বিশ্বকাপ ক্রিকেট স্বপ্নরঙিন হাতছানি

Posted on by 0 comment

PddMআরিফ সোহেল: অর্জনের রেকর্ডবুকে বাংলাদেশের আরেকটি নতুন অধ্যায় রচিত হলো। বহুজাতিক আসরে শিরোপা না পাওয়ার কষ্ট শেষ। বিশ্বকাপ ক্রিকেট মিশন শুরুর আগে ক্রিকেটপাগল বাঙালিদের কাছে এ এক বড় প্রাপ্তি। আয়ারল্যান্ডে তিন জাতি ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলও এক ফুৎকায় উড়ে গেছে বাংলাদেশের কাছে। ধারাবাহিক পারফরমেন্সে উদ্বেলিত-উজ্জীবিত বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন স্বপ্নের ঘুড়ি উড়তে শুরু করেছে।
দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ভাস্বর বাংলাদেশ এখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। যেই বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ খেলাই ছিল স্বপ্নারাধ্যের মতো। সেই বাংলাদেশই এখন অনেকের কাছে নতুন ‘শ্রীলংকা’। ঠিক ১৯৯৬ সালে শ্রীলংকার অবিকল দল বলার চেষ্টা করছেন। নতুন ফরমেটের বিশ্বকাপ আসরে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত এহেন কথা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। এমন কী পঞ্চম বিশ্বকাপেই শিরোপা জয়কে অসম্ভব দেখছেন না কেউ কেউ!
কেন তার অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এক্সপার্টরাÑ
এক. প্রথমত গত বিশ্বকাপের দুর্দান্ত ফর্ম। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ।
দুই. স্বাগতিক আয়ারল্যান্ড ও সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জয়।
তিন. ধারাবাহিক দলীয় পারফরমেন্স। গত দেড় বছরে ২৭ ওয়ানডের ১৭টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এ-সময় বিবেচনায় দল হিসেবে তৃতীয় বাংলাদেশ। তাদের ওপরে রয়েছে ইংল্যান্ড আর ভারত।
চার. ক্রিকেটপ্রাণ মাশরাফি বিন মর্তুজার বুদ্ধিদ্বীপ্ত বোলিং আর চৌকস অধিনায়কত্বে দলের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার ঈর্ষণীয় গুণ।
পাঁচ. ১৯৯৮ সালে ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়ার ২২ বছর পর কোনো টুর্নামেন্টের বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা জয়ের অনুপ্রেরণা।
ছয়. বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার। উল্লেখ্য, সদ্য প্রকাশিত আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে সাকিব বিশ্বকাপে এক নম্বর অলরাউন্ডার হিসেবে খেলতে যাচ্ছেন।
আয়ারল্যান্ড পর্ব শেষ করে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মঞ্চে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ দল। ৩০ মে পর্দা উঠেছে ক্রিকেটের মহা-আয়োজনের। ব্রিটিশ রাজ প্রাসাদের মলচত্বরে হয়ে গেছে ১২তম বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরের জমকালো উদ্বোধন। ১ জুন থেকে মাঠের লড়াই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ ২ জুন। প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা।
ত্রিদেশীয় সিরিজে শিরোপা জয়। শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দু-দফা হারিয়ে বাংলাদেশ শতভাগ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে। তাই এক্সপার্টরা মাশরাফির বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছেন। সম্প্রতি সময়ে দারুণ খেলছে বাংলাদেশ। এই আসরে প্রাপ্তি-অর্জন বড্ড কাজে লাগবে বিশ্বকাপে। বিশেষ করে পেসারদের গুঁড়িয়ে-উড়িয়ে হুক-পুলের অভিজ্ঞতা ইংলিশ কন্ডিশনে খুব কাজে লাগবে। ওয়ানডেতে তামিম, মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর পাশাপাশি লিটন, সৌম্য, মোসাদ্দেক, মিরাজ, জায়েদের ওপরও এখন নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে অভিজ্ঞতা আর সৌরভময় তারুণ্যের দৃঢ়তায় বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য।
ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার অনিল কুম্বলে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে দারুণ খেলছে। তিনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আলাদাভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বকাপে এবার অন্যরকম বাংলাদেশকে দেখা যাবে। ধারাবাহিকতা থাকলে তাদের সেমিফাইনাল খেলা নিশ্চিত।’
ভারতের সাবেক ওপেনার ও ধারা বিশ্লেষক আকাশ চোপড়া বলেছেন, ‘এশিয়ায় ভারতের পর দাপুটে দল হিসেবে এখন পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশকেই মনে করে ক্রিকেটপ্রেমীরা। আমার মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ নকআউট পর্বে উঠবে; মানে সেমিফাইনাল খেলবে।’
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম মাশরাফির বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলংকার প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক শ্রীলংকার মতো বাংলাদেশ দলে এখন শুরুতে ঝুঁকি নেওয়ার মতো ক্রিকেটার আছে, আছে তাদের সামর্থ্যও। আবার পরে ধরে খেলার ক্রিকেটারের সংখ্যাও কম নয়। এবারের বাংলাদেশ বিশ্বকাপে যে কোনো দলকেই ভড়কে দিতে পারে।
অন্যদিকে বাইরে থেকে বাংলাদেশ দলের শক্তি হয়ে দারুণ বোলিং-ব্যাটিং-ফ্লিডিং করছেন কোচ স্টিভ রোডস। তার মন্ত্রের উজ্জীবনী সুধা পান করে সিনিয়র-জুনিয়র সব ক্রিকেটাররাই দুর্দান্ত পারফরমেন্স করছেন। প্রথমবারের মতো ওয়ানডে টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ী দলের কোচ স্টিভ রোডস মনে করেন, পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের বাইরেও বাংলাদেশ শক্তি সঞ্চয় করেছে।
পরিসংখ্যানও আদরে কাছে টেনে নিয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ১৯ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলেছে দুটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আর এশিয়া কাপ। ৩টি টুর্নামেন্টেরই ফাইনালে উঠে শিরোপা জিতেছে একটিতে। এ-সময়ের নিষ্কণ্টক পরিসংখ্যানে ৩৫ ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের জয় ২৪টিতে। ৩৩ ম্যাচে ভারতের জয় ২২টিতে। শ্রীলংকার দেড় বছরে ২৬ ওয়ানডে খেলে জিতেছে মাত্র ৬টি ম্যাচে।
বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ড প্রস্তুতিটা দারুণ এবং সুচারুভাবেই সম্পাদন করেছেন মাশরাফিরা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বহুজাতিক আসরে শিরোপা জয়ের সঙ্গে টোটাল দল হিসেবে বাংলাদেশের ড্রেস রিহার্সসোসের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়েছে। এই আসরে ওপেনিং সংকট থেকে পরিত্রাণ, রান তাড়া করে জয়, চাপের মধ্যেও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার কৌশল, আশা জাগানিয়া ব্যাটিং এবং সব মিলিয়ে পেশাদার টিম বাংলাদেশ হয়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরুর আগে এক আসরে একগুচ্ছ প্রাপ্তি বাংলাদেশকে নিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিত করেছে।
কাটলো শিরোপা জয়ের অর্বাচীন গেরো। গত এক যুগে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ছয়-ছয়টি টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেও শিরোপা জিততে পারেনি বাংলাদেশ। অবশেষে সেই অমানিশার আঁধার কেটেছে আয়ারল্যান্ডে এবং তা দুর্দান্তভাবেই।
দুয়ারে বিশ্বকাপ; কিন্তু প্রথমবারের মতো ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের উৎসব এখনও চলছে। মাশরাফি-সাকিবরা উদযাপনে রং ছড়াতেই আয়ারল্যান্ড থেকে ছুটি পেয়েই দেশে ছুটে এসেছেন। প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। কথা বলেছেন মিডিয়ার সঙ্গে; বিশ্বকাপ আর ত্রিদেশীয় জয় ইতিহাস নিয়ে। বাংলাদেশ তার ক্রিকেটাতিহাসে ২০০৯ ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে উঠেছিল। এশিয়া কাপে ২০১২ ও ২০১৬ সালেও বাংলাদেশ ফানালিস্ট। কিন্তু এই ৩টিতেই ফাইনালে নাকাল বাংলাদেশ। ২০১৮ সালেও ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ ও নিদাহাস ট্রফিতে ফাইনালে উঠেও জয় থেকেছে সোনার হরিণ হয়েই। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, যে ম্যাচে ভারতের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালেও ভারতের কাছেই হেরেছিলেন মাশরাফিরা। স্মৃতির ক্যানভাসে ২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৮ উইকেটে হারের গল্পটাও ভেসে ওঠে।
তিন জাতি ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৬১ রান তাড়া করে বাংলাদেশ জিতেছে ৮ উইকেটে, ৪০ বল হাতে রেখে। পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৪৭ রান বাংলাদেশ টপকে গেছে ৫ উইকেট এবং ১৬ বল হাতে রেখে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯৩ রানের টার্গেটও স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে এবং ৪২ বল হাতে রেখে। এরপর বৃষ্টিবিঘিœত ফাইনাল ম্যাচে ২৪ ওভারে বাংলাদেশকে করতে হবে ২১০। অর্থাৎ ওভারপ্রতি রানের নামতা গুনতে হয়েছে ৮.৭৫। যদি ৫০ ওভারে এই রানরেট বিবেচনা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের টার্গেট ছিল প্রায় ৪৩৮! এই ম্যাচেও বাংলাদেশ সৌম্য-মোসাদ্দেকের দাপুটে ব্যাটিংয়ে ৭ বল হাতে রেখেই শিরোপা জয় করে।
দীর্ঘ দেড় মাসব্যাপী বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরে এবার ১০ দলের সবাই একে অন্যের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। পয়েন্ট টেবিলের সেরা চার উঠবে সেমিফাইনালে। টাইগারদের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ৮টি ভেন্যুতে ঘুরে ঘুরে বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বের ৯ ম্যাচ খেলবে মাশরাফি-সাকিবরা। সেখানে স্বপ্ন-সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। ‘বাংলাদেশ সেমিফাইনালও খেলতে পারে’ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের এই মুখবাক্যকে লাল-সবুজের অনুরাগীরা স্পটলাইন হিসেবে ধারণ করে বসে আছে।

Category:

Leave a Reply