বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে

Posted on by 0 comment
9

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: আমি আরও উল্লেখ করি যে, বাংলাদেশ সরকার বাস্তবঘনিষ্ঠ উদ্ভাবনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।

উত্তরণ ডেস্ক: গত ১১ এপ্রিল ভারত সফর নিয়ে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত ভাষণ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে গত ৭ থেকে ১০ই এপ্রিল আমি ভারতে রাষ্ট্রীয় সফর করি। বর্তমান মেয়াদে ভারতে এটিই ছিল আমার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ও পানিসম্পদ মন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী, অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং উচ্চ পর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল সফরসঙ্গী ছিলেন। ভারতে অবস্থানকালে আমি ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথেয়তা গ্রহণ করি।
৭ই এপ্রিল আমি নয়াদিল্লির পালাম বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে পৌঁছালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি আমাকে স্বাগত জানান। একই দিন বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীমতি সুষমা স্বরাজ এবং ৯ই এপ্রিল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী শ্রীমতি সোনিয়া গান্ধী আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
৮ই এপ্রিল সন্ধ্যায় আমি ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি জনাব হামিদ আনসারীর সঙ্গে এবং ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করি। ভারতের রাষ্ট্রপতি আমাদের সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক আমার দেখামতে বর্তমানে সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ। আমি তাঁকে বাংলাদেশ সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ভারতের রাষ্ট্রপতি আয়োজিত মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৈশভোজে আমি অংশগ্রহণ করি।
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ৮ এপ্রিল সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করেন। এরপর আমি রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। একই দিন আমি হায়দ্রাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করি এবং পরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হই।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সুরক্ষা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, আন্তঃযোগাযোগ তথা কানেকটিভিটি, জনযোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আমরা নিজ নিজ দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত পোষণ করি।
আলোচনাকালে আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ২৫শে মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে গৃহীত হওয়ার কথা জানাই। প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়ে আমাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই সফরে গতানুগতিক চলমান সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্রসমূহ, যেমনÑ বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও মহাকাশ গবেষণা, ভূ-ত্বাত্তিক জরিপ, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা, ভারতীয় অনুদানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ত্রিদেশীয় অংশগ্রহণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ভারত সরকার ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নমনীয় ঋণের ঘোষণা প্রদান করে। এ অর্থ দিয়ে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়াও সামরিক খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার নমনীয় ঋণ প্রদান করবে ভারত। আমরা যৌথভাবে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-এর হিন্দি সংস্করণের মোড়কও উন্মোচন করেছি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি আমাদের দুই সরকারের আমলেই সম্ভব হবে বলে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ সফরে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে মোট ৩৫টি দলিল স্বাক্ষরিত হয় (তালিকা সংযুক্ত)। এগুলোর মধ্যে ১১টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক ২৩টি। বাংলাদেশ এবং ভারতের সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অর্থনৈতিক এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত ৯ বিলিয়ন ডলারের ১৩টি চুক্তি এবং এমওইউ এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ভারতের গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ দিল্লিস্থ ‘পার্ক স্ট্রিট’-এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রোড’।
আমি, প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যৌথভাবে খুলনা-কলকাতা রুটে যাত্রিবাহী রেল ও বাস চলাচল এবং বিরল (দিনাজপুর)-রাধিকাপুর (ভারত) রুটে পণ্যবাহী রেল চলাচলের উদ্বোধন করেছি।
একই দিন বিকেলে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী/সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সদস্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদানের উদ্দেশ্যে নয়াদিল্লির ‘মানেকশ সেন্টারে’ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে এক স্মারক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ১৯৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা, বর্তমানে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিসহ প্রায় ৯০০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আমি ১৯৭১ সালে শহীদ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাতজন সদস্যের নিকটাত্মীয়ের হাতে সাইটেশন এবং সম্মাননা পদক তুলে দেই। অনুষ্ঠানে বক্তৃতাদানকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী/সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ১ হাজার ৬৬১ জন শহীদ সদস্যকে ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদানের এ মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
বক্তব্য প্রদানকালে তিনি ১৯৭৫ সালে নিহত বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের ১৬ জন সদস্যের কথা স্মরণ করেন। পরিবারের সদস্যদের হারিয়েও জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার উদ্দেশ্যে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার জন্য তিনি আমার প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা প্রদানের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন তাঁর সরকার প্রতিবছরে ১০০ জন করে মুক্তিযোদ্ধাকে বিনা খরচে চিকিৎসা প্রদান করবে। এ ছাড়া তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের বৃত্তির সংখ্যা আরও ১০ হাজার বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন যে, বঙ্গবন্ধু সারাবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান নেতা হিসেবে পরিচিত। ৮ই এপ্রিল ভারত-বাংলাদেশ ৬২-দফা সংবলিত একটি যৌথ বিবৃতি/ইশতেহার প্রকাশ করে, যাতে দুদেশের চলমান সম্পর্ক এবং এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
৯ই এপ্রিল আমি আজমির শরিফে হযরত খাজা মাঈনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ)-এর মাজার শরিফ জিয়ারত করি এবং আমাদের দেশ ও জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি।
সফরের শেষ দিনে ১০ই এপ্রিল আমি ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেই। এই অনুষ্ঠানে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রবীণ নেতা, দলের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ও প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী এলকে আদভানি, ভারতের মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমানা চুক্তি সর্বসম্মতিক্রমে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভাতে পাস হওয়ায় আমি বিজেপিসহ সকল রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ জানাই। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমি বাংলাদেশ যে সার্বভৌম দেশ, তা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করি এবং একই সাথে বাংলাদেশ যে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত, তা উল্লেখ করি। আমি আরও বলি যে, বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং বিবাদের মাধ্যমে কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয় বলে মত প্রকাশ করি।
এই অনুষ্ঠানের পর, আমি বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিজনেস ফোরামে যোগদান করি। আমি ফোরামে বাংলাদেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের চিত্র তুলে ধরি এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাই।
আমি আরও উল্লেখ করি যে, বাংলাদেশ সরকার বাস্তবঘনিষ্ঠ উদ্ভাবনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। আমি নিশ্চিত একসঙ্গে কাজ করলে, এ অঞ্চলের মানুষের জীবন আমরা বদলে দিতে পারব।
বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এবং বর্তমানে তা এক বিশেষ উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।
পারস্পরিক সহযোগিতা-বিশ্বস্ততা-বন্ধুত্বের বহুমুখী সম্পর্ক এই সফরের মাধ্যমে আরও সুসংহত হয়েছে। সফরকালে আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

Category:

Leave a Reply