বিক্রমপুরে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ আবিষ্কৃত

2-6-2019 8-41-35 PMআরিফ সোহেল: প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র বিক্রমপুরের মুন্সিগঞ্জে এবার আবিষ্কৃত হয়েছে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ। গত ২২ জানুয়ারি রামপালের বল্লালবাড়িতে আবিষ্কৃত মৃৎ পাত্র, ইট, কাঠ-কয়লা ও ইটের টুকরো তার সাক্ষ্য বহন করে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতœতত্ত্ব খননের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে আরেকটি নব ইতিহাসের। এর আগে নাটেশ্বর এবং রঘুরামপুরেও প্রতœস্থান খুঁজে পেয়েছে এই সংগঠনটি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ও চীনের একদল প্রতœতাত্ত্বিক যৌথভাবে এই কাজে সম্পৃক্ত। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে বিক্রমপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ যাত্রা শুরু করে। রামপালের বল্লাল বাড়িতে আবিষ্কৃত রাজা বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ ও মন্দির রয়েছে। দুদিনের পরীক্ষামূলক খননেই মাটির নিচে চাপা থাকা ৮০০ বছরের পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন খননকারীরা।
মুন্সিগঞ্জ সদরের রামপাল ইউনিয়নের বল্লালবাড়ি এলাকাটি বাংলার সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুর হিসেবে পরিচিত থাকলেও সেখানে রাজবাড়ির কোনো চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল না। দখল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটিতে চারদিকে পরিখাবেষ্টিত এমন বিশাল বাড়িটি আবিষ্কারের জন্য এর আগে কোনো প্রতœতাত্ত্বিক খনন হয়নি। ড. নূহ-উল-আলম লেনিনের নেতৃত্বে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শন ও প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ উদ্ধারে ২০১১ সাল থেকে প্রতœতাত্ত্বিক দেশের খ্যাতিমান প্রতœতত্ত্ববিদ ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে জরিপ ও খননকাজ শুরু হয়। এতে রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে আবিষ্কৃত হয় হাজার বছরের বৌদ্ধবিহার ও টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বরে বৌদ্ধমন্দির। আর এবার একই ইউনিয়নের বল্লালবাড়ি এলাকায় আবিষ্কৃত হলো সেন আমলের রাজবাড়ি। বল্লালবাড়িতে খননকাজ শুরুর আগে জমি দখল অধিকারে থাকা মালিকদের অনুমতি নিয়েই খননকাজ শুরু করা হয়েছে।
সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা বিজয় সেন ও বিলাস দেবীর ছেলে বল্লাল সেন ১১৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাবার মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১১৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ২০ বছর রাজত্ব করেন। তিনি তার নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিক্রমপুরের রামপালে। কিন্তু সেই রাজধানীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে মুন্সিগঞ্জে বল্লালবাড়ি একটি জায়গা রয়েছে। সেখানের একটি স্পটে খনন করেই মূল মাটির ২-৩ ফুট নীচে প্রাচীন ইট, ইটের টুকরো, মাটির পাত্রের টুকরো, কাঠ-কয়লা পাওয়া গেছে। প্রথমে খননকাজ শুরু হলে প্রাচীন প্রতœস্থানের নিদর্শনস্বরূপ এসব জিনিসই পাওয়া যায়। পরে বিস্তৃত আকারে খনন করলে মূলত দেয়াল বেরিয়ে আসে। যেমনটি পাশর্^বর্তী রঘুরামপুরে ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বরে পাওয়া গেছে। খননকাজটি চালিয়ে যেতে পারলে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ, মন্দির, রাস্তাঘাট সবকিছুই পাওয়া যাবে। ভূ-প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে রাজা বল্লাল সেনের প্রাসাদ বা দুর্গ হারিয়ে গেছে বহুকাল আগেই। একটি ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রাচীন বিক্রমপুরের ইতিহাসের নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে বলেন, প্রায় ৮০০ বছর প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল এই বিক্রমপুরে। তাই এখানে ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু কখনও এই রাজধানী বা রাজপ্রাসাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজকের খননের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা লক্ষ করছি, তা আমাদের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে। উল্লেখ্য, খননকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং চীনের অধ্যাপক চাই হোয়াংবো।
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, সেন বংশের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। খননের মধ্য দিয়ে সেন বংশের ইতিহাস ও তৎকালীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুরের ইতিহাস বৈজ্ঞানিকভাবে বের হয়ে আসছে। যা বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে। খুঁজে পাওয়া নিদর্শন নিয়ে গবেষণা করা হবে। এগুলো থেকে প্রাচীন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বল্লালবাড়িতে পরীক্ষামূলক খনন শুরু হয়েছে। ২১ জানুয়ারি মাত্র ৯ বর্গমিটার খননেই বেরিয়ে আসে প্রাচীন বসতির গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য স্থাপত্যের চিহ্নরেখা। প্রথম দিনই উন্মোচিত হয় সেন রাজবাড়ির প্রতœতত্ত্ব নিদর্শন পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা।
মাত্র দুদিনে পরীক্ষামূলকভাবে ২১-২২ জানুয়ারি খনন করে এই বল্লালবাড়ি আবিষ্কার করা হয়েছে। একটি পানের বরজের মাটি খুঁড়ে দলটি এই প্রতœনিদর্শন পায়। এখান থেকে পাওয়া চারকোল দিয়েও তাই সহজেই এটার বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব। সংগ্রহকৃত চারকোলটি আমেরিকান ল্যাবরেটরি বেটাতে পাঠানো হবে। সেখানে কার্বন পরীক্ষা শেষে সংগ্রহ করা নমূনা কত বছর আগের তা জানা যাবে।
প্রতœতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সন্ধান করে জানা গেছে, বল্লালবাড়ি এলাকাটি একটি দুর্গ। এটি বর্গাকার, প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ২৭২ মিটার। দুর্গের চারদিকে যে পরিখা [নালা] ছিল তা প্রায় ৬০ মিটার প্রশস্ত। রামপাল কলেজের পাশে এখনও একটি পরিখা দৃশ্যমান। অন্যগুলো ভরাট করে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। আবিষ্কৃত নিদর্শনের সময়কাল নির্ণয়ে এখন গবেষণা করা হবে।
মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, এই খননে প্রাচীন নিদর্শনের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিক্রমপুরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ ছাড়াও প্রতœতত্ত্বনগরী মুন্সিগঞ্জে আরও বেশি আকৃষ্ট করবে পর্যটকদের।
উল্লেখ্য, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী ও রামপাল অঞ্চলে প্রাচীন নিদর্শন ও প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ উদ্ধারে ২০১১ সাল থেকে প্রতœতত্ত্ব জরিপ ও খননকাজ হাতে নেয়। বৌদ্ধ ধর্মের প-িত অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটার কাছে ২০১৩ সালে প্রাচীন বৌদ্ধবিহারটি আবিষ্কার হয়। বিহারটি বিক্রমপুর বিহার নামে পরিচিত। আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারের ৫টি ভিক্ষু কক্ষ ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। একেকটি কক্ষের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৩ দশমিক ৫ মিটার করে। ধারণা করা হচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্মের জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে এই বিহারের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর গ্রামে দেড় হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধনগরীও আবিষ্কার করেছে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন। সেখানে খননে বেরিয়ে এসেছে বৌদ্ধমন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এই খননে দেড় হাজার বছর আগের বৌদ্ধযুগের নগরীর নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়।
শ্রীনগরের বালাসুরে জমিদার যদুনাথ রায়ের পরিত্যক্ত বাড়িতে অগ্রসর বিক্রমপুর সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়েই বিক্রমপুর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালের ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। বিক্রমপুর জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ১৯৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল।

Category:

Leave a Reply