ডনে। দেশে থাকলে আইন অনুযায়ী তাকে ২০০৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে জেলেই থাকতে হতো। ছেলের সৌভাগ্য মা তখন গ্রেফতার থাকা অবস্থায়ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মৌখিক মুচলেকা দিয়ে ছেলেকে জেল থেকে বের করে প্রবাসে পাঠাতে সক্ষম হন। ছেলে এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হয়েছেন বটে; কিন্তু দেশে এসে মায়ের জন্য কিছুই করার সাহস ও হিম্মত তার নেই। যৌথ কৃতকর্মের ফল ভোগ করছেন কেবল একা মা। এই বিচারে ছেলে বটে তারেক জিয়া!
প্রকৃত বিচারে এমনটা না হলে তারেক জিয়া যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান হয় কীভাবে! দ-িত মা ও ছেলেÑ দুজনই যে কতটা যোগ্য এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বায়োডাটার দিকে তাকালে। প্রসঙ্গত শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদ-, তেমনি যে কোনো ব্যক্তিকে যদি নৈতিকতা বজায় রেখে মানসম্মান নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়, তবে শিক্ষা জরুরি। অল্প বিদ্যা আসলেই ভয়ঙ্কর। এর মধ্যে ক্ষমতা যুক্ত হলে হয় অতি ভয়ঙ্কর। মা খালেদা জিয়া পড়েছিলেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। একাধিকবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম দিনাজপুর গার্লস হাই স্কুল। এসব দেশবাসী সবারই জানা।
কিন্তু পুত্র তারেকের শিক্ষার দিকটা রহস্যময়। রয়েছে দুই ধরনের তথ্য। প্রথম তথ্যমতে তারেক জিয়া ঢাকা রেসিডেন্টসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। মতান্তরে বিএফ শাহীন স্কুলে লেখাপড়া করলেও পরীক্ষা দেন ঢাকা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে। ১৯৮৪ সালে প্রথমে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন ও পরে লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরে স্বভাবজনিত কারণে পড়াশোনা আর অগ্রসর করতে পারে নি।
আসলেই ছাত্র বা পড়াশোনার মধ্যে থাকা তারেক জিয়ার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। প্রথম থেকেই বড়দের কথা শোনা ও মান্য করা ছিল তার অনীহা। ফলে লেখাপড়া ভালোভাবে হয়ে ওঠে নি। যতদূর জানা যায়, সেন্ট জোসেফ স্কুলের ছাত্র ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বড় পুত্র তারেক রহমান। কিন্তু পরপর দুবার ফেল করার কারণে ট্রান্সফার সাটিফিকেট নিয়ে ওই স্কুল ছাড়তে হয়। ধারণা করা যায়, তারেক জিয়া কখনও না কখনও ঢাকা রেসিডেন্টসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ছিল এবং সেখানে পড়ার সময়েই সেই স্কুলের ছাত্র খোয়াব খ্যাত গিয়াস আল মামুনের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি পিতার ছেলে স্কুল থেকে টিসি পায়, কোথায় কতটুকু পড়েছে জানা যায় না, বিএ পর্যন্ত পাস করতে পারে না; এমনটা কি আসলে চিন্তা করা যায়! এখন বলা হচ্ছে, তারেক জিয়া না-কি লন্ডনে আইন পড়ছে। এখানেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম গোপন থাকছে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো শিক্ষা নিয়ে মতান্তরের এই জটটা কখনও ভাঙতে যায়নি তারেক জিয়া।
ঠিক যেমন নিজের জন্ম তারিখের জটও কখনও পরিষ্কার করেন নি খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় হঠাৎই জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালন শুরু করেন খালেদা জিয়া। ক্ষমতার মদমত্তে পাগল হয়ে জাতির কোন স্পর্শকাতর ও মর্যাদার জায়গাটায় জন্মদিন পালনের ভেতর দিয়ে আঘাত করতে চাওয়া হয়, তা কারোই না বোঝার কথা নয়। জাতির পিতা ও অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে দল করা যাবে না মর্মে সামরিক ফরমান জারি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। দেশের রাজনীতি থেকে এই মহান নেতার নাম উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেন নি। সেই পথ অনুসরণ করেই খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া আমলে বঙ্গবন্ধুকে হেয় বা খাটো করা, কটাক্ষ বা তুচ্ছ-তচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যেই এমন শোকাবহ একটি তারিখে জন্মদিন পালন করা হতে থাকে। আসলে অন্তত ৪-৫টি জন্মদিন পাওয়া যায় খালেদা জিয়ার। ভাই সাইদ ইস্কান্দর বলেন ৫ সেপ্টেম্বর, মা তৈয়বা খাতুন বলেন মার্চ মাস, বিয়ের কাবিননামায় ৫ আগস্ট আর নির্বাচন ফরমে ১৯ আগস্ট। ছেলের পড়াশোনার মতোই মায়ের জন্মদিন ঘিরে রয়েছে এমন সব রহস্যের জট।
প্রসঙ্গত, ট্রান্সপারেন্ট থাকাটা রাজনীতিকদের বড় গুণ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রধান কথা। কিন্তু জিয়া পরিবারের আদ্যোপান্ত সবকিছুই কেমন যেন রহস্যঘেরা। মেজর জিয়া কী জন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন, তা কখনও যেমন সুস্পষ্ট করা হয় নি; তেমনি ওই দিনগুলোতে খালেদা জিয়া কীভাবে হানাদার বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে গেলেন আর থাকলেন তাও স্পষ্ট করা হয় নি। ‘মুক্তি’ হওয়ার কারণে অগণিত মুক্তিযোদ্ধার বাড়িঘর পোড়ানো এবং নিরীহ মা-বাবাসহ আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে বহাল তবিয়তে খালেদা জিয়া সেখানে থাকলেন কীভাবে তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
তবে জিয়া পরিবারের রহস্যের সব জট আসলে লুক্কায়িত রয়েছে ‘ছেঁড়া সার্ট’ ও ‘ভাঙা সুটকেস’-এর মধ্যে। এসব দেখিয়ে সহানুভূতির ঢেউ তুলে তৎকালীন বিএনপি সরকার রাষ্ট্র থেকে ভরণপোষণ ও থাকার জায়গাসহ সব বিষয়ে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়েছিল নাবালক দুই পুত্র ও বিধবা স্ত্রীকে। আর এখন! ওই পরিবারের দেশে-বিদেশে কোথায় কোন সম্পদ কীভাবে রয়েছে তার সব হিসাব বোধকরি কেউ দিতেও পারবেন না। জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিলেন খালেদা জিয়া। কোকো জীবিত থাকতে দুই পুত্রের অর্থ সম্পদ নিয়ে ঝগড়ার কথা কম-বেশি সবারই জানা। আর সৌদি আরবে সুটকেস নিয়ে যাওয়ার সবটা তো এখন গল্পকথার মতো। অর্থপাচার মামলায় এফবিআই কর্মকর্তা ডেবরা লাপ্রেভেটি সাক্ষ্য প্রদানের কথাও দেশবাসীর অজানা নয়। সাধে সাধে তো আর তারেক জিয়া মানি লন্ডারিং মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কিংবা ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হয় নি! প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার রয়েছে ৩৩টি মামলা আর তারেক জিয়ার ১৩টি। এর মধ্যে পুত্রের দুটি ও মায়ের একটি মামলায় সাজা হলো। আরও কতটি মামলায় কী প্রমাণিত হবে এবং আদালত কী রায় দেবে কে জানে!
বিএনপি দলটি আসলে দেশবাসীকে বোকা বা অন্ধ ভাবে। নতুবা যা ইচ্ছে তাই করে চলতে পারে কীভাবে! রাজনৈতিক দলে এমন নিয়ম চালু আছে, প্রধান নেতা বিদেশে বা জেলে গেলে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা গেল এই নিয়ম কার্যকর থাকছে না। কিছুদিন আগে খালেদা জিয়া যখন বহুদিন লন্ডন থাকলেন, তখন কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দেওয়া হয় নি। এবারে তিনি গ্রেফতার হলে দায়িত্ব দেওয়া হলো ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হাওয়া ভবন খ্যাত প্রবাসী তারেক রহমানকে। প্রবীণরা দেশে সক্রিয় থাকতে কোনো বৈঠক ছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ের নেতা রিজভীর ঘোষণায় শূন্য পদে তারেককে বসিয়ে দেওয়া প্রবীণ নেতাদের অপমান করারই নামান্তর। আর কেবল পারিবারিক বিবেচনায় ওপর থেকে বসিয়ে দেওয়া এই নেতা যে অতি বিতর্কিত তা কারোরই অজানা নয়। কেবল দুর্নীতির কারণেই নয় সন্ত্রাসী ও উগ্রজঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্যও মানুষের মধ্যে, কূটনৈতিক মহলে তারেক জিয়ার ইমেজ খুবই খারাপ। খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর বৈঠক ছাড়া এক ঘোষণায় এই নিয়োগ দেওয়ায় ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব। সার্বিক বিচারে কার্যকরি চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক জিয়া এখন বিএনপির গলার ফাঁস।
তবে, এই নিয়োগের চাইতেও দেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত ও অভাবিত কাজটি করেছে বিএনপি দলটি। দলটি হঠাৎ করেই দলীয় গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা হয়েছে যে, “নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তারা হলেনÑ ক. ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে দ-িত ব্যক্তি, খ. দেউলিয়া, গ. উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, ঘ. সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।” এই বিচারে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া কোনো পদে যেমন থাকতে পারেন না, তেমনি নির্বাচনেও অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।
প্রসঙ্গত, বিএনপি দলটির সম্মেলন হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দুই বছর হয়ে গেলেও দলটি গঠনতন্ত্র প্রকাশ করেনি এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে এতদিন জমা দেয় নি। তাই প্রশ্ন হচ্ছে দুটো। প্রথমত; তাড়াহুড়া করে পরিবর্তন করা হলো কেন? দ্বিতীয়ত; সম্মেলন ছাড়া এভাবে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন কি করা যেতে পারে? বিএনপি যেহেতু ওই সম্মেলনের পর গঠনতন্ত্র ছাপায় নি, তাই বলার উপায় নেই, সম্মেলনে ছাড়া এমন তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্রের মতো দলের পবিত্র আমানত দলটি পরিবর্তন করতে পারে কি না? তবে দুর্নীতির মামলায় দ-িত খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে দলের নেতৃত্বপদে রাখা এবং তারেক জিয়াকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা তথা পরিবারতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য যে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে প্রশ্ন হলো বিএনপি গঠনতন্ত্রের পুরো ৭ ধারা বাতিল করল কেন? বিএনপি পাগল ও দেউলিয়াদেরও কি দলীয় পদে রাখতে চায়! সর্বোপরি, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে যারা দ-িত হয়েছে এরা কারা? মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা নয় কি? কোন জায়গায় ছাড় দিচ্ছে বিএনপি তা সুস্পষ্ট। এই পরিবর্তন করে বিএনপি দলের মধ্যে স্থায়ীভাবে যে বিষবৃক্ষ রোপণ করল তার ফল দলটিকে আজন্ম ভোগ করে যেতে হবে। ধরে নেওয়া যাক, খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া দুর্নীতির মামলাগুলো থেকে খালাস পেল। তখন কি বিএনপি আবার এই ধারা যুক্ত করতে পারবে? তখন দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিতরা তা হতে দেবে না। আসলে দুর্নীতিবাজদের নিশ্চিন্তে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে থাকার একটা সুন্দর জায়গা করে দিল বিএনপি। প্রকৃত বিচারে এই সংশোধনের ভেতর দিয়ে বিএনপি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত জিয়া বংশকেই কেবল ছাড় দিল না, ছাড় দিয়ে দিল দুর্নীতিবাজদেরও। এই ছাড় দেওয়া দেশের সংবিধান এবং এমনকি বিএনপি দলটির ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচির সাথেও সাংঘর্ষিক। এই পরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে দলটি প্রতিষ্ঠার সময় জিয়া ঘোষিত ১০-দফা তথা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জেহাদের’ ঘোষণা কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া কর্তৃক দেশবাসীকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ‘উপহার’ দেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে পরিহাসের মতো শোনাবে। আর দুর্নীতির অপরাধে দ-িত খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়া ও তারেকের প্রবাসে থাকা বিয়োগান্তক এক প্রহসন নাটকের মঞ্চায়ন বলেই মনে হবে।
খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার বিয়োগান্তক এই প্রহসনের নাটকে খলনায়কের চরিত্রে আছে আসলে জামাত। ২০১৪ সালে যখন যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতাদের মামলায় শাস্তি হচ্ছিল, তখন জামাতের বিপদে বিএনপি দাঁড়িয়েছিল পাশে। জামাতের জন্য কি না করেছে বিএনপি! ক্ষমতায় গিয়ে জাতীয় পতাকা উড়াতে দিয়েছিল। আর বিরোধী দলে থাকতে জামাতের সাক্ষাৎ মুরব্বি পাকিস্তানের কথা শুনে যুদ্ধংদেহী আগুন সন্ত্রাস পর্যন্ত চালিয়েছিল। কিন্তু এখন বিএনপির বিপদের দিনে জামাত নামছে না রাস্তায়। যদি না নামে তবে কি হবে জোটের অবস্থা! এটা কার না জানা যে, সংকট তীব্র হলে দল ও জোটে ভাঙন হয়। সংকটে তো পড়ছে বিএনপি। কে জানে কি কপালে আছে বিএনপি ও বিএনপি-জামাত জোটের!
বিএনপির জন্য আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক মহল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার শাস্তি ও গ্রেফতারে নীরব। কোনো দেশই খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের প্রতিবাদ কিংবা মুক্তি দাবি করেনি। জামাত নেতাদের বিচারে শাস্তি হলে পাকিস্তান পার্লামেন্ট বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু খালেদা ও তারেক প্রশ্নে পাকিস্তানও নীরব। বলাই বাহুল্য, বহু সমালোচিত ও দ-িত তারেক জিয়া কার্যকরী চেয়ারপারসন হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো সাপোর্ট পাওয়া এখন দিল্লি দুরস্তের মতো ব্যাপার-স্যাপার হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির বিচ্ছিন্নতা চরমে উঠবে।
সব মিলিয়ে বিএনপি এখন দাঁড়িয়ে আছে ক্রস রোডে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিএনপি এটা প্রমাণ করেছে এবং সর্বমহলেই স্বীকৃত যে, গণসম্পৃক্ত আন্দোলনের দল নয় বিএনপি। সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী, দলছুটদের নিয়ে ক্ষমতায় থেকে ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠা পাওয়া দল হচ্ছে বিএনপি। যদি আন্দোলনের দল নয় কথাটাকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারে বিএনপি, তবে দলটির ভবিষ্যৎ আছে। আর যদি না পারে তবে দুর্ভোগ দুর্দশা ভাঙন বিচ্ছিন্নতা যে ভাগ্যে জুটবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট ঠিকই লিখেছে যে, ‘খালেদার সাজায় খোড়া হয়ে গেল বিএনপি’। ওই পত্রিকাটি আরও লিখেছে যে, ‘জেল থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ থাকলেও খালেদার ভাগ্য প্রায় নির্ধারিতই হয়ে গেছে বলা যায়। এই রায়ের ফলে জিয়া বংশের পতনের পথ প্রশস্ত হলো।’ অবস্থাদৃষ্টে সেটাই তো মনে হচ্ছে।

Category:

Leave a Reply