বিএনপি : বিনোদনের জন্য একটি ‘কৌশলগত’ পার্টি

Posted on by 0 comment

PMনূহ-উল-আলম লেনিন: গাধা না-কি পানি ঘোলা না করে খায় না। বাজা দলের অর্থাৎ বিএনপি’র অবস্থা হয়েছে তাই। অবশেষে দলটি ‘বিশ^াসঘাতক’ এবং ‘বেইমান’ হিসেবে নিজেদের নাম লেখালো বিএনপি। পাঠক, ভুল বুঝবেন না, ওই দুটি বিশেষণ আমরা ব্যবহার করিনি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা প্রকাশ্যেই গণমাধ্যমের কাছে গত ২৮ এপ্রিলও ঘোষণা করেছিলেন, বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করলে এবং জাতীয় সংসদে যোগদান করলে তারা ‘বিশ^াসঘাতক’ ও ‘বেইমান’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। ২৪ ঘণ্টা না যেতেই বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত চারজন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং সংসদ অধিবেশনেও যোগদান করেন।
অথচ এর আগে ২৭ এপ্রিল বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ গ্রহণ করায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বিএনপি তাদের নির্বাচিত ছয় সদস্যের শপথ গ্রহণ ও সংসদে যোগদান নিয়ে গত প্রায় চার মাস যাবত মেলোড্রামা মঞ্চস্থ করে আসছে। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার মতো কোনো অবস্থাতেই এই ‘অবৈধ’ পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণার পাশাপাশি, তারা সরকার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লাগামহীন অপপ্রচার চালিয়েছে। বলেছে, সরকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, ভয়-ভীতি এবং প্রলোভন দেখাচ্ছে। অথচ ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যার পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম দলের গুশলান কার্যালয়ে গণমাধ্যমের কাছে বললেন, কোনো চাপ বা প্রলোভন নয়, কৌশলগত কারণে দলীয় চার এমপি শপথ নিয়েছেন।
বেচারা নিধিরাম সরদার! এই চারজন যে শপথ নেবেন তার বিন্দু বিসর্গও তিনি বা তথাকথিত নীতি-নির্ধারক স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ জানতেন না। শপথ গ্রহণকারী বিএনপি দলীয় এমপিগণ বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে শপথ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তারা শপথ নিয়েছেন।’ রাতে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম এই বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করেন।
বস্তুত দলীয় সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই শপথ নিতে অনড় ছিলেন বিএনপি থেকে বিজয়ী পাঁচ সদস্য। সরকারের চাপে নয়, বিএনপি দলীয় ঐক্য রক্ষার জন্য এই পাঁচ সদস্যের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি কৌতুকের সৃষ্টি করে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ ফোরাম দলের স্থায়ী কমিটি। স্থায়ী কমিটি আগেই শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ২৯ এপ্রিল, স্থায়ী কমিটির অজ্ঞাতে, তাদের মতামত না নিয়েই তারেক রহমান একক সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য হন। অন্যথায় না-কি দলে বিভেদ সৃষ্টি হতো, দল ভেঙে যেত। কয়েকদিন আগেই মির্জা ফখরুল, মোশাররফ ও গয়েশ^র গং জোরের সাথে বলেছেন বিএনপি যৌথ নেতৃত্বেÑ যৌথ সিদ্ধান্তে চলে।
কিন্তু হায়, এ কি হলো? বিএনপি স্টাইলের গণতন্ত্রের মুখে চুন-কালি মেখে দিয়ে দুর্নীতির জন্য দ-প্রাপ্ত, খুনের আসামি এবং পলাতক বলে বিবেচিত তারেক রহমান বুড়ো-ধাড়ি নেতাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং তাদের ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে বিএনপির শ্যাম ও কুল রক্ষার চেষ্টা করলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতারা এজন্য অপমানিতবোধ করেছেন, তেমনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ‘ঐক্যফ্রন্ট’ ও ২০-দলীয় জোটের নেতারাও এই সিদ্ধান্তে হতভম্ব হয়েছেন। ঐক্যফ্রন্ট ও নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না প্রকাশ্যেই গণমাধ্যমের কাছে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের ‘বিএনপি জিজ্ঞেসও করেনি। এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঐক্যের পরিপন্থী।’ ঐক্যফ্রন্টের নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘সিদ্ধান্তটি পদ্ধতিগতভাবে ভুল।’ ৩০ এপ্রিল প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, ‘সিদ্ধান্তটি ইউটার্ন ও চমক সৃষ্টি করেছে।’ আবার সাথে সাথে এ-কথাও বলেছেন, ‘ভয়াবহ দানব-কে পরাজিত করার জন্যই শপথ নেওয়া হয়েছে।’ (প্রথম আলো, ১ মে ২০১৯)।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য অনুযায়ী বিএনপি থেকে নির্বাচিত শপথ গ্রহণকারী পাঁচ সদস্যেরই দায়িত্ব ‘ভয়াবহ দানব’কে পরাজিত করা। দলের মহাসচিব এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যদের এ-ব্যাপারে কোনো দায়িত্ব নেই। অদ্ভুত যুক্তি বটে!
প্রশ্ন হলো এই পাঁচজন সদস্যের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে এত নাটকীয়তার কেন প্রয়োজন হলো। কেন এত পানি ঘোলা করা হলো। কেনই বা দলের মহাসচিব শপথ নিলেন না?
এর উত্তর খুব সহজ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান দলের অনিবার্য আনুষ্ঠানিক ভাঙন ঠেকাতে সংসদে যোগদানে ইচ্ছুক সদস্যদের চাপের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে দৃশ্যত বিএনপির ঐক্য আপাতত রক্ষা পেলেও বাস্তবে তো বিএনপি ইতোমধ্যেই একাধিক উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য এবং দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য, নেতা-কর্মী বিএনপি নেতৃত্ব অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি তাদের আস্থা হারিয়েছেন।
বিএনপি বস্তুত আইসিইউ’তে। দেশের ও দলের স্বার্থ নয়, খালেদা-তারেকের কাছে তাদের ব্যক্তিগত পারিবারিক স্বার্থই বড়। খালেদা-তারেক তাদের কৃত অপরাধের জন্য, পর্বতপ্রমাণ দুর্নীতির জন্য দেশের প্রচলিত আইনে আদালতের বিচারে দ-প্রাপ্ত আসামি। বিএনপি মুখে যত বড় বড় বুলিই আওড়াক না কেন, তাদের রাজনীতির একমাত্র এজেন্ডা খালেদা-তারেককে মুক্ত করা। একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার শীর্ষে থেকে বিদেশ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া জিয়া অরফানেজের অর্থ অর্থাৎ এতিমের টাকা আত্মসাৎ করার মতো গর্হিত অপরাধ করার পরও তাকেই দলের প্রধান রেখেছে বিএনপি। রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে প্যারোলে বিদেশে গিয়ে চুটিয়ে রাজনীতি করছেন তারেক রহমান। তার বিরুদ্ধেও মানিলন্ডারিংসহ দুটি মামলায় কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় উচ্চ আদালতের বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি। খালেদা কারাগারে বিধায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হয়েছে হত্যা ও দুর্নীতির মামলায় দ-প্রাপ্ত এবং আইনের চোখে পলাতক তারেক রহমানকে। তিনি লন্ডনে বসে স্কাইপে দলীয় স্থায়ী কমিটির সভায় অংশগ্রহণ করেন এবং তথাকথিত স্থায়ী কমিটির তোয়াক্কা না করে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। গত সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনে বিএনপি ৭০০ জনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তারেক রহমান এই সুযোগে মনোনয়ন প্রার্থীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এজন্য ইংল্যান্ডে তারেক ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।
দলটি এখন এমনই দেউলিয়া যে, নীতি-নৈতিকতা এবং স্বীকৃত রীতি-পদ্ধতির ধার না ধেরে, এই দুই ‘অপরাধী’কেই দলের কা-ারি করতে বাধ্য হচ্ছে। দলের স্থায়ী কমিটিতে অনেক প্রবীণ নেতা থাকা সত্ত্বেও, তাদের মধ্য থেকে কাউকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে ভরসা পায় না খালেদা পরিবার এবং তাদের বংশবদ স্থায়ী কমিটি গং। পুরো দলটিই এখন খালেদা-তারেকের কাছে জিম্মি।
এ-কারণে দলের মধ্যে পুঞ্জিভূত হয়ে উঠছে ক্ষোভ-বিক্ষোভ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বিএনপির নেতৃত্বের শূন্যতা, কাপুরুষতা, কোনো ঝুঁকি গ্রহণে অনীহা এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা দলটিকে অনিবার্য বিলুপ্তি বা ভাঙনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংসদে যোগদান করা না করা নিয়ে মির্জা ফখরুলের ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ, স্থায়ী কমিটির সদস্যদের উষ্মা প্রকাশ এবং শেষ পর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ প্রমাণ করেছে বিএনপি এখন একটি লোক হাসানোর ‘বিনোদন পার্টিতে’ পরিণত হয়েছে। ‘কৌশলগত’ কারণে মির্জা ফখরুলের শপথ না নেওয়া আবার কৌশলগত কারণে অন্য পাঁচ সদস্যের শপথ গ্রহণ বিএনপিকে দেশবাসীর সামনে হাস্যোস্পদ করে তুলেছে। বিএনপি এখন আর কর্মসূচি এবং আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল থাকছে না। হয়তো শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বিএনপি একটি ‘কৌশলগত’ দল।
জাপানে হারিকিরি বলে আত্মহননের একটি প্রথা চালু আছে। বিএনপি এখন সেই হারিকিরির মতো আত্মহননের পথ ধরেছে। অন্যদিকে, সার্কাস পার্টির ক্লাউনের মতো জনগণের চিত্ত বিনোদনের জন্য নানারকম কসরত বা ‘কৌশল’ প্রদর্শন করে চলেছে। আর এসব কারণে বিএনপির বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সম্প্রতি স্বয়ং মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, সংসদে যোগদানের বিষয়ে বিএনপি প্রথমেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভুল করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রকাশ্যেই ফখরুলের সমালোচনা করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের পর বিদ্রোহী বিএনপির পাল্টা কমিটির মহাসচিব মেজর হাফিজ দলীয় সংসদ সদস্যদের শপথের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই পক্ষে-বিপক্ষে প্রকাশ্যেই মতামত দিচ্ছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন।
দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, দিশাহীন বিএনপি-কে অনিবার্য ভাঙনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা।

Category:

Leave a Reply