বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ফিরে পেল সংসদ

Posted on by 0 comment

সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত

43বহুল আলোচিত ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সংবিধানের বর্তমান ৯৬ অনুচ্ছেদের এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে ফিরে এলো জাতীয় সংসদের হাতে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদেও সংসদের হাতেই এই ক্ষমতা ছিল। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ দলটির ৯ এমপি বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও দলের উপস্থিত এমপিরা সবাই বিলের পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারি জোট ১৪ দল, প্রধান বিরোধী দল জাপাসহ অন্যান্য ছোট বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে বিলের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে কোনোরকম বিরোধিতা ছাড়াই বিভক্তি ভোটে নির্বিঘেœ বিলটি পাস করেন।
পাস হওয়া বিলটিতে বলা আছে, প্রমাণিত অসদাচরণ বা বিচারকাজে অসামর্থ্যরে কারণে বিচারকের অপসারণ নির্ধারিত হবে সংসদের ভোটাভুটিতে। সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে নাÑ এমন বিধান সংযোজন করা হয়েছে সংশোধনীতে। বিলের দফা (৩)-এ বলা হয়েছেÑ কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ঠিক ৭টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। এর আগেই প্রায় কানায়-কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় অধিবেশন কক্ষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বেশিরভাগ সদস্যই এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ৭টা ৩৭ মিনিটে স্পিকার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আকারে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ সংসদের বিবেচনার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করতে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হককে আহ্বান জানান। বিলটির ওপর আনা জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব এবং বিভিন্ন দফায় আনা সংশোধনী প্রস্তাবসমূহ কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাওয়ার পর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে সংসদ লবিতে গিয়ে গোপন ব্যালটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিলটির শিরোনাম, দফা এবং উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতি স্পিকার পৃথকভাবে ভোটে দিলে প্রত্যেকবারই সংসদ সদস্যরা লবিতে গিয়ে ভোট দেন। ভোট গ্রহণের এই প্রক্রিয়া শেষ হয় রাত ১১টা ৬ মিনিটে। এরপর স্পিকার বিভক্তি ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন। বিলের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৩২৮টি, আর বিপক্ষে কোনো ভোট পড়েনি। পরে রাত ১১টা ৭ মিনিটে স্পিকার বিলটি পাস হলো বলে উল্লেখ করেন। এ সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সবাই একযোগে টেবিল চাপড়ে নিজেদের সমর্থন জানান।
অসামর্থ্যরে কারণেই কেবল অপসারণ হবে : আইনমন্ত্রী
সদস্যদের জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রস্তাবকারীদের অনেকের প্রশ্ন ছিলÑ এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে কিনা। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো হস্তক্ষেপ হবে না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাসের পরেই কেবল সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, বিলে বলা আছে, কেবলমাত্র প্রমাণিত গুরুতর অসদাচরণ ও বিচারকাজ করতে অসামর্থ্যরে কারণেই একজন বিচারককে অপসারণ করা যাবে। একজন বিচারক অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। আমরা বলে থাকি, আল্লাহর পরেই বিচারক। সেই কারণে তার হাতের ক্ষমতা ক্ষুণœ হোক, আমরা সেটির পক্ষে নই। তিনি বলেন, এই বিলটি পাসের ফলে জনগণের অধিকার, বিচার বিভাগের সম্মান-জবাবদিহিতা-পবিত্রতা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।
বিলটির প্রেক্ষাপট
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় উচ্চ আদালতের বিচারকদের পদের মেয়াদ নির্ধারণ ও তাদের সরানোর ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে যায়। চতুর্থ সংশোধনী বাতিল হলে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের আমলে এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অভিশংসনের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিলটি পাসের ফলে এখন আবার সংসদের হাতে বিচারকদের সরানোর ক্ষমতা ফিরল। তিন মাসের মধ্যে এই সংক্রান্ত আইন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
৯৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনের প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে
বিলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন বিচারক ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট
সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশে কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে। বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ছাড়া কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, গত ৭ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ওইদিনই বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে বিলের ওপর সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

Category:

Leave a Reply