‘বিপ্লব গোলাপের শয্যা নয়’

22

চির বিদায় ফিদেল কাস্ত্রো

রাজীব পারভেজ : কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ফিদেল কাস্ত্রো গত ২৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন একজন কিউবান রাজনৈতিক নেতা ও সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী। কিউবা বিপ্লবের প্রধান নেতা ফিদেল ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ থেকে ডিসেম্বর ১৯৭৬ পর্যন্ত কিউবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ তার স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিউবার মন্ত্রী পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ১৯৬১ সালে দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন কিউবা কমিউনিস্ট দলের প্রধান হিসেবে। এর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০৮ সালে তিনি তার দায়িত্ব ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে অর্পণ করেছিলেন। রাউল বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সহকারী প্রধান এবং মন্ত্রী পরিষদের প্রধান হিসেবে আছেন। এর আগে তিনি ১৯৫৯-২০০৮ পর্যন্ত ফিদেলের মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন।
হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সময় ফিদেল কাস্ত্রো তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। এরপর কিউবার রাজনীতিতে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় প্রেসিডেন্ট ফালজেন্সিও বাতিস্তা এবং কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা নিবন্ধ লিখে। তিনি এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। অবশেষে তিনি ১৯৫৩ সালে মনকাডা ব্যারাকে একটি ব্যর্থ আক্রমণ করেন এবং তারপর কারারুদ্ধ হন ও পরে ছাড়া পান। এরপর তিনি বাতিস্তার সরকার উৎখাতের জন্য সংগঠিত হওয়ার জন্য মেক্সিকো যান। ফিরে এসে ১৯৫৬-এর ডিসেম্বরে সরকার উৎখাতে নামেন।
পরবর্তীকালে কাস্ত্রো কিউবান বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের মদদে চলা বাতিস্তার স্বৈরশাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর কিছুদিন পরই কাস্ত্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হন এবং কিউবাকে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে রূপ দেন। ১৯৭৬ সালে তিনি রাষ্ট্র ও মন্ত্রী পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি কিউবার সর্বোচ্চ সামরিক পদেও ঈড়সধহফধহঃব বহ ঔবভব (ঈড়সসধহফবৎ রহ ঈযরবভ) আসীন হন।
সারাবিশ্বে যখন কমিউনিস্ট সরকারগুলো ধসে পড়ছে ঠিক তখন কমিউনিস্ট ব্যবস্থার বৃহত্তম শত্রু বলে পরিচিত আমেরিকার দোরগোড়াতেই সমাজতন্ত্রের ধ্বজা তুলে ধরে রেখেছিলেন কাস্ত্রো। তার সমর্থকরা তাকে সমাজতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখতেন, যিনি জনগণের কাছে কিউবাকে ফেরত দিয়েছিলেন। তবে বিরোধীদের প্রতি চরম দমন-পীড়নের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মার্কসবাদ
১৯৪৮ সালে কিউবার ধনী এক রাজনীতিবিদের কন্যা মার্টা ডিয়াজ বালার্টকে বিয়ে করেন কাস্ত্রো। এই বিয়ের মাধ্যমে দেশটির এলিট শ্রেণিতে যুক্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তার; কিন্তু তার বদলে তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলেন মার্কসবাদে। তিনি বিশ্বাস করতেন কিউবার লাগামহীন পুঁজিবাদের কারণে দেশটির যাবতীয় অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব এবং একমাত্র জনগণের বিপ্লবের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকানোর পর আইন পেশা শুরু করেন; কিন্তু এই পেশায় তিনি সফল হতে ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে দেনায় ডুবে যান তিনি। এই পরিস্থিতিতেও রাজনীতি অব্যাহত রাখেন। প্রায়ই সহিংস বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়তেন তিনি।
দ্য মুভমেন্ট
১৯৫২ সালে ফুলগেন্সিও বাতিস্তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কার্লোস প্রিয়র সরকারকে উচ্ছেদ করেন। বাতিস্তার সরকারের নীতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতোই, যা ছিল কাস্ত্রোর বিশ্বাসের পরিপন্থী। ফলে বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের জন্য তিনি একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন, যার নাম ‘দ্য মুভমেন্ট’। এ সময় কিউবা পরিণত হয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল ধনীদের স্বর্গরাজ্যে। যৌন ব্যবসা, জুয়া এবং মাদক চোরাচালান চরম আকার ধারণ করেছিল। সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশে ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে সান্টিয়াগোর কাছে মোনাকাডা সেনা ছাউনিতে একটি আক্রমণের পরিকল্পনা করেন কাস্ত্রো। আক্রমণটি ব্যর্থ হয় এবং বহু বিপ্লবী নিহত হয়, নয় তো ধরা পড়ে। বন্দীদের মধ্যে কাস্ত্রোও ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের শুনানিগুলো কাস্ত্রো ব্যবহার করতেন সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাবলী ফাঁস করে দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে। এ সময় শুনানিগুলোতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল। ফলে কাস্ত্রোর জনপ্রিয়তা এ সময় বেড়ে যায়। কাস্ত্রোকে অবশ্য ১৫ বছরের কারাদ- দেন আদালত।
গেরিলা যুদ্ধ
সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে ১৯৫৫ সালের মে মাসে জেল থেকে ছাড়া পান কাস্ত্রো। জেলে থাকার সময়েই স্ত্রীকে তালাক দেন তিনি এবং মার্কসবাদে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন। ছাড়া পাওয়ার পর ফের গ্রেফতার এড়াতে মেক্সিকো পালিয়ে যান তিনি। সেখানে তার পরিচয় হয় আরেক তরুণ বিপ্লবী আরনেস্তো চে গুয়েভারার সাথে। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে ১২ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিন নৌকায় ৮১ সশস্ত্র সঙ্গীকে নিয়ে কিউবায় ফিরে আসেন ফিদেল কাস্ত্রো। তারা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং এখান থেকে হাভানার সরকারের বিরুদ্ধে দুবছর ধরে গেরিলা আক্রমণ চালান। ১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি বিদ্রোহীরা হাভানায় প্রবেশ করে। বাতিস্তা পালিয়ে যান। এ সময় বাতিস্তার বহু সমর্থককে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। এসব বিচার কার্যক্রমকে অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষকই ‘অনিরপেক্ষ’ বলে মনে করেন।
আদর্শভিত্তিক কর্মসূচি
কিউবার নতুন সরকার জনগণকে সব জমি বুঝিয়ে দেওয়ার এবং গরিবের অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু একই সাথে দেশে একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। রাজবন্দি হিসেবে বহু মানুষকে কারাগারে এবং শ্রমশিবিরে প্রেরণ করা হয়। হাজার হাজার মধ্যবিত্ত কিউবান বিদেশে পালিয়ে নির্বাসন নেন। ১৯৬০ সালের কিউবাতে থাকা সব মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে নিয়ে নেওয়া হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর একটি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা একবিংশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু
বিপ্লবের সময় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া এবং এর নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের সাথে মিত্রতা তৈরি হয় কাস্ত্রোর। ফলে কিউবা পরিণত হয় ঠা-া যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা চালায় একদল নির্বাসিত কিউবানকে দিয়ে দ্বীপটি দখল করিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়, বহু মানুষ এ সময় নিহত হন, হাজার খানেক মানুষ ধরা পড়ে। এ ঘটনা পরবর্তীতে কিউবা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফিদেল কাস্ত্রো আমেরিকার এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হন। সিআইএ তাকে হত্যার চেষ্টাও করে।
অবসর
কাস্ত্রোর শাসনামলে কিউবায় অবশ্য বহু অভ্যন্তরীণ উন্নয়নও হয়েছে। দেশটির প্রতিটি নাগরিকই বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা পায়। বিশ্বের বহু উন্নত দেশের তুলনায় কিউবায় শিশুমৃত্যুর হার কম। শাসনামলের শেষ ১০ বছরে নিজের বিপ্লবকে বাঁচাতে মুক্ত বাণিজ্যের কিছু কিছু দিক গ্রহণ করতে বাধ্য হন কাস্ত্রো। ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই ৮০তম জন্মদিনের কয়েকদিন আগে ভাই রাউলের হাতে সাময়িক শাসনভার দিয়ে একটি জরুরি অস্ত্রোপচারে যান তিনি। ২০০৮ সালের গোড়ার দিকে তিনি অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সাথে তুলনা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর। বঙ্গবন্ধু সারাবিশ্বের কাছে নিঃশর্ত সাহায্য চেয়েই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে কোনো আপস তিনি করবেন না। ১৯৭৪ সালের জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সভায় আলজেরিয়ায় কিউবার মহান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে বৈঠক হয় বঙ্গবন্ধুর।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, তার সিদ্ধান্ত, অবিচলতা নিয়ে বলতে গিয়ে কাস্ত্রো বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।’ বঙ্গবন্ধুকে প্রথমবার দেখে কাস্ত্রো এই উক্তি করেছিলেন।
কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালিদের পক্ষে দাঁড়ানো ফিদেল কাস্ত্রোকে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায়’ ভূষিত করা হয়।

Category:

Leave a Reply